বঙ্গবন্ধু : বাংলাদেশের স্থপতি ও সংগ্রামী চেতনার অমর কীর্তিমানব

প্রকাশিত: ১:৪৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০২০
বঙ্গবন্ধু : বাংলাদেশের স্থপতি ও সংগ্রামী চেতনার অমর কীর্তিমানব।

জিয়া আল হায়দার :

একজন শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আপোষহীন নেতৃত্বে একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন ৷ পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলে তিনি বারবার কারা নির্যাতিত হয়েছেন ৷ সোহরাওয়ার্দী , ভাসানীর রাজনৈতিক শীষ্য থেকে পর্যায়ক্রমে তিনি তৎকালীন গণসংগঠন আওয়ামীলীগের সভাপতি হন ৷ তিনি সত্যিকারের একজন সংগঠক হিসেবে গাঁও – গ্রামের মানুষের সাথে পরম মমতায় মিশে গিয়েছিলেন ৷ সোহরাওয়ার্দীর ব্রিফকেস হাতে তাকে নৌকায় চড়তে দেখা যায় ৷ পায়ে পায়ে কাঁচা পথে হেটেছেন  গণমুক্তির আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে ৷

  • শেখ মুজিব প্রায়ই  অতি ও অবমূল্যায়ণ এবং রাজনীতিকরণের শিকার হন৷ তাকে  নিয়ে দুটি চরমপন্থী  মেরুকরণ লক্ষ করা যায়৷ তার দল আওয়ামীলীগ তাকে সব দোষ ত্রুটির উর্ধ্বে এক স্বর্গদূত জ্ঞান করে থাকেন।  সর্বত্র সর্বদা কারনে  অকারনে মুজিববন্দনায় জনগণকে বিব্রত করেন ৷ মাসজুড়ে রাত্রিভর উচ্চশব্দে মাইক বাজিয়ে বিরামহীন ঘুম ও গুরুত্বপূর্ণ কাজে অনেকের ব্যাঘাত ঘটান। এটা তারা যতটা না মুজিবের ভালোবাসায় করেন তার চেয়ে বেশী দলীয় স্বার্থে এবং ব্যাক্তি স্বার্থে করে থাকেন ৷ অপর মেরুতে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি ও রাজনৈতিক জ্ঞানশূণ্য বহু মানুষ মুজিবের কৃতিত্ব ও চরিত্র হননে নানা অপবাদ অপসংবাদ বলে বেড়ান দ৷ তারা তাঁকে ভারতের দালাল, এমনকি তার পূর্বপুরুষের মুসলমানিত্ব নিয়েও প্রশ্ন  তোলেন ! স্বাধীনতার কেন্দ্রীয় নেতাকে ভারতের দালাল, ক্ষমতাকামী বলে অভিযুক্ত করতে চান।

মুজিব যদিও একটি দলের পদে ছিলেন৷ কিন্তু তিনি দলের চেয়ে মানুষের ভাবনা বেশী ভেবেছেন৷ মুজিবের একটা দল থাকলেও আদতে তিনি ছিলেন মানুষেরই৷ আজ আওয়ামীলীগ করেন বহুনেতা আছেন যারা আচরণে মুজিবের সম্পূর্ণ বিপরীত৷ আবার আওয়ামীলীগ করেন না; কিন্তু মুজিবের প্রতিবাদী ও নায্যকন্ঠ ধারন করেন, এমন লোকও আছে বিপুল৷ বরং আওয়ামীলীগকে বহুক্ষেত্রে এখন মুজিবের গণমুখি রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে  অবস্থান নিতে দেখা যায়৷ জোর করে ভোট নেয়া , নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতায় সরকারী ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তারা ভোট ও নির্বাচনকে একটা ছেলে খেলায় পরিণত করেছে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সরকার পরিবর্তনের  নাগরিক অধিকার খর্ব করে চলেছে তাদের আমলের প্রতিটি নির্বাচনে। কাজেই মুজিবের গণমুখী রাজনীতির শিক্ষা থেকে খোদ তার দলই এখন বহূদূরে বিচ্যূত হয়ে পড়েছে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় ,স্কুলের শিক্ষার্থীদের যুক্তিযুক্ত দাবী দমনে মারমূখি হতে দেখা যায় তাদের। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে হাতুড়িপেটায় মেতে উঠা কখনো মুজিব সৈনিকের কাজ হতে পারে না৷ অথচ নিপীড়ন,  বৈষম্য ও অনায্যতা টিকিয়ে রাখতে নয়;খতম করতে তিনি লড়েছিলেন । এখানে ইতিহাসের চোখে আমরা মুজিবকে দেখার ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে মূল্যায়ণের প্রয়াস করবো৷

জন্ম ও সংক্ষিপ্ত পারিবারিক পরিচয় :

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ততকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে। সে হিসাবে মাত্র ৫৪ বছর বেঁচেছিলেন তিনি। এর মধ্যে রাজনীতির জীবন ৩৫/৩৭ বছরের। এর মধ্যে কারাগারে কেটেছে মোটামুটি ১২/১৩ বছর। যদি ১৯৩৮ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তার সাক্ষাতের সময় থেকে রাজনীতির যাত্রা ধরা হয় তাহলেও ৩৭ বছর রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ফজিলেতুননেসা রেণুর সঙ্গে তার বিয়ে হয় ১৯৩৮ সালে, সে হিসাবে বিবাহিত জীবনও ৩৭ বছরের। তিন পুত্র- শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল এবং দুই কন্যা- শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

রাজনীতির হাতেখড়ি :

মিশনারি স্কুলে  নবম শ্রেণির পড়ার সময়ই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিলো৷ স্কুলে ছাত্রদের সভা ডাকা হয়। তৎকালীন এসডিও ১৪৪ ধারা জারি করে সেই সভা বন্ধ করে দেন। ছাত্ররা সমবেত হয়ে মসজিদে গিয়ে সভা করেন। শেখ মুজিব দাঁড়িয়ে কিছু কথা বলতেই  গ্রেফতার হন । এটা তার প্রথম গ্রেফতার।  গ্রেফতারের পর সেকেন্ড কোর্টে হাজির করে দু’ঘণ্টা আটক রাখা হয় তাকে। ছাত্রদের বিক্ষোভ ও চাপে শেষ পর্যন্ত কোর্ট থেকেই তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। তারপর  ১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন।

ছোটবেলা থেকেই প্রতিবাদী ও দেশপ্রেমী :

১৯৪০ সাল, অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ স্কুল পরিদর্শনে যান। পরিদর্শন শেষে বাংলোতে ফেরার পথে একদল ছাত্র তাদের পথ আগলে বলতে থাকে, বর্ষাকালে ছাত্রাবাসের ছাদ চুইয়ে পড়া পানিতে ছাত্রদের বিছানাপত্র নষ্ট হয় । ছাত্রাবাসটি মেরামতের দাবি জানায় তারা। প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক তার স্বেচ্ছাধীন তহবিল থেকে এক হাজার ২০০ টাকা মঞ্জুর করেন এবং ছাত্রাবাসটি মেরামত করার নির্দেশ দেন। এই ছাত্রদের নেতার পরবর্তি নাম হয় শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধিকার আন্দোলন ও বারবার কারাভোগ :

১৯৪২ সালে এন্ট্রান্স পাস করার পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমান নাম মাওলানা আজাদ কলেজ) আইন বিষয়ে ভর্তি হন তিনি। এই কলেজ থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি বেঙ্গল মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং বাঙালি মুসলিম নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে আসেন। একই সময়ে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৬ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। বঙ্গীয় মুসলিম লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী-হাসিম গ্রপের সাথে তিনি ছিলেন সক্রিয়ভাবে যুক্ত। এরপর তিনি ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের মহাসচিব নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ তাকে ফরিদপুর জেলার দায়িত্বে নিয়োজিত করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৪৮ সালে শেখ মুজিব ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার প্রতি কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে ১৯৪৯ সালের প্রথমদিকে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। তারপরই তিনি আবার গ্রেফতার হন। তাই তার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা জীবন আর সমাপ্ত হয়নি। ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি মুক্তি লাভ করেন শেখ মুজিব। এ বছরের ২৩ জুন, ঢাকার রোজ গার্ডেনে এক গোপন বৈঠকে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী-মুসলীম লীগ’ গঠিত হলো। একজন রাজবন্দি হিসেবে তখন তিনি ফরিদপুর জেলে অন্তরীণ ছিলেন। কারাবন্দি থেকেই শেখ মুজিব নির্বাচিত হলেন অন্যতম যুগ্ম-সম্পাদক পদে। ১৯৪৯ সালের জুলাই মাসে জেল থেকে বেরিয়েই শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অক্টোবরে আর্মানীটোলা থেকে এক বিশাল ভুখা মিছিল থেকেই গ্রেফতার হলেন মওলানা ভাসানী, শামসুল হক আর শেখ মুজিব।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভংগের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানান এবং মহিউদ্দিন আহমদকে সঙ্গে নিয়ে অনশন শুরু করেন।কারাগারে অনশনরত অবস্থায় স্বাস্থ্যের দ্রত অবনতি হওয়ায় ২৭ ফেব্রয়ারি শেখ মুজিবকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মওলানা ভাসানী স্বীয় ক্ষমতাবলে শেখ মুজিবকে আওয়ামী মুসলীম লীগের অস্থায়ী সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত করেন। ১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে দলের সভাপতি হবার আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ১ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এবছর প্রথম তিন মাসে শেখ মুজিব ৮ বার গ্রেফতার হন। এরপর ’৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬ দফা, স্বায়ত্তশাসনের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে, কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু কারারুদ্ধ হন। ’৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ৬ দফার পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন জানায় বাঙালি জাতি। এতে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের মর্যাদা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তান শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালির এই নির্বাচনে বিজয়কে মেনে নিতে পারে নি । সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে তারা গড়িমসি শুরু করে। ফলে  ’৭১-এর মার্চেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।

মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু :

তিনি চেয়েছেন মানুষের মুক্তি ও সুখ , শান্তি । চাইলে তিনি রাজার হালতে থাকতে পারতেন । কিন্তু শত প্রলোভনও তাঁকে লক্ষ্যভ্রষ্ট ও আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। তাঁর এই আপোসহীন সংগ্রাম ও অপরিসীম দেশাত্মবোধের জন্যই ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

স্বাধীনতার চূড়ান্ত ডাক :

১৭ মার্চ ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জের অজপাড়া গাঁ টুঙ্গিপাড়ার শেখ পরিবারে জন্ম নেয়া খোকা গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আত্মত্যাগ এবং জনগণের প্রতি মমত্ববোধের কারণে পরিণত বয়সে হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। রাজনৈতিক সংগ্রামবহুল জীবনের অধিকারী এই নেতা বিশ্ব ইতিহাসে ঠাঁই করে নেন স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস পরিক্রমায় গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হচ্ছে স্বাধীনতার সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। ইতিহাসের এই অং@শটিতে সর্বাধিক আলোচিত নাম হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশী বাঙালীর এক গৌরবময় দিন ১৯৭১ এর ৭ ই মার্চ ৷ এদিন রেসকোর্স ময়দানে এ জাতির মুক্তির মহাকাব্য আবৃত্তি হয়েছিলো ৷ কবিতার ছন্দময়তায়,নেতৃত্বের দৃঢ়তায়, ভরাট গলার দারাজ কন্ঠে বাতাসে গুঞ্জরিত হয়েছিলো – এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম ৷ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ৷

কুটনৈতিক সাফল্য :

শেখ মুজিবের রাজনীতিতে একটা ভারসাম্য ছিলো ৷ যুদ্ধপূর্ব, যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধোত্তর বাংলায় কখনো তিনি আধিপত্ববাদকে মেনে নেন নি । এজন্য সরকারী ক্ষমতায় না থাকলেও পূর্ব পাকিস্তান চলতো তার কথায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মনোনীত হন তিনি । দূরদর্শী কুটনৈতিক দক্ষতায় যুদ্ধকালে একদিকে ভারতের সামরিক বন্ধুত্ব লাভ করেন  সমান দক্ষতায় স্বাধীন স্বার্বভৌম  দেশ থেকে অতিদ্রুত মিত্রবাহিনীর প্রস্তানের ক্ষেত্রেও তিনি সক্ষম হন৷ প্রথম সাক্ষাতেই ইন্দ্রিরা গান্ধীকে তিনি সাহসিকতার সাথেই সরাসরি বলেন, “আপনার সৈন্য ফিরাচ্ছেন কবে? “আসাধারণ ব্যক্তিত্বময় সাহসী এ প্রশ্নের জবাবে ইন্দ্রিরা গান্ধীকে বলতে হলো,”আপনি যখন চাইবেন”। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের সাধারণ ক্ষমা করে জাতীয় বিভক্তি দূর করতে চেয়েছেন

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি :

বিবিসি রেডিও শ্রোতা জরিপে তাকে “হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি” বলে স্বীকৃত দেয় । ইউনেস্কো ৭ এ মার্চের ভাষণকে “বিশ্ব দালিলিক ঐতিহ্য” হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে ।

গোলাম আযমের দৃষ্টিতে :

  • মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় সাংগঠনিক বিরোধীতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম এক সাক্ষাৎকারে মুজিবের রাজনৈতিক কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিয়ে বলেছিলেন,  তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান৷ জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম প্রভাবশালী নেতা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী এক বক্তৃতায় বলেন, “স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান “

বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ড :

১৫ আগষ্ট ১৯৭৫। জাতির বিপ্লবী মহানায়ককে প্রতিবিপ্লবে জীবন দিতে হলো। এটা বিশ্বের কাছে একটা জাতীয় বেইমানী এবং অকৃতজ্ঞতা হিসেবে আমাদের কলংকিত করেছে। খুনের এবং লাশের রাজনীতির অন্ধকার যাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলো দেশকে ৷ একজন ডানপিঠের দুরন্ত খোকাকে যে জাতি বঙ্গবন্ধু বানিয়েছে তারাই তার রক্তে , তার আত্নত্যাগী পরিবারের রক্ত মেখে হাত রাঙিয়েছে , এটা ইতিহাসে নির্মমতার নৃশংসতার, পাশবিকতার এক কালো অধ্যায় রচনা করেছে ৷ এটা জাতীয় কলংক৷ মুজিব তারুণ্য কাটিয়েছেন মিছিলে, যৌবন কাটিয়েছেন জেলে, পরিবার সন্তানের সান্নিধ্যকে কুরবানি করেছেন মানুষের মুক্তি চিন্তায়৷ পরিণত বয়সে খুন হলেন  নিজ জাতির হাতে, যাদেরকে তিনি খুন করার স্বাধীনতা এনে দিলেন! তবুও জন্মই যার আজন্ম পাপ, জেল, জুলু্‌ মামলা, মিছিল, ভাষণ, এসব ছিলো যার প্রেমাষ্পদ তার জীবন কেড়ে নেয়াটা হয়তো তাঁর দিক থেকে আত্নত্যাগ, রাজনীতির এ্যঙ্গেল থেকে  রাগের, ক্ষোভের, স্বেচ্ছাচারিতার যে কোন একটা সত্য মিথ্যা যুক্তি দাড়  করানো  হয়তোবা সম্ভব।

[১৫আগস্ট নিহত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার। (ছবি : বাসস)]

কিন্তু  নববধূ, নিষ্পাপ শিশু, আমন্ত্রিত মেহমান হত্যার ঘটনা একটা পৈশাচিকতা, কাপুরুষতা । বিজয়ী শক্তি হিসেবে দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধকবলিত দেশ গঠনে যে পর্যাপ্ত নিবেদিত প্রাণ কর্মনিষ্ঠ কর্মী ও সহকারী  দরকার ছিলো তিনি হয়তো তা পান নি ৷উল্টো বিজয়ের নগদ পাওনা বুঝে নিতে তাঁর নাম ভাঙিয়ে অনেকের অনেক অনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির অভিযোগ থেকে গেছে ৷ তিনি এসব নিয়ন্ত্রনে বা প্রতিকারে নির্লিপ্ত ছিলেন এমন অভিযোগে অনেকের তার উপর অভিমান ও ক্ষোভও ছিলো হয়তো৷ তবে সেটা হত্যাকান্ড পর্যন্ত গড়ানোটা রাজনীতির স্বাভাবিক ধারা, আইন, ন্যায়নীতি , মানবতা ও নৈতিক মানদন্ডে আদৌ সমর্থণযোগ্য নয়।

পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ চিত্রায়িত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর কারণে। তাই বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতীয় ইতিহাসে নন্দিত এক মহাপুরুষ হয়ে ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলতে থাকবেন । তাকে দলীয় নেতা মনে করা বা বানানোর চেষ্টা এবং তাকে নিয়ে অতি রাজনীতি করাটা তার অবদান ও আত্মদানকে ম্লান করবে৷

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, বিতার্কিক ও বিশ্লেষক।

শেখ মুজিব : বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক

শোকাবহ ১৫ আগস্ট : বঙ্গবন্ধুসহ একটি জাতীয় পরিবার হারানোর দিন

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বাঙালি নারীর প্রেরণা : শেখ হাসিনা

‘মা’ ফজিলতুন্নেসা মুজিবের জন্য লেখা কন্যা শেখ হাসিনার চিঠি 

মন্তব্য করুন