পৃথক পৃথক সমাবেশ : নেপথ্য ঘটনা ও সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনা-সমালোচনা

প্রকাশিত: ৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২০
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও সমমনা ইসলামী দলের পৃথক পৃথক সমাবেশের চিত্র। ইসলামী আন্দোলনের সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীম (ডানে)। সমমনা ইসলামী দলের মঞ্চ ও নেতৃবৃন্দ (বায়ে)।

গতকাল রাজধানী ঢাকার বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট ও বিজয়নগর মোড়ে পৃথক পৃথক সমাবেশে ওলামায়ে কেরামদের নেতৃত্বে সারাদেশে ক্রমবর্ধন নারী নির্যাতন, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও সরকারের ফ্যাসিবাদী আচরণ নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল ও কর্মসূচী পালিত হয়েছে।

পৃথক পৃথক মিছিল সমাবেশের একটিতে নেতৃত্বে ছিলেন সমমনা ছয়টি ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ। অপরটিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ।

সমমনা ছয়টি দলের মধ্যে ছিলেন – মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ড. আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বে খেলাফত মজলিস, আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীর নেতৃত্বে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ড. মোঃ ঈশা শাহেদীর নেতৃত্বে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন, কাজী আবুল খায়েরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ।

অপরদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একক প্রোগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীম।

পৃথক পৃথক সমাবেশ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলামপন্থীদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা সমালোচনা চলছে। কেউ কেউ বলছেন – একই দাবিতে সমাবেশ তারপরও আলাদা আলাদা কেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে – প্রথমে গত ৯ অক্টোরব ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সারাদেশে চলমান ধর্ষণ ও নারী নিপিড়নের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক কর্মসূচী হিসেবে রাজধানী ঢাকার বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটসহ চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ ময়দান ও খুলনা মহানগরীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দিয়েছিলো। ধারাবাহিক কর্মসূচীর আওতায় গতকাল সব জায়গাতেই তাদের কর্মসূচী পালিত হয়েছে।

এরপর গত ১১ অক্টোবর সমমনা ইসলামী ছয় দল বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে ছয় দফা দাবি সামনে রেখে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়। প্রথমে সমাবেশটি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নামে ডাকার বিষয়টিও সামনে এসেছিলো কিন্তু পরবর্তিতে সমমনা ইসলামী ছয় দলের ব্যানারেই সমাবেশের প্রচার প্রচারণা হয়।

তবে সমমনা ইসলামী ছয় দলের পক্ষ থেকে তাদের যৌথ কর্মসূচীতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ডাকা হয়েছিলো কি না এ বিষয়টি পরিস্কার করে কেউ বলতে পারেনি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এক নেতা জানিয়েছেন – তাদেরকে ডাকা হয়েছে এমন কোনো খবর তারা শুনেননি।

এরপর উভয় দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় – সমমনা ইসলামী  ছয় দল তাদের সমাবেশ বায়তুল মোকাররমে নয় বরং বিজয়নগর এলাকায় করবে। তবে জুমার নামাজের পর তারা তাদের কর্মীদের একত্রিত করে বায়তুল মোকাররম থেকে মিছিল নিয়ে বিজয়নগরের দিকে যাবে। এরপর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ উত্তর গেটে তাদের সমাবেশ ও বিক্ষোভ কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

এই সমঝোতার ভিত্তিতেই পরবর্তিতে সুষ্ঠুভাবে, কোনো সমস্যা ছাড়াই দুটি সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বায়তুল মোকাররমে মিছিল সমাবেশ করে এবং সমমনা ইসলামী ছয় দল বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে জুমার নামাজের পর মিছিল নিয়ে বিজয়নগর চলে যায় এবং সেখানেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। পরবর্তিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মিছিলও বিজয়নগরের কাছাকাছি পর্যন্ত যায় এবং পুলিশের বাধায় মিছিল সমাপ্ত করে দেয়।

