আমার দেখা আল্লামা শফী রাহিমাহুল্লাহর ইন্তেকাল ও জানাযা

প্রকাশিত: ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০
আমার দেখা আল্লামা শফী রাহি. এর জানাযা ও দাফন। ছবি : শাহরিয়ার হাসান।

১৮ সেপ্টেম্বর। শুক্রবার। বরাবরের মতোই ফজরের আজান দিচ্ছে তখনও আমি আমার কাজ করছি। আজানের পরপরই নামাজ পড়ে ঘুমাতে গেলাম। সাড়ে ৯ টার দিকে পাবলিক ভয়েসের অফিসে এলেন দেশের একজন তরুণ আলেম মুফতী শামসুদ্দোহা আশরাফী। আমি পাবলিক ভয়েসের অফিসেই থাকি। এখানেই ঘুমাই। উনি এসে ঘুম থেকে উঠালেন। দুজনে নাস্তা করলাম। সমকালিন কওমী সমস্যা নিয়ে টুকটাক কথাও হলো। উনি চলে যাওয়ার পর আবারও ঘুম। জুমার নামাজের পর আমার টেবিলে বসলাম। খবর নিয়ে জানলাম দেশের কিংবদন্তি আলেম নেতা, আমীরে হেফাজত আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর অসুস্থতা বেড়েছে। আগের রাতে হাটহাজারী মাদরাসার ছাত্রদের টানা দুদিনের আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনা উপ-ঘটনার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে উনাকে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তখনই বলেছে আল্লামা শফীর অবস্থা সংকাটাপন্ন। তাকে ঢাকায় নিয়ে যান। তারপরও শুক্রবার বিকেল ৩-টা পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ছিলেন। তখন উনার অক্সিজেন লেভেল চল্লিশের কাছাকাছি ছিলো। (আল্লামা শফী রাহি. এর পরিবারের একজন থেকে জানা) এক কথায় সংকটাপন্ন অবস্থা। (গণমাধ্যম থেকে হাসপাতালের ডাক্তারের সূত্রে জানা)।

এয়ার এম্বুলেন্স রেডি করে সেদিন দুপুর ৩ টা নাগাদ তাকে ঢাকায় আনার প্রস্তুতি শুরু হয়। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে চট্টগ্রাম থেকে রওয়ানা করে ঢাকায় পৌছাতে বিকেল সাড়ে চারটা বা পাঁচটা বেজে যায়। সেখান থেকে আল্লামা শফীকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার আজগর আলী হাসপাতালে। এ হাসপাতালে এর আগেও তিনি একাধিকবার চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাটহাজারী মাদরাসায় ফিরেছেন। ১৮ সেপ্টেম্বর তার নিথর দেহ বের হয়েছে এ হাসপাতাল থেকেই।

[১৭ সেপ্টেম্বর শায়খুল ইসলাম আল্লামা শফী রাহি. কে চট্টগ্রাম থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় আনার প্রস্তুতি। ছবি : সংগ্রহিত।]

ঢাকায় আল্লামা শফী চিকিৎসা নিতে এসেছেন জেনেই বরাবরের মতো সাংবাদিকসূলভতা থেকে খোঁজ নিতে শুরু করলাম উনার সাথে আছেন কারা কারা। দু’জনের নাম পেলাম। একজন উনার সন্তান আলোচিত আনাস মাদানী অপরজন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর এক সময়ের প্রধান খাদেম ও আনাস মাদানীদের এক সময়ের চক্ষুশূল মাওলানা রাকিবুল ইসলাম ফারুকী (তার ব্যাপারে সবশেষে বিস্তারিত লিখছি)। সাথে সাথেই ফোন দিলাম আনাস মাদানীকে। কয়েকবার। তিনি ফোন ধরেননি। এরপর ফোন দিলাম রাকিবকে। সেও ফোন ধরলো না। মনে মনে রেডি হচ্ছিলাম আজগর আলী হাসপাতালে যাবো।

মৃত্যু সংবাদ :

সময় সন্ধ্যা ছয়টা বাজে তখন। চেষ্টা করেই যাচ্ছি হাসপাতালে আল্লামা শফীর অবস্থা জানার জন্য। কোনোভাবেই সফল হচ্ছিলাম না। ফেসবুক থেকেই টুকটাক খবর জানছিলাম। সম্ভবত ৬ টা ২৫ মিনিট হবে। দেশের প্রখ্যাত একজন আলেম (সঙ্গত কারণে নাম বললাম না) হোয়াটসঅ্যাপে কল দিলেন। রিসিভ করার সাথে সাথে কান্নার আওয়াজ। আমি একটু ভয় পেলাম। এক দু সেকেন্ডে তিনি কেবল বললেন – “আমার শায়খ তো আর নেই হাছিব”। চমকে উঠলাম। বুঝতে বাকি রইলো না কিছুই। আমিই আর কথা বাড়াতে পারলাম না। ফেসবুকে ঢুকলাম। তখনও খবর ফেসবুকে আসেনি। কিন্তু হোমস্ক্রীনে রাকিবুল ইসলাম ফারুকীর একটা লাইভ চলছিলো তখন। এক দু মিনিট চলছে তখন লাইভের। সাথে সাথে ফোন দিলাম রাকিবকে। ও ফোন রিসিভ করে হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে ওই কথাটাই বললো – “হুজুর আর নাই হাছিব ভাই”। এসময়ে পেলাম সাদা কাফনে জড়ানো একটা মুকুটহীন সম্রাটের একটি নিথর দেহ।

এরপর আমার দু চোখ বেয়ে অঝোড়ে অশ্রু ঝড়ছিলো। কিন্তু আমাকে সংবাদ করতে হবে। একটা ছবি বানাতে হবে। কাঁদতে কাঁদতেই এগুলো করলাম। এরপর চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে ইচ্ছামতো আরও কতক্ষণ কাঁদলাম। থামানোই যাচ্ছিলো না কান্না। হসপিটালে যেতে হবে এ চিন্তাও ঘুরছিলো মাথায়। মিনিট দশেকের মধ্যেই বের হলাম আজগর আলীর উদ্দেশ্যে।

সময় ৭ টা ১০ মিনিট : এর মধ্যেই আমার টেবিলের সামনে এলেন মারকাযুত তাকওয়ার উস্তাদ মাওলানা ফুয়াদ হাসান ভাই। এসেই জিগেশ করলেন – হাসপাতালে যাবেন? এক দু মিনিটের মধ্যেই রেডি হলাম। হাসপাতালে রওয়ানা দিলাম। অফিসের নিচে নেমেই দেখি একটি প্রাইভেট কার দাড়ানো পাঠাও রাইডের। ঐ গাড়িতে উঠেই বের হলাম আল্লামা শফীর শেষ সময়টার সঙ্গী হতে।

