ধ্বংশের মুখে বাংলাদেশের টেনিস খেলা : ব্যারিস্টার সুমন

ফেসবুক লাইভে টেনিসের দুর্দশা দেখালেন ব্যারিস্টার সুমন

প্রকাশিত: ৫:৪১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২০

হবিগঞ্জে ব্যারিস্টার সুমন ফুটবল অ্যাকাডেমির মাধ্যমে ফুটবল খেলার জন্য বেশ প্রশংসনীয় কাজ করে যাচ্ছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবি ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদু্ল হক সুমন। বাংলাদেশের ফুটবল খেলা বিষয়ে যথেষ্ট সমালোচনা করেও তিনি নিজস্ব উদ্যোগে ফুটবল টিম ও একাডেমি গঠন করার পর সম্প্রতি তিনি সরব হয়েছেন টেনিস খেলা নিয়েও।

সম্প্রতি ব্যারিস্টার সুমন শাহবাগের বাংলাদেশ জাতীয় টেনিস ফেডারেশনের মাঠে গিয়ে তিনি একটি ফেসবুক লাইভ করেছেন। লাইভে তিনি বলেছেন – আমি প্রতিদিন সুপ্রিমকোর্টে এই টেনিস ফেডারেশনের সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করি নিয়মিত। আজকে মনে হলো – এই ফেডারেশনের কী অবস্থা তা একটু দেখে যেতে।

  • তিনি বলেন – আজকে আমি টেনিস ফেডারেশনের এই মূল কেন্দ্রে এসে যা বুঝলাম তা হল বাংলাদেশ ফুটবলের বারোটা যেমন বাজানো হয়েছে তেমনিভাবে টেনিস খেলারও কোন অবস্থা রাখা হয়নি। অনেকটাই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে দেশের অন্যতম এই খেলাটি।

তিনি টেনিস ফেডারেশন এর বৃহৎ বৃহৎ চারটি মাঠ দেখিয়ে বলেন, কেউ কেউ বলছেন বিগত তিন বছর যাবত এই মাঠে কোন খেলা হয় না। এবং কেউ কেউ বলছেন এক বছর ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে এসব মাঠগুলো।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, জাতীয় টেনিস ফেডারেশন এর এই দৃষ্টিনন্দন মাঠগুলো এখন হয়েছে গাঁজাখোর এবং মাদকসেবীদের আড্ডাখানা। চাইলেই গাঁজাখোর ও মাদকসেবীরা এখানে এসে নির্বিঘ্নে মাদক সেবন করতে পারে। তিনি বলেন এভাবেই দেখে দেখে আমাদের দেশের খেলাধুলার মূল স্থানগুলোকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

  • তিনি বলেন, যেখানে এই টেনিস-এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে রিপ্রেজেন্ট করার কথা সেখানে যখন দেখা যায় এই স্থানে গাজাখোরদের আড্ডার ব্যবস্থা থাকে তখন বুঝে নেন যে আমরা কাদেরকে নেতা বানাচ্ছি এবং নেতারা কি করছেন এ দেশে।

ব্যারিস্টার সুমন বলেন আমি শুনে অবাক হয়েছি এই টেনিস ফেডারেশনের সভাপতি হলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। আমার দুঃখ লাগে উনার মত একজন সজ্জন ব্যক্তি এবং ভদ্রলোক মানুষ এমন একটি ফেডারেশনের সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও এই ফেডারেশনের এমন দুর্গতি কেন?

