‘রুহানী সাহাবা’ শব্দের ব্যবহারের কোনো সুযোগ ইসলামে নেই : মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ

প্রকাশিত: ৭:৫৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২০
‘রুহানী সাহাবা’ শব্দের ব্যবহারের কোনো সুযোগ ইসলামে নেই : মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ

সম্প্রতি জাতীয় ইসলামি সংস্কৃতিক সংগঠন কলরবের গাওয়া ‘রুহানি সাহাবা’ শিরোনামে একটি সংগিত বিষয়ে আলোচনায় আসা ‘রুহানী সাহাবা’ শব্দটি নিয়ে শায়খ জাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও বাংলাদেশের প্রথম সারীর একজন আলেম মুফতী মিজানুর রহমা সাঈদ পাবলিক ভয়েসকে বলেন –

‘রুহানী সাহাবা’ শব্দের ব্যবহারের কোনো সুযোগ ইসলামি শরিয়তে নেই। শরিয়তে যাদেরকে সাহাবি বলা হয় তারা নির্দিষ্ট রয়েছেন। আলাদা করে রুহানি সাহাবা পরিভাষা ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। সাহাবি এবং নবীর (স.) বিষয়টি ইসলামের নির্দিষ্ট পরিভাষা। তাই নতুন করে কেউ এসে রুহানি সাহাবা বা রুহানি নবী হতে পারবে না

তিনি বলেন – “এমনকি আভিধানিক অর্থ নিয়েও অন্য কারো কাউকে ‘রুহানি সাহাবা’ বলা যাবে না। বরং এটি হলো ইসলামের একটি খাস পরিভাষা। এই পরিভাষাকে বর্তমানে হাজার বছর পরে এসে এটার রূপক অর্থ নিয়ে বা অপ্রকাশ্য কোন অর্থ নিয়ে যদি এটাকে ব্যবহার করা হয় তাহলে আমার খেয়াল মতে, এবং আমার অনুসন্ধান মতে, আমার জানামতে এটি সাহাবাদের শানে গোস্তাখি বা বেয়াদবি করার সমতুল্য বিষয় হবে।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন – তাই এটা বলা কোনভাবেই সঠিক নয় এবং এটি বলাও উচিত নয়। বরং এটা বলা যায় – আমরাতো সাহাবায়ে কেরামের গোলামের গোলামের গোলামের সমতূল্যও নই। সেখানে রুহানি সাহাবা কিভাবে হতে পারি।

তিনি বলেন – “এই শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে কেউ কেউ বুঝতে পারে রাসূলুল্লাহ সাল্লামকে যারা দেখেছেন তারা হলে ‘জিসমানী সাহাবি’ এবং এখন যাদেরকে বলা হচ্ছে তারা হল রুহানি সাহাবি। বরং চিন্তা করলে দেখা যায় রুহানি সাহাবি জিসমানি সাহাবিদের থেকেও অনেক ক্ষেত্রে বড়। তাই এই শব্দ ব্যবহারের কারণে সাহাবায়ে কেরামদের আজমত এবং বরত্বের মধ্যে একটি দাগ লেগে যাবে। এমনকি যাদেরকে রুহানি সাহাবী বলা হবে তাদের সম্মান ও সাহাবায়ে কেরামের কাছাকাছি উঠে যাবে।”

তিনি রাসুলুল্লাহ স. এর রুহানি সন্তান হওয়ার বিষয়টি উল্যেখ করে বলেন – ইসলাম আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রুহানি সন্তান হওয়ার মত কাজ করো। তিনি পবিত্র কোরআনের সুরা আহযাবের ৬ নয় আয়াতের উদ্বৃতি দিয়ে বলেন কোরআন শরীফে রয়েছে – ‘নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা। [সূরা আহযাব-৬]

এই আয়াত হিসেবে নবীর স্ত্রীরা যদি আমাদের মা হন তাহলে নবী হবেন আমাদের পিতা এবং তিনি পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের ব্যাখ্যার বিষয়ে কিরআতে সাযযার ‘কিরআতে ইবনে আব্বাস’ এর মধ্যে নবী আমার আমাদের পিতা হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট উল্যেখ থাকার কথা বলে বলেন – কিরআকে ইবনে আব্বাসের মধ্যে উল্যেখ আছে,  ‘ও হুয়া আবুন লাহুম’ অর্থাৎ নবী স. আমাদের পিতা। এ বিষয়টি স্পষ্ট করে তিনি বলেন এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম আমাদের পিতা’। একই সাথে তিনি আবু দাউদ শরীফের হাদিস উল্লেখ করে বলেন আবু দাউদ শরীফে এমন একটি হাদীস রয়েছে যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম আমাদের পিতা হিসেবে উল্যেখ করা হয়েছে।

