মুসলমানদের হৃদয়ে আঘাত করে মুহাম্মদ স. কে ফের ব্যঙ্গ করলো ফ্রান্সের শার্লি এব্দো

প্রকাশিত: ৩:৩৭ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০২০

বিশেষ প্রতিবেদন :  ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ব্যঙ্গ করে ফ্রান্সের বিতর্কিত ও ধর্মবিদ্ধেষী ম্যাগাজিন শার্লি এব্দো পূনরায় প্রায় ১২ টি ‘অপমানমূলক’ কার্টুন প্রকাশ করেছে।

  • চরম বিতর্কিত এই ম্যাগাজিনটি সেপ্টেম্বর সংখ্যায় ১ তারিখে (গতকাল) অর্থাত মঙ্গলবারে পূনরায় পঞ্চম বারের মতো হযরত মুহাম্মদ স. কে নিয়ে এই বারোটি ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশ করে।

এর আগে ২০০৫ সালে সর্বপ্রথম ও ২০০৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ম্যাগাজিনটিতে হযরত মুহাম্মদ স. কে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশ করেছিলো। তখন মুসলমানরা প্রতিবাদ করার পর কিছুদিন থেমে থেকে ২০১২ সালে তৃতীয়বারের মতো পূনরায় মহানবী স. কে নিয়ে এই উসকানীমূলক কাজটি করেছে এই বিতর্কিত ম্যাগাজিনটি। যার জের ধরে তিন বছর পর ২০১৫ সালে ম্যাগাজিনটির অফিসে কয়েকজন মুসলিম জানবাজরা হামলাও করেছিলো। যে হামলায় প্রায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিলো।

এরপর ২০১৫ সালে এই হামলার জের ধরে আবারও চতুর্থ বারের তারা মুহাম্মদ স. কে নিয়ে অপমানমূলক কার্টুন প্রকাশ করে। তখনকার ব্যঙ্গচিত্রে মহানবী (সা.)-কে কান্নারত দেখানো হয়েছে। তাঁর মাথায় সাদা পাগড়ি। হাতে ধরা একটি লেখা। তাতে ফরাসি ভাষার লেখা ‘জে সুই শার্লি’। পত্রিকাটি তখন বলছে, এটি ‘সারভাইভার্স ইস্যু’। এমনকি তখন তারা এই সংখ্যাটির ৩০ লাখ কপি ছাপিয়েছে। সাধারণত তারা ৬০ হাজার কপি ছাপে।

  • এভাবেই বারবার ফ্রান্সের এই বিতর্কিত সাময়িকিটি হযরত মুহাম্মদ স. কে নিয়ে অপমানমূলক কার্টুন প্রকাশ করে আসছে। যা স্পষ্টত একটি ধর্মবিদ্ধেষ এবং একটি জাতীগোষ্টিকে অপমান করা।

বিশ্বের প্রায় ১৮০ কোটি মুসলমানদের কাছে তাদের প্রিয় এবং স্পর্শকাঁতর একটি স্থানের নাম ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়া সাল্লাম। নবী মুহাম্মদ স. এর ভালোবাসা প্রকাশ করতে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিতে পারে মুসলমানরা।

মুসলমানদের এই স্পর্শকাঁতর স্থানটিকে তাই বারবার আঘাত করে বিশ্বের অসংখ্য মুসলিম বিদ্ধেষীরা। এতে করে মুসলমানদের সাথে পারস্পরিক বিভিন্ন ধর্মের লোকদের সহাবস্থান হুমকির মুখে পড়ে প্রায়ই।

  • ইসলামের নবী মুহাম্মাদ স. কে অপমান করা নিয়ে বিশ্বের যে কয়টি ঘটনা সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো ফ্রান্সের একটি ধর্মবিদ্ধেষী কথিত রম্য সাময়িকী শার্লি এব্দোতে নবী মুহাম্মাদ স. কে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশ করা।

২০০৫ সালের জানুয়ারী মাসে শার্লি এব্দো ম্যাগাজিনে সর্বপ্রথম মুহাম্মদ স. কে ব্যাঙ্গ করে বিতর্কিত কার্টুন প্রকাশ করে। যা নিয়ে বিশ্বের মুসলমানরা কড়া প্রতিবাদ ব্যাক্ত করেন। এরপরও ম্যাগাজিনটির পক্ষ থেকে কোনো দুঃখ প্রকাশ না করে তাদের সেই সংস্করণটি তখন পূনরায় (দ্বিতীয়বার) ২০০৬ সালে প্রকাশ করা হয়। এরপর বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের কড়া প্রতিবাদের মুখে কয়েক বছর থেমে থেকে ২০১২ সালে তৃৃতীয়বার তারা আবারও কিছু কার্টুন প্রকাশ করে।

  • পরবর্তিতে ২০১৫ সালে ৯ জানুয়ারি দুই ভাই সাঈদ এবং শেরীফ কুয়াচি শার্লি এব্দোর দপ্তরে হামলা চালায়। সাময়িকীর সম্পাদক স্তেফানি শার্বনিয়ার যিনি শার্ব নামে বেশি পরিচিত ছিলেন, তিনি এবং আরও চারজন কার্টুন শিল্পী মারা যান। এছাড়াও মারা যান সর্বমোট ১২ জন।

বাকি নিহতেদের মধ্যে ছিলেন দুজন কলাম লেখক, একজন কপি এডিটার, একজন অতিথি যিনি একটি বৈঠকে যোগ দিতে সেখানে গিয়েছিলেন এবং অফিসের কেয়ারটেকার। সম্পাদকের দেহরক্ষী এবং একজন পুলিশ অফিসারও ঘটনায় নিহত হন। পুলিশ ওই দুই ভাইকে যখন খুঁজছিল, তখন প্যারিসের পূর্বাঞ্চলে আরেকটি অবরোধের ঘটনা শুরু হয়। পরে ওই দুই ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এবং প্রায় ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

