সাক্ষাৎকারে একবারের জন্যও নারী সাংবাদিকের দিকে তাঁকাননি তালেবান নেতা

প্রকাশিত: ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০

…সাক্ষাৎকারের পুরোটা সময় আমি খেয়াল করলাম, তিনি এবং তার প্রতিনিধিদলের অন্য তালেবান নেতারা আমার চোখে চোখ রাখছেন না। এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল যে তারা পুরুষদের সঙ্গে কথা বলার সময় যতটা সহজ, মেয়েদের বেলায় মোটেই তা নন।

দীর্ঘ পরিশ্রমের পর আফগান তালেবানের একজন প্রধান নেতার সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে বিবিসির এক নারী সাংবাদিক বিরল এক অভিজ্ঞতার ঘটনা জানালেন।

কাতারের রাজধানী দোহায় তালেবান ও আফগান সরকারের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার শেষ দিনে প্রায় তিন মিনিট ধরে নেওয়া একটি মুখোমুখি সাক্ষাৎকারে ওই তালেবান নেতা একবারের জন্যও নারী সাংবাদিকতার দিতে তাঁকাননি বলে উল্যেখ করেছেন বিবিসির ওই নারী সাংবাদিক।

বিবিসির পশতু বিভাগের শাজিয়া হায়া বলেন – কাতারের দোহায় তালেবানের সঙ্গে আফগান সরকারের ঐতিহাসিক আলোচনার শেষ দিনে আমি তার দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম একটা সাক্ষাৎকারের অনুরোধ নিয়ে। আমি তখন বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেব। তখন হোটেলের লবিতে দেখলাম তালেবান প্রতিনিধিদলের কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের ঘিরে রেখেছে রিপোর্টাররা। একটা চমৎকার প্রতিবেদন লেখার জন্য তার কাছ থেকে দারুণ কোন তথ্য পাওয়ার এটাই শেষ সুযোগ।

তিনি বলেন – আমি আমার ব্যাগটা মেঝেতে রেখে তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম তক্ষুনি একটা সাক্ষাৎকারের অনুরোধ নিয়ে। অনেক সময় যদি কাউকে অপ্রস্তত অবস্থায় ধরতে পারেন, তাদের কাছ থেকে কথা বের করা যায়। খুব সতর্কভাবে লেখা কোন প্রেসবিজ্ঞপ্তির চেয়ে বরং এভাবেই একমাত্র পাওয়া যেতে পারে আপনার প্রতিবেদনে ব্যবহারযোগ্য কোন উদ্ধৃতি।

তালেবানের এই নেতা সাথে সাথে বললেন – “আমি কথা বলবো না”। আমি যখন আসলে তার দিকে ক্যামেরা হাতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তিনি আমাকে আশা করছিলেন না।

আমি তার অস্বস্তি বুঝতে পারছিলাম এবং সাথে সাথেই একটু পিছিয়ে এলাম। আমি হাসিমুখে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বললাম সাক্ষাৎকার নেবেন আমার পুরুষ সহকর্মী। আমি সেখানে থাকবো ক্যামেরা ধরার জন্য।

শেষ পর্যন্ত আমি অবশ্য কথা বলতে অনিচ্ছুক ঐ তালেবান নেতার সাক্ষাৎকার নিতে পেরেছিলাম।

কিন্তু সাক্ষাৎকারের পুরোটা সময় আমি খেয়াল করলাম, তিনি এবং তার প্রতিনিধিদলের অন্য তালেবান নেতারা আমার চোখে চোখ রাখছেন না। এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল যে তারা পুরুষদের সঙ্গে কথা বলার সময় যতটা সহজ, মেয়েদের বেলায় মোটেই তা নন।

ইসলাম ধর্মের রীতি অনুসারে তালেবানরা বিশ্বাস করে, একজন অপরিচিত নারীর চোখে রাখা মানে তাকে অশ্রদ্ধা করা। ইসলামের দৃষ্টিতে এটা পাপ। পর্দা লঙ্ঘনের শামিল।

  • আমি পুরো তিন মিনিট সময় ধরে একজন তালেবান নেতার সাক্ষাৎকার নিলাম কিন্তু তিনি একবারও আমার দিকে তাকালেন না।
  • আমি সত্যিই বিশ্বাস করি তিনি যদি ভবিষ্যতে আমাকে দেখেন, তিনি মনেই করতে পারবেন না যে আমাকে তিনি একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন।

কিন্তু এসবের কিছুতেই আমি অবাক হইনি। যে দলটি বহু বছর ধরে লুকিয়ে ছিল, লড়াই করছিল- তাদেরকে চোখের সামনে দেখা, নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করা, সেটাও কয়েকমাস আগে অকল্পনীয় ছিল।

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তালেবান ওই নেতা বলেছিলেন – “আমি খুনি নই, কিন্তু আমাকে আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে একজন খুনি হিসেবে। আমি রাজনীতি নিয়ে কথা বলবো না। বরং আপনাদের সবার সঙ্গে বসার জন্য একটা সময় ঠিক করা যাক। আমরা একসঙ্গে চা খাব এবং আমি আপনাদের কিছু কবিতা শোনাবো।”

কথাগুলো তিনি বললেন নরমভাবে, তার মুখে মৃদু হাসি। তালেবানের খুব গুরত্বপূর্ণ একজন নেতা এভাবে কথা বলবেন, সেটাও আমি আশা করিনি।

সূত্র : বিবিসি

মন্তব্য করুন