তালেবান ও আফগান সরকারের বহুল প্রতিক্ষিত শান্তি আলোচনা : শুরু হচ্ছে ‘শনিবার’

প্রকাশিত: ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২০
তালেবান ও আফগান সরকার : বহুল প্রতিক্ষিত শান্তি আলোচনা শুরু হচ্ছে শনিবার

অবশেষে আগামীকাল শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে তালেবান ও আফগান সরকারের মধ্যে বহুল প্রতিক্ষিত আন্ত:আফগান শান্তি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। আফগান সরকার কর্তৃক তালেবানের সকল শর্ত মেনে এবং তালেবানের পক্ষ থেকে নতুন করে ১০০ বন্দি মুক্তির দাবি ‘ছাড়’ দিয়ে এই আলোচনা কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন : 

কাতারের সাথে তালেবানের বৈঠক : সব বন্দির মুক্তি তারপরই শান্তি আলোচনা

শুরু হতে যাচ্ছে আফগান সরকার ও তালেবানের বহুল প্রতিক্ষিত ‘শান্তি আলোচনা’

শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার সরকারের পক্ষ থেকে আজ (১১ সেপ্টেম্বর) স্পষ্টভাবে এ ঘোষণাটি এলো। এর আগে আফগান গণমাধ্যমও বিষয়টি পরিস্কার করেছিলো। তালেবানও বিষয়টি নিশ্চিত করে একটি ঘোষণা দিয়েছে। ঘোষণা দিয়েছে আফগানিস্তানে অন্যায়ভাবে যুদ্ধে এসে হেরে যাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল পম্পেও।

তালেবানের ঘোষণা : শান্তি আলোচনায় তালেবান প্রতিনিধি দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাইম আখন্দ বৃহস্পতিবার রাতে এক টুইট বার্তায় বলেছেন যে আন্তঃ-আফগান আলোচনার উদ্বোধনী বৈঠকটি কাতারে ১২ সেপ্টেম্বর তারিখে হওয়ার কথা রয়েছে।

আরও পড়ুন :

তালেবানের বিজয় : মুক্তি পেলো সকল বন্দিরা, নজর এবার ‘শান্তি আলোচনায়’

শান্তি আলোচনায় তালেবানের নেতৃত্ব দেবেন মাওলানা আবদুল হাকিম

পাকিস্তান পার্লামেন্টে বিন লাদেনকে ‘শহীদ’ আখ্যা দিলেন ইমরান খান

কাতারের ঘোষণা : এর পরপরই কাতার সরকার এই শান্তি আলোচনা শুরুর তারিখটি নিশ্চিত করেছে। একই সাথে কাতার সরকার অত্যন্ত খুশির সাথে ঘোষণা দিয়েছে যে – আফগানিস্তানের শান্তি আলোচনা ২০২০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর (শনিবার) রাজধানী দোহায় শুরু হবে।

ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে – “বিভিন্ন আফগান দলের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ আলোচনা আফগানিস্তানে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনার দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পথ পরিস্কার করবে…”

কাতার সরকারের পক্ষ থেকে বিবৃতিতে দেশটির একজন মন্ত্রী মুতলাক আল কাহতানির বরাদ দেওয়া হয়েছে।

কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মুতলাক আল কাহতানি বলেছেন: “কাতারের পক্ষ থেকে আফগান সরকার ও তালেবানের মধ্যে সকল দ্বিধা নিরসনের জন্য কূটনীতি এবং প্রত্যক্ষ সংলাপের পথ পরিস্কারের প্রতি সর্বদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেছেন – আমরা এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা তৈরিতে আমাদের ভূমিকা অব্যাহত রাখব। আমরা সব পক্ষের সাথেই জড়িত হয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করেছি এবং সকল সহযোগিতা অব্যহত রেখে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি সামনে আনতে পেরেছি। এবং তাদেরকে সহায়তা করতে পেরে বরং আমরা কৃতজ্ঞ হয়েছি।”

আমেরিকার ঘোষণা : মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল পম্পেও একটি টুইট বার্তার মাধ্যমে আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন: তিনি লিখেছেন – “আফগানিস্তানের শান্তি আলোচনা ১২ ই সেপ্টেম্বর শুরু হবে জেনে আমেরিকা উভয় গ্রুপকেই স্বাগত জানাচ্ছো। এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত এবং চল্লিশ বছরের যুদ্ধ ও রক্তপাতের অবসান ঘটাতে আফগানিস্তানের সেরা সুযোগ।”

আরও পড়ুন :

