বেফাকের সভাপতি পদে অরাজনৈতিক ব্যক্তিই পছন্দ আমেলা সদস্যদের

প্রকাশিত: ৯:০৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০২০
বেফাকের সভাপতি পদে অরাজনৈতিক ব্যক্তিই পছন্দ আমেলা সদস্যদের

বাংলাদেশের কওমী মাদরাসাসমূহের সর্বোচ্চ শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নির্ধারণের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসছে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর বেফাকের সভাপতি আল্লামা আহমদ শফী রাহি. এর ইন্তেকালের পর শুণ্য এ পদটির নেতৃত্ব নির্বাচন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে কওমীর নীতি নির্ধারকদের জন্য।

সপ্তাহখানেক আগে বেফাকের খাস কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে আগামী কাল ৩ অক্টোবর (শনিবার) বেফাকের আমেলা বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সারাদেশ থেকে আগত আমেলার সদস্যদের উপস্থিতিতে এ বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হবে যে, বেফাকের সভাপতি কাকে নির্ধারণ করা হবে। ১৫৭ সদস্য বিশিষ্ট আমেলা সদস্যের মধ্যে প্রায় ১০০ জন আগামী কাল বেফাক অফিসে উপস্থিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দেশব্যাপী বেশ কয়েকজন আমেলা সদস্যদের সাথে এ বিষয়ে একটি সূত্রের মাধ্যমে আলোচনা করা হলে তারা বেশিরভাগই মিডিয়ায় তাদের মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে নাম প্রকাশ করতে চাননি তবে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের মতামত বেশিরভাগই অরাজনৈতিক এবং বিতর্কমুক্ত নেতৃত্ব নির্বাচনের দিকেই যায়। একই সাথে কোনো সিন্ডিকেটের প্রভাবে না পড়ে এমন নেতৃত্ব নির্বাচনের দিকে আগানোর বিষয়টি জোরদার করার দিকে নজর দেওয়ার বিষয়েই তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

বি-বাড়িয়ার প্রভাবশালী একজন আমেলা সদস্যের কাছে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন – “বেফাকের প্রধান নেতৃত্ব অরাজনৈতিক ব্যক্তিই হতে হবে। এমনকি বেফাকের পদ নিতে আকস্মিকভাবে রাজনৈতিক পদ ত্যাগ করে এলেও তাদেরকে হঠাত করে অরাজনৈতিক ভেবে বেফাকের সর্বোচ্চ পদে বসানোর সুযোগ নেই। তবে সবক্ষেত্রেই বেফাকের গঠনতন্ত্র মেনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

আরও পড়ুন : বেফাকের গঠনতন্ত্রে সভাপতি নির্ধারণের শর্তসমূহ জেনে নিন

রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক বিষয়টি নিয়ে আরও গভীর বিশ্লেষণ নিয়ে জানতে চাওয়া হলে বেফাকের অপর একজন প্রবীণ সদস্য ও প্রভাবশালী আলেম বলেছেন – ‘বেফাকের সভাপতি হতে রাজনৈতিক কোনো পদ থেকে হুট করে কেউ পদত্যাগ করে এলেই তাকে বেফাকের সভাপতি নির্বাচনের সুযোগ নেই কারণ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থেকে প্রাথমিক পদত্যাগ করলেও তার নাম নির্বাচন কমিশন ও সরকারী দপ্তরে থেকে যায়। তাই পূর্ণাঙ্গ পদদ্যাগ ও রাজনীতি ছাড়ার পরই কেবল সভাপতি বিষয়ে চিন্তা আসতে পারে। তিনি বলেন – সার্বিক এ বিষয়গুলো গঠনমূলকভাবে সামনে রেখে তবেই বেফাক বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসা উচিত।”

