আল্লামা তাকী উসমানীর সম্মাননা : কিছু প্রসঙ্গ কথা

প্রকাশিত: ৬:৪৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২০

সৈয়দ শামছুল হুদা

আল্লামা তাকী উসমানী বর্তমান মুসলিম বিশ্বের গর্ব। আলেম-উলামাদের শান ও মর্যাদা কেমন হতে পারে তার একটি জীবন্ত উদাহরণ তিনি। আমরা তাঁকে নিয়ে খুবই গর্ব করি। তাঁর ব্যক্তিত্ব, চিন্তা-চেতনা, কর্মপদ্ধতি নিয়ে আমরা অহঙ্কার করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে যারা তাঁর সরাসরি ছাত্র, তাদের মধ্যেও আল্লামা তাকী উসমানী সাহেবের শিক্ষা দর্শন, চিন্তাগত দর্শন, কর্মকৌলশগত দর্শনের মিল খুঁজে পাই না।

আল্লামা তাকী উসমানীকে শুধু পাকিস্তানের সকল ঘরানার আলেম সমাজই নয়, সারা বিশ্বের জ্ঞানপিপাসু মানুষ পছন্দ করে। তিনি একাধারে বহু প্রতিভার অধিকারী মানুষ। তিনি আরবদের সামনে অনর্গল আরবীতে বক্তৃতা করছেন। তিনি দেশের জেনারেলদের সামনে অনর্গল ইংরেজিতে বক্তৃতা করছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন। যে দেশে যাচ্ছেন যতদূর সম্ভব তাদের ভাষায় তাদেরকে বুঝানোর জন্য চেষ্টা করছেন। এতে তাঁর ব্যক্তিত্ব আরো বেশি করে ফুঠে উঠছে। তিনি ইসলামকে সহজভাবে মানুষের সামনে বুঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

  • বর্তমান সময়ে ইসলামী অর্থনীতির সেরা ব্যাখ্যাকার তিনি। উনার বড় ছেলে পাকিস্তানের জাতীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা। সেদিন একজন হুজুর একটি স্টেটাস দিলেন যে, তাকী উসমানী সাহেবতো ভালো মানুষ, কিন্তু তার ছেলেটা বখাটে হয়ে যাচ্ছে তার দিকে তিনি খেয়ালই রাখছেন না। কী অসাধারণ পেরেশানী! অপর একটি লেখায় দেখলাম, বাংলাদেশের এক শীর্ষ আলেম বলছেন, তারচেয়ে কপাল পোড়া আর কে আছে যে ব্যাংকে চাকুরী করে।

অথচ এই মুফতি সাহেবানগণ বর্তমানে মানুষ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লেনদেন করে, এগুলো কীভাবে করবে, এ নিয়ে সামান্য গবেষণাও করছেন না। ইসলামকে খন্ডিতভাবে শিখতে, শিখাতে এদেশের আলেমদের কোন তুলনা নেই। বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তি, টেকনোলোজির সময়ে ইসলামী অর্থনীতির যে বিশাল বাজার সেখানে মুসলমানরা কীভাবে নেতৃত্ব দিবে সেটার সমাধান দেওয়ার ক্ষমতা নাই, এখনো পড়ে আছেন সেই মান্দাতা আমলে ব্যাংকে চাকুরী করা হারাম। ইংরেজি শিখা হারাম সেই রকম ভাবনার মধ্যেই। আর তাকী উসমানী সাহেবরা ব্যাংকিং সেক্টর, কোম্পানী ব্যবসা, শেয়ার মার্কেটসহ সকল প্রকার আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী আদর্শের মূল চেতনার ভিতর থেকে কীভাবে পরিচালনা করা যায় তার প্র্যাকটি্ক্যাল থিউরি উপস্থিত করে দেখাচ্ছেন।

একটি স্বাধীন মুসলিম দেশে লক্ষ লক্ষ আলেম, কোটি কোটি দ্বীনদার সমর্থক, তারা ইচ্ছে করলেই একটি সুন্দর ইসলামী ব্যাংক করে দেখাতে পারেন। ব্যাংক নামক শব্দটি নিয়েও যদি কোন আপত্তি থাকে, সেই জায়গায় অন্যকিছু বসাতে পারেন। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই যখন সামান্য সোনা-রুপার পয়সার লেনদেন করা যায়। এখন বিলিয়ন, ট্রিলিয়ন ডলার লেনদেনের সময়। এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ কীভাবে মুসলমানরা সামলাবে তার বাস্তব রূপরেখা এদেশের আলেমরা তুলে ধরতে পারেন নাই। এ বিষয়ে উনারা  জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। তার কিছুই করেন  না। নিজেরা মাদ্রাসার বড় বড় ভবন তৈরী করার জন্য দুনিয়াদারদের নিকট থেকে দুই হাতে পয়সা নেন, কিন্তু এরা কিভাবে হালাল ব্যবসা করবে, কীভাবে এখন ব্যাংকিং সমস্যা সমাধান করবে তার কোন ব্যবস্থাই করতে পারলেন না স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও। কিন্তু তাকী উসমানী সাহেবরা পেরেছেন। তিনি ব্যাংকারদের ধরে এনে এনে বুঝাচ্ছেন, এ পলিসি এভাবে গ্রহন করুন, ওটা করবেন না। এই পলিসি হালাল, এটা হালাল না। সাধারণ মুসলমান শিল্পপতিরা এসব কথা সাদরে গ্রহন করছেন। কোন সত্যিকার মুসলমানই সুদ খেতে চায় না। কিছু মানুষ পরিবেশের কাছে জিম্মি হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের আলেম সমাজ কোনদিন ব্যাংকে গিয়ে তাদেরকে এসব বিষয়ে সতর্ক করেছেন, সেমিনার করেছেন জানা নেই।

