হাটহাজারীতে ফের আন্দোলন,  যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

প্রকাশিত: ৪:৩৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০
হাটহাজারীতে ফের আন্দোলন,  যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

উম্মুল মাদারিস বাংলাদেশের কওমী মাদরাসার সর্বোচ্চ দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা ছাত্রদের আন্দোলন গতরাত ১১ টায় সাময়িকভাবে স্থগিত হলেও আজ (১৭ সেপ্টেম্বর) পূনরায় ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করেছে।

অপরদিকে হাটহাজারী মাদরাসায় ছাত্রদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে এর সুষ্ঠু সমাধানের দাবিতে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সমনে আজ (১৭ সেপ্টেম্বর) একটি সংহতি সমাবেশের ডাক দিয়েছেন।

হাটাহাজারী মাদরাসায় অস্থিরতার সুষ্ঠু সমাধান চান নুরুল হক

তিনি লিখেছেন –  চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে কওমী মাদরাসার শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ সমাধানে আজ বিকাল ৫ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটা সংহতি সমাবেশ রয়েছে। আশপাশের ছাত্রবন্ধুরা এ সমাবেশ উপস্থিত হয়ে সত্য-ন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে পারেন।

হাটহাজারীতে পূনরায় আন্দোলন শুরু হওয়ার ব্যাপারে আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট একজন ছাত্র পাবলিক ভয়েসকে বলেন – ‘সকালে ছাত্রদের কাছে খবর আসে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ গতরাতের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মাদরাসা বন্ধের পায়তারা করছে এবং ছাত্রদের ন্যায্য দাবি না মানার দিকে আগাচ্ছে।’ বিশেষ করে একটি সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, অব্যহতি দেওয়া আল্লামা শফীপূত্র মাওলানা আনাস মাদানীকে মাদরাসায় পূনরায় নিয়ে আসার একটি প্রচেষ্টা চলছে।

বিষয়টি আন্দোলনকারীরা জানার পরই তারা ফুঁসে উঠে এবং পূনরায় মাদরাসা মাঠে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেয় এবং শনিবার পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আজকের মধ্যে শুরা বৈঠক ডেকে সকল শর্তসমূহ মেনে নেওয়ার আহবান করে।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সেই অবস্থান কর্মসূচি এখনও চলমান রয়েছে।

এছাড়াও কিছু তথ্য ও বক্তব্যের ভিত্তিতে ছাত্রদের এই আন্দোলনকে বিভিন্ন পক্ষ-বিপক্ষের আন্দোলন হিসেবে চিত্রায়িত করে কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশ করার ঘটনারও বিরোধিতা করেন আন্দোলন সংশ্লিষ্ট অপর এক ছাত্র।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ছাত্র বলেন – আমরা কোনো পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে নয় বরং হাটহাজারী মাদরাসায় দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়ে আসা কিছু অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। কাউকে মুহতামিম বানানো বা মাদরাসার নিয়ন্ত্রণ কাউকে দেওয়া বা কারো হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ সরানো আমাদের লক্ষ নয়।

তাদের এ ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত না করার বিশেষ অনুরোধও জানান তিনি।

অপরদিকে একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীরা অসুস্থ “আল্লামা শফীর উপর হামলা করেছে” মর্মে একটি গুজবও ছড়িয়ে পড়ে। যে বিষয়ে হাটহাজারী মাদরাসার মুঈনে মুহতামিম আল্লামা শেখ আহমদ মাদরাসার মাইকে একটি পরিস্কার বার্তা প্রকাশ করেন এবং বলেন – আল্লামা শফির উপর কোনো হামলা করা হয়নি এবং তিনি সুস্থ আছেন। একই সাথে তিনি আন্দোলনকারীদের কাছে যান এবং তাদের সাথে কথা বলে আজকের মধ্যেই শুরা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি আশ্বাস দেন।

বিষয়টি নিয়ে আল্লামা শেখ আহমদের সাথে কথা বলার জন্য পাবলিক ভয়েসের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি। তবে তার ঘোষণাটি ভিডিও আকারে পাওয়া গেছে।

এদিকে দুপুর ১২ টার দিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে যেখানে দেখা গেছে মাদরাসার ছাত্ররা কিছুটা সহিংস অবস্থায় রয়েছে এবং মাদরাসার কয়েকটি ভাংচুরের মতো কিছু কাজও করছে। কিন্তু কিছু সময় পরেই আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্টরা ভাংচুর করা বা উত্তেজিত ছাত্রদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসেন এবং তাদের আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ অবস্থায় পরিচালিত করার ঘোষণা দেন। কোনো ভাংচুর বা মাদরাসার কোনো উস্তাদদের সাথে অসৌজন্যতামূলক আচরণ করা থেকে বিরত থাকারও জোর আহবান জানান তারা। তবে কেউ কেউ দাবি করেছেন ভিডিওটি গতকালের।

ভিডিওটি দেখুন

ঘটনাপ্রবাহে জানা যায় – গতকাল (১৬ সেপ্টেম্বর) জোহরের নামাজের পর হঠাত করেই হাটহাজারী মাদরাসায় একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং মাদরাসার নানা অনিয়মকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে নামে ছাত্ররা। দিনভর বিভিন্ন ঘটনা ও কার্যক্রমের মাধ্যমে আন্দোলন পরিচালিত হয়।

বিক্ষুব্ধ হাটহাজারী মাদরাসার ছাত্ররা : আনাস মাদানীর রুম ভাংচুর

এর মধ্যে আল্লামা শফিপুত্র মাওলানা আনাস মাদানীর রুমের জিনিসপত্র ভাংচুরের ঘটনা ঘটে ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সময়ে আলোচিত ব্যক্তি মাওলানা মঈনুদ্দিন রূহীকে গণধোলাই দেওয়া হয়।

মাওলানা মাঈনুদ্দিন রুহিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের গণধোলাই

পরবর্তিতে আন্দোলনকারীদের দাবি অনুসারে চট্টগ্রামে অবস্থানরত তিনজন শুরা সদস্যকে উপস্থিত করে আল্লামা শফীর সভাপতিত্বে আন্দোলনকারীদের পাঁচটি দাবির প্রথম তিনটি দাবি মেনে নেওয়ার লিখিত ঘোষণা দেওয়া হয় এবং ১৯ সেপ্টেম্বর (শনিবার) পূর্নাঙ্গ শুরা বৈঠক ডেকে বাকি দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। এ আশ্বাস মেনে নিয়ে আন্দোলনকারীরা গত রাত ১১ টায় তাদের আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেয়।

আনাস মাদানিকে বহিস্কার : সাময়িক স্থগিত হাটহাজারী ছাত্রদের আন্দোলন

যে তিনটি দাবি মেনে নেওয়ার মাধ্যমে আন্দোলন সাময়িক স্থগিত ঘোষণা করা হয় :

১. আল্লামা আহমদ শফীর পুত্র ও মাদরাসার প্রবীণ শিক্ষক মাওলানা আনাস মাদানী কে মাদ্রাসা থেকে অব্যহতি প্রদান।

২. মাদ্রাসায় অধ্যায়নরত কোন ছাত্রকে কোন ধরনের হয়রানি এবং সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না।

৩. আগামী ১৯ তারিখ শনিবারে নতুন করে শুরা বৈঠক ডেকে বাকি সমস্যাগুলোর সমাধান করা।

আন্দোলনকারীদের পাঁচটি দাবি :

এক. মাওলানা আনাস মাদানীকে অনতিবিলম্বে মাদরাসা থেকে বহিষ্কার করতে হবে।

দুই. ছাত্রদের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সুবিধা প্রদান ও সকল প্রকার হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

