১২ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জের সেই মসজিদে থাকা মনিরও চলে গেলেন পরপারে

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে গ্যাস লিকেজের বিস্ফোরণ

প্রকাশিত: ৯:২০ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২০

দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লায় বায়তুস সালাত জামে মসজিদের দ্বিতীয় তলার মেসে থাকতেন বরিশাল বাকেরগঞ্জের মনির ফরাজি (৩৩)। এই মসজিদেই নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও আদায় করতেন তিনি।

গত শুক্রবারও একইভাবে এশার নামাজ আদায় করতে গিয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে গ্যাস লিকেজ থেকে হওয়া বিস্ফোরণে গুরুতর দগ্ধ হন মনির।

আহত হয়ে ছিলেন রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)।

শেষ পর্যন্ত প্রায় আড়াই দিন মুমূর্ষু অবস্থায় থেকে তিনিও যোগ দিলেন মৃত্যুমিছিলে। গতরাত সাড়ে ১০ টায় তিনি হাসপাতালেই ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের পর পরিবারের কাছে তার লাশ হস্তান্তর করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বিষয়টি পাবলিক ভয়েসকে নিশ্চিত করেছেন মরহুমের নিকটাত্মীয় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মোহাম্মদ আলমগীর হোসাইন।

তিনি জানিয়েছেন – ইতোমধ্যেই তার লাশ নিজ এলাকায় পৌঁছেছে। সেখানে বেলা ১১ টায় জানাযা শেষে নিজ গ্রামে বাসভবনের কাছে পারিবারিক কবরস্থানেই তার দাফন হবে। তার ইন্তেকালে এলাকায় শোকের মাতম চলছে বলেও জানান তিনি।

জানা যায় – মনির ফরাজির বাড়ি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ থানার গাড়ুরিয়ার বারোঘরিয়া গ্রামে। তিনি নারায়ণগঞ্জ এলাকায় চুক্তিভিত্তিক টাইলসের কাজ করতেন। পাঁচ বছর বয়সী ইয়াসিন নামের শিশু সন্তান আছে তাঁর। ছোট ভাই সুলতান ফরাজিও টাইলসের কাজ করেন।

মনির ফরাজির বড় ভাই কালাম ফরাজি গতকাল একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মনিরের ছোট একটা ছেলে আছে। চিন্তা হচ্ছে ওর জন্য। ডাক্তারের কথা শুনে মনে হলো মনির আর বাঁচবে না। ওর শরীরের ৯৭ শতাংশ পুড়ে গেছে। এখানে দুপুর পর্যন্ত ছিল মনিরের বৌ জেসমিন খাতুন আর ছেলে ইয়াসিন ফরাজি। জেসমিন বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিল। ছেলের অবস্থাও খুব খারাপ ছিল। ওদের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। তাই পাঠিয়ে দিয়েছি বরিশালের বাকেরগঞ্জ। আমাদের বাড়ি ওখানে।’

পরে মুঠোফোনে জেসমিন খাতুনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “শুক্রবার বিকেলে স্বামীর সঙ্গে কথা হয় আমার। তখন আমি আমার বাবার বাড়ি বাকেরগঞ্জে ছিলাম। আমার শ্বশুর ও শাশুড়ি অসুস্থ। তাই আমাকে মনির বলল, ‘তুমি বাড়ি যাও, বাবা-মা অসুস্থ।’ আমি বাড়ি গেলাম। রাতে শুনলাম এই ঘটনা। কিছুই ভাবতে পারছি না। সবাই মিলে আমাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিল।” বলতে বলতে কেঁদে ওঠেন জেসমিন।

মনির ফরাজির বিষয়ে জানতে চাইলে রাতে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘মনির ফরাজির অবস্থা খুবই খারাপ। তাঁর শরীরের বেশিরভাগ অংশই পুড়ে গেছে।’ শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে ১০ টায় তিনি ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ্ তাঁকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করেন।

প্রসঙ্গত : গত শুক্রবার রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে এশার নামাজের সময় তিতাস গ্যাস কোম্পানীর অবহেলায় গ্যাস লিকেজ হয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে এখন পর্যন্ত ২৭ জন মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আজ রোববার সকাল পর্যন্ত ২৫ জনের লাশ তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ছাড়া গুরুতর আহত অবস্থায় ১১ জন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছে। যাদের সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে ডাক্তাররা।

অপরদিকে নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে ছয়টি এসির একটিও বিস্ফোরিত হয়নি। লিকেজ থেকে বের হওয়া গ্যাস এবং বিদ্যুতের স্পার্ক থেকে বের হওয়া আগুনেই এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির প্রধান উপ-পরিচালক নূর হাসান আহমেদ।

তিনি বলেন, মসজিদের এসি থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি। ছয়টি এসির প্রতিটির ক্যাচিং পুড়েছে কিন্তু ভেতরের সব ঠিক আছে। বিস্ফোরণ হয়েছে গ্যাসের ও বিদ্যুতের স্পার্ক থেকেই। এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর সিআইডির তদন্ত কমিটির সদস্যও পুলিশ পরিদর্শক জিয়াউদ্দিন উজ্জলও একই কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ থেকেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ছয়টি এসির একটিও বিস্ফোরিত হয়নি, হওয়ার কথাও নয়। বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, তিতাস গ্যাস, সিআইডি এবং ডিপিডিসির পক্ষ থেকে আলাদা পাঁচটি তদন্ত কমিটি গঠনা করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগে সমস্যা-এই দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে প্রাথমিকভাবে তারা কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরা ববি।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে বলে কোম্পানির নারায়ণগঞ্জ অফিসের ডিজিএম মফিজুল ইসলাম জানিয়েছেন। কমিটির প্রধান করা হয়েছে তিতাস গ্যাসের ঢাকা অফিসের মহাব্যবস্থাপক আবদুল ওহাবকে। শনিবার সকালে বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মোহাম্মদ আল মামুন।
অপরদিকে ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মোর্শেদ কে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এই তদন্ত কমিটিকে আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে আগামী ১০ কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়।
ঘটনা তদন্তে কাজ করছে সিআইডির পাঁচ সদস্যের একটি দলও।

[প্রতিবেদনটি করতে সহযোগিতা করেছেন পাবলিক ভয়েসের বিশেষ প্রতিনিধি আলমগীর হোসাইন]

মন্তব্য করুন