গণপরিবহনে হেলপার কর্তৃক নারীদের ‘শারিরীক হেনস্তা’ বন্ধ হবে কবে !

প্রকাশিত: ৭:৫৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১, ২০২০
গণপরিবহনে হেলপার কর্তৃক নারীদের ‘শারিরীক হেনস্তা’ বন্ধ হবে কবে !

তানহা আফরিন (ছদ্মনাম)। শাহবাগ থেকে ধানমণ্ডি যাবে। একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। বেশ কয়েকটি টিউশনিও করেন। প্রতিদিনই যার চলাচলের একমাত্র মাধ্যমে ‘লোকাল বাস’। পাবলিক ভয়েসের প্রতিবেদকের কাছে বাসে উঠার ক্ষেত্রে শারিরীক হেনস্থা হওয়ার ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছিলেন তিনি।

প্রথম দিকে যখন ঢাকায় এসেছেন তিনি তখন অনেক কিছুই বুঝতেন না। স্বাভাবিকভাবেই বাসে উঠতেন। এখানে ওখানে যেতেন। একদিন মধ্যদুপুরে শাহবাগ থেকে বাসে উঠতে গিয়ে বাসের দরজায় হেলপার কর্তৃক অনাকাঙ্খিত এক ঘটনার শিকার হলেন।

বাসের ছোট্ট দরজা দিয়ে উঠার সময় হেলপার তার শরীরের স্পর্শকাঁতর এক স্থানে হাত দিয়ে বসলেন। তিনি চমকে উঠে নেমে গিয়ে হেলপারকে ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন – ‘এমন কেন করেছেন তিনি’। হেলপার কাচুমাচু করে বাসের গায়ে দুটি থাপ্পড় দিয়ে ড্রাইভারকে তড়িঘড়ি করে বললো, ‘আগান বস’!

আফরিনের আর বুঝতে বাকি রইলো না কিছুই। স্তম্ভিত হয়ে ছিলেন তিনি। ওদিকে শা শা করে বাসটা চলে গেলো। শাহবাগ মোড়ে একটু নির্জন স্থানে অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থেকে পেছনের বেশ কিছু ঘটনা মনে করলেন। এমন ঘটনা তার সাথে আরও ঘটেছে। প্রায়ই বাসের হেলপাররা এমনকি অনেক সময় অনেক যাত্রীরাও বিব্রত করে দেওয়ার মত করে দেহ স্পর্শ করেছে তার।

  • এরপর থেকে তানহা বেশ সতর্ক। কখনওই বাসের দরজায় হেলপার দাড়িয়ে থাকলে তিনি উঠেন না। হেলপারকে নামতে বলে তিনি বাসে উঠেন। কিছুটা স্বস্তিতে তিনি থাকেন এখন।

ঢাকার লোকাল পরিবহনগুলোতে নারীদের হয়রানীর ঘটনা নতুন নয়। হাজার হাজার ঘটনা রয়েছে এমন। এমনকি বাসে বা বিভিন্ন পরিবহনে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে অনেক।

সুমাইয়া তারিন নামে একটি মেয়ে ঔমেন চ্যাপ্টার নামে একটা ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে একটি লেখায় উল্যেখ করেছেন – ...বছর তিনেক আগের কথা, আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী। বাসে করে কোথাও যাচ্ছিলাম। বলে রাখা ভালো, গ্রামের মেয়ে হওয়াতে আমার বাস যাতায়াতের অভিজ্ঞতার ঝুলি একদমই শূণ্য ছিল। তখন আমার পাশের সিটে ছিল একজন মাঝ বয়সী লোক, বয়সে আমার বাবার চেয়েও বড়। পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্ত্বেও তিনি শুরু থেকেই আমার সাথে খুব ক্লোজ হয়ে বসেছিলেন। আমি অস্বস্তিবোধ করছিলাম। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছিলাম না কারন এর আগে কখনো এরকম অভিজ্ঞতা আমার হয়নি। উনি কথা বলার অজুহাতে আমার পিঠে হাত দিচ্ছিলেন, আমি কিছু না বলে ওখান থেকে উঠে অন্য সিটে চলে গিয়েছিলাম। ওই বয়সে এরকম পরিস্থিতি ফেস করার মত মানসিকতা আমার ছিল না। বয়স্ক একজন লোকের এহেন আচরণে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এই ঘটনার ট্রমা কাটিয়ে উঠতে আমার বেশ সময় লেগেছিলো।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারীতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে – এক বছরে গণপরিবহনে ৫২টি ঘটনায় ৫৯ জন নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তবে প্রকৃত ঘটনা এরচেয়েও কয়েকগুন বেশি বলে ধারণা করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সড়ক পথে ৪৪টি, রেলপথে ৪টি ও নৌপথে  ৪টি যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৬ টি ধর্ষণ, ১২টি গণধর্ষণ, ৯টি ধর্ষণের চেষ্টা ও ১৫টি যৌন হয়রানির ঘটনা রয়েছে।

  • বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “১ বছরের এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র প্রতীকি চিত্র বহন করে। প্রকৃতপক্ষে ঘটনার ভয়াবহতা অনেক বেশি।”

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুসারে এসব ঘটনায় ৪৪টি মামলা দায়ের করা হয় যার পরিপ্রেক্ষিতে ৯৩ আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এছাড়াও গণপরিবহনে যৌন সহিংসতা কমাতে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সেগুলো হলো-

  • ১. গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
  • ২. চালক, হেলপার ও সুপারভাইজারের আলাদা আলাদা নেমপ্লেটসহ ইউনিফর্মের ব্যবস্থা করা।
  • ৩. চালক, হেলপার ও সুপারভাইজারের নিয়োগপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি নিয়ে ডাটাবেইজ তৈরি করা।
  • ৪. গাড়ির ভিতরে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের হটলাইন নাম্বার, ফোন নাম্বার ও গাড়ির নাম্বার সাটানোর ব্যবস্থা করা।
  • ৫. গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ানো।
  • ৬. বাস মিনিবাসে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন দরজার আসে পাশে রাখা।
  • ৭. গণপরিবহনে অস্বচ্ছ ও বিজ্ঞাপনে মোড়ানো কাচেঁর ব্যবহার বন্ধ করা।
  • ৮. গণপরিবহনে যৌন সহিংসতার মামলা, গ্রেফতার ও বিচার দ্রুত শেষ করা।

অপরদিকে ২০১৮ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক পরিচালিত ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে দেখানো হয়েছে- দেশে গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিক বা অন্যান্যভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। রাস্তা থেকে শুরু করে গণপরিবহনে ভ্রমণ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের হয়রানির ঘটনা ঘটে থাকে।

  • আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকা, বাসে অতিরিক্ত ভিড়, যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো না থাকা আর তদারকির অভাবকে যৌন হয়রানির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাসে এ গবেষণারটির জরিপে ৩৫৭ জন নারী অংশ নেন। আর গুণগত গবেষণায় ২৯ জন করে নারী ও পুরুষ অংশ নেন।

ঢাকার মতিঝিল, মহাখালী, বনানী, মিরপুর ও কল্যাণপুর, গাজীপুর ও সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের খাগান গ্রামের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, কর্মজীবী নারী ও গৃহিনী- যারা প্রতিনিয়ত গণপরিবহন ব্যবহার করেন তাদের নিয়ে এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এছাড়াও ২৯ জন পুরুষ যাত্রী, বাস, টেম্পো ও সিএনজিচালক ও চালকের সহকারীরও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

  • গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭৪ শতাংশ নারী বাস, টেম্পো বা সিএনজিতে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে টেম্পোতে যাতায়াতকারীরাই সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এছাড়াও পথচারী ২৬ শতাংশ নারী যৌন নিপীড়নের কথা বলেছেন। গবেষণায় অংশ নেওয়া বেশিরভাগ নারীই (৬৬ শতাংশ) জানিয়েছেন, তারা ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলে অধিকাংশই অর্থাৎ ৮১ শতাংশ নারীই নিশ্চুপ থাকেন।

এর মধ্যে ২০১৩ সাল থেকে পাবলিক বাসের চালক এবং তার সহযোগীদের দ্বারা চলন্ত বাসে মেয়ে যাত্রীদের গণধর্ষণ বা ধর্ষণের উদ্দেশে যৌন হয়রানীর ব্যাপারে অভিযোগ আসা শুরু হয়েছে। ভারতে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে চলন্ত পাবলিক বাসে একটি মেয়েকে গণধর্ষণ করার ফলে মেয়েটি মারা যান। ভারতের ঐ ভয়াবহ ঘটণার অনুকরণ (!) করে বাংলাদেশেও কিছু বাস চালক এবং তাদের সহকারীরা মেয়ে যাত্রীদের চলন্ত বাসে অথবা বাস থেকে তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় আটকিয়ে গণধর্ষণ করা শুরু করে দিয়েছে। এইসব বেশির ভাগ ঘটনাতে দেখা যাচ্ছে- ভিক্টিম মেয়েটি যদি রাতের কিংবা ভোরের যাত্রী হন, শেষের স্টপেজের যাত্রী হন তখন মেয়েটি বাসে উঠার পর দেখা যায় চালক এবং তার সহকারীরা আর অন্য কোন যাত্রীকে বাসে উঠতে দেয়না বা বাসে ত্রুটি আছে বলে আগেই অন্য যাত্রীদের নামিয়ে দেয় – এইভাবে এরা যে কোন নারীকে ধর্ষণের জন্য টার্গেট করে এবং টার্গেট নারীটি ছাড়া তারা বাস জনশূন্য করে ফেলে। আবার টার্গেট নারীটি যাতে বুঝতে না পারে যে বাসে তিনি একা – সেক্ষেত্রে কিছু কিছু ঘটনায় দেখা যায় তারা তাদের লোকজনদের যাত্রী সাজিয়ে বাসে বসিয়ে রাখে– যারা কিনা পরবর্তীতে মেয়েটির ধর্ষণকারী হয়ে আত্মপ্রকাশ করে।