গাড়ি হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে পারেনি। কারণ ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে পড়েছে যে – এ দেশের কিংবদন্তি সেই আল্লামা শফী বেঁচে নেই। হাসপাতালের দিকে তখন মানুষের ঢল। মাঝপথেই পুলিশ গাড়ি আটকে দিলো। কিছু পথ হেটে হাসপাতালে গেলাম। সামনে কঠোর পুলিশ প্রহরা। হাসপাতালের বাইরে রাস্তায় তখন মাদরাসা ছাত্র ও উস্তাদদের ভিড়। কিছুটা হইচইও লক্ষ করলাম। সেদিকে খেয়াল না করেই হাসপাতালে লবিতে ঢুকে গেলাম। ততক্ষণে হাসপাতালের মূল গেট আটকে দিছে। সিকিউরিটিকে সাংবাদিক পরিচয় দিলাম। যেতে দিলো না। পুলিশ ও উধ্বর্তন দায়িত্বশীলদের নির্দেশনা – কাউকে ভেতরে যেতে দেওয়া হবে না। পরে আবার নেমে এলাম রাস্তায়। এসে দেখি রাকিবুল ইসলাম ফারুকী সেখানে সাংবাদিকদের সাক্ষাতকার দিচ্ছে। ডিবিসিসহ বেশ কয়েকটি টিভি ক্যামেরা তখন রাকিবের সামনে। বেশ উচ্চস্বরেই সে কথা বলছিলো। বিশেষ করে তার মূল কথা ছিলো – “আল্লামা শফীর রুমে হামলা করা হয়েছে। মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে এবং এ হত্যার বিচার করতে হবে।” তবে বলা বাহুল্য তার এই কথাকে সেখানে তখনকার উপস্থিত অল্প কিছু মানুষও সমর্থন করেনি। কওমী ছাত্রদের চিরাচরিত অভ্যাস ‘ঠিইইইক’ বলেও কেউ চিল্লানি দেয়নি তার কথার শেষে। যা বলার উচু গলায় সে নিজেই বলেছে। তার কন্ঠই শেনা যাচ্ছিলো।

আমি রাস্তায় নামতে নামতে তার কথা শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। বলতে গেলে বিষয়টা বুঝতে পারতেছিলাম না কী হইছে। ভিড়ের মধ্যেই রাকিবকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম – কী হইছে বলো। সে বললো, এখানে না বরং আপনাকে ভেতরে গিয়ে বলবো চলেন। আমিও তার হাত ধরেই হাসপাতালের ভেতরে যেখানে আল্লামা শফীর স্বজনরাসহ ঢাকার কয়েকজন আলেমরা ছিলেন সেখানে যেতে চাইলাম। প্রথমে একটা গেটে চেষ্টা করে রাকিবসহ কেহই আমরা ঢুকতে পারিনি। পরে অপর আর একটা গেটে চেষ্টা করে রাকিব ভেতরে চলে গেলেও আমার আর যাওয়া হয়নি। কিছুটা চেষ্টা করেও পারিনি। এর মধ্যে এই পুরো বিষয়টা বাবরি চুলওয়ালা স্বাস্থ্যবান একটা ছেলে মোবাইলে রেকর্ড করছিলো। তার চেহারা আমার মনে আছে। এর আগে আমার গুপ্তচর বা খণ্ডিত তথ্য পাচার করা লোক দেখার সৌভাগ্য হয়নি। পরবর্তিতে বুঝলাম – গুপ্তচর বা খণ্ডিত তথ্য পাচার করা লোকগুলো মূলত এমন হয়।

[হাসপাতালের মূল এরিয়ার প্রবেশের পথে। এখান থেকে চেষ্টা করেও ভেতরেও যাওয়া যায়নি। এই লেখাটির লেখক দাড়িয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছেন। ছবি : উসামা মুহাম্মদ।]

হাসপাতালে তখন দু স্তরের পুলিশের বেষ্টনি ছিলো। একটা ছিলো হাসপাতালে প্রবেশের মূল প্রবেশপথে আর একটা ছিলো – হাসপাতালের মূল এরিয়ার প্রবেশের পথে। এর মধ্যে মূল গেট থেকে মূল এরিয়ার মধ্যবর্তি লবিটাতে সাংবাদিকসহ কিছু মানুষ থাকার অনুমতি পেয়েছিলো। বাকি দুই পক্ষের (বিশ্লেষণ করবো) সমর্থকরা সবাই রাস্তায় ছিলো। এর মধ্যে আমার অবস্থান ছিলো সাংবাদিকদের এরিয়ায়।

পক্ষ-বিপক্ষ ভাগ হয়ে যাওয়া এবং ভাংচুর ও উত্তেজনাকর মূহুর্ত :

সময় ৭ টা ৪০ মিনিট : রাকিবের বক্তব্যটার পর পরই হঠাত কিছুটা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো হাসপাতালের সামনে। ততক্ষণে রাকিব ভেতরে সেভ জোনে চলে গেছে। নয়ত পরিবেশ তখনই খারাপ হয়ে পড়তো বলা যায়। তবে রাকিব ভেতরে যাওয়ার দু তিন মিনিট পরেই আর একজন লোক হাসপাতালের সামনের লবিতে এসে খুব জোরে জোরে বলছিলো – “জুনায়েদ বাবুনগরীর বিচার করতে হবে। আল্লামা শফীর মৃত্যুর জন্য সে দায়ী”। এটা বলার পর হয়ত আধা মিনিট সময় সে পেয়েছিলো। চতুর্দিক থেকে তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে অনেকেই। মারধরের অবস্থাও সৃষ্টি হয়েছে। কোনোমতে জনরোষ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে সে হাসপাতালের মূল এরিয়ায় ঢুকে পড়তে কাঁচের দরজার সামনে পর্যন্ত যেতে পেরেছিলো। কিন্তু দরজা আটকানো। এরপর হাসপাতালের কাচের সেই দরজার সামনেই তার উপর উপর্যপুরী হামলা শুরু হয়ে গেছে ততক্ষনে। লাথি, কিল ঘুষি তখন হাসপাতালের দরজায়ও পড়ছিলো। কোনোমতে সিকিউরিটি গার্ডদের দয়ায় সে ভেতরে ঢুকতে পেরেছিলো। নয়ত তার কী অবস্থা হতো সেটা ভাবলে আমি এখনও শিউরে উঠি। অবস্থা দেখে এক পুলিশ সদস্য আমার কানে কানে বলছিলো – “এরা কী পাগল নাকি! এখানে এসে এমন করছে কেন?”

[আজগর আলী হাসপাতালের ভেতরে উত্তেজনাকর মূহুর্ত থামাচ্ছে পুলিশ। ছবি : ভিডিও ফুটেজ থেকে নেওয়া।]

হাসপাতালের সামনের রাস্তায় লোকজনের উপস্থিতি বেড়েছে। পক্ষে-বিপক্ষে আরও হইচই চলেছে। বিশেষ করে উপরে বর্ণিত সৃষ্ট উত্তেজনাটা মারাত্মক আকার ধারণ করেছিলো। পুলিশের বারবার হিমশিম খেতে হয়েছে গেট আটকে রাখতে। ততক্ষণে আবার নতুন একটি দাবি তৈরি হয়েছে – আল্লামা শফী রহিমাহুল্লাহর জানাযা ঢাকায় হতে হবে। এ দাবিটি ততক্ষণে মিছিলে পরিণত হয়েছে। সাথে যোগ হয়েছে – ফরিদাবাদ মাদরাসায় আল্লামা শফীর লাশ নেওয়ার দাবির বিষয়টিও। এ দাবিতেও বেশ বড় একটি গ্রুপ বিশেষ করে ফরিদাবাদের ছাত্ররা মিছিলের মতো পরিবেশ তৈরি করে ফেলেছিলো। যদিও এই দুই দাবির মিছিলের কারণে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ইস্যুটি আর সামনে বাড়েনি। এটা হয়ত আল্লাহ তায়ালার রহমত ছিলো। এ সময় পর্যন্ত ভেতর থেকে জেনেছিলাম – আল্লামা শফীর মৃতদেহ সরাসরি চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে। ঢাকায় কোথাও রাখা হবে না। কিন্তু ছাত্রদের দাবি ও আলোচনার ভিত্তিতে মৃতদেহ পরবর্তিতে ফরিদাবাদ মাদরাসায় নেওয়া হয়েছিলো। যেখানে তৈরি হয়েছে আর এক লজ্জাজনক অধ্যয়। যেটার বিস্তারিত বিবরণও থাকবে নিচে।

[হাসপাতালের বাইরে হাজারো মানুষের উপস্থিতি। ছবি : ভিডিও ফুটেজ থেকে।]

সময় ৮.০০ টা : পরবর্তিতে পুলিশের জোর প্রচেষ্টায় লবিটা খালি করা হলো এবং হাসপাতালে প্রবেশের মূল পথের কেচিগেট আটকে দিয়ে পুলিশ বেষ্টনি দিয়ে দেওয়া হলো। এবার লবিতে আরও কম লোকজন থাকার সুযোগ পেলো। ভাগ্য ভালো যে – আমার সাংবাদিকতার কার্ড এবং অ্যাটিচিউড দেখে পুলিশের লোকজন আমাকে সেখান থেকে বের করে দেয়নি। এর মধ্যেই সেখানে একে একে ওলামায়ে কেরামরা আসা শুরু হলো। সবার নাম আমার মনে নেই। তাছাড়া আমি সবাইকে চিনিও না। সর্বপ্রথম আমার নজর যার উপর পড়েছিলো – তিনি ছিলেন আল্লামা মাহফুজুল হক। আমি নিজেও এগিয়ে গিয়ে সালাম দিলাম। তিনি বিষর্ম মুখেই সালামের জবাব দিলেন। মুসাফাহা করলেন। তিনিও এসে লবিটাতেই দাড়িয়েছিলেন। সাংবাদিকরা তার মতামত নিলো। আমিও ভিডিও করলাম।

[আল্লামা শফী রহ. এর মৃত্যুখবর শুনে হাসপাতালে আল্লামা মাহফুজুল হক। ছবি : ভিডিও ফুটেজ থেকে।]

শেষ পর্যন্ত তিনিও আর ভেতর পর্যন্ত যেতে না পেরে ফিরে গেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জেনেছি। এমনকি তখন আরও জানলাম – ঢাকার অনেক আলেমরাই ভেতরে ঢোকার সুযোগ পায়নি। আল্লামা শফীর পর ঢাকায় সর্বপ্রবীণ আলেম আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী হাসপাতালেই আসেননি। একটি সূত্র থেকে জেনেছি উনারা আঁচ করতে পেরেছিলেন যে ভেতরে তাদেরকে যেতে দেওয়া হবে না। এমন আরও অনেকেই আছেন। তবে যাত্রাবাড়ির শায়েখ, বাংলাদেশের বিতর্কহীন নির্ভরযোগ্য আলেম আল্লামা মাহমূদুল হাসান সাহেব, মধুপুরের পীর সাহেবসহ কয়েকজন ভেতরে গিয়েছিলেন। যদিও মধুপুরের পীর সাহেবকে ভেতরে প্রবেশ করাতে কিছুটা হইচই করতে হয়েছে উপস্থিত ছাত্র-জনতার।

এর মধ্যে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাকর্মীরাও। বিশেষ করে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল-মাদানী ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র পদপ্রার্থী আলহাজ্ব আবদুর রহমানকে আমি দেখেছি। সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ভেতরেই ছিলেন। এছাড়াও বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটির দায়িত্বশীল ও ইশা ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা আল আমিন ও বর্তমান ইশা ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের অনেককেই তখন পুলিশ বেষ্টনিতে সংরক্ষিত লবিতেই দেখেছি আমি। আরও ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দায়িত্বশীলরাসহ ঢাকার অনেক ছাত্রনেতারাও।

[আল্লামা শফী রহ. এর মৃত্যুখবর শুনে হাসপাতালে ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী ও দলের নেতাকর্মীরা। ছবি : সংগ্রহিত।]

সময় ৮ টা ৫০ মিনিট : ভেতরের মূল পয়েন্টে সে সময় অনেকের আনাগোনা। একটি জাতীয় দৈনিকের একজন সিনিয়র সাংবাদিকও তখন ভেতরের মূল স্থানে। (সঙ্গত কারণে নাম বললাম না) তিনি আমার খুব পরিচিত এবং কাছের মানুষ। আমাকে রাইরে দেখে তিনি ফোন করে বললেন – ‘হাছিব ভাই, আপনি একটু সাংবাদিকদের সমন্বয় করেন। আনাস মাদানী একটা ব্রিফিং দেবেন। পরিস্থিতি যেহেতু খুব একটা ভালো না তাই তাকে বাইরে বের করা যাবে না। সাংবাদিকরা লবিতে থাকবে এবং সে ভেতর থেকে দরজা খুলে ব্রিফিং দেবেন।’

আমি তখন প্রতিটা চ্যানেল এবং পত্রিকার সাংবাদিকদের কানে কানে গিয়ে বিষয়টা বলে তাদেরকে এক জায়গায় জড়ো করলাম। কিছুক্ষণ পরই মাওলানা আনাস মাদানী ব্রিফিং দিয়েছেন। তিনি পরদিন (শনিবার) দুপুর ২ টায় চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে জানাযা হবে মর্মে জানিয়ে সার্বিক আরও কিছু বিষয় ব্রিফিংয়ে বলেছেন। সাথে এটুকু শব্দও তিনি বলেছেন – ‘আব্বা টেনশনে ‘হার্টফেল’ করে ইন্তেকাল করেছেন’। এছাড়াও সবাইকে আল্লামা শফী বেঁচে থাকাকালীন সময়ে হাটহাজারী মাদরাসাসহ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে যেভাবে খেয়াল রেখেছেন সেভাবে খেয়াল রাখার অনুরোধও করেছেন।

[সাংবাদিকদের সামনে ব্রিফিং দিচ্ছেন মাওলানা আনাস মাদানী। ছবি : ভিডিও ফুটেজ থেকে।]

আজগর আলী হাসপাতাল থেকে ফরিদাবাদ :

সময় রাত ৯ টা ৫০ মিনিট : ‘ঢাকায় জানাযা চাই, আর কোনো দাবি নাই’ এই মিছিলে তখন উত্তাল হাসপাতালের সামনের প্রাঙ্গন। ধিরে ধিরে এই দাবি আরও জোড়ালো হচ্ছিলো। অন্তত ফরিদাবাদ মাদরাসায় আল্লামা শফীর মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার দাবি তখন বেশ জোড়ালো। বেশ কয়েকবারই এই দাবি ও মিছিলের মধ্যে পুলিশ হিমশিম খেয়েছে ছাত্র জনতাকে আটকে রাখতে। তবে কিছু ভাইয়ের একান্ত প্রচেষ্টা এবং দু একবার আমি নিজেও ছাত্রদের সামনে গিয়ে বারবার তাদের থামতে বলার পর পরিবেশ কিছুটা শান্ত হয়েছে। প্রথমে ফরিদাবাদ নেওয়ার সিদ্ধান্ত না থাকলেও সবার প্রচেষ্টা ও দাবিতে শেষ পর্যন্ত মৃতদেহ সেখানে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ সময়টাতে হাসপাতালের মধ্যে আল্লামা শফী রাহিমাহুল্লাহর মোবারক দেহ গোছল করানো হচ্ছিলো।

আমার জানামতে গোছলের কাজ সম্পন্ন করেছেন মাওলানা যুবায়ের বিন আব্দুল কুদ্দুছ, মাওলানা যুবায়ের আহমদ ফরিদাবাদ, মাওলানা আবু জাফর, মাওলানা জাবের আব্দুল্লাহ। মাওলানা সালমান উজানী এবং নাম সংগ্রহ করতে না পারা বেফাকের একজন দায়িত্বশীল।

গোছলদানে আরও অংশ নিয়েছেন মুফতি ফয়জুল্লাহ, মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস দা.বা. ও মাওলানা আনাস মাদানী।

এছাড়াও আল মারকাজুল ইসলামীর পরিচালক মুফতী শহিদুল্লাহ ও তার সন্তান হামজা ইসলামের সহযোগিতায় তাদের প্রতিষ্ঠানের একজন সেচ্ছাসেবকও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

