বিশ্ব রাজনীতির জাতাঁকলে মুসলিমরা!

প্রকাশিত: ৯:৩৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২০

সালমান মাহমুদঃ বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতাসীন দেশগুলো মুসলিমদেরকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ক্ষমতাসীন দেশগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে এবং তাদের রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বলি হচ্ছেন নির্যাতিত মুসলিম দেশ ও জাতিগোষ্ঠীগুলো।

বেশ কয়েকদিন ধরে বিশ্বের ক্ষমতাধর দুইটি রাষ্ট্র আমেরিকা ও চীনের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে। পূর্বে চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক কিছুটা বন্ধুত্বসুলভ থাকলেও ট্রাম্প আসার পর থেকে সে সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে শত্রুতায় রুপ নিচ্ছে। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশই তাদের ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের ক্ষেত্রে বিশ্বে নির্যাতিত-নিপীড়িত মুসলমান ও তাদের ইস্যুগুলো হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

এ যেমন ইজরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটে ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে সরাসরি ইসরায়েলকে মদদ দিয়ে আসছেন, সেখানে সি জিনপিং সরকার বরাবরই ফিলিস্তিনকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলে যাচ্ছেন। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিলে সই করেছেন, যা এখন আইনে পরিণত হয়েছে। ওই আইনে তাঁকে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলমানদের ওপর চীন সরকারের নির্যাতন-নিপীড়ন চালানোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। এ আইনে উইঘুরদের উপর নির্যাতন চালানোর জন্য চীন সরকারের তীব্র নিন্দা করো হয়েছে এবং ”ভোকেশনাল এডুকেশন” নামের শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে চীনা কর্তৃপক্ষ উইঘুরদের মানবাধিকার যেভাবে কেডে নিচ্ছে, তা বন্ধ করতে বলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কয়কটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের তরুণ উইঘুর মুসলিমদেরকে একটি জেলখানার মতো জায়গায় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়, তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করতে দেয়া হয় না। তাদের উপর নির্যাতন করা হয়, এবং ধর্মীয় উপাসনা থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করা হয়। ট্রাম্পের এ আইনে দ্রুত এসব বন্ধ করতে বলা হয়েছে।

অথচ ট্রাম্প নিজেই কিনা ইসরায়েলের দ্বারা পরোক্ষভাবে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যায়ভাবে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড দখল করে মানবতাবিরোধী জঘন্য কাজে মদদ দিয়ে যাচ্ছেন। নিজ দেশ আমেরিকাতেও মুসলিম নাগরিকদের কোনঠাসা করে রেখেছেন। মুসলিমদের উপর নতুন নতুন আইন আরোপ করে তাদেরকে আইনের শিকলে আবদ্ধ করে রেখেছেন।

ট্রাম্পের সে আইনে চীন সরকারকে বিদেশে থাকা উইঘুর মুসলিমদের তাদের স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প নিজেই আমেরিকায় থাকা বহু মুসলিমদের তাদের স্বজনদের সাথে দেখা করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছেন। আর সে ট্রাম্প কিনা উইঘুর মুসলিমদের পক্ষে আইন পাশ করেছেন! তাঁর এ দুমুখো আচরণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, তাঁর এ উইঘুর নীতি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা এবং স্বার্থ হাসিলের কৌশল।

অন্যদিকে চীনা সরকার বরাবরই উইঘুরদের উপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সকল প্রকার অধিকার হরণ করছেন। আবার তারাও ফিলিস্তিনীদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার। গত মাসে আমেরিকার সাথে উত্তেজনার মধ্যে ট্রাম্পের উইঘুর নীতির পরপরই চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সাথে ফোনালাপ করেন। সেখানে তিনি ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি চীনের পক্ষ থেকে সমর্থন জানান এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ে ও তাদের ন্যায় বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে চীনের সুদৃঢ় ও স্বচ্ছ অবস্থান রয়েছে বলে জানান। সি জিন পিংয়ের এ দুমুখো নীতি থেকে এটা স্পষ্ট যে, ট্রাম্পের মতো তাঁরও এ সমর্থন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল এবং আমেরিকাকে টক্কর দেয়ার কৌশল। ট্রাম্পের উইঘুর নীতির পাল্টা জবাব দিতেই চীন এ কৌশল বেছে নিয়েছে।

আবার আমরা যদি ভারত পাকিস্তানের দিকে তাকাই, সেখানেও এ দুমুখো আচরণ স্পষ্ট। পাকিস্তান কাস্মীর, মিয়ানমার, ফিলিস্তিন এবং মধ্য প্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর অধিকার আদায়ে কিছুটা সোচ্চার হলেও চীন মিত্ররাষ্ট্র হওয়ায় উইঘুরের মুসলিমদের বিষয়ে বরাবরই চুপ রয়েছে। অনুরূপভাবে ভারতও আমেরিকা দাতারাষ্ট্র হওয়ার এবং ইজরায়েলের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখতে ফিলিস্তিন ও মধ্য প্রাচ্যের মুসলিমদের বিষয়ে বরাবরই চুপ থেকেছে। ইদানিং চীনের সাথে সম্পর্ক খারাপ যাওয়ায় এবং ট্রাম্পের উইঘুর নীতির সুবাদে তাঁরাও ট্রাম্পের সাথে সুর মিলিয়ে উইঘুর মুসলিমদের অধিকার নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে। চীনের সাথে সম্পর্ক খারাপ না হলে তারাও উইঘুর বিষয়ে চুপ থাকতো। অথচ নিজ দেশেই তারা মুসলমানদের নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে কোনঠাসা করে রেখেছে। কাশ্মীরের কথা না হয় বাদেই দিলাম। প্রতিবেশী মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ইস্যুতেও তারা বরাবরই নিরব থেকেছে।

এভাবে যদি আমরা দেখতে চাই, তাহলে দেখা যাবে, বিশ্বের ক্ষমতাসীন দেশগুলো কোনো না কোনভাবে মুসলিমদেরকে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এবং শত্রু রাষ্ট্রগুলোকে চাপে রাখতে মিত্র দেশের সংখ্যা বাড়াচ্ছে।

এক মধ্যপ্রচ্যের মুসলিম দেশগুলোর দিকে তাকালেই সেটা স্পষ্ট হয়ে যায়। বিশ্বের মোড়ল রাষ্ট্রগুলো তাদের নিয়ে কি রাজনীতিই না খেলতেছে। কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। কেউ আবার মিত্র রাষ্ট্রের কারণে পক্ষে-বিপক্ষে ভাগ হয়ে নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে যাচ্ছে। অর্থাৎ সবাই’ই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক ফায়দা হাসিলের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে নির্যাতিত মুসলিমদের। এমনকি মুসলিম রাষ্ট্র হয়েও স্বার্থের জন্য তারা তাদের মুসলিম ভাইদের সাহায্যে এগিয়ে আসছে না, বরং স্বার্থের লড়াইয়ে নীরবতা পালন করছে।

আর তাদের স্বার্থের দলাদলিতে পিষে মারা যাচ্ছে নির্যাতন-নিপীড়নের স্বীকার বেচারা মুসলিম জাতিগোষ্ঠীগুলো। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মুসলিম দেশগুলো। তাদের স্বার্থের দলাদলি থেকে কবে পরিত্রাণ পাবে মুসলিমরা? কবে আবার তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে? কবে আবার তারা নিজ জন্মভূমিতে স্বাধীনভাবে নিজ অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকবে?

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এমএম/পাবলিকভয়েস

মন্তব্য করুন