পরবর্তিতে সমাবেশের পর রাতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ বিষয়টিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে দোষারোপ করা শুরু করে।

সোস্যাল মিডিয়া অ্যাকটিভিস্ট ও জমিয়তের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত, মুফতী আমিনী রহ. এর দৌহিত্র আশরাফ মাহদী বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে লেখেন – ‘জুমার নামাজ শেষ হতেই ইসলামী আন্দোলনের ভাইয়েরা জুমার সালাম ফেরানের সাথে সাথেই তাকবীর দিয়ে উত্তর গেইটের মূল জায়গায় তাদের ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।’ এছাড়াও বিষয়টিকে তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কিছু কর্মীদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ হিসেবে অভিহিত করেন এবং সমমনা দলের প্রোগ্রাম বাধাগ্রস্থ হওয়ার দাবি করেন। ফেসবুকে তার আইডিতে দেওয়া পোস্টে বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনা সমালোচনাও হয়।

যদিও তিনি মিছিলে ছিলেন বা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এমন কিছু জানা যায়নি। বরং একটি সূত্র থেকে জানা গেছে তিনি বর্তমানে মিশরে অবস্থান করছেন।

এছাড়াও সমমনা ইসলামী ছয় দলের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন কর্মীরা অনেকেই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ধরণের লেখালেখি করেছেন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে দোষারোপ করছেন।

জনপ্রিয় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট সাইমুম সাদী লিখেছেন – “আজ বায়তুল মোকাররমে আলাদা আলাদা সমাবেশ, দু এক জায়গায় হাল্কা ধাক্কাধাক্কি, জুমার নামাজের সালাম ফেরানোর সাথে সাথেই শ্লোগান এবং সিড়ি ও সমাবেশের স্থান দখলে রাখার প্রচেষ্টা কিছুটা বিব্রত হতে হয়েছে আমাদেরকে।”

তবে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে – বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ শেষ হওয়ার প্রায় ৩০ মিনিট পর উত্তর গেটে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বিক্ষোভপূর্ব সমাবেশ শুরু হয়েছে। এর আগে দলের স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের ব্যানার নিয়ে উত্তর গেটের পাশেই দাড়িয়ে ছিলেন। মাইক থেকে দলের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বারবার তাদের কর্মীদের বলে দিয়েছিলেন – যাতে সমমনা ইসলামী দলের বিক্ষোভ মিছিলটি সুষ্ঠুভাবে বিজয়নগরের দিকে যেতে পারে। এমনকি তাদেরকে সুশৃঙ্খলভাবে যেতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কর্মী সমর্থক ও স্বেচ্ছাসেবকরা পথ করে দিয়েছিলেন।

এছাড়াও শুক্রবার সকালেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অঙ্গ সংগঠন ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী জেনারেল দলীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে ফেসবুকে পোস্ট করে জানিয়েছিলেন – “বায়তুল মোকাররম উত্তর গেইটে আজকের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য যারা আসবেন তাদের জ্ঞাতার্থে- বাদ জুমা বায়তুল মোকাররম উত্তর গেইটে একই সময়ে আজ ভিন্ন ব্যানারে দুটি কর্মসূচি রয়েছে। পূর্ব আলোচনার প্রেক্ষিতে জুমার নামাজের পরপরই “সমমনা ইসলামী দলসমূহ” তাদের মিছিল নিয়ে চলে যাবে। এরপরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। আশাকরি আমরা সবাই উভয় কর্মসূচীর সফলতা ও শৃঙ্খলার প্রতি সচেতন থাকবো ইনশাআল্লাহ।”

তবে প্রত্যক্ষদর্শী অপর একজন পাবলিক ভয়েসকে জানিয়েছেন – লোক উপস্থিতি অনেক বেশি হওয়ায় সেখানে অনেক কিছুই শৃঙ্খলার সাথে করা সম্ভব হয়নি। তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পোশাক পরিহিত স্বেচ্ছাসেবকরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন।

