নোয়াখালীতে বর্বরতা : ক্ষোভে ফুঁসছে দেশ, দু’জন গ্রেফতার

প্রকাশিত: ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৫, ২০২০

নোয়াখালী প্রতিনিধি :

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে মধ্যযুগীয় কায়দায় চরম বর্বরতমভাবে স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে নির্যাতন করার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠছে দেশের জনগণ। সোশ্যাল মিডিয়া সহ সারাদেশে বইছে প্রতিবাদের ঝড়।

ইতিমধ্যেই গভীর রাতে ঢাকার মিছিল করেছে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন নামে একটি সংগঠন। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতারের দিয়েছে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম। এছাড়াও আজ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণবিরোধী ও নোয়াখালীর ঘটনার প্রতিবাদে মিছিল-মিটিংসহ মানববন্ধনের আহ্বান করেছেন বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকারের ছত্রছায়ায় থাকা স্থানীয় প্রভাবশালী বখাটে, লম্পট ও নরপিচাশ ধরণের প্রায় ৯ জন যুবক ওই গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারধর করে তার ভিডিও চিত্র ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে আছে দেশের মানুষ।

ঘটনার ৩৩ দিন পর নয়জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। রোববার (৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১টার দিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে নির্যাতিতা গৃহবধূ (৩৫) বাদী হয়ে এ মামলা করেন।

তবে মামলায় গণধর্ষণের চেষ্টা করার কথা উল্যেখ করা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই গৃহবধূকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। লোকলজ্জার ভয়ে গণধর্ষিতার পরিবার এ নিয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করে। এমনকি ৩২ দিন অতিবাহিত হলেও ভুক্তভোগি পরিবার এ ঘটনায় থানায় কোন অভিযোগ দায়ের করতে পারেনি।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুই দফায় অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এক আসামিকে রোববার বিকেল ৪টায় এবং অপর আসামিকে রাত ১১টায় একলাশপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে মূল আসামী ও প্রভাবশালী সন্ত্রাসী দেলোয়ার ও তার মূল সহযোগিদের এখনও ধরতে পারেনি পুলিশ।

গ্রেফতারকৃত লম্পট দুজন হলেন- একলাশপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের জয়কৃঞ্চপুর গ্রামের খালপাড় এলাকার হারিদন ভূঁইয়া বাড়ির শেখ আহম্মদ দুলালের ছেলে মো. আব্দুর রহিম (২০) ও একই এলাকার মোহর আলী মুন্সি বাড়ির মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে মো. রহমত উল্যাহ (৪১)।

বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো.হারুন উর রশীদ এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, পুলিশের ৫ টি ইউনিট ৭ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেফতার করেছে।

শ্লীলতাহানিতে জড়িত থাকা অন্য ব্যক্তিরা হলেন দেলোয়ার, বাদল ও কালাম ও তার সহযোগিরা।

অপরদিকে, ঘটনার পর ভয়ে বাড়িছাড়া নির্যাতিতা গৃহবধূকে সদর উপজেলার মাস্টার পাড়ার তার এক আত্মীয়ের বাসা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২ সেপ্টেম্বর রাত ৯ টার দিকে উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের খালপাড় এলাকার নূর ইসলাম মিয়ার বাড়িতে গৃহবধূর বসতঘরে ঢুকে তার স্বামীকে পাশের কক্ষে বেঁধে রাখে স্থানীয় বাদল ও তার সহযোগীরা। এরপর গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা করে তারা। এ সময় গৃহবধূ বাধা দিলে তারা বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারধর করে মোবাইলে ভিডিও চিত্র ধারণ করেন।

ওসি মো. হারুন উর রশীদ জানান, পুলিশ অভিযুক্ত অপর আসামিদের গ্রেফতারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। গ্রেফতার আসামিদের বিচারিক আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হবে।

নির্যাতনের ঘটনায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ও জেলা প্রশাসক খোরশেদ আলম খানের নেতৃত্বে আরেকটি তদন্তদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।

ভুক্তভোগী গৃহবধূর বাবা জানান, আমি নিরীহ লোক। সন্ত্রাসীদের ভয়ে কোনো কথা বলার সাহস পাই না। আমি শুধু আল্লাহর কাছে বিচার চাই।

নোয়াখালী পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন জানান, গৃহবধূকে নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। অভিযুক্তদের গ্রেফতারে এবং নির্যাতিতা পরিবারকে আইনি সহযোগিতা দিতে জেলা পুলিশের ৫টি ইউনিট মাঠে কাজ করছে।

রোববার  দুপুরের দিকে ঘটনার ৩২দিন পর গৃহবধূকে নির্যাতনের ঐ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে প্রকাশ পেলে ইতিমধ্যে তা ভাইরাল হয়ে গেলে টনক নড়ে স্থানীয় প্রশাসনের।

ঘটনার পর থেকে গত ৩২ দিন অভিযুক্ত স্থানীয় দেলোয়ার, বাদল, কালাম ও তাদের সহযোগীরা গণধর্ষিতা গৃহবধূর পরিবারকে অবরুদ্ধ করে রাখলে পুরো ঘটনা থেকে যায় স্থানীয় এলাকাবাসী ও পুলিশ প্রশাসনের অগোচরে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত মাসের (২ সেপ্টেম্বর) উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের খালপাড় এলাকার নূর ইসলাম মিয়ার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।

বেগমগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো.হারুন উর রশীদ জানান, পুলিশ বতর্মানে ঘটনাস্থলে রয়েছে।

ভিডিওচিত্রে দেখা যায় – ভুক্তভোগী গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে তাঁর মুখমণ্ডলে উপুর্যপুরি লাথি ও বেধড়ক মারধর করতে দেখা যায়। এসময় গৃহবধূ হামলাকারীদের বহুবার পায়ে ধরে এবং বাবা-বাবা বলে ডাকলেও নির্যাতন বন্ধ রাখা হয়নি। বরং তাঁর শরীরের স্পর্শকাতর স্থানসহ সবস্থানে লাঠি দিয়ে আঘাত করে মারাত্মক আহত করে। তারা এ সময় তাঁকে ধর্ষণের চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। এলাকার বাদল, কালাম ও দেলোয়ারসহ আরো কয়েকজন ব্যক্তি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, প্রায় দেড় থেকে দুই মাস আগে এলাকার একদল বখাটে ওই গৃহবধূকে কুপ্রস্তাব দেয় এবং শারীরিক সম্পর্কের চেষ্টা করে। এভাবে তারা আরো কয়েকবার তাঁকে কুপ্রস্তাব দেয় বলে গৃহবধূ জানান। পরে বখাটেরা শারীরিক সম্পর্ক করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে কোনো এক সময়ে তাঁকে বেদম মারধর করে ভিডিও ধারণ করে। এভাবে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলেও তারা গৃহবধূকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দিয়ে আবারো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়ে অবশেষে আজ রোববার তারা ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ফলে তা ভাইরাল হয়ে পড়ে।

জানা যায়, ওই গৃহবধূর সঙ্গে তাঁর স্বামীর দীর্ঘদিন বনিবনা ছিল না। তবে সম্প্রতি স্বামী তাঁর কাছে ফিরে আসেন। তাঁদের দুটি সন্তান রয়েছে। ঘটনার সময় ওই নারীর স্বামীকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেয় বলে অভিযোগ করেন গৃহবধূ।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আলমগীর হোসেনের নজরে এলে তিনি এ বিষয়ে তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বেগমগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশ আজ নির্যাতিতাকে তাঁর বাবার বাড়ি থেকে সন্ধ্যায় উদ্ধার করেছে। তিনি পুলিশকে জানান, আজ থেকে ২০/২৫ দিন আগে এ ভিডিও চিত্র ধারণ করা হয়। তবে, সঠিক তারিখ তিনি বলতে পারেননি।’

প্রতিবেদনটি করতে সহায়তা করেছেন এম.এস আরমান।

মন্তব্য করুন