এ ঘটনার এক সপ্তাহ পর ২০১৫ সালেই আবারও চতুর্থবার মহানবী স. কে নিয়ে কিছু অপমানমূলক কার্টুন প্রকাশ করে ম্যাগাজিনটি। তখনকার ব্যঙ্গচিত্রে মহানবী (সা.)-কে কান্নারত দেখানো হয়েছে। তাঁর মাথায় সাদা পাগড়ি। হাতে ধরা একটি লেখা। তাতে ফরাসি ভাষার লেখা ‘জে সুই শার্লি’। পত্রিকাটি তখন বলছে, এটি ‘সারভাইভার্স ইস্যু’। এমনকি তখন তারা এই সংখ্যাটির ৩০ লাখ কপি ছাপিয়েছে। সাধারণত তারা ৬০ হাজার কপি ছাপে।

এরপর প্রায় পাঁচ বছর বিষয়টি থেমে থাকলেও সম্প্রতি প্যারিসের একটি আদালতে শার্লি এব্দোর অফিসে হামলায় সহযোগিতার অভিযোগ আনা ওই ১৪ জনের বিচারকার্য শুরু হয়। পাঁচ বছর আগে শার্লি এব্দোর অফিসে যে হামলা হয়, তার সাথে জড়িত সন্দেহে ১৪জন কথিত ষড়যন্ত্রকারীর বিচার আজ বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) শুরু হচ্ছে। কথিত ষড়যন্ত্রকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, শার্লি এব্দোতে ২০১৫-র ৭ই জানুয়ারি দুই ভাই-এর চালানো বন্দুক হামলায় সহযোগিতা করেছিল এই ১৪জন।

বিচার শুরুর একদিন আগে অর্থাত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) শার্লি এব্দো মুহাম্মদ স. কে নিয়ে বহুল বিতর্কিত কিছু কার্টুন পঞ্চমবারের মতো আবার প্রকাশ করেছে, যে কার্টুন প্রকাশের জেরেই ২০১৫ সালে তাদের অফিসে হামলা চালানো হয়েছিল।

শার্লি এব্দোর সর্বসাম্প্রতিক সংস্করণের মলাটে ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ স. এর সেই মূল ১২টি কার্টুন চিত্র আবার ছাপা হয়েছে। এই কার্টুনগুলো শার্লি এব্দোয় প্রকাশের আগে সেগুলো ডেনমার্কের একটি সংবাদপত্রেও ছাপা হয়েছে।

ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয়কে ঔদ্ধত্বের সাথে বলা হয়েছে, ২০১৫-র হত্যাকাণ্ডের পর থেকে মুহাম্মাদ স. কে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন ছাপানো অব্যাহত রাখার জন্য তাদের কাছে প্রায়ই অনুরোধ এসেছে।

তারা লিখেছেন – “আমরা সবসময়ই এই অনুরোধ প্রত্যাখান করেছি। আইনত এধরনের কার্টুন প্রকাশে কোনরকম নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু সে ধরনের কার্টুন প্রকাশের জন্য কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে হবে, এমন কোন কারণ যা বিতর্কের খাতিরে সামনে আনা যুক্তিসঙ্গত হবে,”  ”যেহেতু জানুয়ারি ২০১৫-র সেই সন্ত্রাসী হামলার বিচার এ সপ্তাহে শুরু হচ্ছে, তাই কার্টুনগুলো পুন:প্রকাশ করা আমরা দরকার বলে মনে করেছি।”

শার্লি এব্দোর প্যারিসের দপ্তরে এবং পরবর্তীতে ইহুদীদের একটি সুপারমার্কেট ও একজন পুলিশ অফিসারের ওপর হামলায় সহযোগিতার জন্য চোদ্দ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে তারা বন্দুকধারীদের অস্ত্র এবং অন্যান্য সহযোগিতা করেছে।

জানুয়ারি ২০১৫ সালে বন্দুকধারীরা এই হাইপার ক্যাচার সুপারমার্কেটে হামলা চালিয়ে চার ব্যক্তিকে হত্যা করে। অভিযুক্তদের মধ্যে তিনজনকে তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার করা হবে। কারণ তারা উত্তর সিরিয়া এবং ইরাকে পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়।

ফ্রান্সের আরএফআই সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, ধারণা করা হচ্ছে হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া এবং আইনজীবী মিলিয়ে প্রায় ২০০ ব্যক্তি এই মামলায় সাক্ষ্য দেবে।

এ বছর মার্চ মাসে এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবার কথা ছিল, কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির কারণে তা পিছিয়ে যায়। এই বিচার কাজ নভেম্বর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। বিচারে আসামীরা দোষি সাব্যস্থ হলে তাদের ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন পর্যন্ত যে কোনো সাজার মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে।

কিন্তু এর মধ্যে পূনরায় এই ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশ করা মূলত মুসলমানদের হৃদয়ে ফের আঘাত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে বিচারকার্য শুরু করার আগ মূহুর্তে এই কার্টুন আবার প্রকাশ করার মধ্যে ফ্রান্সের এই সাময়িকিটি তাদের ইসলামবিদ্ধেষের রূপ পূনরায় আবার সামনে আনলো।

সংবাদ সূত্র : আনাদুলু, বিবিসি, আরএফআই, প্রথম আলো।

হাছিব আর রহমান/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন