করোনায় কোন দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা?

প্রকাশিত: ৭:১৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০২০

এইচ আর ইমন
অতিথি লেখক

বাংলাদেশে গত মার্চ মাসের ৮ তারিখে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর ১৭ মার্চ বন্ধ করে দেওয়া হয় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কয়েক দফা ছুটি বাড়ানোর পর আবারও গত ২৯ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বৃদ্ধি করা হয়। তবে এই সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সম্ভাবনা কম।

করোনার কারণে এবার এসএসসির ফল প্রকাশে দেরি হয়। আটকে ছিল একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিও। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় ৯ আগস্ট থেকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। তবে ১ এপ্রিল এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো স্থগিত রয়েছে। এতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে ১২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী।

এদিকে এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, করোনা প্রকোপের শুরুর দিকে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গড়ে ৪০ শতাংশের কম শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস অংশগ্রহণ করে। প্রয়োজনীয় ডিভাইস না থাকা, ওয়াইফাই কিংবা ইন্টারনেট ডেটা প্যাক কেনার সামর্থ্য না থাকা, ক্লাস চলাকালীন সময়ে বাসায় বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা, কিংবা ডিভাইস-ইন্টারনেট-বিদ্যুৎ সব থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত নেটওয়ার্ক না পাওয়া ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা সংকটের দিকে।

বিশ্বের যেসব দেশে শিক্ষাখাতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করে আসছিলো এবং শিক্ষা কার্যক্রম অনেকটাই ক্যাম্পাসের পাশাপাশি অনলাইন নির্ভর করছিল। এতে বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতেও সেখানে পাঠদান সম্ভব হচ্ছে। অক্সফোর্ডসহ বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে কয়টা বিশ্ববিদ্যালয় সেই পথে আছে? এমনকি সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ো ভর্তি হওয়া ২০১৯-২০২০ সেশনের শিক্ষার্থীগণ পড়েছে বিপাকে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীগণ ভর্তি হয়ে মাত্র দু এক মাস ক্লাস পেয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯-২০ সেশনের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সুমাইয়া নিশাত জানান, তাদের দুই বা তিনটি ক্লাস হয়েছিল ক্যাম্পাস বন্ধের আগে। এখন অনলাইনে কিছু ক্লাস হলেও অনেক কোর্সের ক্লাস চালুই হয়নি। আবার অনেক সহপাঠী অনুপস্থিত অনলাইন ক্লাসে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ডিভাইসের না থাকায়।

অন্যদিকে করোনাকালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার অবস্থা সন্ধিহান। বিদ্যালয়গুলোতে তালা ঝুলছে দীর্ঘ প্রায় পাচঁ মাস যাবৎ। বাড়িতে পড়ানোর মতো কেউ নেই। অনলাইন তো নাগালের বাইরে। গ্রামে ছেলেমেয়েদের বড় অংশই মধ্যবিত্ত বা, গরিব পরিবারের। করোনাকালে অভাব বেড়েছে, ঠাঁই নড়েছে। গত মে মাসে ব্র্যাকের একটি জরিপ দেখা গেছে, ১৬ শতাংশ শিশু করোনাভাইরাসের আতঙ্কে ভূগছে।

এভাবে সরকারি প্রাথমিক স্কুলে পড়ুয়া প্রায় সোয়া কোটি শিশুর অনেকে লেখাপড়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। গত দুই দশকের শিক্ষার অর্জন হারাতে বসেছে।

সরকারি নির্দেশনা অনুসারে, প্রাথমিক বিদ্যালয় খুলবে সবার শেষে। সেগুলোর ছুটি সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত গড়াতে পারে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের পড়াশোনা মুখ থুবড়ে পড়ার ঝুঁকিটা আরও বড় হচ্ছে। অথচ সেটা ঠেকানোর ‍কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

তিন মাস পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শুধু সংসদ টিভি চ্যানেলে প্রচারিত ক্লাসের ভরসায় থেকেছে। গত ২৮ জুন সরকার জেলায় জেলায় শিক্ষকদের বলেছে মুঠোফোনে ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার তদারকি করতে।

বাসায় টিভি থাকলেও সম্প্রচারিত রেকর্ড করা ক্লাসগুলো গৎবাঁধা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মে মাসের জরিপটি দেশের ৮ বিভাগের ১৬ জেলায় করা। সেটার ফলাফলে দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ ছেলেমেয়ে টিভির ক্লাসে আগ্রহ পায় না।

দু-একটি জেলার শিক্ষা প্রশাসন ইউটিউব আর ফেসবুকে রেকর্ড করা ক্লাস তুলে দিচ্ছে। দেশজুড়ে শিক্ষকরাও তা করছেন। সরকারি কিছু বড় স্কুল অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে। তবে অনলাইনে দেখার সুযোগ-সামর্থ্য সবার নেই।

এখন বাংলাদেশ বেতার ও কমিউনিটি রেডিওতে ক্লাস প্রচারের তোড়জোড় চলছে। এ ছাড়া ‘এডুকেশন হেল্পলাইন’ খোলার জন্য শিক্ষকদের ডেটাবেইস তৈরি হচ্ছে। হেল্পলাইনে ফোন করে শিক্ষার্থী বিনা খরচে তার পছন্দের শিক্ষকের সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলতে পারবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ফসিউল্লাহ জানান, প্রাথমিকের ছেলেমেয়েরা ক্লাসের বাইরে পড়তে অভ্যস্ত নয়। তারপরও এসব করার উদ্দেশ্য, পড়ালেখার চর্চাটা যেন টিকে থাকে।

মুঠোফোনে তদারকির কর্মসূচিতে শিক্ষকেরা অভিভাবকের ফোনে কল দিয়ে সপ্তাহে একবার শিক্ষার্থীর পড়ার খোঁজ নেন। পড়া দেন আর টিভির ক্লাস দেখতে বলেন। তবে শিক্ষকেরা বলছেন, অনেক সময় ফোন বন্ধ থাকে। এমনিতেও সপ্তাহে এক দিনে কতটুকুই-বা হয়।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সেপ্টেম্বরে স্কুল খুলে দেয়ার প্রস্তুতি এবং নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।

তবে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হতে পারে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক,মাধ্যমিক এবং সবার শেষে প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা হবে। সবকিছু মিলে এখন দেখার বিষয় বাংলাদেশে সরকার কি যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সের চলা ভুল পথে চলতে যাচ্ছে নাকি শিক্ষামন্ত্রীর কথার সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে যাচ্ছে অনির্দিষ্টভাবে।

লেখক, শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আই.এ/

মন্তব্য করুন