তিন. শায়খুল হাদিস আল্লামা আহমদ শফী অক্ষম হওয়ায় মহাপরিচালকের পদ থেকে সম্মানজনকভাবে অব্যাহতি দিয়ে উপদেষ্টা বানাতে হবে।

চার. উস্তাদদের পূর্ণ অধিকার ও নিয়োগ-বিয়োগকে শুরার নিকট পূর্ণ ন্যস্ত করতে হবে।

পাঁচ. বিগত শুরার হক্কানী আলেমদেরকে পুনর্বহাল ও বিতর্কিত সদস্যদের পদচ্যুত করতে হবে।

প্রসঙ্গত : চট্টগ্রামে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ এই কওমি মাদ্রাসাটিতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে পারস্পরিক মতপার্থক্য চলে আসছিল। বিশেষ করে আল্লামা আহমদ শফীর সন্তান আনাস মাদানী এবং আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে কেন্দ্র করে পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা চলেছে।

মাদরাসার সহযোগি পরিচালকের পদ থেকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে সরিয়ে মুঈনে মুহতামিম হিসেবে আল্লামা শেখ আহমদকে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই এ আলোচনা দৃশ্যমান হয়।

তার আগে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশকে কেন্দ্র করেও চট্টগ্রামের প্রবীণ আলেম মুফতি ইজহার ও তার সন্তান মুফতি হারুন ইজহার এর সাথে হেফাজতের আমীর আল্লামা শফী ও তার পূত্র মাওলানা আনাস মাদানীর সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য হয়েছে। যে মতপার্থক্যের জের ধরে হেফাজত থেকে পারস্পরিক বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছে।

‘আমাকে মাফ করি দিবেন, দোয়া করিবেন’ : জুনায়েদ বাবুনগরীকে আনাস মাদানী

আনাস মাদানীর ফোনালাপ : মুখ খুললেন আল্লামা বাবুনগরী

এরপর হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নিয়েই ফটিকছড়ির প্রবীণ আলেম আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথেও আল্লামা শফী ও তার পুত্রের মতবিরোধ হয়েছে। পরবর্তিতে নাজিরহাট বড় মাদরাসা নিয়েও আল্লামা শফি ও তার পূত্র আনাস মাদানীর সাথে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

নাজিরহাট মাদরাসায় গোলযোগ : যা বলছেন মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী

মাদরাসা রক্ষার জন্যই আমি আল্লামা শফীর বিরুদ্ধে মামলা করেছি : মুফতী হাবিবুর রহমান

আল্লামা শফীর বিরুদ্ধে মামলা : আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর প্রতিবাদ বিবৃতি

সামগ্রিক এসব ঘটনা উপ-ঘটনা মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কওমি মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমস্যা চলে আসছিল। সাথে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক বেফাক বিষয়ক অস্থিরতাও। করোনাভাইরাস মহামারী সময় পুরো লকডাউনের সময়টিতেই কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বিষয়গুলো নিয়েই ব্যস্ত ছিল।

এর মধ্যে গত মাসখানেক আগে হাটহাজারী মাদরাসা খোলার পর আজ (১৬ সেপ্টেম্বর) হঠাৎ করে জোহরের নামাজের পর হাটহাজারী মাদরাসার ছাত্ররা হাটহাজারী মাদ্রাসার মাঠে নেমে আসে এবং আন্দোলন শুরু করে দেয়।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ও হাটহাজারী মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় ও চট্টগ্রামের বেশ কিছু মাদরাসা নিয়ে আল্লামা শফিপূত্রের বাড়াবাড়ি করাসহ অনেক সমস্যার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের দৃশ্যমান প্রতিবাদ হিসেবে এই আন্দোলনের সূত্রপাত বলেও মনে করছেন অনেকে। এমনকি আন্দোলনকারীরা এসব সমস্যার গঠনমূলক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম চলমান রাখবেন বলেই ধারনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দ্রুত শুরা ডেকে হাটহাজারী সমস্যার সমাধান করুন : মুফতী ফয়জুল করীম

মন্তব্য করুন