কর্ণফুলী নদী : চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ

প্রকাশিত: ৭:৫০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০২০
চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলি নদী। এবিএম ইকবাল হায়দার

এবিএম ইকবাল হায়দার :

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ, বন্দর নগরী চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নদী। আর এ কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর এবং বৃহত্তর বাণিজ্যিক রাজধানী। এই বন্দরের মাধ্যমেই দেশের অধিকাংশ আমদানি-রপ্তানি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।

ভারতের মিজোরাম লুসাই পাহাড় থেকে নেমে সুদীর্ঘ ৩২০ কিলোমিটার পথ বয়ে কর্ণফুলী নদী মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। বাংলাদেশের অংশের প্রায় ১৬১ কিলোমিটার পথচলা এই নদীর দুই পাশে হাজারো বর্ণিল দৃশ্য চোখে পড়ে সকলেরই।

[আকাশ থেকে কর্নফুলী নদী ও ব্রিজ।]

ষোড়শ শতকের শুরুতে গৌড়ের সুলতান মাহমুদ শাহ’র আমলে পর্তুগীজ বণিকদের মাধ্যমে এ জনপদে ব্যবসা বাণিজ্য শুরু হয়।কর্ণফুলীর পাড়ে গড়ে ওঠা পোতাশ্রয় বা চট্টগ্রাম বন্দর বাণিজ্যে নতুনমাত্রা রূপ দেয়। পর্তুগীজদের পথ ধরে ইংরেজ,ওলন্দাজ, ফরাসিসহ প্রভৃতি দেশের বণিক শ্রেণী এ দেশের সাথে নৌপথে বাণিজ্য শুরু করেন। কালক্রমে চট্টগ্রাম হয়ে ওঠে বাণিজ্য নগরী।দেশের অর্থনীতিতে শুরু থেকেই কর্ণফুলী নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে। নদীর তীরে খাতুনগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামের ব্যবসায় গোড়াপত্তন ঘটে বলে জানান প্রবীণ ব্যবসায়ীরা। ভৌগোলিক অবস্থার কারনে কর্ণফুলী নদীর চাক্তাই খালকে ঘিরে বাণিজ্যের প্রসারতা ঘটে।

[চট্টগ্রামে বন্দরে ভেড়ার অপেক্ষায় অপেক্ষমান সারি সারি জাহাজ। ছবি : উইকিপিডিয়া।]

‌‌‌‌‍‍কর্ণফুলী নদীর নামের উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন কাহিনী প্রচলিত আছে। কথিত আছে আরাকানের এক রাজকন্যা চট্টগ্রামের এক আদিবাসী রাজপুত্রের প্রেমে পড়েন। এক জ্যােৎস্নাস্নাত রাতে তারা দুই জন এই নদীতে নৌভ্রমণ উপভোগ করছিলেন। নদীর পানিতে চাঁদের প্রতিফলন দেখার সময় রাজকন্যার কানে গোজাঁ একটি ফুল পানিতে পড়ে যায়। ফুলটি হারিয়ে কাতর রাজকন্যা সেটা উদ্ধারের জন্য পানিতে ঝাপিঁয়ে পড়েন। কিন্তু প্রবল স্রোতে রাজকন্যা ভেসে যান। তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। রাজপুত্র রাজকন্যাকে বাচাঁতে পানিতে লাফ দেন, কিন্তু তাতে সফল হয়নি। রাজকন্যা’র শোকে রাজপুত্র পানিতে ডুবে আত্মাহুতি দেন। এই করুণ কাহিনী থেকেই নদীটির নাম হয় ‘কর্ণফুলী’। তবে মধ্যযুগীয় পুঁথিতে নদীটিকে কাঁইচা খাল লিখা হয়েছে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় লিখেছেন “ওগো ও কর্ণফুলী, তোমার সলিলে পড়েছিল কবে কার কানফুল খুলি, তোমার স্রোতের উজান ঠেলিয়া কোন তরুণী, কে জানে সাম্পান নায়ে ফিরেছিল তার দয়িতের সন্ধানে “। কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ ১৯৬২ সালে রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘কর্ণফুলী’। এছাড়া চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ও লোকসংস্কৃতিতে এই নদীর প্রভাব অনেক । চট্টগ্রামের জনপ্রিয় আঞ্চলিক গান “ছোড ছোড ঢেউ তুলি পানিত ছোড ছোড ঢেউ তুলি লুসাই ফা-রত্তুন লামিয়ারে যারগই কর্ণফুলী “।

[কর্নফুলী নদীতে রাতের জেটি। ছবি : উইকিপিডিয়া ]

এছাড়াও কর্ণফুলী নদীর উপর বাঁধ দিয়ে রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় কাপ্তাই বাঁধ তৈরি করা হয় ১৯৬৪ খ্রীস্টাব্দে। এই বাঁধে সঞ্চিত পানি ব্যবহার করে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়। কর্ণফুলী নদীর উপর দিয়ে সংযোগ স্থাপন করেছেন দুটি উল্লেখযোগ্য সেতু শাহ আমানত সেতু ও কালুরঘাট সেতু। কর্ণফুলীর পাড়ে গড়ে ওঠেছে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বড় সার কারখানা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) ও চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড।

[চট্টগ্রাম বন্দর।]

সম্প্রতি কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত হচ্ছে কর্ণফুলী টানেল। চট্টগ্রামে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি এসেছিল ২০০৮ সালে। চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠের এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রতিশ্রুতি দেন। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এই টানেল নির্মাণে ব্যয় হবে ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। টানেল নির্মাণে কাজ করছে চীনের একটি নির্মাণ সংস্থা। অনুমান করা হচ্ছে ২০২২ সাল নাগাদ এই নিমার্ণ কাজ শেষ হবে।

[নির্মিতব্য কর্নফুলি টানেলের লে-আউট]

এতকিছু থাকার পরেও অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নদী এখনও শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে মারাত্মক দূষনের শিকার। নদীর পাড়ে ও আশেপাশে গড়ে ওঠা অসংখ্য অবৈধ বসতি এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে পড়ায় কর্ণফুলীর পানি মারাত্মক দূষিত হয়ে পড়ছে। বর্তমানে নদীর প্রায় ৩০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। এক সময় কর্ণফুলী নদীতে ডলফিন লাফালাফি করত এখন সেই ডলফিনের দেখা মেলে না।তাছাড়া কর্ণফুলী নদী আর নদী নেই খালে পরিনত হয়েছে। তাই চট্টগ্রামের হৃদ স্পন্দন কর্ণফুলী নদী রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে সংশ্লিষ্ট মহলকে।

লেকক : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থী এবিএম ইকবাল হায়দার।

এনএইচ/

মন্তব্য করুন