একজন পতিতা মা ও তার পিতৃপরিচয়হীন আদর্শ মেয়ে

প্রকাশিত: ৬:১৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১, ২০২০

নাজমুল হাসান
পাবলিক ভয়েস

শিরোনাম পড়েই চমকে উঠলেন না তো। একজন পতিতা মায়ের পিতৃ পরিচয়হীন কন্যাসন্তান কিভাবে আদর্শবান ও পবিত্র হতে পারে তাই ভাবছেন। সমাজে অহরহ এমন ঘটনার সাথে আমরা পরিচিত না। এদের মাঝে অনেকেই খারাপ লাইনে চলে যায়। ভালোর সংখ্যা খুব কম হয়। আসলে এমন নেতিবাচক ভাবনা আসাটাই স্বাভাবিক। আমাদের সমাজব্যবস্থা এমন নেতিবাচক কিছু ভাবতেই শিখিয়েছে। কারণ পতিতা মানেই খারাপ- এটাই আমরা মনে করি বা মেনে নিয়েছি।

একজন পতিতা, যিনি পতিতালয়ে রাতের পর রাত এই সমাজের মুখোশ পড়া শত শত পুরুষকে আনন্দ দিয়ে থাকে। যে পুরুষ পতিতালয়ে গিয়ে আনন্দঘন সময় কাটায় তাকে আমরা কখনোই চিনি না বা চেনার চেষ্টাও করি না। কিন্তু যে নারী পেটের দায়ে নিদারুন কষ্ট সহ্য করে বা এই নষ্ট সমাজের কবলে পড়ে পতিতাবৃত্তি করে যাচ্ছে তাকে আমরা বেশ্যা বলেই জানি।

ইন্টারনেট, বিভিন্ন ডকুমেন্টরি বা নাটক, সিনেমার মাধ্যমে আমরা অনেকেই পতিতালয়ের সাথে পরিচিত হই। আবার অনেকের বাস্তব অভিজ্ঞতাও থাকতে পারে। কারণ পতিতালয়গুলো দিনের পর দিন চলছে। সমাজের পুরুষরা দৈহিক শান্তির খোঁজে পতিতালয়ে যান। কিন্তু পতিতাদের জীবন সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেকেরই থাকে না।

বলছিলাম পতিতাবৃত্তি করা একজন মা ও তার পবিত্র  আদর্শবান মেয়ের জীবন কাহিনী সম্পর্কে। ফুটফুটে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন একজন পতিতা মা। তিনি একমাত্র মেয়েকে তিলে তিলে খুব যত্ন করে তাকে গড়ে তুলছেন। অথচ মেয়েটার বাবার পরিচয় নেই। আচ্ছা এই সমাজ কি মেয়েটাকে কোনভাবে মেনে নিবে, তার কোনো অবস্থান দিবে?

মেয়েটার চাল-চলন, রুপে-গুণে, ব্যবহারে কখনো মনে হবে না তার মা পতিতাবৃত্তি করে। মায়ের কলঙ্কের কালির দাগ এতটুকুও তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। সমাজের আর দশটা ভালো মেয়ের চরিত্রের মতো তার চরিত্রও উত্তম রুপে গড়ে তুলেছে। স্কুল ও মাদরাসা শিক্ষার পাশাপাশি নম্রতা, ভদ্রতা, নৈতিকতা, ধর্মীয় জ্ঞান, সামাজিকতা কোনোটারই অভাব নাই তার। অথচ সমাজে পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখেন। সমাজে কোনো কাজ করতে গেলে তাকে নিচু মনে থাকতে হয়। এটাই এই সমাজের বাস্তবতা।

মায়ের পাপের বোঝার ভার তাকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে আজীবন। এই সমাজব্যবস্থা তাকে ভালো পথে বের হওয়ার কোনো সুযোগ দিচ্ছে না। কেউ তার নিজের উত্তম চরিত্রের প্রতিদান না দিয়ে, তার মায়ের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে।

মেয়েটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। মায়ের থেকে দূরে, বহুদূরে আলাদা কোনো ভালো পরিবেশে বেড়ে উঠছে। মা তার সন্তানের ভবিষৎ চিন্তা করে তার জন্য সম্পদ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। মা জানেন তার সম্পদ না থাকলে এই সন্তানকে কেউ স্থান দেন কিনা তা সন্দেহাতীত।

মেয়েটির জীবেনের চলার পথে প্রত্যেকটা সময় তাকে নানারকম বঞ্চনার শিকার হতে হয়। নিজের পরিচয় আড়াল করে যদিও একক জীবন কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু পড়ালেখা, সমাজে চলতে গেলে অথবা একটা সময়ে মেয়েটাকে ধর্মীয় রীতি মেনে, সামাজিকতা রক্ষার জন্য অন্য কারো সাথে জীবন গড়তে হবে। সমাজের ভালো পরিবেশে বেড়ে ওঠা কেউ কি তাকে মেনে নিবে এটা তাকে ভাবতে হয়! বিয়ের পরে আর দশটা মেয়ের মত তারও পরিচয় দিতে হবে। অথচ সে জানেনা তার বাবা কে! কি পরিচয় দিবে সে? তার উত্তম চরিত্রের প্রতিদান কি কেউ দিবে?

সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই মা কে নষ্টা ও মেয়েকে অবৈধ সন্তান হিসেবেই ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু আমরা তাদের ভালো হওয়ার সুযোগ কতটুকু দেই?

একজন পতিতাবৃত্তি করা মা চাইলেও এই পথ ছেড়ে আসতে পারে না। আমাদের অনেকেরই ধারণা আছে এসব রাস্তায় যারা একবার যায়, তাদের ফিরে আসার সুযোগ খুব কম হয়। কারণ সমাজে ভালোর মুখোশ পড়া মানুষগুলোই তাদের ফিরে আসার কোনো সুযোগ দেয় না। এসব স্থানে নিজের রুপ আর গুনকে বিক্রি করেই টিকে থাকতে হয়। আর রুপ -গুণ তো চিরস্থায়ী নয়। একসময় যখন শেষ হয়ে আসে তখন নির্যাতন সহ্য করতে হয় নতুবা সমাজের বঞ্চনার শিকার হতে হয়।

লেখক: পাবলিক ভয়েসের সাব এডিটর

মন্তব্য করুন