তালেবানের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ন্যাটো জোট

তালেবানের সঙ্গে একান্তে বসতে চান ট্রাম্প

এছাড়াও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আফগান সরকারের দপ্তর থেকে বলা হয়েছে – শান্তি আলোচনায় আফগান সরকারের পক্ষ থেকে অংশ নিতে যাওয়া প্রতিনিধি দল ১১ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) দোহার উদ্দেশে রওনা হবে। তালেবানের ২১ সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দল আগেই কাতারে অবস্থান করছে। কাতারে তালেবানের একটি অফিসিয়াল কনস্যুলেটও রয়েছে।

আরও পড়ুন : 

বিবাদে আফগান সরকার : রাজনৈতিকভাবেও বিজয়ের পথে তালেবান

আফগানিস্তানে যুদ্ধ কোন সমাধান নয় : সাবেক তালেবান কমান্ডার

হাফেজ হলো মার্কিন বিমান হামলায় চোখ হারানো সেই আফগান বালক

বিবৃতি অনুসারে, দোহায় শান্তি আলোচনার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন জাতীয় পুনর্মিলনের হাই কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ, ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল সালাম রহিমী, শান্তির জন্য রাষ্ট্রপতির বিশেষ প্রতিনিধি এবং আফগান সরকারের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য শান্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ সাদাত মনসুর নাদেরি।

এদিকে, অন্য একটি সূত্রের বরাতে আফগান গণমাধ্যম টোলোনিউজ বলেছে যে তালেবানের দাবি করা ৫ হাজার বন্দি মুক্তি দেওয়ার মধ্যে আন্তর্জাতিক দুটি দেশ (ফ্রান্স ও অষ্ট্রেলিয়া) যে সকল ছয়জন “কঠোর” তালেবান বন্দিকে মুক্তির ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিল তাদেরকে ছেড়ে দিতেও বৃহস্পতিবার আফগানিস্তারে কাবুল থেকে কাতারের দোহায় স্থানান্তর করা হয়েছে।

পরে বৃহস্পতিবার রাতে তালিবান টুইট করেছে যে ছয় তালিবান “ভাই” দোহায় পৌঁছেছে।

এর আগে গত দুদিন এই শান্তি আলোচনা নিয়ে বেশ নাটকিয়তা তৈরি হয়েছিলো। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আফগান সরকার এবং তালেবানের মধ্যে কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আন্ত:আফগান শান্তি আলোচনা আর একবার অনিশ্চয়তার মুখেও পড়ে গিয়েছিলো। এ সময় শান্তি আলোচনা বিষয়ে একদিকে তালেবানকে দোষারোপ করছে আফগান সরকার অপরদিকে তাদেরকে শান্তি আলোচনায় বসতে আকুতিও জানিয়েছে তারা।

তালেবানের পক্ষ থেকে দাবি করে বলেছিলো মুক্তির জন্য তাদের দেওয়া ৫ হাজার বন্দির মধ্যে ১০০ বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। সব বন্দিকে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত শান্তি আলোচনা হবে না বলেই জানিয়েছিলো তারা।

তবে তাদেরকে মুক্তি না দেওয়ার বিষয়টি আফগান সরকার তারা অস্বিকার করেছেন। সাথে সাথে আফগান সরকার এবং আফগানিস্তানের তালেবানদের মধ্যে শান্তি আলোচনার পথ থেকে সমস্ত বাধা ও বিপত্তিও অপসারণ করা হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন আফগান সরকারের এক মুখপাত্র।

তিনি বলেছিলেন – “সমস্ত বাধা অপসারণ করা হয়েছে এবং এখন তালেবানরা তাদের দায়িত্ব বোঝার এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শান্তি আলোচনার আলোচনায় অংশ নিতে হবে – যদি তালেবানরা তাদের দাবির প্রতি সৎ হয়”। বলেছেন সারওয়ার দানিশ।

এদিকে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির মুখপাত্র সিদ্দিক সিদ্দিকী বলেছেন, “তালেবানরা কিছু অস্থির হয়ে পড়েছে এবং তাদের শান্তি আলোচনার দলকে শেষ মুহুর্তে পরিবর্তন করা ইঙ্গিত দেয় যে তারা এখনও আলোচনার জন্য প্রস্তুত নয়।”

অপরদিকে আফগানিস্তানের সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা আলোচনাকারী দলের সদস্যরা বলেছেন যে আলোচনা শুরু করতে বিলম্ব করার ক্ষেত্রে তালেবানদের আর কোনও অজুহাত নেই।

তবে দলটির একাধিক সদস্যরা বলেছিলেন যে, গত উনিশ বছর ধরে আফগানিস্তানের যা ক্ষতি হয়েছে তার সুরক্ষা এবং আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সুরক্ষাসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তালেবানদের সাথে আলোচনার আলোচ্যসূচির শীর্ষে থাকবে।

আফগানিস্তানের শান্তি আলোচনার দলের সদস্য গোলাম ফারুক মাজরোহ বলেছেন, “আমরা সুন্দর একটি ব্যবস্থার জন্য বছরের পর বছর ধরে ত্যাগ স্বীকার করেছি এবং আমরা আমাদের স্বাধীনতার সাথে কোন আপস করবো না, যার জন্য আমরা ত্যাগ স্বীকার করেছি, এ মুহুর্তে এসে তালেবানের এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে শান্তি আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

আফগান সরকার এবং তালেবানের মধ্যে বন্দি বিনিময় সমাপ্ত করার ঘোষণা দেওয়ার পর আফগান সরকার  এবং তালেবানদের মধ্যে আলোচনার আশা গত দু’সপ্তাহে নতুন গতি জাগিয়েছে। তবে তালেবানরা তখন বলেছে যে আফগান সরকার ওই গ্রুপের ১০০ জন বন্দিকে মুক্তি দেয়নি যাদের নাম তালিকায় ছিল।

এছাড়াও তালেবান বলেছে যে তাদের ছয়জন উচ্চপর্যায়ের বন্দী, যাদের মুক্তি দিতে অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্স নিষেধ করেছিল, তাদের দোহায় স্থানান্তর করা হয়েছিল। তবে তালেবান তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়ে বলেছেন – তাদেরকে কাতারে স্থনান্তরিত করা হলেও তাদের মুক্তির ব্যাপারে আইনী জটিলতা রেখে দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকজন রাষ্ট্রদূতের অনুরোধে সরকারের এটি করা উচিত হয়নি। তালেবান জানিয়েছে যে এই বন্দীদের মুক্তির বিষয়ে আলোচনা করার জন্য তাদের একটি প্রযুক্তিগত দল কাবুলে রয়েছে।

অপরদিকে কাবুলের রাজনৈতিক কর্মী ওয়ালিউল্লাহ শাহীন বলেছেন, কোনো বাহানা না করেই সরকারের উচিত ছিলো এই বন্দীদের মুক্তি দেওয়া।

[আফগান গণমাধ্যম থেকে পাবলিক ভয়েসের অনুবাদ]

প্রসঙ্গত : গত ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত মার্কিন-তালিবান চুক্তির অধিনে, প্রায় ৫,০০০ তালেবান কর্মীকে আফগান সরকার কর্তৃক মুক্তির আলোচনা হয়েছিলো।

আরও পড়ুন :’’

শান্তি আলোচনা সম্পর্কিত অন্যান্য খবর :

শান্তি আলোচনা : ঝামেলা মিটিয়ে প্রস্তুত আফগান সরকার, তৈরি তালেবানও

আফগানিস্তানের শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে তালেবানদের পাকিস্তান সফর

শান্তি আলোচনার আগ মূহুর্তে ১১ জন তালেবানকে হত্যা করেছে আফগান বাহিনী

যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা ও হামলা বন্ধের শর্তে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা

শর্তসাপেক্ষে আফগান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসবে তালেবান

শিগগিরই শুরু হচ্ছে আফগান তালেবান শান্তি প্রক্রিয়া!

তালেবানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে চান আশরাফ গনি

তালেবান সম্পর্কিত সংবাদ :

মোল্লা মোহাম্মদ ওমর : তালেবান যাকে মার্কিন সেনাদের নাকের ডগায় রেখেছিল

তালেবান নেতৃত্বে মোল্লা ওমরের ছেলে, শান্তি চুক্তির অপেক্ষায় আফগান সরকার

ন্যাটো বাহিনীর কমান্ডারের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করল তালেবান

ফের আফগান তালেবান বন্দীদের মুক্তি প্রক্রিয়া শুরু

আবারো মুক্তি পেলেন ৪০০ তালেবান

ঈদ উপলক্ষে তালেবানের তিনদিনের যুদ্ধবিরতি ও ১০০০ বন্দি মুক্তি

আফগান সরকারের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণ করেনি তালেবান

আফগান সামরিক ঘাঁটিতে তালেবানের হামলা, ৩ সেনা নিহত

তালেবান যোদ্ধাদের হামলায় আফগান পুলিশের ৬ সদস্যের মৃত্যু

১,০০০ তালেবানকে মুক্তি দিয়েছি, আমাদের লোকজনকেও মুক্তি দিন:

আরও প্রায় ৫০০ তালেবান নেতাকে মুক্তি দিলো আফগান সরকার

তালেবান আমেরিকা চুক্তির সংবাদ :

আরও সংবাদ :

সূত্র :  আফগান গনমাধ্যম, আনাদুলু, পাবলিক ভয়েস আর্কাইভ

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন