হাটহাজারীর মুহতামিম থেকে আল্লামা শফীর অব্যহতির ঘোষণা : আন্দোলন স্থগিত

প্রকাশিত: ১১:২০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০

দ্বিতীয় দফা ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার সকল দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যহতি নেওয়ার ঘোষণা এসেছে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর।

হাটহাজারী মাদরাসার মাইক থেকে রাত সাড়ে ১০ টায় ঘোষণা দিয়ে এমনটাই জানানো হয়েছে। ঘোষণায় বলা হয় – হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় মাদ্রাসার সকল পদ ছেড়ে দিয়ে নিজের সকল দায়িত্ব মজলিশে শুরার কাছে অর্পণ করেছেন।

অপরদিকে আল্লামা শাহ আহমদ শফী মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে এবং তাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

আন্দোলনরত ছাত্রদের কাছে এসে বিষয়টি জানান মজলিসে শুরার সদস্য মাওলানা নোমান ফয়েজী।

নোমান ফয়জী বলেন – আল্লামা আহমদ শফির সভাপতিত্বে হযরতের কক্ষে এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় আজ।

বৈঠকে আন্দোলনকারীদের দাবি অনুসারে মোট তিনটি নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

১. শাইখুল ইসলাম নিজে সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় মাদ্রাসার সকল পদ ছেড়ে দিয়ে নিজের সকল দায়িত্ব মজলিশে শুরার কাছে অর্পণ করেন। মজলিসে শুরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শায়খুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফীকে হাটহাজারী মাদ্রাসার সদরের মুহতামিম হিসেবে নিয়োগ দান করেন।

২. মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা নুরুল ইসলাম কক্সবাজারিকে মাদ্রাসার সকল দায়িত্ব থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

৩. গতকালের বৈঠকে সকল সিদ্ধান্তসমূহ বহাল রাখা হয়।

গতকালের বৈঠকের সিদ্ধান্তসমূহ :

১. আল্লামা আহমদ শফীর পুত্র ও মাদরাসার প্রবীণ শিক্ষক মাওলানা আনাস মাদানী কে মাদ্রাসা থেকে অব্যহতি প্রদান।

২. মাদ্রাসায় অধ্যায়নরত কোন ছাত্রকে কোন ধরনের হয়রানি এবং সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না।

৩. আগামী ১৯ তারিখ শনিবারে নতুন করে শুরা বৈঠক ডেকে বাকি সমস্যাগুলোর সমাধান করা।

আজকের বৈঠকে আল্লামা আহমদ শফীর সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, আল্লামা শেখ আহমদ, আল্লামা নোমান ফয়জী, আল্লামা সালাউদ্দিন, আল্লামা মুফতি নুর আহমদ, মাওলানা শুয়াইব, মাওলানা ওমর ফারুক, মাওলানা কবির আহমদ, মাওলানা আহমদ দীদার, মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী প্রমূখ।

সব মিলিয়ে আন্দোলনকারীদের সকল দাবি মেনে নিয়েছেন মর্মে ঘোষণা আসার পর তারা তাদের আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেন।

অপরদিকে একটি সূত্র থেকে জানা গেছে – আল্লামা শফী অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে হাসপাতালে নেওয়ার সার্বিক প্রস্তুতি চলছে। আন্দোলনকারী ছাত্রদের শান্ত হয়ে তাকে হাসপাতালে পৌছানোর ব্যবস্থা করার অনুরোধ করা হয়েছে। তবে ছাত্ররা ভয় পাচ্ছেন যে, আল্লামা শফী মাদরাসা থেকে বের হলে ছাত্রদের উপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হামলে পড়তে পারে। মাদরাসার মাইক থেকে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও আন্দোলনকারীরা বারবার ঘোষণা দিয়ে বলেছে – আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের উপর কোনো ধরণের আক্রমন বা কঠোরতা প্রয়োগ করবে না

প্রসঙ্গত : চট্টগ্রামে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ এই কওমি মাদ্রাসাটিতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে পারস্পরিক মতপার্থক্য চলে আসছিল।

বিশেষ করে আল্লামা আহমদ শফীর সন্তান আনাস মাদানী এবং আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে কেন্দ্র করে পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা চলেছে।

মাদরাসার সহযোগি পরিচালকের পদ থেকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে সরিয়ে মুঈনে মুহতামিম হিসেবে আল্লামা শেখ আহমদকে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই এ আলোচনা দৃশ্যমান হয়।

তার আগে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশকে কেন্দ্র করেও চট্টগ্রামের প্রবীণ আলেম মুফতি ইজহার ও তার সন্তান মুফতি হারুন ইজহার এর সাথে হেফাজতের আমীর আল্লামা শফী ও তার পূত্র মাওলানা আনাস মাদানীর সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য হয়েছে। যে মতপার্থক্যের জের ধরে হেফাজত থেকে পারস্পরিক বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছে।

এরপর হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নিয়েই ফটিকছড়ির প্রবীণ আলেম আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথেও আল্লামা শফী ও তার পুত্রের মতবিরোধ হয়েছে।

পরবর্তিতে নাজিরহাট বড় মাদরাসা নিয়েও আল্লামা শফি ও তার পূত্র আনাস মাদানীর সাথে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

সামগ্রিক এসব ঘটনা উপ-ঘটনা মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কওমি মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমস্যা চলে আসছিল। সাথে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক বেফাক বিষয়ক অস্থিরতাও।

করোনাভাইরাস মহামারী সময় পুরো লকডাউনের সময়টিতেই কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বিষয়গুলো নিয়েই ব্যস্ত ছিল।

এর মধ্যে গত মাসখানেক আগে হাটহাজারী মাদরাসা খোলার পর গতকাল (১৬ সেপ্টেম্বর) বুধবার হঠাৎ করে জোহরের নামাজের পর হাটহাজারী মাদরাসার ছাত্ররা হাটহাজারী মাদ্রাসার মাঠে নেমে আসে এবং আন্দোলন শুরু করে দেয়।

প্রাথমিকভাবে গতকাল রাত ১১ টায় আন্দোলনকারীদের প্রাথমিক ৩ টি দাবি মেনে নেওয়ার পর সাময়িকভাবে আন্দোলন স্থগিত করা হয় কিন্তু পরবর্তিতে আজ (১৭ সেপ্টেম্বর) পূনরায় আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা।

দিনভর বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে পুনরায় আজ রাতে আন্দোলনকারীদের সকল দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা আসার পর আন্দোলন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

অপরদিকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ও হাটহাজারী মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় ও চট্টগ্রামের বেশ কিছু মাদরাসা নিয়ে আল্লামা শফিপূত্রের বাড়াবাড়ি করাসহ অনেক সমস্যার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের দৃশ্যমান প্রতিবাদ হিসেবে এই আন্দোলনের সূত্রপাত বলেও মনে করছেন অনেকে।

মন্তব্য করুন