“হেলাল হাফিজঃ একজন বেসামরিক কবি ও বিরহী প্রেমিকের গল্প”

প্রকাশিত: ৯:৩৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৭, ২০২০

ফাইজুল ইসলাম ফাহিম: ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত কবি ভার্জিনিয়া উলফের একটি উক্তি-“কেউ পুরোহিতের কাছে যায়, কেউবা ছুটে যায় কবিতার কাছে। আমি কিন্তু ছুটে যাই আমার প্রিয় বন্ধুটির কাছে’।

হেলাল হাফিজ হয়ত তার প্রিয় বন্ধুটির কাছে ফিরে যেতে পারেন নি, তাই সারাজীবন কগজ কলমের কবিতা নিয়েই জীবন পার করেছেন। প্রেম ও তারণ্যের কবি হেলাল হাফিজ। হেলাল হাফিজ,কবিতার উন্মুক্ত ছন্দকে যে কি না ভালবাসার মালায় রূপান্তর করেছেন। হেলাল হাফিজের নাম শুনলেই ভবঘুরে প্রেমিক কিংবা অসুস্থ প্রেমিকার দুঃখবিলাস খুব ভালভাবেই মনের অন্তরালে বাস্তবতায় রূপ নেয়।

হয়ত সম্রাট শাহজাহান তাজমহলের জন্য খ্যাতি পেয়েছেন, কিন্ত হেলাল হাফিজ কোন ইমারত নির্মাণ ছাড়াই বাংলার অগণিত প্রেমিক প্রেমিকার মণিকোঠায়,  প্রেমপত্রে স্থান নিয়েছেন,পেয়েছেন ভালবাসা। তার কবিতায় যেমন একনায়িকার খামখেয়ালি কথা আছে, তেমনি আছে প্রেয়সীকে না পাওয়ার বেদনা। দুঃখকে ভালবেসেই তিনি হয়ত আজীবন কৃতদার থেকে গেছেন। জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় তিনি পেশা হিসেবে বই লিখে গেছেন, বিনিময়ে তার ভাষ্যমতে মেয়েদের কাছ থেকে পেয়েছেন চুমু, শার্ট-প্যান্ট ও বর্ণিল সব উপহার।

হেলাল হাফিজ ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম খোরশেদ আলী তালুকদার আর মায়ের নাম কোকিলা বেগম। ১৯৬৫ সালে নেত্রকোনা দত্ত হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৬৭ সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে তিনি এইচএসসি পাস করেন। ওই বছরই কবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকেই বাংলায় অনার্স করেন।

এরমধ্যেই লেখালেখি সাথে যুক্ত হন। সান্নিধ্যে আসেন কবি শামসুর রাহমান ও হাসান হাফিজুর রহমানের। তিনি নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ হিশেবেই প্রিয়তমাকে ভালবেসে গেছেন। কিন্ত সময়ের আকস্মিকতায় প্রিয়তমা হেলেনকে সারাজীবনের জন্য পাননি।

পাবলো নেরুদা এজন্যই বলেছেন,
“”In this part of the story I am the one who
dies, the only one, and I will die of love because I love you,
because I love you, Love, in fire and in blood.”

হেলাল হাফিজও কম যাননি। তিনি লিখেছেন,

“খুব মামলি বেশ করেছো চতুর সুদর্শণা,
আমার সাথে চুকিয়ে ফেলে চিকন বিড়ম্বনা। “

কৈশোরেও তিনি মামাতো বোনের প্রেমে পড়েছিলেন। কবিতায় লিখেছেন,

“প্রেমের প্রতিমা তুমি, প্রণয়ের তীর্থ আমার।
বেদনার করুণ কৈশোর থেকে তোমাকে সাজাবো বলে
ভেঙেছি নিজেকে কী যে তুমূল উল্লাসে অবিরাম
তুমি তার কিছু কি দেখেছো?
সে আমার সোনালি গৌরব
নারী, সে আমার অনুপম প্রেম।”

যে জন্য প্রেম ও তারণ্যের কবি হেলাল হাফিজ বিখ্যাত হয়েছেন সে কাব্যগ্রন্থের নাম,”যে জলে আগুন জ্বলে । “১৯৮৬ সালে এটি প্রকাশিত হয়। ২৬ বছর পর ২০১২ সালে আসে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ কবিতা একাত্তর। তার অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’।এ কবিতার দুটি পংক্তি,

‘‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’’

বাংলাদেশের কবিতামোদী ও সাধারণ পাঠকের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়ে থাকে।ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি লিখেন। এই একটি কবিতা লিখেই তিনি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই তখন হেলাল হাফিজকে চিনতো ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ এর কবি হিসেবে। হেলাল হাফিজ স্মৃতিচারণ করেছিলেন এই বলে, তিনি নাকি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে, মনে হতো যেন ভিসির পরেই তার স্থান। বিদ্রোহ আর প্রেমকে তিনি মিলিত করেছিলেন এক বিন্দুতে। তিনি তাঁর ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাতেই বলেছেন,

“কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনী হতে হয়।
যদি কেউ ভালোবেসে খুনী হতে চান
তাই হয়ে যান
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।”

কোন এক সাংবাদিক কবিকে জিজ্ঞেস করেছিলো কবি হওয়ার জন্য প্রেমে ছ্যাকা খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কি না ?