এই আয়াত হিসেবে আমরা আমাদেরকে সরাসরি নবীর রুহানি সন্তান বলতে পারি। এবং এর সাথে মিলিয়ে সাহাবীদেরও রুহানি সন্তান হিসেবে কাউকে যদি বলা হয় তাহলে হয়তো শরীয়তে কিছুটা অবকাশ রয়েছে কিন্তু সন্তান না বলে সরাসরি ‘রুহানি সাহাবা’ বলা এটা গ্রহণযোগ্য নয় বরং রুহানি সাহাবী বিষয়টিও কেবলমাত্র সাহাবীদের গুন হিসেবেই রয়েছে। তাই এখানে অন্য কাউকে রুহানি সাহাবা বলা মানে নিজেদেরকে সাহাবির স্থানে নিয়ে যাওয়া হলো। তাই এটির অর্থই ভুল। এই শব্দের ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।

“অনেকে রুহানি সাহাবা শব্দের ব্যবহার করছেন” উল্যেখ করা হলে তিনি বলেন – “আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি আমাদের আকাবিরদের মধ্য থেকে কেউ যদি এটি বলেও থাকেন তাহলে হয়তো তারা অসতর্কতা স্বরূপ অথবা বিষয়টি তারা গভীরভাবে মাথায় না নিয়ে বলতে পারেন অর্থাৎ তারা হচ্ছে বিষয়টি সেভাবে খেয়াল করেননি তাই এই বেখেয়ালি কোন বিষয়টা হয়তো বড় কিছু নয়। বাকি শরীয়তের আলোকে এরকম বলাটা কোনভাবেই সঠিক নয় এবং উচিত নয়।”

প্রসঙ্গত : জাতীয় ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কলরব’ শিল্পীগোষ্টি কর্তৃক গত ২১ আগস্ট তারিখে প্রকাশ হওয়া ‘রুহানী সাহাবা’ শিরোনামে কওমী মাদরাসার ছাত্রদের নিয়ে একটি সংগিত সম্পর্কে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

আলোচনাটি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর সাহেবজাদা বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের সভাপতি মাওলানা মামুনুল হকের একটি আলোচনায় বিষয়টি আসার পর। তিনি তার আলোচনায় বলেছেন – ‘রুহানী সাহাবা’ বলতে কোনো পরিভাষা ইসলামে নেই।  আলোচনাটি শুনতে ক্লিক করুন এখানে

অপরদিকে বাংলাদেশের প্রতিথযশা দু’জন আলেম আল্লামা আহমদ শফী ও আল্লামা মাহমূদুল হাসানের বরাতে অনেকে দাবি করেছেন – তারা মাদরাসার ছাত্রদের ব্যাপারে ‘রুহানী সাহাবা’ শব্দের ব্যবহার করেছেন। তবে পাবলিক ভয়েসের পক্ষ থেকে তাদের কাছ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে এসব বিতর্কের মধ্যেই কলরবের পক্ষ থেকে একটি ঘোষণায় বলা হয়েছে – তারা এই শব্দটি প্রত্যাহার করে নেবে। এ বিষয়ে কলরবের যুগ্ম নির্বাহী সম্পাদক মুহাম্মদ বদরুজ্জামান জানান –

সম্প্রতি কলরব থেকে রিলিজ হওয়া “রুহানি সাহাবা” শিরোনামের নাশিদটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে । আমাদের সম্মানিত আলেমসমাজ পক্ষে বিপক্ষে নানা মত দিচ্ছেন এবং প্রতিটা মতই গুরুত্বপূর্ণ । এ সুযোগে আবার কেউ কেউ প্রোপাগান্ডাও চালাচ্ছেন । সব মিলিয়ে আমরা এ পরিস্থিতিকে পজিটিভলি নিচ্ছি । ইতিপূর্বে কোন নাশিদ নিয়ে আলেমসমাজ এত কথা বলেছেন আমাদের চোখে পড়েনি, এ জন্য আমরা সত্যি প্রাউড ফিল করছি । সবার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা । আমাদের সংগীত সবার জন্য । যে কোন সংগীত নিয়ে বড় ধরণের বিতর্ক তৈরির সম্ভাবনা হলে তা এড়িয়ে যাবো এটা আমাদের নীতিমালা। যেহেতু সংগীতে “রুহানি সাহাবা” বাক্যের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তাই আমরা এটি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি । পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন হবে ইনশাআল্লাহ । এর আগে আমরা চেষ্টা করছি দেশের বিজ্ঞ ওলামাদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট একটি নির্দেশনা নিতে, যাতে করে বর্তমান অবস্থার সুন্দর অবসান হবে । জাযাকুমুল্লাহ ।

‘রুহানী সাহাবা’ বিতর্ক : কলরব নয় বরং এর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা দরকার – মুফতী রেজাউল করীম আবরার 

মন্তব্য করুন