নরসিংদির একজন আমেলা সদস্য এ বিষয়ে বলেন – ‘আমরা বিতর্কমুক্ত আলেমের নেতৃত্ব চাই বেফাকে। সেক্ষেত্রে ফেসবুকে বেশিরভাগ আলেমদের ক্ষেত্রেই বিতর্ক হচ্ছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন – ফেসবুক থেকে প্রভাবিত হয়ে আলেমদের প্রতি খারাপ ধারণা করার সুযোগ নেই। বিগত সময়টাতে বাংলাদেশে দু একজন আলেম রয়েছেন যারা বিতর্কের উর্ধ্বে ছিলেন। বেফাকের নেতৃত্বে এমন আলেম আনা উচিত।’

একই ধরণের মতামত দিয়েছেন সাতক্ষিরা, বরিশাল, বগুড়ার কয়েকজন আমেলা সদস্যও।

ঢাকার একটি বড় মাদরাসার মুহতামিম ও আমেলা সদস্য তার মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন – বেফাক একটি সম্মিলিত শিক্ষাসংস্থা ধরণের প্রতিষ্ঠান। এ ধরণের প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ধারীরা ব্যক্তিরা এলে বিভক্তি বাড়বে। আমরা যা চাই না।

এ বিষয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একাংশের সভাপতি, যশোর মাদানিনগর মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি ওয়াক্কাছ বলেন, ‘বেফাকের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব যিনি হবেন, তাঁকে নন–পলিটিক্যাল হতে হবে। এ দুটি পদ নন–পলিটিক্যাল।’

অপরদিকে বেফাক সংকট নিরসন নিয়ে গতকাল রাজধানীর বিএম মিলনায়তনে হওয়া একটি ওলামা সম্মেলন থেকেও ১২ দফার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবনাগুলো দেখতে এখানে ক্লিক করুন।

সভাপতি পদে কারা নির্বাচিত করবেন কিভাবে সভাপতি নির্ধারণ হবে এ বিষয়ে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাপরিচালক অধ্যাপক জুবায়ের আহমদ চৌধুরীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন – ‘অফিসিয়ালি এখনও কারো প্রতি কোনো সিদ্ধান্ত বা কারো ক্ষেত্রে আলোচনা নেই তবে সোশ্যাল মিডিয়াসহ কয়েকটি গণমাধ্যমের বিভিন্ন আলোচনায় দেখা যায় যাত্রাবাড়ি মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা মাহমুদুল হাসান ও বারিধারা মাদরাসার মুহতামিম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীসহ কয়েকজনের নামই বেশি আলোচিত হচ্ছে’। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণই আমেলা বৈঠকের উপর নির্ভরশীল। এবং সেখান থেকেই সবকিছু নির্বাচিত হবে।

উল্লেখ্য – জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ দেশের নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনভূক্ত ও বিএনপি জোটে থাকা একটি প্রভাবশালী একটি দল এবং এ দলের পরিচিতি আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীকে দিয়ে। অপরদিকে তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ঢাকা মহানগরীর সভাপতিও।

আরও পড়ুন :

আল্লামা শফী রহ.-এর মৃত্যুতে শোক সভায় বেফাক-হাইআ নিয়ে কঠোর বার্তা

বেফাক-হাইয়া নিয়ে আমাদের মঞ্চের বাইরে যারা যাবে তারা দালাল : জুনায়েদ আল হাবিব

বেফাক সংকট সমাধানে দায়িত্বশীলরা দ্রুত উদ্যোগী হন : মুফতী ফয়জুল করীম

বেফাক ও হাইয়া নিয়ে বসুন্ধরা মাদ্রাসার প্রধান মুফতীর চার প্রস্তাব

  • আমেলা বৈঠকে কোন প্রক্রিয়ায় সভাপতি নির্বাচিত করা হবে জানতে চাইলে অধ্যাপক যুবায়ের চৌধুরী বলেন – “এ বিষয়টি আমেলা বৈঠকের শুরুতেই সিদ্ধান্ত হবে। সে ক্ষেত্রে কন্ঠভোট ও লিখিত ভোট যে কোনো প্রক্রিয়াই হতে পারে। যা মিটিংয়েই সিদ্ধান্ত হবে। অগ্রিম এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেই”।

তবে বেফাকের প্রভাবশালী একজন সদস্য এ বিষয়ে আলাপের এক পর্যায়ে পাবলিক ভয়েসকে বলেন – বিভিন্ন জনের নামই প্রস্তাবনায় আসছে কিন্তু নাম প্রস্তাব ও সমর্থনের ক্ষেত্রেও বেফাকের গঠনতন্ত্র ফলো করতে হবে। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন – সভাপতি পদে যারা নির্বাচন করবেন তারা তো আগে গঠনতন্ত্রের দিকে তাঁকাতে হবে। গঠনতন্ত্র অনুসারেই কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা একাধিক সংগঠনের পদধারী ব্যক্তি সভাপতি পদে নির্বাচন করতে পারবেন না। তবে এসব বিষয়ে আমেলা বৈঠকের আলোচনা ও সিদ্ধান্তের উপরই সবকিছু নির্ভর করবে।

অপরদিকে কওমি মাদ্রাসা–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হেফাজতে ইসলাম ও বেফাকের নেতৃত্ব নিয়ে নানামুখী তৎ​পরতা চলছে। যেসব তৎপরতায় অভিযুক্ত হয়ে পড়ছে অনেকেই। কিন্তু বেফাকের একজন খাস কমিটির সদস্য দাবি করে বলেছেন – “এসব তৎপরতা কোনো জটিলতা সৃষ্টি করবে না বরং আমেলার সিদ্ধান্ত অনুসারেই একটি সুন্দর সমাধান আসবে। সেজন্য আগামী কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করারও আহবান জানান তিনি।”

তবে সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন – সারাদেশের কওমী মাদরাসাসমূহের জন্য বেফাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। বেফাকের অধীন ছয়টি স্তরের সারা দেশের ১৩ হাজার মাদ্রাসা আছে। এসব মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ। কওমি শিক্ষার সনদের সরকারি স্বীকৃতি থাকায় এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এই সুবাদে সরকারের সঙ্গে কওমি আলে​মদের যোগাযোগও বেড়েছে।

হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফী একই সঙ্গে বেফাকের সভাপতি এবং কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য সরকার গঠিত সংস্থা আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়ার চেয়ারম্যান ছিলেন। বেফাকের প্রধানই হাইয়াতুল উলয়ার চেয়ারম্যান হবেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর এই তিনটি পদই শূন্য হয়ে গেছে। সারাদেশের কওমী মাদরাসাসমূহের ছাত্র-শিক্ষকদের চাহিদা ঠিক রেখে যা পূর্ণ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বেফাক সংকট সম্পর্কে জানতে পাবলিক ভয়েসের এই প্রতিবেদনগুলো পড়ুন :

বেফাকের ফোনালাপ ফাঁস ও মার্কশীট দুর্নীতি : ফেঁসে যেতে পারে শতাধিক মাদরাসা

বেফাকের অস্থিরতা: গুঞ্জনের ডালপালা পক্ষ-বিপক্ষ ও অনেক পক্ষ

বেফাক ও কওমী মাদরাসা সংকট : মূল প্রশ্ন আড়ালেই থাকছে

বেফাকে অনিয়ম : বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ

বেফাক থেকে তিনজন বরখাস্ত : দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত চলবে

বেফাক থেকে বহিস্কার ও ‘ফোনালাপ’ বিষয়ে যা বলছেন মুফতি আবু ইউসুফ

বেফাক থেকে বহিস্কার বিষয়ে যা বলছেন মুফতী তোয়াহা

বেফাক সংকট নিয়ে আরও পড়ুন :

খাস কমিটির বেশির ভাগ সদস্যদের উপস্থিতিতে হাটহাজারীতে বেফাকের বৈঠক

বেফাকের অনিয়ম বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন : যারা রয়েছেন কমিটিতে

বেফাকে অস্থিরতা; তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা হবে ২৭ আগস্ট

বেফাক মহাসচিব আল্লামা কুদ্দুস নির্দোষ : আল্লামা শফী

বেফাক সংকট সমাধানে আলেমদের চার প্রস্তাব

মন্তব্য করুন