[বায়তুল মোকাররমে সমাবেশ শুরুর আগেই জুমার পূর্বে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবকরা উত্তর গেটে পৌঁছেছিলেন এবং সুশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন।]

  • আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা একজন পুলিশ কর্মকর্তা উভয় দলের সমাবেশ কার্যক্রম শেষে পাবলিক ভয়েসকে বলেছেন – ‘কোনোরুপ সমস্যা বা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই উভয় দলের সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে’।

উভয় দলের সমাবেশে যে যা বলেছেন :

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীম বলেন –

ভাইয়েরা আমার! ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। আল্লাহপাকের শোকর! আইন প্রণয়নও হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হল এই; বিশ্বের বহু দেশে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইন আছে, নাই তা নয়। কিন্তু ধর্ষণ কি বন্ধ হচ্ছে? এর কারণ খুঁজতে হবে।

আমরা কেউ মনে করি নগ্ন পোশাক ধর্ষণের জন্য দায়ি নয়। আলোচনা চলছে টক শো’তে। আলোচনা চলছে। যুক্তি চলছে। ধর্ষণ কেন হয়? আমরা একে অপরকে বিভিন্ন যুক্তি পেশ করছি। কুরআন ও যুক্তি পেশ করেছে।

আমি মনে করি বাংলাদেশ সরকারের উচিত একদল মনোবিজ্ঞানীদের মাধ্যমে গবেষণাভিত্তিক রিপোর্ট প্রকাশ করা। কিসের জন্য ধর্ষণ হয়? তা উদঘাটন করে সে পথকে বন্ধ করতে হবে।

মনোবিজ্ঞানী বাংলাদেশে আছেন। যদি নগ্ন পোশাক পুরুষদেরকে উত্তেজিতই না করে তাহলে নগ্ন পোশাক দায়ী নয়। আর যদি মনোবিজ্ঞানীরা বলেন এ পোশাক পুরুষকে উত্তেজিত করে তাহলে নগ্ন পোশাক দায়ী হবে। দেখেন! আজকে আপনি ভারতের; যার দিকে তাকানো যায় না এমন সিনেমাও চালু রাখবেন আর ধর্ষকদের ফাঁসির আইন করবেন?

আমি তো মনে করি, জানিনা! কত পুরুষ যেন এই ফাঁসিতে ঝুলতে থাকে! আমার মায়া লাগে, আপনি একজনকে বাঘের মুখে ঠেলে দিবেন আর বাঘকে বলবেন, খবরদার! আক্রমণ করবা না। এটা ইনসাফ হতে পারে না। বরং বাঘের থেকে দূরে রেখে তারপরে বাঘের থেকে বাঁচতে হবে।

আজকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইন হয়েছে, কিন্তু আমি অনুরোধ করবো, অপপ্রয়োগ যেন না হয়। এ দেশে নারী নির্যাতনের খুব শক্ত আইন আছে কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে অধিকাংশ নারী নির্যাতন মামলা মিথ্যা মামলা। এটা হয়রানির জন্য করা হয়েছে। কেননা বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের আইন খুবই কঠোর। তিন মাসে জামিনই হবে না। এর কারণে দেখা যায় পুরুষের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা দেয়া হয়। কেইস করা হয়।

ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করছে। কিন্তু যিনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কি হবে? ব্যভিচারের কি হবে?
আজকে অবৈধ সম্পর্কের কি হবে?

আমাদের বক্তাগণ বক্তব্যে বলেছেন, অনেক মন্ত্রী মিনিস্টাররা এমনভাবে বক্তব্য দেন, জাতি উৎসাহিত হয়। শুধু মন্ত্রী মিনিস্টাররা নয়; আমাদের দেশের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত বক্তব্য দিয়েছেন তোমরা প্রেম কর, একটা প্রেম কর; বেশি প্রেম করিওনা। এটা আমাদের দেশের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য।

আপনি চিন্তা করতে পারেন কোন দেশে বসবাস করছি আমরা? আমাদের দেশের অবস্থা কি?