ব্যারিস্টার সুমন টেনিস খেলে দেশকে বিদেশের কাছে প্রতিনিধিত্ব করা কয়েকজনের সাথে কথা বলেন যারা অভিযোগ করে বলেছেন যে এই ফেডারেশন থেকে তারা কোন ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান না এবং তারা নির্দিষ্ট করে বলেন প্রায় এক বছর পর্যন্ত এই ফেডারেশনের এখানে কোন খেলাধুলা হয় না।

  • লাইভে তিনি আরও বলেন আমরা ফুটবল নিয়ে কাজ করছি এবং ক্রিকেট নিয়ে সারাদেশে কাজ হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ এবং দেশনেত্রী শেখ হাসিনার যে বাংলাদেশ এই বাংলাদেশের কোথাও টেনিস নিয়ে এই অবহেলা অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীও মেনে নেবেন না।

তিনি দাবি করে বলেন, আমি জানি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেনিস এর ব্যাপারে যথেষ্ট পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে কিন্তু যারা এসব জায়গার দায়িত্বে রয়েছে তারাই মূলত শেখ হাসিনাকে গিয়ে বোঝায় দেশ খুব ভালো চলছে। টেনিসের খুব উন্নতি হয়েছে। যারা গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেখানে বক্তব্য দেয় তারা প্রধানমন্ত্রীকে বোঝায় যাদের খুব ভালো চলছে কিন্তু বাস্তবতা আপনাদেরকে সরাসরি লাইভে এসে দেখালাম।

তাই টেনিসকে যদি বাঁচাতে চান আমি মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই আপনি যদি সভাপতি পদে থেকে থাকেন তাহলে আমার কথাকে সত্য না মিথ্যা যাচাই করে দেখুন। আপনি মন্ত্রি থাকা অবস্থায় যদি টেনিসের অবস্থা এই থাকে তাহলে আপনার মন্ত্রিত্ব না থাকলে তো আপনি কিছুই করতে পারবেন না। তিনি টেনিসের উন্নতির জন্য সবাইকে যার যার জায়গা থেকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

প্রসঙ্গত : ক্রিকেট ও ফুটবলের পরে বাংলাদেশের বড় যে কয়েকটি ফেডারেশন আছে তার মধ্যে টেনিস একটা। তবে তাদের কার্যক্রম কখনোই চোখে পড়ার মতো নয়। অনেকটা হতশ্রী অবস্থানে টেনিস ফেডারেশন।

এছাড়াও গত বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোর্শেদের বিরুদ্ধে এক নারী টেনিস প্লেয়ারকে যৌণ হয়রানির অভিযোগ এসেছে। যে অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে বহিস্কারের কথাও শোনা গেছে। এরপর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সচিব মোহাম্মদ মাসুদ করিমকে টেনিস ফেডারেশনের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

যৌণ হয়রানির বিষয়ে জানা যায় – যৌণ হয়রানির অভিযোগ করা ভুক্তভোগী ইমেইলে জানান,

‘সম্প্রতি আমি বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছি আইটিএফ জুনিয়র টুর্নামেন্ট খেলার জন্য। এই সময়ের মধ্যে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোরশেদের নারীদের প্রতি কুদৃষ্টি এবং যৌন হয়রানির বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। টুর্নামেন্টে প্রথম রাউন্ডে হারের পর ঢাকা ক্লাবে আমার হোটেলে এসেছিলেন গোলাম মোরশেদ। তার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে হোটেলের ডাইনিং রুমে আসতে হয়েছিল। সেখান থেকে তিনি আমাকে ফেডারেশনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বলেন। এ অনুষ্ঠানের পর আমি হোটেলে চলে যাই।

কিছুক্ষণ পর ফোনে মোরশেদ সাহেব বলেন, একটি ব্যাগ নিয়ে নামতে। তিনি আমাকে তার বাড়িতে থাকতে বলেন। আমি হোটেলে থাকা বেশি নিরাপদ মনে করি বলে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করি। তিনি আমাকে বলেন, আগে তার বাড়িতে যেতে এরপর থাকার বিষয় বিবেচনা করতে। আমি বিষয়টি ভালোমনেই নিয়েছিলাম।

আমি তার গাড়িতে উঠি। পেছনের সিটে আমি ও উনি ছিলাম। সামনের সিটে উনার ড্রাইভারের সঙ্গে একজন সহকারী ছিলেন। গাড়িতে তিনি আমাকে যৌন হয়রানির চেষ্টা করেন। এ ঘটনার পর অস্বস্তি বোধ করায় টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়াই। আমার বাবা খুলনা থাকা সত্ত্বেও আমি আর টুর্নামেন্টে খেলিনি। আমি গোলাম মোরশেদের শাস্তি চাই। উনার কারণে অনেক নারী টেনিস খেলোয়াড় অস্বস্তিতে পড়েন।’

