ইসরাইলের সাথে ফিলিস্তিনিদের উপর অবরোধে সক্রিয় ছিলো আবর আমিরাত

প্রকাশিত: ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২০
  • ফিলিস্তিনের নাগরিকদের অবরোধ করে রাখতে এক দশক ধরে ইসরাইলকে গোপনে সহায়তা করে গেছে আরব আমিরাত।
  • ফিলিস্তিনিদের উপর অবরোধ আরোপে ইসরাইলকে আমিরাতের প্রকাশ্য সহায়তা করার নথি ফাঁস

– হাছিব আর রহমান 

সংযুক্ত আরব আমিরাত বিগত এক দশক ধরেই ফিলিস্তিনিদের গাজায় অবরোধ করে রাখতে ইহুদিবাদী ইসরাইলকে পূর্ণ সহায়তা দিয়ে গেছে বলে একটি ডকুমেন্ট প্রকাশ করা হয়েছে।

এমনকি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সকল অমানবিক আচরণের প্রতিও সমর্থন দিয়ে গেছে আরব আমিরাত। এমনটাও দাবি করা হয়েছে ডকুমেন্টারিতে।

এছাড়াও আরব আমিরাত নিজেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের লোহিত সাগরের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত বার্নিস সামরিক ঘাঁটি দিয়ে  ফিলিস্তিনের গাজায় যে কোনও মানবিক সহায়তা সরবরাহের পথ বন্ধ করে রেখেছিলো।

ইসরাইল-আমিরাতের এই অবৈধ সম্পর্কের আলোকেই শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের সাথে প্রকাশ্যে রাষ্ট্রিয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন করেছে আরব বিশ্বের এই ধনী দেশটি। সাথে নিয়েছে বাহরাইনকেও। এমনকি আরবদের খণিজ সম্পদও নিয়মিতভাবে ইসরাইলকে দিয়েছে আরব আমিরাত। খবর ডেইলি সাবাহর।

হামাসের সামরিক শাখায় কর্মরত এক প্রকৌশলী “হোয়াটস হিডেন ইজ গ্রেটার” নামে আল জাজিরার একটি ডকুমেন্টারিতে সাক্ষাত দিয়ে এ দাবি প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেছেন – সংযুক্ত আরব আমিরাতের লোহিত সাগরের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত বার্নিস সামরিক ঘাঁটি দিয়ে গাজায় যে কোনও মানবিক সহায়তা সরবরাহের পথ বন্ধ করে রেখেছিলো আরব-আমিরাত।

অপরদিকে সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরাইলের সাথে বিতর্কিত চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের বর্বরতা আরও বাড়বে বলেও ফিলিস্তিনিরা আশংকা করছেন।

[ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের রাষ্ট্রীয় চুক্তির বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ। (ছবি : আনাদুলু]

তারা বলছেন – সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই পদক্ষেপ জবর দখল পূর্বক অঞ্চল থেকে ইসরাইলের সেনা প্রত্যাহার বিষয়ে আরবদের অবস্থানকে একদম দুর্বল করে দেবে।

ফিলিস্তিনিরা গত দুই দশক ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান উদারতার জন্য সম্মান জানিয়ে আসছে, বিশেষত তিনি গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করেছিলেন বলে তারা তাকে সম্মান করতো সব সময়ই। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের প্রতি তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কারণ তিনিই ফিলিস্তিনিদের অধিকার খর্ব করার সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত গত ১৩ ই আগস্ট ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণার পর এটিই প্রথম উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র যারা সরাসরি ইসরাইলের সাথে সম্পর্কে গিয়েছে। এর এক মাস পরেই বাহরাইনও সে পথ অনুসরণ করেছে।

[আমেরিকার হোয়াইট হাউসে আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সাথে ইসরাইলের চুক্তিসাক্ষর অনুষ্ঠান। বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাতিফ আল-জায়ানী (বামে), ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু (মাঝখানে), মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (মাঝখানে) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান (ডানে) ছবি : এএফপি।]

ফিলিস্তিনিদের কাঁদিয়ে ইসরাইলের সাথে চুক্তিসই সম্পন্ন করলো দুই আরব দেশ

জানা যায় – ৩৭৫ বর্গকিলোমিটার (১৪৫ বর্গমাইল) পরিমাপের গাজায় প্রায় ২ মিলিয়ন ফিলিস্তিনিরা বাস করে, যার অর্ধেকেরও বেশি ২০০৭ সাল থেকেই নিজেদের ভূমিতেআ শরণার্থী।

এই অঞ্চলটি ইসরাইল ও মিশরীয় অবরোধের আওতায় রয়েছে যে কারণে এ অঞ্চলটির অর্থনীতিতে চরম মন্দা এবং এর বাসিন্দাদের খাদ্য, জ্বালানী এবং ওষুধ সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের অবরোধের কারণে এ অঞ্চলের মানবিক পরিস্থিতিও দিন দিন খারাপ হয়ে গেছে কারণ এর ৯০% ভূমি ও সমুদ্রসীমা যা ইসরাইল ও মিশর দ্বারা বেষ্টিত রয়েছে যে কারণে বিশ্বের কেহই এখানে প্রবেশ করতে পারে না। এছাড়াও অঞ্চলটির সংকীর্ণ দক্ষিণ সীমান্তে ইসরাইল ও মিশরের কড়া নিয়ন্ত্রন রয়েছে।

খোদ আমেরিকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ২০১২ সালের একটি প্রতিবেদনে সতর্ক করেছিল যে ২০২০ সালের মধ্যে গাজা আর বসবাসের উপযুক্ত থাকবে না। এছাড়াও বিশ্বব্যাংক ২০১৮ সালে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে গাজার অর্থনীতি “চরম পতনের” মধ্যে রয়েছে। ইসরাইল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে “অর্থনৈতিক চরম মন্দা” এড়াতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলো।

জাতিসংঘের রিলিফ ফান্ডের নেতারা গত বছর জানিয়েছিল যে এখানে প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার বাসিন্দা রয়েছে যারা খাদ্যাভাবে ভোগে এবং দরিদ্রসীমার একদম নিচে বাস করে। যার অর্থ হলো – তারা তাদের প্রাথমিক খাদ্য চাহিদা মেটাতে পারে না। এবং যাদের মধ্যে প্রতিদিনের খাদ্য সংগ্রহের জন্য ১.৬০ ডলারও অর্জন করতে পারে না এমন রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার বাসিন্দা।

অবরুদ্ধ এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকটের জন্য ও গাজা উপত্যকায় উচ্চ বেকারত্বের হারের বিরুদ্ধে বহু ফিলিস্তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। এখানের প্রায় ২ মিলিয়ন বাসিন্দা জাতিসংঘের রিলিফ ফান্ড থেকে সরবরাহকৃত সহায়তার উপর নির্ভরশীল।

বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে, গাজার যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার এখন ৫০% থেকে ৭০% এরও বেশি। ফিলিস্তিনি জেনারেল ফেডারেশন অফ ট্রেড ইউনিয়ন অনুসারে গাজা উপত্যকায় দারিদ্র্যের হার ৮০% পর্যন্ত পৌঁছেছে।

নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক ত্রাণবিদ রান-ফোর এর প্রধান অ্যানি জিল্লিমা জানিয়েছেন, ইহুদিবাদী ইসরাইলের হামলার ফলে গাঁজার প্রায় ৭৭% বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এবং কয়েক মিলিয়ন মানুষ তাদের বসবাসের যায়গা হারিয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের এসব অধিকার এবং আবেগের কোনো মূল্য না দিয়েই দুটি আরব দেশ ইসরাইলের সাথে আমেরিকার মধ্যস্থতায় এই নগ্ন ও ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক এই চুক্তিসই স্বাক্ষর করেছে সম্প্রতি।

অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের বিরুদ্ধে একক নেতৃত্বে আসছে ফিলিস্তিন

অপরদিকে এই চুক্তিস্বাক্ষরের বিরোধিতা করে ফিলিস্তিনে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ফিলিস্তিনের নাগরিকরা। তারা বলেছেন – এই চুক্তিস্বাক্ষর ফিলিস্তিনের পিঠে ছুরিকাঘাত। আরব বিশ্ব এমন চুক্তিস্বাক্ষর করে মূলত ফিলিস্তিনিদের হৃদয়ে আঘাত দিয়েছে।

[আল জাজিরা, ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে প্রতিবেদনটি করেছেন পাবলিক ভয়েস নির্বাহী সম্পাদক হাছিব আর রহমান।]

আরও পড়ুন : আমাদের আরব লীগের দরকার নেই : অভিমানী ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী

মন্তব্য করুন