“তিনি বলেছিলেন,”প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কেউ কেউ কবি হতে পারে। আবার কবিতায় ব্যর্থ হয়েও কেউ কেউ প্রেমিক হতে পারেন। আমি দুই পর্যায়েই সফল। আমার নারীভাগ্য বেশ ভালো। অনেক মানুষের ভালোবাসা আমি পেয়েছি। সুতরাং ব্যর্থতাকে কোনোভাবেই ব্যর্থতা বলতে চাই না। ভালোবাসা সব সময়েই দ্বিপাক্ষিক একটা ব্যাপার। প্রকৃত যে কবি, সে ব্যর্থতাকে শিল্পে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। এইটাই হলো চূড়ান্ত কথা।”

কবি একাধারে তুখোর প্রেমিক ও শব্দ শ্রমিক। কবির অচল প্রেমের পদ্যের ছন্দগুলো পড়লেই তা নিশ্চিত হওয়া যায়।কবির কিছু প্রিয় উক্তি,

১। নিউট্রন বোমা বোঝ মানুষ বোঝ না !

২। কবির জীবন খেয়ে জীবন ধারণ করে
কবিতা এমন এক পিতৃঘাতী শব্দের শরীর,
কবি তবু সযত্নে কবিতাকে লালন করেন,
যেমন যত্নে রাখে তীর
জেনে-শুনে সব জল ভয়াল নদীর।

৩। যুক্তি যখন আবেগের কাছে অকাতরে পর্যুদস্ত হতে থাকে, কবি কিংবা যে কোনো আধুনিক মানুষের কাছে সেইটা বোধ করি সবচেয়ে বেশি সংকোচ আর সঙ্কটের সময়।

৪। এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

৫। তারপর ফেরে, তবু ফেরে, কেউ তো ফেরেই,
আর জীবনের পক্ষে দাঁড়ায়,
ভালোবাসা যাকে খায় এইভাবে সবটুকু খায়।

৬। কোনো প্রাপ্তিই পূর্ণ প্রাপ্তি নয়
কোনো প্রাপ্তির দেয় না পূর্ণ তৃপ্তি
সব প্রাপ্তি ও তৃপ্তি লালন করে
গোপনে গহীনে তৃষ্ণা তৃষ্ণা তৃষ্ণা।

৭। জলের আগুনে পুড়ে হয়েছি কমল,
কী দিয়ে মুছবে বলো আগুনের জল।

৮। তবু ফেরে, কেউ তো ফেরেই, আর জীবনের পক্ষে দাঁড়ায়, ভালোবাসা যাকে খায় এইভাবে সবটুকু খায়।

৯। এ কেমন তাবিজ করেছো সোনা, ব্যথাও কমে না, বিষও নামে না।

১০। হয়তো তোমাকে হারিয়ে দিয়েছি নয় তো গিয়েছি হেরে থাক না ধ্রুপদী অস্পষ্টতা কে কাকে গেলাম ছেড়ে।

চলমান সহিংসতার বিপক্ষে হেলাল হাফিজও আওয়াজ তুলেছিলেন,

“মানব জন্মের নামে কলংক হবে,
আমি আজ যদি মিছিলে না যাই,
উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো,
আমার তপ্ত যৌবন দিয়ে,
আজ যদি শুধু নারীকে সাজাই। “

আজ যৌবন দিয়ে শুধু নারীকে না সাজিয়ে নারীর সম্ভ্রম রক্ষার্থেও কবি এগিয়ে আসতে বলেছেন।

পৃথিবীর যে প্রান্তে হেলাল হাফিজের মত কবি নেই,
সেখানে প্রেম নেই,ভালবাসা নেই, সংগ্রাম নেই।বাঙালী বড়ই সৌভাগ্যবান, হেলাল হাফিজ আপনি এখনো বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে।

শুভ জন্মদিন কবি।আপনি থাকুন আমাদের মত নতুন শব্দ শ্রমিকদের ভালবাসায় ও নারীর বিরহী প্রেমে।

লেখকঃ আইন বিভাগ ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এনএইছ/এমএম/পাবলিকভয়েস

মন্তব্য করুন