আল্লামা শফী রহ.-এর মৃত্যুতে শোক সভায় বেফাক-হাইআ নিয়ে কঠোর বার্তা

প্রকাশিত: ১২:১৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০

ঢাকার প্রশিদ্ধ কওমী মাদরাসা জামিয়া মাদানীয়া বারিধারায় আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীর আমন্ত্রণে গতকাল অনুষ্ঠিত ‘আল্লামা শফী রহ. এর শোকসভা’ যেন পরিণত হয়েছিলো বেফাক-হাইআতুল উলয়ার ভবিষ্যত নেতৃত্ব নির্ধারণের মঞ্চ হিসেবে।

শোকসভায় বেশিরভাগ বক্তারাই তাদের আলোচনায় রেখেছেন বেফাক-হাইআ প্রসঙ্গ। কেউ কেউ দিয়েছেন কড়া বার্তাও। এ ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনায় এসেছে জামিয়া রাহমানিয়ার শাইখুল হাদিস মাওলানা মামুনুল হকের বক্তব্য, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার শাইখুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের বক্তব্য এবং ৫-ই মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের উপর সংগঠিত ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের সময় আলোচিত-সমালোচিত হওয়া মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের বক্তব্য।

এমনকি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব স্পষ্ট করেই বলেছেন – এই মঞ্চের সিদ্ধান্তের বাইরে যারা যাবে তারাই দালাল গোষ্ঠির কাতারে নাম লেখাবে।

তিনি বলেন – “পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই- বেফাক, হাইয়াতুল উলইয়া, হেফাজতে ইসলাম, খতমে নবুওয়তের বিষয়ে আজকে এই মঞ্চ থেকে যেই সিদ্ধান্ত হবে, সেই সিদ্ধান্তই কার্যকর হবে। সেই সিদ্ধান্তই কার্যকর হবে। এর বাহিরে কেউ দরজা বাদ দিয়া জানালা দিয়া প্রবেশ করতে যাবেন, এর বাহিরে কেউ বাঁকা পথে হাটতে যাবেন, আপনারাও দালাল গোষ্ঠীর কাতারে নাম লেখা হবে।”

মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের এ বক্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কওমী অঙ্গনের মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। আল্লামা শফী রহ.-এর ইন্তেকালের পর বেফাক-হাইআর পদ-পদবি নিয়ে যে বিতর্ক তুঙ্গে উঠবে কওমী অঙ্গনে সে বিষয়টিই সামনে এসেছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব আরও বলেন – আল্লামা আহমদ শফী কোনো ব্যক্তির নাম নয় বরং একটি প্রতিষ্ঠানের নাম। তিনি বলেন – আল্লামা আহমদ শফীর নাম বিক্রি করে যারা দালালি করেছে তাদের রুজি-রুটি বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন – পরিতাপের বিষয়, নিজের সন্তান হয়ে বাবার লাশ দাফনের সুযোগ পায়নি।

অপরদিকে বারিধারা মাদরাসার শাইখুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকও বলেছেন কঠোর কথা।

তিনি তার বক্তব্যের শুরুতে দু এক মিনিট আল্লামা শফী রহ. এর স্মৃতিচারণ করে বলেন – আল্লামা শফী আমার উস্তাদ। আমি উনার কাছে পড়েছি। আল্লামা শফী আল্লাহর ওলী ছিলেন। অনেকে বাহির থেকে ভাবতো তিনি হয়ত এই করছেন, সেই করছেন আসলে এসব কিছু চাটুকার ও ‘লুসুসুদ দ্বীন’, উলামায়ে সু-রা তাদের ফায়দা হাসিল করার জন্য এসব করতো।

তিনি বলেন – বেফাক ও হাইআর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা রক্ষা করবো। আজকের এই মঞ্চে যে ওলামায়ে কেরাম রয়েছেন তারা হলেন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এবং বিশ্বাসযোগ্য ওলামায়ে কেরাম। তাই আমরা এই ওলামাদের নেতৃত্বে হাইআ চালাবো, বেফাক চালাবো, হেফাজত চালাবো, খতমে নবুওয়াত চালাবো।

তিনি বলেন – আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই। এই বেফাকের একটি পুরনো পরিবার আছে। আজকে নতুন করে বেফাকে ঢুকে কেউ সভাপতি হয়ে যাবেন অত-এতিম বেফাক নয়। তাই নতুন অতিথি কেউ বেফাকের চেয়ারে বসার কোনো স্বপ্ন দেখবেন না।

তিনি হুমকি দিয়ে বলেন – বেফাক, হাইআ ও হেফাজতের কোনো ক্ষতি ঘটালে তার ‘ঠ্যাং ভাঙ্গি দিবো, মুখ সেলাই করে দেবো”। তিনি আরও বলেন – আমাদের কোনো সরকারের দরকার নাই। কোনো পরামর্শদাতারও দরকার নাই। আমরা নিজ পায়ে চলতে পারি।

সভায় মাওলানা মামুনুল হক সারাদেশের সকল মাদরাসা হাটহাজারী মাদরাসায় পরিণত হবে বলে উল্লেখ করে বলেন -“দীর্ঘদিনের অস্থিরতার অবসান ঘটে উম্মুল মাদারিস হাটহাজারী যেভাবে তার পূর্বের ধারায় ফিরে গিয়েছে শাইখুল ইসলাম আল্লামা শফি (রহ) এর রুহানী ধারার বরকতে তেমনিভাবে বেফাক-হাইয়াও তার স্বকীয় ধারায় ফিরে যাবে, হেফাজতও তার স্বকীয় ধারায় ফিরে যাবে।

হেফাজতকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করবার কোন সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। বেফাককে নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। যদি নতুন কোন খেলা শুরু করবার দুরভিসন্ধি কারো থেকে থাকে আমি হাটহাজারী মাদরাসার ছাত্রজনতার বিপ্লব থেকে তাদের সতর্কবানী শোনাতে চাই।

শাইখুল ইসলামের পাচ হাজার সন্তান যেমনিভাবে যেমনিভাবে তার ঘাম এবং আশ্রুতে গড়া উম্মুল মাদারিসলে কলংকমুক্ত করেছে তেমনিভাবে বাংলার টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া আল্লামা আহমদ শফি (রহ) এর লক্ষ সন্তান এখনো জীবিত আছে।

প্রয়োজনে আগামী দিনে শুধু হাটহাজারী মাদরাসা নয়, সারা বাংলার লক্ষ জনতা তাদের প্রাণপ্রিয় এদারাগুলোকে দালালমুক্ত করবার জন্য  গোটা বাংলাদেশকে হাটহাজারীতে পরিণত করবে ইনশাআল্লাহ।”

শোকসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন – অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী। (পীর সাহেব দেওনা)। বেফাকের খাস কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম জিহাদী। জামিয়া দারুল আরকামের মাওলানা সাজিদুর রহমান। মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী। বেফাকু্ল মাদারিসিল আরাবিয়ার যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক। মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জির প্রতিনিধি মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী। শায়খুল হাদীস মাওলানা হেলাল উদ্দিন ফরিদপুর। মুফতী মোহাম্মদ আলী। মাওলানা খালিদ সাইফু্ল্লাহ আইয়ুবী, মাওলানা মামুনুল হক, বারিধারা মাদরাসার শাইখুল হাদিস উবায়দুল্লাহ ফারুকসহ বিভিন্ন ওলামায়ে কেরামগন।

প্রসঙ্গত : আল্লামা শাহ আহমদ শফী রাহি. এর মৃত্যুর পর তার নিয়ন্ত্রণে থাকা পদগুলো নিয়ে নেতৃত্বের সংকট ও সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে বলে অনেকেই ধারণা করেছিলেন। গত দু একদিনে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে পড়ছে বলেই মনে করছেন সচেতন মহলরা। বিশেষ করে বেফাক নিয়ে আলোচনা চলছে জোড় দিয়ে।

তবে বেফাকের সদর বা সভাপতি নির্ধারণের বিষয়ে বেফাকের গঠণতন্ত্রে পরিস্কার ভাবেই চারটি নিয়মবা মূলনীতি দেওয়া আছে। মূলনীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো – ১. কোন রাজনৈতিক দলের কর্ম কর্মকর্তা বা সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সাথে জড়িত বা একাধিক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত বা দায়িত্বশীল এমন ধরনের ব্যক্তি অত্র প্রতিষ্ঠানের জন্য সদর হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।

এছাড়াও আরো যে তিনটি শর্ত রয়েছে তা হলো – ২. উক্ত প্রতিষ্ঠানের সদরকে অবশ্যই হক্কানী আলেমে দীন, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, বিবেচনা শক্তির অধিকারী, কর্মতৎপর, বেফাকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি আস্থাশীল ও বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সকলের আস্থা ও শ্রদ্ধাভাজন, হক্কানী কোন বুযুর্গের নিসবতওয়ালা  যুগ চাহিদার সম্পর্কে সচেতন, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি অগ্রগতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে।

৩.  যারা প্রতিষ্ঠানের সদর বা নায়েবে সদর হবেন তাদেরকে অবশ্যই নিয়মিত বেফাকের সকল পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মাদ্রাসার কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি হতে হবে।

৪. বেফাকের প্রতি আন্তরিক, বেফাকের হিতাকাঙ্খী, এবং বেফাকের প্রতি যাদের ত্যাগ রয়েছে এমন ধরণের ব্যক্তিত্ব হতে হবে।

এই চার শর্তের ভিত্তিতেই বেফাকের গঠনতন্ত্র অনুসারে প্রধান ব্যক্তি নির্বাচিত হবেন।

মন্তব্য করুন