আমাদের দেশের অবস্থা হলো, মইনুল ইসলাম সাহেব। সে হলো ইত্তেফাক পত্রিকা যে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেই তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ছেলে। তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কে?
যে, অনেকেই বলে ইত্তেফাক পত্রিকা না হলে এ দেশে স্বাধীনতা আসতো না। নেপথ্যে মানিক মিয়া স্বাধীনতার কর্ণধার ছিল। শেখ সাহেব (বঙ্গবন্ধু) তার কাছে বসে থাকতেন, অর্থায়ন করতেন মানিক মিয়া, বুদ্ধি দিতেন মানিক মিয়া, পত্রিকায় ছাপা করতেন স্বাধীনতার পক্ষে হাজারো খবর। কিন্তু তাঁর ছেলে ব্যরিস্টার! শুধু ইঙ্গিতবহ একটা কথা বলার কারণে তাঁকে জেলখানায় পুঁতে দেয়া হয়েছে। সেখানে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাঁকে থাকতে হয়েছে। নির্যাতিত হয়েছে সে।

এইভাবে আপনি ধর্ষণ বন্ধ করবেন? এটা সম্ভব? এটা হয় না। কাজেই ইসলাম কি বলছে ধর্ষণ বন্ধ করার ব্যাপারে? সেই বিষয়ে গবেষণা করা উচিত। আর ইসলাম যেভাবে বলছে সেভাবে ধর্ষণ বন্ধ করা উচিত, এ ছাড়া জীবনে ধর্ষণ বন্ধ হবে না।

আইন দিয়ে বন্ধ করবেন? এ দেশে কি চুরির আইন নাই? কি চুরি বন্ধ হয়েছে? ঘুষের আইন নাই? ঘুষ কি বন্ধ হয়েছে? খুনের আইন নাই? খুন কি বন্ধ হয়েছে? সন্ত্রাসের আইন নাই? সন্ত্রাস বন্ধ হয়েছে? নারী নির্যাতন আইন নাই? কি নারী নির্যাতন বন্ধ হয়েছে? হবেনা। সম্ভব না। যতক্ষন পর্যন্ত চরিত্র গঠন না করবেন।

এর জন্য আমি বলবো, চরিত্র গঠন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। আপনি মতিঝিল আইডিয়াল কলেজ থেকে নারীদের থেকে মহিলাদের উড়না খুলে দিবেন? আর ধর্ষণ বন্ধ করবেন? এটা কোনদিন সম্ভবনা।

এরপরে আসেন! সিলেটে থানায় নিয়ে আমার বাংলাদেশের জনগণকে হত্যা করা হয়েছে। রায়হান! ছোট্ট একটা শিশু, কাঁদছে। ও বড় হয়ে ও তার বাবাকে বাবা বলে ডাকবে না। বিদায়ই আমি প্রশ্ন করতে চাই, ওই শিশু বাচ্চাটার কি অন্যায় ছিল?
কি দোষ ছিল? ওর বাবাকে কেন হত্যা করা হয়েছে? আমি মনে করি ওই রায়হানকে হত্যা করা হয় নাই বরং বাংলাদেশের প্রত্যেকটা যুবককে হত্যা করা হয়েছে। প্রত্যেকটা নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশের হাজারো-কোটি শিশুর বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। কাজেই এর বিচার করতে হবে।

কক্সবাজারে সেনাবাহিনীর এক সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা আমরা দেখছি না। আবরার হত্যা হয়েছে, বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, কিন্তু আবরারের খুনিরা আজ পর্যন্ত হাসছে, পরীক্ষা দিচ্ছে।
তবে ফাঁসির রশিতে কাউকে ঝুলতে আমরা দেখি নাই।

আপনারা দেখেছেন! মাত্র গত সপ্তাহে মাগুরায় এক শান্তিপূর্ণ এক মানববন্ধন, যেখানে ছিলনা কোনো মিছিল, যেখানে ছিলনা কোনো খুন-খারাবি-অত্যাচার-অবিচার। যাদের কাছে লাঠি ছিলনা, না গজারি ছিল, না অবৈধ পিস্তল ছিল। সেই মানববন্ধনের উপরে মাগুরার ছাত্রলীগের সভাপতি আক্রমণ করেছে। রক্তাক্ত করেছে। আমাদের ভাইদেরকে।

বাংলাদেশে যারা ধর্ষণ বিরুধী আন্দোলন করছে তাদের উপরে যারা আক্রমণ করেছে আমি মনে করি তাদের উপর আক্রমণ করা হয় নাই বরং ধর্ষণের পক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছে।

আপনারা দেখেছেন মাত্র দুইদিন আগে ভোলার লালমোহন ফরাসগঞ্জ ইউনিয়নে হযরত মাওলানা তোফায়েল হোসেন সাহেব। তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন, আওয়ামীলীগের দাবি কি ছিল?প্রার্থীতা প্রত্যাহার করতে হবে। মার্কা রাখতে পারবে না। সে বলছে, কেন? এটা আমার অধিকার। নাগরিক অধিকার। আমি অবশ্যই থাকবো, আমি ক্যান্ডিডেট থাকবো। আমি নির্বাচন করবো। কিন্তু সেই ব্যক্তিকে রক্তাক্ত করে হসপিটালে মৃত্যুর মুখোমুখি করা হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের ক্যান্ডিডেট ছিল। হাতপাখার ক্যান্ডিডেট। তোফায়েল আহমদ সাহেব।

আমি সরকারকে বলবো একদিকে আপনি গুন্ডাবাহীনি পালবেন আরেক দিকে দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত করবেন? এটা কোনোদিন সম্ভব না।
আপনি ধর্ষক পালবেন, আর দেশকে ধর্ষণমুক্ত করবেন? এটা কোনোদিন সম্ভব না।

আমরা অনেকেই মনে করি সরকার পরিবর্তন!সরকার পরিবর্তন! সরকার পরিবর্তন!! সরকার পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কিন্তু কাকে সরকার নিয়ে আসবেন? এটা দেখার প্রয়োজন আছে।

বিএনপির আমলে ধর্ষণ হয়েছে। জাতীয় পার্টির আমলে ধর্ষণ হয়েছে। বিগত সরকারগুলোর আমলে ধর্ষণ হয়েছে। এরা ধর্ষণকে প্রতিরোধ করতে পারবে না।বরং এমন এক সরকার বসাতে হবে যারা ধর্ষণ করে না, ধর্ষণের প্রতিবাদ করে। ধর্ষণ বন্ধ করতে চায়। সেই সরকার ইসলামী সরকার। সেই সরকার ইসলামী সরকার।

 

 

আপনারা দেখেছেন! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি; তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ধর্মভিত্তিক কোনো সংগঠন ইউনিভার্সিটিতে রাজনীতি করতে পারবে না। আমি ওই হিন্দু বেচারাকে বলবো, ছাত্রলীগের সভাপতি সাহেব! আপনি দেশটাকে কি মনে করছেন? দিল্লি মনে করছেন না কি? এ দেশকে ভারত মনে করছেন না কি?

এটা নবাব সলিমুল্লাহর ইউনিভার্সিটি। এটা বাংলাদেশের বিরানব্বই পার্সেন্ট মুসলমানদের দেশের ইউনিভার্সিটি। এ ইউনিভার্সিটি গড়েছে মুসলমান। জায়গা মুসলমানদের। হিন্দুরা বাঁধা দিয়েছে।

কাজেই ইউনিভার্সিটিতে কোনো ধর্মভিত্তিক সংগঠনকে কেউ বাঁধা প্রদান করে অর আঙুলকে ভেঙ্গে ফেলা হবে, হাত ভেঙ্গে ফেলা হবে, চোখ উপরে ফেলা হবে, ইনশা আল্লাহ।