কিছু ব্যাংক অর্থের বিনিময়ে শরিয়াহ কমিটি পরিচালনা করে। কিছু হুজুরদের দিয়ে মিটিং করায়। যাওয়া-আসার সময় নগদ খাম ধরিয়ে দেয়। বেশ, শেষ। কিন্তু নিজেরা গবেষণা করে ব্যাংকিং সেক্টরকে ইসলামাইজেশনের জন্য জাতীয় কোন উদ্যোগ কোন আলেমদের থেকেই দেখা যায় না। এক হারাম ফতোয়া দিয়েই দায়িত্ব শেষ। এদেশের কোটি কোটি মুসলমান জাহান্নামে যাক, তাতে উনাদের পেরেশানী নেই। নিজেরা নিরাপদে জান্নাতে যেতে পারলেই হলো এমনই একটি অবস্থা।

  • তাকী উসমানী সাহেবের খাস শাগরেদ মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ, মুখতি দেলাওয়ার  সাহেব প্রমুখ এদেশের অর্থনীতিকে হালাল পথে চালাতে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন আমার জানা নাই। উনারা কোন অর্থনীতিবিদদের নিয়ে মিটিং করেছেন শুনি নাই। অর্থনীতিবিদদের নিজেদের মাদ্রাসায় বা বিশেষ কোন হলে ডেকে তাদের সামনে কোন সভা করেছেন, কোন শীট ধরিয়ে দিয়েছেন শুনি নাই। উনারা বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের ভাষা কতটুকু বুঝেন সেটাই সন্দেহ। অথচ তাদেরকে নিয়েও আমরা গর্ব করি।

কিন্তু উনারা উনাদের উস্তাদদের শিক্ষা বাংলাদেশে প্রয়োগ করতে পারেন নাই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে উনারা  চিন্তার ক্ষেত্রে চরমসীমার প্রান্তিকতা লালন করেনে। অনেক ক্ষেত্রেই উনারা তাকী উসমানী সাহেবের মতো উদার নন। অথচ তাকী উসমানী সাহেবের পাশে বসতে পারে সেই দেশের সকল ঘরানার আলেম সমাজ। হোক সে জামায়াতে ইসলামীর, হোক সে বেরলভি জামায়াতের, হোক সে শিয়া সম্প্রদায়ের। জাতীয় ইস্যুতে তারা একসাথে বসতে পারেন, বসেন, কথা বলেন। সমাধান করেন। পাকিস্তানে করোনাকালীণ আলেমদের ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ এর কিছুই করতে পারে নাই।

  • পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় এ পুরস্কার তাকী উসমানী সাহেবকে খুব বড় করবে বিষয়টি এমন নয়। বরং  আমি মনে করি, এ পুরস্কার প্রদান করে পাকিস্তানী সরকার নিজেদের সম্মানকেই বৃদ্ধি করেছে।

বাংলাদেশে এমন বহুমুখি প্রতিভাধর আলেম দেখতে চাই। আরবী, বাংলা, ইংরেজিতে সমান দক্ষতা অর্জন করে দেশের সকল সেক্টরে দাপটের সাথে ইসলাম প্রতিষ্ঠার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে  নেতৃত্ব দিবেন তেমন আলেম দেখতে চাই।

ইতিমধ্যেই কিছু আলেম এগিয়ে আসছেন দেখে আগ্রহবোধ করছি। পটিয়া মাদ্রাসায় সম্প্রতি প্রমোশন পাওয়া মুফতি উবায়দুল্লাহ হামযা সাহেবের ইংরেজি বয়ান শুনেছি। খুবই ভালো লেগেছে। তিনি বাংলা, আরবী ও ইংরেজিতে সমান পারদর্শী। এবং উপযুক্ত জায়গায় নিয়োগ পেয়েছেন। উনাদের পক্ষে আগামী দিনে বাংলাদেশকে সুন্দরভাবে বিশ্বের কাছে প্রেজেন্টেশন করা সম্ভব। মুহতারাম আহমাদুল্লাহ ভাই, মিজানুর রহমান আজহারী, আব্দুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ, ইউসুফ সুলতান প্রমুখের আলোচনা ও কর্মতৎপরতা ভালো লাগে। যদিও তারা বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক বিশেষ কোন জায়গায় এখনো যেতে পারেননি। হয়তো আগামী দিনে তারাও বিশেষ কোন জায়গা দখল করতে পারবেন। এবং যোগ্যতার সাথে তারাও নেতৃত্ব দিবেন।

বাংলাদেশে আলেমদের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দেখতে চাই। শুধু ক্ষমতার চেয়ার নিয়ে টানাটানিই সবকিছু নয়। যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ প্রতিভা দিয়ে যে কোন সরকারকে দুর্বল করে রাখা যায়। আল্লাহ আমাদের দেশের আলেম সমাজকে রাষ্ট্রের অভিভাবকতুল্য জায়গায় যাওয়ার তৌফিক দান করুন।

লেখক : জেনারেল সেক্রেটারী, বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট বিআইএম।

মন্তব্য করুন