তৃতীয়মাত্রায় ইসলামী আন্দোলন : ইসলামপন্থী রাজনীতির এক অকাট্য বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০২০

পলাশ রহমান

চ্যানেল আইর জনপ্রিয়  টক’শো তৃতীয়মাত্রায় কথা বলেছেন ইসলামী আন্দোলনের নেতা গাজী আতাউর রহমান। উপস্থাপক জিল্লুর রহমানসহ অন্য আলোচক ছিলেন মিসবাহুর রহমান চৌধুরী। তিনি ‘কথিত’ ইসলামি ঐক্যজোটের প্রধান।

কথিত শব্দটা ব্যাবহার করলাম এই কারনে যে, তৃতীয়মাত্রার নিয়মিত অতিথি এই কথিত ‘চৌধুরী সাহেব’ নিজেকে ইসলামি ঐক্য জোটের নেতা পরিচয় দিয়ে মূলত জাতীর সাথে বড় ধরণের প্রতারণা করছেন। আর তার প্রতারণায় সহযোগী ভূমিকা রাখছে তৃতীয়মাত্রা।

তৃতীয়মাত্রার উপস্থাপক জিল্লুর রহমান গাজী আতাউর রহমানকে প্রশ্ন করেছেন, বিভিন্ন ইস্যুতে ইসলামপন্থী দলগুলো রাস্তায় বড় বড় মিটিং মিছিল করতে পারলেও ভোটের রাজনীতিতে তারা অনেক পিছিয়ে। জনগণ তাদের ভোট দেয় না, কেনো?

গাজী আতাউর রহমান দেশে ভোট না হওয়ার কথা বলেছেন। মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ার কথা বলেছেন। তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন ঢাকার মিডিয়াগুলোর ভূমিকার। কারণ গণতন্ত্রের রাজনীতিতে সংবাদ মাধ্যম হলো ৪র্থ স্তম্ভ। এই স্তম্ভ সমাজ, রাষ্ট্র এবং সরকারকে সব থেকে বেশি প্রভাবিত করে। রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি ধারন, নির্মান বা ভাঙ্গার পেছনে নিয়ামক শক্তি হিসাবে কাজ করে।

গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, স্বাধীনতার পরে থেকে আমাদের দেশীয় মিডিয়াগুলো পরিক্ষিত দূর্নীতিবাজ এবং অসাধু দল ও মানুষগুলোকে প্রমোট করেছে, করছে। পক্ষান্তরে তারা দেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে তো প্রাপ্য অবদানের স্বীকৃতি দেয়ই না, বরং সাম্প্রদায়িকতা নামের একটা আবারণ তৈরী করে দেশের সাধারণ মানুষকে ইসলামপন্থী রাজনীতি সম্পর্কে জানতেও বাধাগ্রস্ত করে। সুতরাং ভোটের রাজনীতিতে ইসলামপন্থী রাজনীতির বিকাশ না হওয়ার পেছনের অন্যতম দায় রয়েছে ঢাকার মিডিয়াগুলোর।

আমি মনে করি গাজী আতাউর রহমানের কথার অকাঠ্যতা প্রমাণ করার জন্য বেশি কষ্ট করার দরকার নেই, জনাব জিল্লুর রহমানের তৃতীয়মাত্রার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। তার অনুষ্ঠানের নিয়মিত একজন অতিথি হলেন মিসবাহুর রহমান চৌধুরী। তাকে তিনি ইসলামি ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেন। তার মুখ থেকে জাতীকে গুরুত্বপূর্ণ নসিহত শোনান। (যেমন শোনাতেন শাহেদের মুখ থেকে) তাকে ধর্মীয় বুদ্ধিজীবী হিসাবে উপস্থাপন করেন। অথচ এই মিসবাহুর রহমান চৌধুরীর আসল পরিচয় কী? তার অতীত কী? তার শিক্ষাগত যোগ্যতা কী? ইসলাম সম্পর্কে তার জ্ঞান কতোটুকু? তাকে যে ভাবে জাতীর সামনে উপস্থাপন করা হয় সে আদৌ সেই পর্যায়ের মানুষ কীনা এসব নিয়ে ভাবেন না কখনো।

মিসবাহুর রহমান চৌধুরী ছিলেন ঢাকার সাঁপুড়িয়াদের নেতা। তিনি বায়তুল মোকার্রমের সামনে প্রাইভেট কারে করে হকারি করতেন। সাপের তাবিজ বিক্রি করতেন। ইসলামী আন্দোলনের মরহুম নেতা সৈয়দ ফজলুল করিম রহ. এর নেতৃত্বে যখন দেশ কাঁপানো সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং ওই সংগঠন থেকে তসলিমা নাসরিনের ধর্মদ্রোহীতার বিরুদ্ধে হরতার আহবান করা হয়, তখন হরতালের সমর্থনে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জীবন্ত সাপ মিছিল করে আলোচনায় আসেন এই মিসবাহুর রহমান চৌধুরী।

এরপর তিনি ধিরে ধিরে ইসলামী আন্দোলনসহ অন্যান্য ইসলাপন্থী দলগুলোর সাথে সুসম্পর্ক তৈরী করেন। মূলধারার ইসলামী ঐক্যজোটে যোগ দেন। এক সময় সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি নিজেকে ইসলামী ঐক্য জোটের নেতা ঘোষনা দেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত জানা যায়নি মোট কতোটা এবং কোন কোন ইসলামি দল নিয়ে তার ইসলামি ঐক্য জোট গঠিত? তার দলের অন্যান্য নেতাকর্মী কারা? তার জোটের কোনো কর্মসূচি আজ অবধি কেউ দেখেনি। অথচ তৃতীয়মাত্রা তাকে নিয়মিত অতিথির কাতারে রেখেছে। তার মুখ থেকে জাতীকে নসিহত শোনায়। আর দেশের মূলধারার ইসলামপান্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে, এসব দলের নেতাদেরকে, শিক্ষিত আলেমদেরকে তারা আড়ালে রাখে। সুতরাং বলাই যায় দেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যান্য মিডিয়াগুলোর মতো তৃতীয়মাত্রাও সমান দায়ী।

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূলনীতি, সংবিধানের চার নীতিসহ অনেক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করেন জিল্লুর রহমান। গাজী আতাউর রহমান স্বভাবসূলভ বেশ গোছালো এবং বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দেন। কিন্তু ভূরাজনীতির প্রশ্নে বিস্তর কথা বলার সুযোগ থাকলেও তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান কূটনীতির প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে আসেন।

গাজী সাহেবের মতে শেখ হাসিনার কূটনীতি এখন আর একক ভাবে ভারত নির্ভর নেই। চীন এবং তুরস্কের সাথে সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্ককে তিনি ইতিবাচক ভাবে দেখতে চান।

তিনি মনে করছেন, সরকার এখন ভারতের উপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে অন্যদিকে বন্ধু খোঁজার চেষ্টা করছে।

আমি জানি না- এটা গাজী আতাউর রহমানের নিজস্ব চিন্তাভাবনা, নাকী তার দলের দৃষ্টিভঙ্গি?

তবে আমি মনে করি, দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনীতিতে ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান, ভূমিকা এবং দৃষ্টিভঙ্গি একটু খোলাসা করা দরকার ছিল। চিন, তুরস্ক, মালেশিয়া, সৌদিআরবের সাথে তাদের বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে কথা বলা দরকার ছিল।

মোদ্দা কথা হলো- আমাদের দেশের দূর্নীতি, অনিয়ম, নির্যাতন বন্ধ করতে হলে মিডিয়াগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। যার যতোটা মূল্যায়ন প্রাপ্য ততটা দিতে হবে। মিসবাহুর রহমান চৌধুরীদের ইসলামি নেতা বা বুদ্ধিজীবী বলে প্রচার করলে কোনো দিন দায় এড়ানো যাবে না। কারন মিসবাহুর রহমান চৌধুরীর উত্থান এবং আজকের অবস্থানের পেছনের গল্প খুঁজলে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি আরেক সাহেদের গল্প বেরিয়ে আসবে।

মন্তব্য করুন