প্রিয় ভাইয়েরা আমার! আজকে ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন চলছে। এইভাবে ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন করলে হবে না। আমরা সবাই, আমাদের সবাইকে মাঠে নামতে হবে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে হবে। সংগ্রাম করতে হবে।

গোটা বাংলাদেশকে অবরোধ করতে হবে। যদি আমরা অবরোধ করতে পারি, আন্দোলন করতে পারি, তাহলেই ধর্ষণমুক্ত নতুন এক বাংলাদেশ আমরা দেখতে পারবো। খুনমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে পারবো। আমরা যিনামুক্ত এক বাংলাদেশ দেখতে পারবো।

আজকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলবে আর যিনা-ব্যভিচার চলবে তা হতে পারে না। একজন মেয়ের সাথে সম্পর্ক থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত; খুবই ভালো, যখন সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় অমনি গিয়ে সেই মেয়ে ধর্ষণের মামলা দেয়। এই সমস্ত ফাইজলামি চলতে পারে না। চলতে দেয়া হবে না। ধর্ষণ বন্ধ করুন। যিনা-ব্যভিচার বন্ধ করুন। খুন বন্ধ করুন। এবং সন্ত্রাস বন্ধ করুন।

দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি চলছে; এইভাবে একটা দেশ চলতে পারে না। হু হু করে মূল্য বৃদ্ধি হচ্ছে। গতকালকে একদাম আজকে আরেক দাম। যা ক্রয়ক্ষমতার উর্ধ্বে চলে যায়। আমরা বিশ্বাস করি স্থিতিশীল সরকার যতদিন পর্যন্ত না আসবে ততদিন পর্যন্ত দেশ স্থিতিশীল হবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাকে এবং আমাদের সবাইকে এ আন্দোলন-সংগ্রাম করার তাওফিক দান করুন।

এ ছাড়াও দলের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা মহানগরের সভাপতি মাওলানা ইমতিয়াজ আলমসহ দলের নেতৃবৃন্দ সেখানে বক্তব্য রেখেছেন।

  • অপরদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমাবেশ থেকে আগামী ২৩ অক্টোবর শুক্রবার বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতী সৈয়দ রেজাউল করীমের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছে।

 

সমমনা ইসলামী ছয় দলের সমাবেশে নেতৃবৃন্দের বক্তব্য :

সমমনা ইসলামী দলের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রেখেছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী। তিনি তার বক্তব্যে চলমান নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভারতীয় আগ্রাসনের ব্যাপারে সোচ্চার থাকার আহবান জানিয়েছেন।

[সমমনা ইসলামী  ছয় দলের সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী। মাইক ধরে রেখেছেন মাওলানা মামুনুল হক।]

সমাবেশে মাওলানা মামুনুল হকের সারসংক্ষেপ বক্তব্য :

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট বাংলাদেশে ইসলামী সাংস্কৃতি চলবে৷ স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে অপসাংস্কৃতি মেনে নেয়া হবে না৷ নারীদেরকে অশ্লিল পোষাকে বিজ্ঞাপনের বস্তু বানানো চলবে না৷ নোংরা আকারে সিনেমার ব্যানারে সম্মানীতা মা বোনদেরকে দেখতে চাই না৷ এসব প্রচারণা নিষিদ্ধ করতেই হবে৷

সরকারি আদেশে সিনেমা হল চালু করে দেয়া হয়, অথচ ওয়াজ মাহফিলের ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি মিলে না৷ উল্টো মাহফিলগুলো বন্ধ করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে৷ এসমস্ত পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হবে। প্রশাসনকে সকল ইস্যুতে নীরব থাকা চলবে না৷ কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব মেনে নেয়া হবে না৷

ধর্ষণের বিরুদ্ধে কার্যকারী আইন দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে৷ ধর্ষণের সহায়ক সমস্ত অশ্লীলতা নিষিদ্ধ করতে হবে৷ ধর্মের উপর বা ধর্মীয় বিধানের উপর আঘাত আর মেনে নেয়া হবে না৷ আমাদের সহ্য সীমা অতিক্রম হয়ে গেছে৷ টিভির পর্দায় নোংরা মানসিকতার প্রচার দেখতে চাই না৷

কাফনের কাপড় পরিধান করে রাস্তায় নামবো ইনশাল্লাহ!

সমমনা ইসলামী ছয় দলের আহুত গণমিছিল পরবর্তী বিক্ষোভ সমাবেশে মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি বলেন –

বাজারে আলুর কেজি ৫০ টাকা পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকা আমরা কিন্তু আজ এর প্রতিবাদ করতে রাস্তায় আসিনি, আমরা এসেছি ধর্ষণমুক্ত, ব্যভিচার মুক্ত, অনাচার মুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে, আমরা এসেছি মা-বোনদের ইজ্জত সম্মান রক্ষা করতে।

আমি স্পষ্ট বলতে চাই ডিজিটাল বাংলাদেশের অর্থ যদি হয়, নারীকে বিবস্ত্র করে ধর্ষণ করা। ডিজিটাল বাংলাদেশের অর্থ যদি হয়, আইন শৃঙ্খলার দায়িত্বে বসে খুন-খারাবি তে জড়িত থাকা। ডিজিটাল বাংলাদেশ এর অর্থ যদি হয়, মনুষ্যত্ব মানবতাকে বিলীন করে দেওয়া। তাহলে আমরা এই ডিজিটাল বাংলাদেশ চাই না চাইনা চাইনা।

সংগ্রামী বিক্ষুব্ধ জনতা! এই ডিজিটাল বর্বরতার বিরুদ্ধে এই ডিজিটাল নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার গর্জে উঠবে আরেকবার।

সংগ্রামী সাথী ও বন্ধুগণ! সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলতে চাই, আপনি একদিকে পানি ভরা পুকুরে নেমে গোসল করতে বলবেন, আরেকদিকে মৃত্যুদণ্ডের আইন করবেন, এ কারণে যে, তোমার হাঁটু যেন পানিতে না ভিজে, এটা জাতির সঙ্গে তামাশা ছাড়া আর কিছু না। একদিকে অশ্লীলতার জমজমাট আসর চলবে যাত্রা চলবে অশ্লীল সিনেমা চলবে আরেকদিকে মৃত্যুদণ্ডের আইন করবেন কোনদিন এটা ফলপ্রসূ হবে না।

সর্বশেষ কথা সারাদেশ থেকে আমাদের কাছে ফোন আসছে, হুজুর! প্রশাসন মাহফিল করতে দিচ্ছে না অথচ আজ থেকে সিনেমা হল খুলে দেওয়া হচ্ছে, জাতির সাথে এই তামাশা বন্ধ করুন।নচেৎ সামনের দিনগুলোতে কাফনের কাপড় পরিধান করে রাস্তায় নামতে বাধ্য হবো। ইনশাআল্লাহ!

এছাড়াও সমমনা ইসলামী দলের সমাবেশ থেকে ৬ দফা দাবি পেশ করা হয়েছে। দাবিগুলো হলো :

  • ১। যিনা, ব্যভিচার ও ধর্ষণ প্রতিরোধে জনসম্মুখে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
  • ২। পর্ণোগ্রাফির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • ৩। মাদকদ্রব্যের অবাধ-প্রাপ্তি ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
  • ৪। নারীর অশ্লীল উপস্থাপনা ও পণ্য হিসাবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
  • ৫। আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং বিচার কাজকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ মুক্ত রাখতে হবে।
  • ৬। নারীর মর্যাদা এবং অধিকার সংরক্ষণে কুরআন-হাদীসের শিক্ষাসমূহ জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

প্রতিবেদন সহায়তা : মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীমের বক্তব্যের শ্রুতিলিখন করেছেন কবি মনসুর আহমাদ। মাওলানা মামুনুল হকের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ লিখেছেন আরিফ জাব্বার। মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দির বক্তব্যে লিখেছেন মাহদী হাসান।

মন্তব্য করুন