যৌন হয়রানির এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গুলশান থানায় মামলা হয় বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোর্শেদের বিরুদ্ধে। মামলাটি করেন যৌন হয়রানির শিকার ১৬ বছরের ওই টেনিস খেলোয়াড়ের চাচা হীরা লাল। এ ঘটনার তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ওই খেলোয়াড় দেশ ছেড়েছেন।

ভুক্তভোগী ওই কিশোরীর চাচা হীরা লাল গুলশান থানায় করা এজাহারে অভিযোগ করেন, আইটিএফ জুনিয়র টেনিসে অংশ নিতে গত ২ নভেম্বর ঢাকায় এসেছিল আমার ভাতিজি। বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোর্শেদের মাধ্যমে ঢাকা ক্লাবের গেস্ট হাউজে উঠেছিল সে। গত ৪ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটের দিকে গোলাম মোর্শেদ আমার ভাতিজির কক্ষের সামনে এসে তাকে ডিনারের প্রস্তাব দেন। আমার অপ্রাপ্ত বয়স্ক ভাতিজি প্রস্তাবে রাজি হলে গোলাম মোর্শেদ তার গাড়িতে গুলশানের বাসায় নিয়ে মদ ও সিগারেটের অফার করেন। গাড়িতে বসে গোলাম মোর্শেদ আমার ভাতিজির শরীরের বাম পাশের উরুতে হাত দিয়ে তাকে শ্লীলতাহানি করে এবং অশ্লীল কথাবার্তা বলে।

পরে আমার ভাতিজিকে নিয়ে মোর্শেদ একটি কফিশপে যায়। কফি খাওয়ার পর আমার ভাতিজি তাকে ঢাকা ক্লাবে পৌঁছে দেয়ার অনুরোধ করলে কৌশলে গোলাম মোর্শেদ তাকে আবার বাসায় নিয়ে কুপ্রস্তাব দেয়। আমার ভাতিজি প্রতিবাদ ও চিল্লাচিল্লি করলে গোলাম মোর্শেদ একটি গাড়ি ভাড়া করে তাকে পৌঁছে দেয়। আমার ভাতিজি হতাশাগ্রস্ত হয়ে কাউকে না জানিয়ে ১৪ নভেম্বর আমেরিকা চলে যায়। আমার ভাই ও ভাতিজির সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানার পর এজাহার করি। সবকিছু জানতে সময় লাগায় এজাহার করতেও বিলম্ব হয়। এ বিষয়ে বিবাদীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে মর্জি হন।

আইটিএফ টুর্নামেন্টে খেলতে ৪ নভেম্বর বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আসেন ভুক্তভোগী ওই টেনিস খেলোয়াড়। ঢাকার টুর্নামেন্ট শেষে খুলনায় শেখ রাসেল আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ টেনিসে অংশ নেয়ার কথাও ছিল তার। কিন্তু এমন ঘটনার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মেয়েটি ওই টুর্নামেন্টে আর খেলতে চায়নি। রাজশাহীতে আরেকটি আইটিএফ টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়ে আতঙ্কে সেখান থেকে ফিরে আসে সে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন গুলশান থানার ডিউটি অফিসার এসআই সিনথিয়া। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মামলা হয়েছে। একমাত্র আসামি বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোর্শেদ। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১০ ধারায় মামলাটি করা হয়।

এমন আরও অনেক অনিয়মের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশন। এক কথায় বলতে গেলে ধ্বংশের মুখে আছে বাংলাদেশের অন্যতম এই ক্রিড়াঙ্গনটি। এছাড়াও ২০০৯ সালের পর অস্থায়ী কমিটি দিয়েই চলছে বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশন। কোনো পূর্ণাঙ্গগ কমিটি ঘোষিত হয়নি টেনিস ফেডারেশনে।

আরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন