এক টুকরো সাদা কাপড়

প্রকাশিত: ৬:১০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২০
এক টুকরো সাদা কাপড়। গল্প। সুমাইয়া বিনতে আবদুল আজিজ।

সুমাইয়া বিনতে আব্দুল আজিজ।।

বিছানায় মাকে নিজের সামনে বসিয়ে শপিং ব্যাগ থেকে সাদা কাপড়ের টুকরো টা বের করে মাকে দেখিয়ে যখন বললাম ‘এটা আমার কাফনের কাপড়। মা হতভম্ব হয়ে একবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন,আর একবার সেই ধবধবে সাদা কাপড়ের দিকে।মাকে এমন হতভম্ব হতে দেখে আমি বেশ মজা পেয়ে হেসে ফেললাম। মাকে মাঝে মাঝে এভাবে ভয়ংকরভাবে চমকে দিতে বেশ লাগে। যদিও আজকের মতো এমন ভয়ংকর, অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ এর আগে কখনো করিনি। যাইহোক,আমি হেসে দিয়ে মাকে বললাম, এত টাস্কি খাওয়ার মতো কিছু হয় নাই মা।

মা কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, টাস্কি খাওয়ার মতো কিছু হয় নাই মানে কী? আর এইটা তোর কাফনের কাপড় সেইটারই বা মানে কী? মাথা ঠিক আছে তোর?

আমি হাসতে হাসতে কাপড় খানা আবার শপিং ব্যাগে ঢুকাতে ঢুকাতে আপনমনে বলতে থাকলাম, কে কখন মারা যায় কে জানে বলো? মৃত্যু আমাদের সবচে’ কাছে। অথচ আমরা এই মৃত্যুকেই প্রতিনিয়ত বেমালুম ভুলে যাই!

এরপর মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বললাম, তাই কাফনের কাপড়টা এনে রাখলাম। যাতে প্রতিদিন অন্তত একনজর করে হলেও এই কাপড়টা দেখতে পারি আর উপলব্ধি করতে পারি যে মৃত্যু আমার খুব কাছে! খুউব!

আমার কথা শুনে মায়ের চোখ ছলছল করছে। মা ধরা গলায় বলল, তাই বলে এখনই তোর এই ব্যবস্থা করে রাখা লাগবে? এখন তো নাও মরতে পারিস।

আমি হেসে বললাম, আবার এখন মরতেও তো পারি। বলা তো যায় না কিছুই। বাবাকে,ভাইদেরকেও এই কাপড়খানা দেখিয়ে রাখবো। যাতে এরমধ্যে আমি মারা গেলে এই কাপড়েই যেন আমাকে জড়িয়ে দেয়।

কথাটুকু বলে আমি কাপড়ের ব্যাগটা ওয়্যারড্রবের এককোণে রেখে আমার রুমে চলে আসলাম। আমি জানি,মা এখনো হতভম্ব হয়ে বসে আছে। মা কি আমাকে পাগল ভাবছে? ভাবুক! পাগল তো আমাকে দোকানদার চাচাও ভেবেছিল! কলেজ থেকে আসার পথে আমাদের স্থানীয় বাজারের পরিচিত দোকানটায় গিয়ে যখন বললাম, চাচা! কাফনের কাপড় লাগবে।

দোকানদার চাচা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কে মারা গেছে?

-কেউ মারা যায় নাই চাচা।

-তাইলে কাফনের কাপড় চাইলা যে?

-অগ্রীম কিনে রেখে দিবো।

চাচা এবারে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কার জন্যে কিনে রাখবা?

-বললাম, আমার জন্যই।

চাচা কপাল কুচকে বললেন, পাগল হইছ তুমি? তোমার বয়স কত হইছে?

-আমি মৃদু হাসলাম চাচার কথা শুনে। এদের কীভাবে বুঝাবো যে,মৃত্যু বয়স হিসেব করে আসে না? মৃত্যু যখন তখন যে কাউকে এট্রাক করতে পারে। হোক সেটা পিচ্চি কোনো বাচ্চা কিংবা থুড়থুড়ে বুড়ো। বেশ কয়েকদিন যাবতই এই মৃত্যু জিনিসটা বড্ড বেশি ভাবাচ্ছে আমাকে। সবসময়ই মনে হয়,এই বুঝি এখনই মরে যাবো আমি। এইতো সুস্থ-স্বাভাবিকই আছি আমি। কিন্তু তাতে কী? মৃত্যু কি সুস্থ লোকদের স্পর্শ করতে পারে না? অবশ্যই পারে। মৃত্যু নিয়ে এতশত ভাবনা থেকেই ভাবলাম কাফনের কাপড়টাও কিনে রাখি। এতে করে যতবার কাপড়টা দেখবো ততবারই মৃত্যুর কথা আরও গভীরভাবে স্মরণ হবে। মৃত্যুর ভয়ে আল্লাহর আরও কাছে যেতে ইচ্ছে করবে,একদম কাছে,একদম! এই জিনিসটা যে ভীষণ জরুরী,ভীষণ!

দোকানদার চাচাকে যখন বললাম, বেশি দামী কাপড় দেয়ার দরকার নেই। সবচেয়ে কম দামী যেটা সেইটাই দিন।

চাচা আবারও অবাক হলেন। সাধারণত কাফনের কাপড়ের ক্ষেত্রে মানুষ নিজের সাধ্যমতো সবচেয়ে দামী কাপড়টাই কেনার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা বুঝে না যে,কাফনের কাপড় দামী দেয়ার মধ্যে কোনো ফায়দা নেই। উমর ইবনে খাত্তার রা. তার ছেলেকে বলেছিলেন, তোমরা আমার কাফনের কাপড়ের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ীতা অবলম্বন করো। কারণ, আল্লাহ তা’য়ালার নিকট যদি আমার কল্যাণের ফয়সালা হয়ে থাকে তাহলে তিনি আমাকে এর চেয়ে উত্তম কাপড়ের মাধ্যমে তা পরিবর্তন করে দেবেন। আর যদি এর বিপরীত হয়,তাহলে এটাও খুব দ্রুতই আমার কাছ থেকে কেড়ে নিবেন।

অথচ আমরা এটা না বুঝে কাফনের কাপড়ের ক্ষেত্রে বরং দামী কাপড় খোঁজার চেষ্টা করি। মূলত সমাজের প্রচলিত রিতীর বিরুদ্ধে গিয়ে কাফনের জন্য কম দামী কাপড় চাওয়াতেই চাচা হয়তো মনে মনে বিষম খেয়ে যান। আমি চাচার ভেতরের এই অভিব্যক্তিটা বুঝলাম। হেসে বললাম, আসলে চাচা, কাফনের কাপড় কম দামি হওয়াই শ্রেয়! দামী কাপড় পরার অধিকার মৃত ব্যক্তির চেয়ে জীবিত ব্যক্তিরই বেশি।

সেদিনের পর থেকে আমি আমার চূড়ান্ত গন্তব্যে পরিহিত করে যাওয়ার উদ্দেশ্য কিনে আনা সেই এক টুকরো কাপড় প্রতিদিনই একবার করে হলেও ছুঁয়ে দেখি। নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ নেই। অনুভব করি মৃত্যু আমার খুব কাছে, খুউব। এইতো এসে পরল বুঝি! কিন্তু আমি? আমি প্রস্তুত?

আই.এ/

মন্তব্য করুন