চিরচেনা ফরিদাবাদ মাদরাসার পথে আল্লামা শফীর নিথর দেহ :

রাত ১২ টার কাছাকাছি সময় হবে (সঠিক সময়টা নোট নেই) : হাসপাতাল থেকে আল্লামা শফী রাহিমাহুল্লাহর নিথর দেহ একটি লাশবাহী ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে বের হলো। সাথে মারকাজুল ইসলামীর আরও দুটি অ্যাম্বুলেন্স। আর পেছনে একটা গাড়িতে মুফতী ফয়জুল্লাহ, আনাস মাদানীসহ আরও কয়েকজন। যাবেন আল্লামা শফীর চিরচেনা জায়গা জামিয়া ইমদাদুল উলুুম ফরিদাবাদ মাদরাসায়। প্রায় ২০ হাজার ছাত্র-জনতা ঘিরে ধরে অ্যাম্বুলেন্সসহ গাড়ি বহরটি ফরিদাবাদ মাদরাসার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো। আমি এবং কলরবের মুহাম্মদ বদরুজ্জামান একসাথে হাসপাতাল থেকে বের হলাম। বদরুজ্জামান ভাই আর ফরিদাবাদ গেলেন না। আমি রিকশায় করে ফরিদাবাদ মাদরাসায় চলে গেলাম। সেখানে গিয়েই পেলাম প্রিয় বন্ধু হাম্মাদ বিন মোশাররফকে। আরও পেলাম মুফতী মিজান ভাইসহ পরিচিত অনেককে। ফরিদাবাদ মাদরাসায় আমার ছোটভাই হাফিজুর রহমান দাওরায়ে হাদিসে পড়াশোনা করার সুবাধে সেখানের অনেকের সাথেই আমার বেশ সুসম্পর্ক আছে।

মাদরাসার মাঠসহ পুরো এরিয়া তখন লোকে লোকারণ্য। প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা সিরিয়ালে দুই পাশে দাড়িয়ে আছে ছাত্ররা। গেটের সামনে প্রায় ৪০ মিনিট অপেক্ষা করার পর আল্লামা শফী রাহি. মৃতদেহ ফরিদাবাদ মাদরাসায় পৌছালো। তখন সময় রাত ১ টার কাছাকাছি।

ফরিদাবাদ মাদরাসা গেটে অনাকাঙ্খিত ও অসহিঞ্চু প্রথম ঘটনা :

মৃতদেহ বহনকারী গাড়িটি ফরিদাবাদ মাদরাসার মাঠের ঠিক মাঝ বরাবর গিয়ে পৌঁছেছে। গেট দিয়ে তখন মুফতী ফয়জুল্লাহ ও আনাস মাদানীদের বহন করা গাড়িটি প্রবেশ করেছে। উনারাও গাড়ি থেকে নামলেন। হয়ত ভাবতেই পারেননি আল্লামা শফীর লাশের সামনেও এমন কিছু ঘটবে। উনারা নামার দু এক মিনিটের মধ্যেই ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ চিৎকার চেঁচামেচি করে উনাদের উপর হামলে পড়তে চাইলো। আল্লাহর বিশেষ মেহেরবানী ফরিদাবাদ মাদরাসার স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্বে থাকা ছাত্ররা তাদেরকে সেইভ করতে পেরেছিলো। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারেনি। সবাই মিলে বেশ কষ্টে নিরাপত্তা দিয়ে তাদেরকে নিয়ে গেলো আল্লামা আবদুল কুদ্দুস সাহেব দা.বা. হযরতের রুমে সেখান থেকে খাস মেহমান খানায়। তাদেরকে ওই রুমটাতেই নেওয়া হয়েছিলো যেখানে আল্লামা শফী জীবদ্দশায় এসে থাকতেন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো – এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ নিয়েও অনেককে ফেসবুকে উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। মুফতী ফয়জুল্লাহ, আনাস মাদানীদের উপর রাগ থাকতে পারে। ছাত্রদের এই ক্ষোভও হয়ত জায়েজ। কিন্তু সেটার বহিঃপ্রকাশ এই দিনে! এই সময়ে!! এটা তো স্পষ্টত অমানবিকতা।

এ ঘটনায় সবাই-ই হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলো। কারণ এমন কিছু কেউ হয়ত কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি। এখানে সবাই-ই মাদরাসার ছাত্র। হামলে পড়া ছেলেগুলোও মাদরাসার ছাত্রই ছিলো। (প্রমান নিচে পাবেন। সে বিষয়টাও আসবে লেখায়।) কিন্তু এই হতবিহ্বলতায় সবচেয়ে বড় যে ঘটনাটা ঘটেছে তা হলো – আল্লামা শফীকে বহনকারী গাড়িটি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। বাধভাঙ্গা জনতা বারবার গাড়িটিকে ধাক্কা দিচ্ছিলো। হযরতের লাশ দেখানোর জন্য জোর করছিলো। তখন ওই সময় গাড়িটির পাশে নিরাপত্তা দেওয়ার মতো কেউ ছিলো না। প্রায় আধা ঘন্টা এভাবে গাড়িটি নিরাপত্তাহীন ছিলো। বারবার ফরিদাবাদ মাদরাসার হোসাইন আমীন নামের একজন শিক্ষক পরিবেশ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছিলো। এমনকি তখন মানুষের চাঁপে গাড়ির ফ্রিজিং পাইপেও সমস্যা দেখা দিচ্ছিলো। গাড়ির ইমার্জেন্সি মাইক থেকে এটা বারবার বলা হচ্ছিলো তখন। তবে গাড়ির ড্রাইভার ও ফরিদাবাদের কয়েকজন ছাত্রের কঠোর প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত গাড়ির কোনো দরজা কেউ খুলতে পারেনি। নয়ত বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো।

[ফরিদাবাদ মাদরাসা মাঠে আল্লামা শফী রাহি. মৃতদেহ বহনকারী গাড়ির চারপাশে ভিড় করে থাকা ভক্তবৃন্দ। ছবি : ইখলাস আল ফাহিম।]

ওই সময়টাতে আমি আর হাম্মাদ গাড়ির কাছাকাছি দাড়িয়ে আছি। অবস্থা দেখে আমাদের আর সহ্য হচ্ছিলো না। দুজনেই নেমে পড়লাম স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্বে। কিছুক্ষণের মধ্যে চলে এলো ফরিদাবাদের আরও ছাত্ররাও। শেষ পর্যন্ত প্রায় আধাঘন্টার প্রচেষ্টায় আমরা অ্যাম্বুলেন্সের চারপাশ থেকে মানুষ সরাতে সক্ষম হয়েছিলাম। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর গাড়িটি ফরিদাবাদ মাদরাসার তালিমাতের রুমের সামনে নিয়ে একটি গোছালো অবস্থায় রাখা হয়েছিলো।

 

আল্লামা শফী রাহিমাহুল্লাহুকে জনতার শেষ দেখা :

সময় তখন ১ টা ৩০ মিনিট প্রায় : আল্লামা শফীকে বহনকারী লাশের অ্যাম্বুলেন্সটি প্রস্তুত করা হয়েছে ছাত্র-জনতা তাকে শেষ দেখাটি দেখার জন্য। কিন্তু মানুষের চাঁপ এতোটাই তীব্র ছিলো যে কিছুতেই সম্ভব হচ্ছিলো নিয়মে আনাটা। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করেও আমরা কিছু না করতে পেরে আমি ভিড় থেকে বের হয়ে ছোটভাইকে ফোন দিলাম। দাওরায়ে হাদিসের ছাত্র মাওলানা হাসান মাহমুদ ও ছোটভাইর সাহায্যে চলে গেলাম দফতরে ইহতেমামে। সেখানে গেটে দেখলাম পরিচিত অনেক ছাত্ররাও আছে। সবার নাম আমার মনে নেই। এরপর দফতরে ইহতেমামের জানালা দিয়ে দেখলাম ভেতরে আল্লামা আবদুল কুদ্দুস দা.বা. হযরতের সন্তান মাওলানা জোবায়েরকে দেখা যাচ্ছে। উনার সাথে কথা বলতে চাইলাম। তিনিও সুযোগ দিয়ে আমাকে দফতরে ইহতেমামে ডেকে নিলেন। আমি উনাকে পুরো বিষয়টা বললাম যে, “এভাবে খুব খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হবে। কিছু একটা নিয়মে আনেন।” উনি বিষর্ম মুখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাঁকিয়ে থেকে বললেন – কী করা যায় হাছিব ভাই বলেন!