অনুসন্ধান মতে বাংলাদেশে চলন্ত পাবলিক বাসে প্রথম গনধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া যায় ২০১৩ সালের ২৪শে জানুয়ারীতে। ঐদিন মানিকগঞ্জের ঢাকা-আরিচা হাইওয়েতে ‘শুভযাত্রা পরিবহন’ এ একজন নারী গার্মেন্টস কর্মীকে বাসের চালক এবং সহকারী ধর্ষণ করে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যায়। মেয়েটির কাছে বাসের ভাড়ার জন্য খুচরা টাকা ছিলনা- তাই তিনি ১০০০ টাকা দিয়েছিলেন । বাস সহকারী বলেছিল তাঁকে বাকী টাকা ফেরত দিবে। কিন্তু মাঝ রাস্তায় বাস নষ্ট এই কথা বলে তারা সব যাত্রীদের নামিয়ে দেয়- মেয়েটিকে তারা বাকী টাকা ফেরত দিবে বলে বাসে বসতে বলে। কিন্তু এরপর বাস চালু করে কিছুদূরে নিয়ে চলন্ত বাসে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে।এই ঘটনার পর পুলিশ বাস চালক এবং এর সহকারীকে গ্রেফতার করেছিল- কিন্তু এরপর কি হল জানা যায়নি ।

এরপর ধামরাইয়ে একজন নারী গার্মেন্টস কর্মী রাত ১০টায় তাঁর কাজ শেষে বাসায় ফেরার জন্য ‘যাত্রীসেবা’ নামে একটি লোকাল বাসে উঠলে বাসটি ধামরাইয়ের কালামপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে মেয়েটি ছাড়া সব যাত্রী বাস থেকে নেমে গেলে বাসের দরজা-জানালা বন্ধ করে ড্রাইভার সহ ৫ জন মেয়েটিকে চলন্ত বাসে গণধর্ষণ করে। মেয়েটির চিৎকার শুনে একটি পেট্রোল পাম্পের কর্মীরা ধামরাই থানা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের এলাকা থেকে ভুক্তভোগী মেয়েটিকে উদ্ধার করে এবং ৫ জনকে আটক করে।

২০১৬ সালের এপ্রিলেও একজন গার্মেন্টস কর্মী ’বিনিময়’ নামের লোকাল বাসে করে ভোর ৬টায় তাঁর আত্মীয়ের বাসা থেকে ফেরার পথে টাঙ্গাইল- ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলন্ত বাসে ৩ জন বাসের কর্মী দ্বারা গণধর্ষণের শিকার হন।

২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহে ‘ছোঁয়া’ বাসে যাওয়ার সময় রূপা খাতুন নামে একজন আইনের ছাত্রীকে বাসের চালক এবং এর সহকারীরা গণধর্ষণের পর হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় পঁচিশ মাইল এলাকায় বনে ফেলে রেখে যায়। এরপর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে রূপাকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলায় বাসের চালক এবং তিন সহকারীদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকার এর ডকুমেন্টেশন থেকে জানা গেছে যে ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ১০ জন নারীকে চলন্ত বাসের ভেতরে কিংবা বাস থেকে জোর করে নামিয়ে নিয়ে গণধর্ষণ করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে ২ জনকে হত্যাও করা হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশী বলেই ধারনা করছে অধিকার। রুপা খাতুন ছাড়া চলন্ত বাসে গণধর্ষণের কেউ বিচার পেয়েছেন কি না জানা যায়নি। সূত্র : মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ , বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি, দৈনিক সংবাদপত্র।

প্রতিবেদনটি করেছেন : পাবলিক ভয়েস নির্বাহী সম্পাদক ‘হাছিব আর রহমান’

মন্তব্য করুন