সু চির দুঃসময় শুরু : রোহিঙ্গা জেনোসাইডের বিচার বাংলাদেশে আনার প্রস্তাব

প্রকাশিত: ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২০

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর ভয়াবহ নিপীড়ন ও গণহত্যা চালানোর বিষয়ে গাম্বিয়া কর্তৃক নেদারল্যানাডের হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে করা মামলার বিষয়ে অনেক অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে।

গণহত্যার কথা স্বীকার করা দুই সেনা কর্মকর্তাকে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে পৌঁছানোর খবর ফাঁস হওয়ার পর এ নিয়ে সারা বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

আর এ ঘটনাকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, সরকার এবং বিশেষ করে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির জন্য দুঃস্বপ্নের শুরু হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

অপরদিকে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারিক কার্যক্রম তৃতীয় কোনো দেশ বিশেষ করে বাংলাদেশে আনার প্রস্তাবও দিয়েছে বিচারে সংশ্লিষ্টরা। রোহিঙ্গাদের হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে শুনানি হবে, সেটি যেন নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের পরিবর্তে অন্য কোন দেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশে আদালত বসিয়ে করা হয়, সেরকম একটি আবেদন পেশ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির সব কার্যক্রম সাধারণত চলে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে। কিন্তু এই প্রথম এরকম কোন উদ্যোগ নেয়া হলো, যেখানে ভিক্টিম বা নির্যাতিতদের শুনানির জন্য আদালতকেই অন্য কোন দেশে বসানোর আবেদন জানানো হয়েছে।

আইসিসিতে এরকম একটি আবেদনের কথা জানা গেল এমন এক সময়, যখন মিয়ানমারের দুজন সৈন্য, যারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হত্যা এবং ধর্ষণের ঘটনায় সরাসরি অংশ নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন এবং দ্য হেগে গিয়ে পৌঁছেছেন বলে খবর বেরিয়েছে। মিয়ানমারকে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য যে তদন্ত প্রক্রিয়াধীন, সেখানে এই দুটি ঘটনাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবীরা।খবর বিবিসির।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মিয়ো উইন তুন (৩৩) ও য নিং তুন (৩০) নামের ওই দুই সেনা মিয়ানমার বাহিনীর পক্ষ ত্যাগ করে রাখাইন রাজ্যে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রামরত আরাকান আর্মির কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি দেন। পরবর্তী সময়ে ওই দুই সেনা কর্মকর্তা বাংলাদেশ সীমান্তে এসেছিলেন। সম্প্রতি তাঁরা দ্য হেগে পৌঁছেছেন।

নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট, সংক্ষেপে আইসিসি) ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস, সংক্ষেপে আইসিজে) অবস্থিত।

আইসিজেতে জেনোসাইডবিরোধী সনদ লঙ্ঘন ও রোহিঙ্গা জেনোসাইড সংঘটনের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার মামলা চলছে। অন্যদিকে আইসিসির নির্দেশে এর প্রসিকিউটরের দপ্তর রোহিঙ্গা জেনোসাইড, গণবাস্তুচ্যুতিসহ গুরুতর অপরাধের অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

জানা গেছে, মিয়ানমারের ওই দুই সেনা দুটি আদালতেরই নাগালের মধ্যে আছেন। আগামী দিনগুলোতে তাঁদের সম্ভাব্য সাক্ষ্য, স্বীকারোক্তি ও তথ্য-উপাত্ত রোহিঙ্গা জেনোসাইডের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ‘টার্নিংপয়েন্ট’ হয়ে উঠতে পারে।

রোহিঙ্গা জেনোসাইডসহ নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে আসা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কতটা সফলভাবে চালানো যাবে তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দুই সদস্যের স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি পুরো পরিস্থিতিকে বদলে দিতে পারে।
নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চল বিষয়ক সাবেক উপপরিচালক ফেলিম কাইন টুইট বার্তায় বলেছেন, রোহিঙ্গা গণহত্যার সাক্ষী হিসেবে মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তাদের আইসিসিতে উপস্থিতি অং সান সু চির জন্য চরম দুঃস্বপ্ন। কারণ তাঁর সরকার আইসিসির বিষয়ে অস্বীকার, অগ্রাহ্য করার নীতি অনুসরণ করে আসছে।

মানবাধিকার সংগঠন ফরটিফাই রাইটসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথু স্মিথ বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা চালানোর বিষয়ে প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের দুই সেনার স্বীকারোক্তি ওই দেশটির সামরিক বাহিনীর দায়মুক্তি বর্মে বড় ধরনের ফাটল ধরাবে। টুইট বার্তায় তিনি আরো বলেন, ন্যায়বিচারের জন্য রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারের জনগণের জন্য এটি এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

ম্যাথু স্মিথ বলেছেন, মিয়ানমারের ওই দুই সেনার কাছ থেকে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়নি, এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই ফরটিফাই রাইটস এ বিষয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, ‘যদি মনে হতো যে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে তবে ঝোঁকের বশে বাংলাদেশ আইসিসির সঙ্গে যোগাযোগ করবে না কিংবা আইসিসিও কাউকে দ্য হেগে নিয়ে যাবে না। এভাবে ওই আদালত (আইসিসি) চলে না।’

এদিকে মিয়ানমারবিষয়ক কানাডার সাবেক বিশেষ দূত ও বর্তমানে জাতিসংঘে কানাডার রাষ্ট্রদূত বব রে বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালানোর বিষয়ে মিয়ানমারের দুই সেনার স্বীকারোক্তি দেশটির সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে নৃশংসতার আন্তর্জাতিক ফৌজদারি তদন্তে বড় প্রভাব ফেলবে।

কানাডা এ ব্যাপারে পরবর্তী উদ্যোগ নিতে সহায়তা করবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বব রে বলেছেন, যদিও ওই ব্যক্তি গুরুতর ফলাফলের মুখোমুখি হতে পারেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁরা তাঁদের অপরাধমূলক কাজের মাত্রা সম্পর্কে অবগত এবং তাঁরা এককভাবে ওই অপরাধ করেননি।

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর নৃশংসতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সহযোগীর ভূমিকার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন লন্ডনে অবস্থানরত মিয়ানমারের নির্বাসিত মানবাধিকারকর্মী মং জার্নি।

ওই আরাকান আর্মিই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওই দুই সদস্যকে আটক করেছিল। তাদের কাছেই প্রথম রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালানোর বর্ণনা দিয়েছেন। আরাকান আর্মির মুখপাত্র খাইন থু খা বলেছেন, ‘ওই দুই সেনা মিয়ানমার বাহিনী থেকে পালিয়েছেন। আমরা তাঁদের অভিজ্ঞতার বিষয়ে সাক্ষাত্কার নিয়েছি।’ সূত্র : বিবিসি, কালের কন্ঠ।

মন্তব্য করুন