সোজা ভাবে আমি বললাম – মারকাজুল ইসলামীর হামজা ইসলাম ভাইকে ডেকে আনেন। আমি উনাকে একটু আগে সামনে দেখেছি। উনারা এসব পরিস্থিতি কনট্রোল করতে পারেন। প্রশিক্ষণ আছে। জোবায়ের সাহেব নিজেই বের হতে নিয়েছিলেন হামজা ইসলাম ভাইকে ডাকতে। আমি ধরে ফেললাম এবং বললাম – আপনি বের হইয়েন না। কারণ গেটের ঘটনাটা তখনও আমার চোখের সামনে ভাসছিলো। পরে আমি নিজেই গিয়ে হামজা ইসলাম ভাইকে খুঁজে বের করে উনাকে নিয়ে এলাম। উনি ছিলেন চরম পর্যায়ে ক্লান্ত। ঘেমে চুপসে ছিলেন। তারপরও অনেকটা জোর করেই উনাকে দফতরে ইহতেমামে আনলাম। উনি এসে সব শুনে ২০ জন ছাত্র চাইলেন। দাওরায়ে হাদিসের ছাত্র হাসানসহ আরও কয়েকজন দায়িত্ব নিয়ে তাদেকে ব্যাচসহ ২০ জন ছাত্র দিলেন। আমাকেও একটা ব্যাচ পরায়া দিলেন ফরিদাবাদ মাদরাসার। এরপর হামজা ইসলাম ভাইর পরিকল্পনায় ফরিদাবাদ মাদরাসার ছাত্রদের অক্লান্ত পরিশ্রমে অত্যন্ত সুচারুরুপে প্রায় ৩ ঘন্টাব্যপী সময় ধরে প্রায় লাখো সংখ্যার মানুষ আল্লামা শফী রাহিমাহুল্লাহর নিথর ও নূরানী আভায় জ্বলজ্বলে চেহারাটা দেখলো।

[ফরিদাবাদ মাদরাসা মাঠে আল্লামা শফী রাহি. মৃতদেহ বহনকারী গাড়ির চারপাশে ভিড় করে থাকা ভক্তবৃন্দ। ছবি : সংগ্রহিত]

ফরিদাবাদের মাঠে দ্বিতীয়বার অনাকাঙ্খিত ঘটনা :

সময় ২.০০ টা : (ফরিদাবাদ মাদরাসার এক ছাত্রের বর্ণনা অনুসারে) দফতরে ইহতেমামের মধ্যে মুফতি ফয়জুল্লাহ তখন বিষর্ম ও মলিন হয়ে আছেন। শেষবার আল্লামা শফী রাহি. চেহারাটা দেখতে চেয়েছেন। তিনি চলে যাবেন ফরিদাবাদ থেকে। হাটহাজারীতেও হয়ত গাড়ি বহরে যাবেন না এমনটাই সিদ্ধান্ত। সাহস (!) করে বের হলেন। একটু নিরাপত্তায় লাশবাহী গাড়িটির কাছে গেলেন। স্বেচ্ছাসেবকরা বেশ সতর্ক। (এরপরের অংশ আমার নিজের দেখা) আমি তখন লাশবাহী গাড়িটির পাশে। মুফতী ফয়জুল্লাহ এলেন। আল্লামা শফীর নিথর মোবারক চেহারাটা দেখলেন। আলো-আধারীতে উনার চোখে তখন পানি চিকচিক করতে দেখেছি আমি। এক দু নজর দেখে মাথা নিচু করে তিনি বের হয়ে যাচ্ছিলেন। মাঠের মাঝামাঝি যাওয়ার পর উনার উপর আবারও হামলে পড়েছে অজ্ঞাত কিছু পোলাপান। হইচই, চিৎকার চেচামেচি আবারও শুরু হয়েছে। এবারও ফরিদাবাদের ছাত্রদের ও পুলিশের কড়া নিরাপত্তায় তাকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে ঘটেছে অন্য এক ঘটনা।

হামলায় সম্পৃক্ত তিনজন আটক :

এই হইচইয়ের মধ্যেই স্বেচ্ছাসেবকরা তিনজন ছেলেকে ধরে ফেলেছে যারা হামলা করেছে তাদের। বেশ পরিশ্রম করে তাদের মধ্যে দুজনকে তালিমাতের দফতরেও নিয়ে আসা গেছে। তিনজনের একজনকে মাঠের মধ্যের একটা গ্রুপ টেনা-হেঁচড়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে। বাকি দুজনকে কঠোর প্রচেষ্টা করেও নিতে পারেনি। এই টানাটানিতে তাদের জামা-কাপড়ও ছিড়ে গেছে। আমি নিজেও ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে গেছিলাম। শেষ পর্যন্ত তাদের দুজনকে তালিমাতের দফতরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। পেছন পেছন আমিও ঢুকলাম। ঢুকে দেখলাম দুজনই মাদরাসার ছাত্র। ফরিদাবাদ মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তাদের সাথে কথা বলতে চাইলাম। তারা অনুমতি দিলো। ভিডিও অপেন করে তাদের নাম, পরিচয়, কেন হামলা করেছে, কী করে, আজকের দিনে কেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে এসব কিছু জানতে চাইলাম। ভিডিওতে তারা মিনিট দশেক কথা বলেছে। ভিডিও আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। আমি অবাক হয়েছি তাদের মানসিকতা দেখে। এই শিক্ষা কে দেওয়া শুরু করলো তাদের! রিতিমত ভয়ংকর। ভয় পাওয়ার মতো অবস্থা। সম্পূর্ণ ভুল পথে তাদেরকে কেউ পরিচালিত করছে। একজন তো নিজেকে ‘মানহাজি’ও পরিচয় দিয়েছে সরাসরি। মাত্র শরহে বেকায়ায় একজন এবং নাহবেমীরে পড়ে একজন। মাদরাসার নাম সঙ্গত কারণেই বললাম না। তবে কেহই ফরিদাবাদ মাদরাসার না।

[বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী অনেকের মধ্যে পুলিশের হাতে ধৃত তিনজন। পুলিশ জানিয়েছে তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এসেছে। একজন নিজেকে সরাসরি ‘মানহাজি’ মতাদর্শের বলেও স্বীকার করেছেন। ভিডিও ফুটেজে যা স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত রয়েছে।]

এর মধ্যে পুলিশ, সিআইডি ও ডিজিএফআইর লোকজনও চলে এলো। তারা তাদের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করলো। নাম, ঠিকানা পরিচিতি নিলো। পুরো সময়টাই আমি সামনে ছিলাম। আমি স্পষ্টই সাক্ষি দিতে পারি – মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাদেরকে কোনো কটু কথাও বলেনি। বরং ছাত্ররা ঠান্ডা পানি এনে খাইয়েছে তাদের। যা করার পুলিশই করেছে। কিছুক্ষন পর আরও একজন ধরে নিয়ে এসেছে স্বেচ্ছাসেবকরা। আমি তারও ভিডিও সাক্ষাতকার নিয়েছি। সংরক্ষিত আছে আমার কাছে। তার মোবাইল থেকেই তার ফেসবুক আইডি ঘেটে তো আমি অবাক। কী সব পোস্ট আর বিশৃঙ্খল কাজ! মিনিটে মিনিটে আপডেট দিয়ে সাথীদের জানাচ্ছিলো সব কিছু। সেও কওমী মাদরাসায় পড়ে। মেশকাতে। অন্য মাদরাসায়। তবে তৃতীয় বারে আনা ছেলেটা মূলত হুজুগে করছিলো এসব। কেউ তাকে নির্দেশনা দিয়ে পাঠিয়েছে এগুলো করার জন্য। পরবর্তিতে পুলিশ তিনজনকেই গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে।

আমার বুখারির শায়েখ প্রিয় সিপাহসালারকে শেষ দেখা :

সময় ৩.০০ টা : ভিড় কমেছে ফরিদাবাদ মাঠের। মন ছটফট করছিলো প্রিয় শায়খকে শেষবারের মতো একবার দেখার জন্য। আস্তে আস্তে বের হলাম হাম্মাদ ভাইসহ। গিয়ে দাড়ালাম গাড়ির সামনে। কাঁচের দেয়ালের ওপাশে তখন নুরানী চেহারাখানা। চোখ বন্ধ আর হালকা দাড়ির নিস্পাপ নিথর চেহারাটা দেখে নিজের চোখের সাথে লড়াইয়ে পারা যায়নি। মিনিট দুয়েক তাঁকিয়ে থেকে আস্তে করে চলে এলাম। এই চেহারা আর দেখবো না। কাঁপা কাঁপা ভাঙ্গা গলায় তিনি আর নাস্তিক-মুরতাদদের বিরুদ্ধে হুংকার তুলবেন না। মাথা ঝুঁকিয়ে ‘ক্বলা হাদ্দাসানার’ সূর শুনবেন না আর। হাটহাজারীর দারুল হাদিসের মসনদটা আল্লামা শফীর মেহেকে আর ঘ্রাণ বিলাবে না। এসব ভাবতেই কলিজায় একটা আঘাত লাগছিলো যেন। মনে হচ্ছিলো কেউ খামচি মেরে কলিজাটা ছিড়ে নিয়ে যাচ্ছে। জান্নাতে আপনার সাথে দেখা হবে – এটুকু চাহিদা রইলো রব্বে কারীমের কাছে।

আপন নীড়ের পথে আল্লামা শফীর নিথর দেহ :

সময় রাত ৪.০০ টা : বিভিন্ন ঘটনা ও সবকিছু শেষ করার পর চট্টগ্রামের পথে আল্লামা শফীর মৃতদেহ রওয়ানা হবে। সব পরিস্থিতি দেখে পুলিশ কড়া নিরাপত্তার দায়িত্ব নিলো। এই বহরে কোন কোন গাড়ি যাবে এবং কতজন যাবে সব লিস্টেড করলো। আমি ফরিদাবাদের একটি টিমের সাথে এই লিস্টেড হলাম। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পুরো পথে কঠোর সিকিউরিটি থাকবে।

[ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে আল্লামা শফী রাহি. এর মৃতদেহ বহনকারী গাড়ির বহর। ছবি : ভিডিও ফুটেজ থেকে।]

ফরিদাবাদ থেকে গাড়ি ছাড়লো। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আল্লামা শফী রাহিমাহুল্লাহর নিথর দেহ বহন করা ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সটির সাথে আমার প্রায় ৭ বছর কাঁটানো হাটহাজারী এলাকায় পৌছালাম। তখন সময় সকাল ৯ টা হবে। এর মধ্যে ফজরের নামাজের পর ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়েতে ঝাঁকে ঝাঁকে মাইক্রোবাস আর মাদরাসা ছাত্র-শিক্ষক ও মুসলিম জনতার ছুটে চলা দেখে কিছুটা অনুভব করতে পেরেছিলাম যে হাটহাজারীতে আজ কী হতে চলছে। একটি ইতিহাস যে হাটহাজারীতে রচিত হবে তা বুঝতে কষ্ট হয়নি আমার।

আনাস মাদানী কী জানাযায় গিয়েছেন :

ফরিদাবাদের ঘটনার পর সবাই নিথর হয়ে গেছেন মনে হলো। বিভিন্ন অনাকাঙ্খিত ঘটনার ভয়ে অনেকটাই ভীত হয়ে পড়েছিলেন অনেকে। অনেককেই হাটহাজারী না যেতে পরামর্শ দিচ্ছিলেন সবাই। সেখানেও অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটে যেতে পারে হয়ত। যেসব কারণে আমাদের গাড়ি বহরে আল্লামা শফীপূত্র মাওলানা আনাস মাদানী, মুফতী ফয়জুল্লাহ, আল্লামা আবদুল কুদ্দুস দা.বা., মাওলানা জুবায়েরসহ অনেকেই যাননি। তবে তারা জানাযা পড়তে পেরেছেন কি না সে তথ্য আমার জানা নেই। বের করতে পারিনি। কিন্তু মাওলানা আনাস মাদানী যদি জানাযায় উপস্থিত না হয়ে থাকেন তাহলে কঠোর এক দায় আর আপরাধবোধ এ প্রজন্মের কাছে ছেড়ে দিয়ে গেলেন। এ দায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম কাউকে না কাউকে বহন করতেই হবে। এর মুআখাজাও ভোগ করতে হবে।

[আনাস মাদানী, মুফতী ফয়জুল্লাহদের দোষ থাকতে পারে। সে সব দোষের বিচারও চাইতে পারে কেহ। কিন্তু এই দিনে এসব আচরণ আমি এক চুলও সমর্থন করি না]

একটি অপ্রকাশিত বিষয় :

সময় ভোর ৬ টা ৩০ মিনিট : (বিশেষ কিছু নিরাপত্তার কারণে আমি বিষয়টার কিছুই সেভাবে প্রকাশ করতে পারবো না।) আমার কাছে একটি ফোন এলো। ফেসবুক মেসেঞ্জারে। খুবই নির্ভরযোগ্য ও চমকে উঠার মতো পরিচয়ের একজনের ফোন। প্রায় ২৯ মিনিট সেই ফোনে দুজন মানুষ আমার সাথে কথা বলেছেন। যত শুনছিলাম ততই পাথর হয়ে যাচ্ছিলাম। এই কথাগুলো আমি না শুনলেই হয়ত ভালো থাকতাম। থাকতে পারতাম। কিন্তু শুনেছি। আফসোস করতেও ভুলে গেছি সব শুনে। যখন কথাগুলো শুনছি তখন আমার দুটি গাড়ির সামনেই আল্লামা শফী রাহি. কে বহন করা অ্যাম্বুলেন্সটি শা শা করে ছুটছিলো। আমি সেদিকে তাঁকিয়ে বারবার জপছিলাম – “শায়খ – ক্ষমা করে দিয়েন আমাদের, ক্ষমা করে দিয়েন”। খোদার কাছে অনেক শোকরিয়া – এই কথপোকথনগুলো আমার কাছে রেকর্ডেট না। তবে মহান প্রভু এ বিষয়ে আমার হৃদয়ের কথাটা যেন শুনেন। এই দোয়াটা আমি করছি সব সময়। করেও যাবো ইনশাআল্লাহ। রাব্বে কারীম – আমার এ দোয়া আপনি কবুল করুন।  আমিন। ছুম্মা আমিন।

তারই অঙ্গনে তারই নিথর দেহের প্রবেশ :

সময় সকাল ১০.০০ টা : আমাদের গাড়ি হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ড পার হতে পারেনি। কেবল মাত্র পুলিশের দুটি গাড়ি ও লাশ বহন করা অ্যাম্বুলেন্স ও মারকাজুল ইসলামির গাড়িগুলো সে পর্যন্ত আসতে পেরেছে। ফরিদাবাদের ছাত্ররাসহ হেটে হেটে হাটহাজারী গেট পার হলাম। পেছন থেকেই মারকাজুল ইসলামীর গাড়ি এলো। হামজা ইসলাম ভাই জানালা খুলেছেন দেখে সামনে আগালাম। তখনও আল্লামা শফীর মৃতদেহ তার প্রিয় কাননে প্রবেশ করেনি। আমরা হাটহাজারী মাদরাসার উত্তর গেট দিয়ে মাদরাসায় প্রবেশ করলাম হামজা ইসলাম ভাই ও মারকাজুল ইসলামীর স্বেচ্ছাসেবকরাসহ। একটু পরই লাশ প্রবেশ করলো হাটহাজারী মাদরাসার প্রধান গেট দিয়ে। কান্নার রোল পড়ে গেলো হাটহাজারী মাদরাসা মাঠে। কাঠফাটা রোদ ভেঙ্গে হাজার হাজার মানুষ দাড়িয়ে আছে প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো একবার দেখার জন্য। নিরাপত্তার কাজ করতে চাইলো মারকাজুল ইসলামীর স্বেচ্ছাসেবকরা। কিন্তু কার সাথে কথা বলবে, কী করবে কিছুই বুঝা যাচ্ছিলো না। হামজা ইসলাম ভাইকে নিয়ে গেলাম মাওলানা দিদার সাহেবের রুমে। তিনি বিষর্ম তখন। একজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন – ‘হুজুরকে আমরা হারায়া ফেললাম’। এর মধ্যেই দিদার সাহেবকে সবকিছু বলার পর তিনি মুফতী জসিম উদ্দিন সাহেবের সাথে দেখা করতে বললেন। কারণ দায়িত্ব উনার।

 

[হাটহাজারী মাদরাসার ইঞ্চি ইঞ্চি জায়গায় মানুষের ভিড়। ছবি : সংগ্রহিত।]

যে পরিমাণ ভিড় আর মানুষের চাঁপ তাতে আর হাটা সম্ভব হচ্ছিলো না। অপরদিকে মাদরাসার মাইকে জানলাম মুফতী জসিম উদ্দীন সাহেবের ব্যবস্থাপনায় গোছালো এন্তেজাম হচ্ছে মৃতদেহ দেখানোর। হামজা ভাই বললেন খুব ক্লান্ত। নিয়ে গেলাম মেহমান খানায়। সব বুঝায়া বলার পরও মেহমান খানা ফিলআপ দাবি করে ঢুকতে দিলো না দায়িত্বশীলরা। হামজা ভাইও চলে গেলেন উনার বাবা মুফতী শহিদুল ইসলাম সাহেবের কাছে। তিনি হাটহাজারীর এক উস্তাদের রুমে ছিলেন। আর দেখা হয়নি হামজা ভাইর সাথে। পরে বিশেষভাবে আমি মেহমান খানায় ঢুকেছিলাম। সেখানে দেশবরেণ্য অনেক উলামায়ে কেরামরা ছিলেন। ছিলেন হাটহাজারীতে আন্দোলনের ঘটনায় আলোচিত অনেক ব্যক্তিত্বরাও। ওই সময়টাতে পুরো হাটহাজারী শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়েছিলো। হাজার হাজার ছাত্রদের চোখে আমি পানি দেখেছি। এর একটু পরই দেখা হয়েছিলো জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম একাংশের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান ভাইর সাথে। আরও অনেককে দেখেছি। চুপচাপ থেকেছি।

জানাযা ও আমি :

সময় ১১.০০ টা : আর পারছিলাম না। দেহে শক্তি নাই কোনো। সারারাত ঘুমহীন ও বিভিন্ন কাজের কারণে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়ছিলাম। একটু পিঠ লাগানো দরকার কোথাও। কিন্তু ফোনে নেটওয়ার্ক নাই। পরিচিত কাউকে ফোনও দিতে পারছিলাম না যে তাদের কাছে যাবো। একবার চেয়েছিলাম ভার্সিটি চলে যাই। দু ঘন্টা ঘুমিয়ে আবার আসবো। কিন্তু যে অবস্থা তাতে ভার্সিটিতে যাওয়া এবং আসা দুটোই পায়ে হেটে করা লাগতো হয়ত। শেষ পর্যন্ত মসজিদে নূরের তৃতীয় তলায় গিয়ে এক কোনায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দু ঘন্টা ঘুমিয়ে যখন উঠেছি তখন প্রায় ১ টা ২০ মিনিট। তড়িঘড়ি করে উঠে বহু কষ্টে অজু করে জোহরের নামাজ ও জানাযার প্রস্তুতি নিলাম। দুপুর ২ টা ১০ মিনিটে জানাযা হলো। জানাযার আগে তেমন কোনো কথা কেউ বলেনি। এটা নাকি নির্দেশনা ছিলো। জোহরের নামাজের আগে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সুন্দর কথা বলেছেন। আমি শুনতে পারিনি অবশ্য। শুনলে সে বিষয়টাও এখানে আনতাম। পরিশেষে হাটহাজারী মাদরাসার শাহী গেটের সামনে জাহাঙ্গীর ভাইর পানের দোকানের কাছাকাছি জায়গায় রাস্তায়ই জানাযার নামাজটা পড়ে ফিরতি পথ ধরলাম। প্রায় দেড় কিলোমিটার হেটে অনেকটাই হিট স্ট্রোকের মতো অবস্থায় পড়ে শেষ পর্যন্ত গাড়ি বের করতে পেরেছিলাম। রাত ১০ টা নাগাদ ঢাকায় এসে পৌঁছালাম এক মহা-ইতিহাসের সমাপ্তি অধ্যয়ের সাক্ষি হয়ে। সবকিছু বিশেষ এক জায়গায় ব্রিফিংও দিতে হলো।

[আল্লামা শফী রাহি. এর কবর। ছবি : ইখলাস আল ফাহিম।]

আফসোস ও অপূর্ণতা :

১. হাটহাজারী গিয়েছি। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী হাফিজাহুল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে পারিনি। একজন নিভৃতচারী এই আলেমের হাতের স্পর্শ সব সময়ই আমাকে উজ্জিবিত করে তোলে। আমার কুতুবে সিত্তাহর উস্তাদ তিনি। হেফাজতের রক্তসঞ্চারণে তার স্পর্শ আছে। হাটহাজারী মাদরাসাকে নতুন পরিচয় দানেও তার অবদান আছে। আল্লামা আহমদ শফী রাহি.-এর কলিজার টুকরা ছিলেন তিনি। ছিলেন আল্লামা শফীর সর্ব ভরসার মানুষ। সময় গড়িয়েছে। দুঃখ বেদনার জঞ্জাল তৈরি হয়েছে কিন্তু আল্লামা হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরীর মন থেকে আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী রাহি. এর প্রতি টান আর ভালোবাসার কমতি হয়নি এই বিশ্বাসটাই আমি রাখতে চাই। একই সাথে তার মধ্যেই আমরা আল্লামা শফীর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। দেখতে চাই। ইনশাআল্লাহ – কাছাকাছি সময়ে আবার যাবো চট্টগ্রাম। হাটহাজারী মাদরসায়। আল্লামা শফী রাহিমাহুল্লাহর মকবারায় একটু চোখের পনি ফেলতে। ইনশাআল্লাহ প্রিয় বাবুনগরী হযরতের স্পর্শও তখন নিয়ে আসবো।

২. হাটহাজারী মাদরাসায় আমার প্রিয় উস্তাদ মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী। হুজুরের রুমের সামনে দুবার গিয়েছিলাম। কিন্তু প্রচন্ড ভীড়। খাদেম ভেতরে যেতে দেয়নি। আমিও আর জোর করিনি। সাথে একটু ভয়ও ছিলো। কারণ হুজুর আমাকে মুহাব্বাত করেন খুব কিন্তু আমি যোগাযোগ রাখি না ঠিকমতো।

৩. আল্লামা শফী রাহিমাহুল্লাহর জানাযায় শরিক হয়েছিলেন আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীম (শায়খে চরমোনাই)। শায়খের সাথে আগের রাতে কথা হয়েছিলো। জানাযায় আসবেন বলেছিলেন। কিন্তু হাটহাজারীতে দেখা করতে পারিনি।

রাকিবুল ইসলাম ফারুকীর সাথে আমার পরিচয়টা কী :

এ বিষয়টা লম্বা করবো না। আজগর আলী হসপিটালে রাকিবের ভূমিকায় সে নিন্দিত হয়েছে এটা আমিই বলতে পারি। এমনকি সে সময়টাতে তার এই ভূমিকাটা আমি ভালোভাবে দেখিনি। আমাকে তার সাথে খুব খোশগল্প তখন করতে দেখে উপরে বলা গুপ্তচর ভাইটি ক্ষেপেছিলেন। সেজন্যই তিনি ছবি আর ভিডিও ধারণ করেছেন। সেটা আবা ফেসবুকে কওমী অঙ্গনের পরিচিত উসামা মুহাম্মাদকেও দিয়েছেন। সেটাতে খুব একটা কিছু না করতে পেরে ফেসবুকে ট্রলে পরিচিত যুবাইর মাহমুদ নামের একজন ভিডিওটিও ফেসবুকে দিয়েছে। তারা মিলে বেশ হইচই করেছে এটা নিয়ে। মূলত তারা একটা সন্দেহে পড়েই এটা করেছে। রাকিবের সাথে আমার পরিচয়ের বিষয়টা ক্লিয়ার হলে এই সন্দেহটা সচেতন কারো থাকবে না বলেই আশা করি।

রাকিবের সাথে মূলত আমার পরিচয় প্রায় যুগ পার হয়েছে বলা যায়। আমরা একই মাদরাসায় পড়েছি ভোলায়। বাড়িও এক জেলাতে। আমার বাসায়ও ওর যাওয়া-আসা আছে। বয়সে এবং জামাতে সে আমার ছোট। হাটহাজারীতে একসাথে পড়া না হলেও হেফাজতের সময়টাতে রাকিব যখন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর সবচেয়ে কাছের খাদেম হিসেবে ছিলো তখন তার সাথে আমার যোগাযোগ ছিলো খুব। ১৪ সাল ২০ সাল পর্যন্ত আমি চট্টগ্রামেই ছিলাম। হাটহাজারীতেই। তবে মাদরাসায় না ভার্সিটিতে। আল্লামা বাবুনগরী হযরতের কাছাকাছি থাকায় তখনও তার সাথে যোগাযোগ হতো। প্রায়ই আমি হাটহাজারী মাদরাসায় যেতাম। আল্লামা বাবুনগরী হযরতের রুমেও যেতাম। প্রচন্ড মজাদার একটা খিচুড়ি ও রান্না করে খাওয়াতো। বলতে গেলে এটার লোভেই যেতাম। ঢাকাতেও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী হযরত অসুস্থ হয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমি গিয়েছিলাম ওর মাধ্যমে। হুজুরকে দেখে এসেছিলাম। আমি মানুষের সাথে ঠিকমতো যোগাযোগ রাখি না। ওর সাথেও রাখতাম না। এটা নিয়ে তার ক্ষোভও ছিলো। ও জুনায়েদ বাবুনগরী হুজুরের আপন মানুষ এটাই আমি জেনে আসছি বিগত মাসখানেক আগেও। সর্বশেষ যখন ও এসব বিষয়ে ওর একটি আলোচিত ভিডিও প্রকাশ পেলো তখনই সবকিছু জানলাম আমি। কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক তো এতে শেষ হয়ে যায়নি। হবেও না হয়ত। তবে এর মানে এটাও না যে – আমি তার সব কথা ও কাজকে সমর্থন করি বা করবো। তাছাড়া এসবে আমার কোনো লাভ-স্বার্থও নেই। আমি যে কোনো কাজ বিশেষ চিন্তায় করি। কোনো স্বার্থ তালাশে না। ব্যাস! এটুকুই। এর বেশি কিছু বলার নেই।

[একাত্তর টিভিতে আল্লামা শফী রাহি.-এর ইন্তেকাল বিষয়ক এক লাইভ অনুষ্ঠানে মুখোমুখি আল্লামা মামুনুল হক (বায়ে) ও রাকিবুল ইসলাম ফারুকী (ডানে)।]

পরিশিষ্ট :

আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী রাহিমাহুল্লাহর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইসলামী জাগরণের একটি অধ্যয়ের সমাপ্তির দ্বারপ্রান্তে এসেছে। আগামীর বাংলাদেশে ইসলামের জাগরণ তার পন্থা পরিবর্তনে মরিয়া হয়ে উঠছে। জানি না এই পরিবর্তন কী নতুন কোনো ভোরের আভা ছড়াবে নাকি অমাবশ্যার ঘোর অমানিষা ডেকে আনবে। আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী রাহি. এর ইন্তেকালের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে যে অবিশ্বাস, অনৈক্য আর বিভেদের নতুন দেয়াল তৈরি হয়েছে তা কী ভাংবে নাকি আরও ভয়ানক হবে সেটাও দেখার সময় আসবে। তবে এসব কিছু ভেঙ্গে ইসলামী জাগরণে সবাই সবার সারথি হবো – এ কামনাই থাকবে সব সময়।

[এই লেখা বিষয়ে যে কোনো ধরণের প্রমান বা তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হলে লেখকের সাথে সরাসরি দেখা করে যাচাই করতে হবে। কোনো ডকুমেন্ট কাউকে হস্তান্তর করা হবে না। সাথে সাথে এই লেখার সকল দায় একান্ত লেখকের। পাবলিক ভয়েস প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই লেখার দায় বহন করবে না।]

লেখক : হাছিব আর রহমান। ছাত্র – আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী রাহিমাহুল্লাহ।

আগামী পর্বের বিষয়বস্তু : আল্লামা শফী রাহিমাহুল্লাহুর ইন্তেকাল নিয়ে কার কী কথা ও কারা কী ভূমিকা রেখেছেন। নেতৃত্ব নিয়ে কারা কোথায় লবিং করেছেন এ বিষয়ে কিছু বিশ্লেষণ।

ঐতিহাসিক জানাযায় অংশ নেওয়া জনস্রোতের কিছু অংশ।

আল্লামা শফী রাহি. এর ঐতিহাসিক জানাযায় অংশ নেওয়া জনস্রোতের কিছু অংশ। ছবি : ইখলাস আল ফাহিম।

আল্লামা শফী রাহি. এর ঐতিহাসিক জানাযায় অংশ নেওয়া জনস্রোতের কিছু অংশ। ছবি : সংগ্রহিত।

আল্লামা শফী রাহি. এর ঐতিহাসিক জানাযায় অংশ নেওয়া জনস্রোতের কিছু অংশ।

[হাটহাজারী মাদরাসার প্রধান মসজিদ। জানাযার সময় ছাদেও হাজার হাজার মানুষ। ছবি : ইখলাস আল ফাহিম।]

মন্তব্য করুন