ইতিহাসের বাঁকে প্রিয় বাবরি মসজিদ : মনে রেখো আমাদের

প্রকাশিত: ১:৪২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০২০
ইতিহাসের বাঁকে প্রিয় বাবরি মসজিদ : মনে রেখো আমাদের

ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য এক দরদনাখ দিন ছিলো ৫ আগষ্ট। এই দিনে এ উপমহাদেশে নতুন এক ইতিহাসের মোড় তৈরি হয়েছে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদকে তথাকথিত রামমন্দিরে রূপান্তরিত করার প্রাথমিক দৃশ্যমান পদক্ষেপের মাধ্যমে।

বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মানের জন্য রুপোর ইট দিয়ে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে গুজরাটের কসাইখ্যাত নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে – ‘এ বিষয়টি বলতে গেলেই একজন মুসলমান হিসেবে লজ্জায় মাথা নুয়ে আসে’। কিন্তু অযোধ্যায় এ ঘটনাটাই ঘটেছে গতকাল। বাবরি মসজিদ সাময়িকের জন্য হলেও তাঁর পরিচয় হারিয়েছে। এ জায়গাটি এখন ‘রামমন্দির’ নামে চিনবে সবাই।

[ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ]

  • উগ্র হিন্দুদের হাতে বাবরি মসজিদের শাহাদাতের ২৮ বছর পর বিভিন্ন প্রহসন ও ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের জয়জয়কারের মধ্য দিয়ে বাবরি মসজিদ তার পরিচয় হারালো। যা মুসলমানদের হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে দিলো। একদিন এ ক্ষত অবশ্যই রিকভার হবে। বাবরি মসজিদ আমাদের মনে রাখবে, আমরাও বাবরি মসজিদকে মনে রাখবো – ইনশাআল্লাহ।

তবে বাবরি মসজিদের স্থানে রামমন্দির নির্মান সূচনার দুঃখজনক দিনে বাংলাদেশে তেমন কোনো কঠোর ও দৃশ্যমান প্রতিবাদ নজরে না আসাটা একটা বিস্ময়। আজ থেকে ২৮ বছর আগে যখন বাবরি মসজিদ শহীদ করে দেয়া হয়েছিল তখন বাবরি মসজিদ রক্ষার জন্য কঠোর আন্দোলনে নেমেছিলেন এদেশের ওলামায়ে কেরামসহ আপামর মুসলিম জনতা। শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহমতুল্লাহি আলাইহি, খতিব ওবায়দুল হক রহমতুল্লাহি আলাইহি, চরমোনাই মরহুম পীর সৈয়দ ফজলুল করিম রহমাতুল্লাহ আলাইহিসহ দেশের প্রথমসারির ওলামায়ে কেরামরা মিলে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলেন। এমনকি ভারত অভিমূখে বাবরি মসজিদ রক্ষার জন্য লংমার্চের ঘোষণা পর্যন্ত দিয়েছিলেন। কিন্তু ২৮ বছর পরে এসে যখন বাবরি মসজিদের নাম পুরোপুরি মুছে ফেলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলো তখন দু-একটি মিছিল প্রতিবাদ ছাড়া এদেশের মুসলমানরা সহ বিশ্ব মুসলমানদের কোন কড়া প্রতিবাদ নজরে আসেনি – বাবরি মসজিদ হয়ত এ বিষয়টিও মনে রাখবে।

বাবরি মসজিদের স্থানে মন্দির নির্মান মুসলমানদের হৃদয়ে কুঠারাঘাত : ইসলামী আন্দোলন

বাবরি মসজিদের স্থানে মন্দির নির্মানের কঠোর প্রতিবাদ খেলাফত আন্দোলনের

এই মনে রাখার মধ্য দিয়েই বাবরি মসজিদ বেঁচে থাকবে মুসলমানদের হৃদয়ে। তরতাজা থাকবে এ মসজিদের শাহাদাতের বেদনাবিদুর ইতিহাস। এই ক্ষতের উপরই নির্মিত হবে নতুন ইতিহাস। শোনা যাবে নতুন আজান।

বাবরি মসজিদ নিয়ে ভারতে হিন্দু-মুসলিম দূরত্বের ইতিহাস এ উপমহাদেশে অনেক পুরনো। উগ্র হিন্দুরা দাবি করেন – বাবরি মসজিদ একটি রামমন্দিরের উপর নির্মান করা হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এ কথার কোনো ভিত্তি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে পাওয়া যায় না। এমনকি উগ্র হিন্দুরা পুরো অযোধ্যা শহরকেই হিন্দুদের দেবতা রাম-এর ভূমি বলে আখ্যা দেয়। কিন্তু অযোধ্যা রাম-এর জন্মস্থান বলেও ঐতিহাসিকরা স্বীকৃতি দেন না। কিন্তু ভারতে হিন্দুদের মধ্যে উগ্র ও মুসলিম বিদ্ধেষী হিসেবে ব্যাপক পরিচিত দুটি সংঘ তথা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এই দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন এবং তারাই নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর এই মসজিদকে শহীদ করে দেন। রাজনৈতিকভাবে তাদেরকে সহায়তা করে ভারতে হিন্দুত্ববাদ ছড়ানো রাজনৈতিক দল বিজেপি। যে বিজেপির ক্ষমতামলেই ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংশ হয় ও বর্তমানেও যে বিজেপির নেতৃত্বেই বাবরি মসজিদের স্থানে রামমন্দির নির্মিত হওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

[সবুজের বুকে এক টুকরো আজানগাহ – ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ]

তবে আনুষ্ঠানিকভাবে রামমন্দির নির্মানের আগে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত থেকে এক প্রহসনের রায়ের মাধ্যমে ববারি মসজিদের জায়গা দখল করাকে আইনগতভাবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যে রায়কে কোনো মুসলমানই মেনে নেননি। এমনকি মেনে নেননি অনেক হিন্দুরাও। আদালতের রায় সম্পর্কে দেশটির সাবেক এক বিচারপতি অশোককুমার গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন – “গুন্ডামি করে মসজিদটা ভেঙে আদালত বলল ওখানে মন্দির হবে” তিনি বলেছিলেন – “এই রায়টা কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হল, সবটা ঠিক বুঝতে পারছি না। সুপ্রিম কোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সেই আদালত একটা রায় দিলে তাকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে পাচ্ছি না। চারশো-পাঁচশো বছর ধরে একটা মসজিদ একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। সেই মসজিদকে আজ থেকে ২৭ বছর আগে ভেঙে দেওয়া হল বর্বরদের মতো আক্রমণ চালিয়ে। আর আজ দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলল, ওখানে এ বার মন্দির হবে।”

গুন্ডামি করে মসজিদটা ভেঙে আদালত বলল ওখানে মন্দির হবে

তবে বিশ্ব মুসলমান এমন সময় বাবরি মসজিদকে রামমন্দিরে রূপান্তরিত হতে দেখলো যখন তাদের সামনে তুরস্কের আয়াসোফিয়া তাঁর মসজিদের হারানো গৌরব ফিরে পেয়েছে। দীর্ঘ ৮৬ বছর পর আয়াসোফিয়ায় সিজদা হয়েছে। নামাজ হয়েছে। এক মহাউদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসী দেখেছে একটি মসজিদ তার হারানো মর্যাদা ফিরে পাওয়ার দৃশ্য। বাবরি মসজিদও তাঁর হারানো গৌরব ফিরে পাবে এ আশা আমরা করতেই পারি। কারণ ইসলাম ধর্মমতে মসজিদের জায়গা চিরকাল মসজিদই থাকে। একদিন না একদিন এই বাবরি মসজিদগাহে সিজদা হবে। নতুন মিনারে আজান হবে। সেদিনে অপেক্ষায় আছে বিশ্বের শতকোটি মুসলমান।

পাঁচশ বছরের ইতিহাসের পাতায় বাবরি মসজিদ :

বাবরি মসজিদ ও রামমন্দির নিয়ে অযোধ্যার এই ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যায় – ১৫২৮ সালে মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মীর বাকি ভারি গম্ভুজ বিশিষ্ট অনিদ্যসুন্দর এই মসজিদটি তৈরি করেন। সম্রাট বাবরের নামনুসারে মসজিদটির নাম দেওয়া হয় ‘বাবরি মসজিদ’।

  • ১৫২৮ সাল থেকে নিয়ে ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত এই মসজিদ নিয়ে তেমন কোনো দৃশ্যমান বিবাদ চোখে পড়েনি পরবর্তিতে ১৮৫৩ সর্বপ্রথম এই মসজিদকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মত সহিংসতার ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়।

একই বছর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন দুই ধর্মের জন্য একই জায়গা আলাদা করার উদ্দেশ্যে বেষ্টনী তৈরি করে। বেষ্টনীর ভেতরের চত্বর মুসলিমদের জন্য এবং বাইরের চত্বর হিন্দুদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হয়।

এরপর ১৮৮৫ সালে মোহন্ত রঘুবীর দাস নামে অযোধ্যার এক পুরোহিত ও রামায়ণ বিশেষজ্ঞ দাবিদার বাবরি মসজিদের জায়গা রামমন্দিরের জন্মস্থান দাবি করে প্রথম মামলাটি করেন। ফৈজাবাদ কোর্টে মামলা করে তিনি জানান, বাবরি মসজিদের চত্বরের বাইরের চাবুতারায় (উঁচু বাঁধানো স্থান) রামচন্দ্রের জন্মস্থান। ইতিহাসের লম্বা গতিপথে সেখানে মোগল আক্রমণের সময়ে মসজিদ গড়ে উঠলেও আসলে এখানে মন্দির ছিল এক সময়ে। সেই স্থানটিতে তাঁরা মন্দির তৈরি করতে চান, কিন্তু ততকালীন সেক্রেটারি অব স্টেট (লর্ড উডহাউজ) তার দাবি পর্যবেক্ষণ করে কোনো সত্যতা না পেয়ে সেটি বাতিল করে দেন।

এরপর ১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর মসজিদের ভেতর হিন্দুদের ইশ্বর রামের পুরনো একটি মূর্তি রেখে দেয় হিন্দুরা। এই সময়েই মূলত তুঙ্গে ওঠে বিতর্ক। এমনিতেই তখন দেশভাগ, অন্তর্বর্তী সরকার ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে তুমুল সাম্প্রদায়িকতার ঝড় চলছিল। আর তাতে যেন অনুঘটক হয়ে দাঁড়ায় এ ঘটনা। বিভিন্ন স্থানের হিন্দু রামভক্তরা সম্পূর্ণ অন্যায্যভাবে এখানে মন্দির তৈরির দাবি করতে থাকেন। অন্যদিকে মুসলমানরা তাদের অধিকার মতে মসজিদ রক্ষার জন্য প্রতিবাদে সরব হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে গোটা চত্বরটা সিল করে ডিসপুটেড ল্যান্ড হিসাবে চিহ্নিত করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। সাথে সাথে সরকার ঐ চত্বরকে বিতর্কিত জায়গা বলে ঘোষণা দেয় এবং মসজিদের দরজা বন্ধ করে দেয়।

এরপর ১৯৫০ সালে ১৬ জানুয়ারি মন্দির পক্ষের নেতা গোপাল সিং বিশারদ ফৈজাবাদ কোর্টে একটি মামলা দায়ের করেন। বাবরি মসজিদ সংলগ্ন স্থানটিতে- যেখান থেকে মূর্তিটি উদ্ধার হয়েছে, সেখানে পুজোপাঠের অন্যায্য অনুমতি চাওয়া হয়। এবং সেই সঙ্গে মূর্তিটি যেখান থেকে পাওয়া গিয়েছে, সেখান থেকে যাতে সরানো না হয়, তার নির্দেশিকা দাবি করেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে সাময়িকভাবে জন্মস্থান থেকে মূর্তি সরানো যাবে না বলে নির্দেশ জারি করে ফৈজাবাদ আদালত। এলাহাবাদ আদালতেও তার পক্ষেই সায় দেওয়া হয়।

এরপর সেই বছরেরই এপ্রিলে উত্তরপ্রদেশের গোবিন্দবল্লভ পন্ট শাসিত কংগ্রেস সরকার আদালতের এই ইঞ্জাকশান তোলার জন্য মামলা করেন। অন্যদিকে ১৯৫০ সালের ডিসেম্বরে বিতর্কিত স্থানে পুজোপাঠ চলতে থাকার অনুমতি চেয়ে মামলা করেন রাম জন্মভূমি মন্দির ট্রাস্টের প্রধান পরমহংস রামচন্দ্র দাস। এই ট্রাস্ট আবার বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরবর্তিতে তাঁর দাবি মিথ্যা প্রমানিত হওয়ায় তিনি নিজেই আবার মামলা তুলে নেন।

এরপর ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে অখিল ভারতীয় আখড়া পরিষদের প্রধান নির্মোহী আখড়া আবার একটি মামলা করেন। সেখানে তিনি নিজেকে এই ভূমির আসল মালিক বলে দাবি করেন। এদিকে ১২ বছরে ধরে যদি কোনও জমি, সম্পত্তি অনধিকৃত ও বিতর্কিত হিসাবে গণ্য হয়, সেক্ষেত্রে তার আদি মালিকদের আর মালিকানা থাকে না। এর ফলে চিন্তিত হয়ে পড়েন উত্তরপ্রদেশের সুন্নি সেন্ট্রাল বোর্ড অব ওয়াকফ-এর সদস্যরা। তাই জমির দাবি বজায় রাখতে ১৯৬১ সালের ১৮ ডিসেম্বর, ১২ বছর হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগেই নড়েচড়ে বসেন তাঁরা। অযোধ্যার মুসলিম বাসিন্দাদের ডেকে এনে সকলে মিলে মসজিদের চত্বরটি দাড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন এবং হিন্দুদের মূর্তি সরানোর দাবি করতে থাকেন।

১৯৮৪ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) নেতৃত্বে ইশ্বর রামের জন্মস্থান উদ্ধার এবং তার সম্মানের একটি মন্দির প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে হিন্দুরা। তৎকালীন বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি (পরবর্তীতে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ঐ প্রচারণরা নেতৃত্ব নেন।

১৯৮৬ সালে জেলার বিচারক আদেশ দেন যেন বিতর্কিত মসজিদের দরজা উন্মুক্ত করে দিয়ে হিন্দুদের সেখানে উপাসনার সুযোগ দেয়া হয়। মুসলিমরা এর প্রতিবাদে বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটি গঠন করে।

এরপর ১৯৮৯ সালে বাবরি মসজিদ সংলগ্ন জায়গায় রাম মন্দিরের ভিত্তি স্থাপান করে নতুন প্রচারণা শুরু করে উগ্রবাদি সংগঠন ভিএইচপি। ভিএইচপি-র সহ-সভাপতি এবং এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি দেবকীনন্দন আগড়ওয়ালা এরপর আসরে নামেন। তিনি এবছর ১ জুলাই এলাহাবাদ আদালতের লখনউ বেঞ্চে মামলা করেন। সেখানে তিনি বলেন, ১৫২৫ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের স্থপতি ভারত আক্রমণ করেন। ১৫২৮ সালে বাবরের হানায় ধ্বংস হয় রামমন্দির। এরপর সেখানেই তৈরি হয় বাবরি মসজিদ। এই দাবির স্বপক্ষে তিনি ফাজিয়াবাদের জেলা গেজেটে তেমন কোনো স্ট্রং তথ্য না দিতে পারলেও একই বছর ১৪ অগস্ট জমিটিতে যেভাবে পুজো চলছে তা চালু রাখার নির্দেশ দেয় আদালত। এর পরেই রাজীব গান্ধী শাসিত কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সরকার ভিএইচপি-কে রামমন্দিরের শিলান্যাসের অনুমতি দেয়। পরবর্তিতে সেখানে প্রথমবারের মতো রামমন্দিরের প্রথম ইঁটটি স্থাপন করা হয়।

এরপর ১৯৯০ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ভিএইচপি’র কর্মীরা প্রথমবারের মতো বাবরি মসজিদে আক্রমন করে এবং মসজিদের আংশিক ক্ষতিসাধন করে। প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর আলোচনার মাধমে বিতর্ক সমাধানের চেষ্টা করলেও তা পরের বছর বিফল হয়।

পরবর্তিতে ১৯৯১ সালে অযোধ্যা যে রাজ্যে অবস্থিত, সেই উত্তর প্রদেশে ক্ষমতায় আসে উগ্রবাদী হিন্দুদের পৃষ্টপোষক দল বিজেপি।

  • এরপর ১৯৯২ সালে ভিএইচপি, বিজেপি এবং শিব সেনা পার্টির সমর্থকরা প্রশাসনের সামনে মুসলমানদের হৃদয়ে কঠোর আঘাত দিয়ে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদটি ধ্বংস করে দেয়। প্রতিবাদে সরব হয় ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরা। এর ফলে পুরো ভারতে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে হওয়া দাঙ্গায় ২ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। প্রতিবাদ, পাল্টা প্রতিবাদে জ্বলতে থাকে অযোধ্যা।

কেন এমনটা ঘটল তার তদারকি করতে বিচারপতি লিবেরহ্যানের অধীনে তৈরী হল বিশেষ কমিটি। রিপোর্ট দিতে বেঁধে দেওয়া হল ৩ মাসের সময়সীমা। এই সময়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে জারি হল রাষ্ট্রপতি শাসন। ভেঙে দেওয়া হয় কল্যাণ সিং শাসিত উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকার।

 

[শাহাদাতের পরও বাবরি মসজিদগাহে নামাজ পড়েছে মুসলমানরা।]

পরবর্তিতে ১৯৯৩ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতায় যখন কংগ্রেস তখন প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমারাও অযোধ্যার বিশেষ জমি অধিগ্রহণ অ্যাক্ট পাশ করেন। এর মাধ্যমে মসজিদের জমিটি সরকারি সম্পত্তি হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে পিটিশন জমা করেন ইসমাইল ফারুকিসহ বাবরি মসজিদ রক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়া মসজিদপন্থী নেতৃত্ববৃন্দ। তারা এই মসজিদের জায়গা সরকারের দখল নেওয়ারও বিরোধিতা করেন এরপর ১৯৯৪ সালে “ইসলাম ধর্ম পালনের জন্য মসজিদ অত্যাবশ্যক নয়। বিশ্বের যে কোনো স্থানে, এমনকি খোলা মাঠেই চাইলে নামাজ আদায় করা যায়” মর্মে একটি হাস্যকর রায় দেয় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এতে বলা হয়, “রাষ্ট্রের এই জমি অধিগ্রহণ করা সংবিধানবিরুদ্ধ নয়।” এর ফলে ৬৭.৭ একরের মধ্যে ২.৭৭ একরের বিতর্কিত জমিটুকু অধিগ্রহণ করে সরকার। এরপর ১৯৯৬ সালে এলাহাবাদ আদালতে এই মামলার বিভিন্ন সাক্ষীদের মৌখিক বিবৃতি নেওয়া শুরু হয়।

১৯৯৮ সালে ভারতে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির অধীনে জোট সরকার গঠন করে বিজেপি। যে কারণে উগ্রবাদী হিন্দুরা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ২০০১ সালের ৬ ডিসেম্বর মসজিদ ধ্বংসের বার্ষিকীতে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ঐ স্থানে আবারো মন্দির তৈরির দাবি তোলে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ভিএইচপি। আদালতে বিষয়টি নিয়ো আবারও জোড় কার্যক্রম শুরু হয়।

এর মধ্যে জানুয়ারি ২০০২ সালে নিজের কার্যালয়ে অযোধ্যা সেল তৈরি করেন প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি। সিনিয়র কর্মকর্তা শত্রুঘ্ন সিংকে নিয়োগ দেয়া হয় হিন্দু ও মুসলিম নেতাদের সাথে আলোচনার জন্য। পরবর্তিতে ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর প্রদেশের নির্বাচনের তফসিলে মন্দির তৈরির বিষয়টি বাদ দেয় বিজেপি। অপরদিকে ভিএইচপি ১৫ই মার্চের মধ্যে মন্দির নির্মানকাজ শুরু করার ঘোষণা দেয়। শত শত স্বেস্বচ্ছাসেবক সেখানে জড়ো হয়। এবং হিন্দু মুসলিমদের মাঝে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

এরপর একই বছরের মার্চ মাসে বাবরি মসজিদ বিতর্কের সূত্র ধরে গুজরাটে দাঙ্গা হয়। দাঙ্গায় ১ হাজার থেকে ২ হাজার মানুষ মারা যায়। যাদের বেশিরভাগই মুসলমান এবং সে দাঙ্গায় নেতৃত্ব দেয় গুজরাটের কসাই খ্যাত বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এরপর ওই বছরেরই এপ্রিল মাসে ধর্মীয়ভাবে পবিত্র হিসেবে বিবেচিত জায়গাটির মালিকানার দাবিদার কারা, তা নির্ধারণ করতে তিনজন হাইকোর্ট বিচারক শুনানি শুরু করেন।

এরপর ২০০৩ সালের জানুয়ারি মাসে এলাহাবাদ হাইকোর্টে বাবরি মসজিদ নিয়ে শুরু হয় শুনানি। সেখানে হিন্দুদের দাবিমাফিক আগে মন্দির ছিল কিনা তা খুঁড়ে দেখে যাচাই করার ভার দেওয়া হয় আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে। ২০০৩ সালে জুনে খননকাজ শুরু করার পরে হিন্দুদের দাবিকে সমর্থন জানায় আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার প্রত্নতত্ত্ববিদরা। তাঁরা জানান সেখানে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের প্রমাণ পেয়েছেন তারা। তবে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের রিপোর্টকে মিথ্যা বলে ঘোষণা করেন মসজিদ পক্ষ। সেই বছরেই ক্রমেই বাড়তে থাকে অশান্তি। পরিস্থিতি সামাল দিতে মার্চ মাসে বিতর্কিত জমিতে সকল ধর্মীয় কার্যকলাপ বন্ধ রাখার অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু হিন্দু অ্যাক্টিভিস্ট রামচন্দ্র পরমহংসের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি বলেন তিনি মৃত ব্যক্তির আশা পূরণ করবেন এবং অযোধ্যায় মন্দির তৈরি করবেন।

এরপর ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পেছনে উস্কানি দেয়ায় সাত জন হিন্দু নেতাকে বিচারের আওতায় আনা উচিত বলে রুল জারি করে একটি আদালত। এর মধ্যেও বিজেপি নেতা আদভানি জানান তার দল এখনও অযোধ্যায় মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তা ‘অবশ্যম্ভাবী।

পরবর্তিতে ২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে উত্তর প্রদেশের একটি আদালত রায় দেয় যে মসজিদ ধ্বংস করার সাথে সম্পৃক্ত না থাকার দাবি করে আদভানিকে রেহাই দিয়ে আদালতের জারি করা পূর্ববর্তী আদেশ পুনর্যাচাই করা উচিত।

এরপর বেশকিছুদিন বিষয়টি আদালতের নিয়ন্ত্রনাধীন থাকলেও ২০০৫ সালের জুলাই মাসে মসজিদ চত্বরে একটি বিস্ফোরক ভর্তি একটি জিপ দিয়ে হামলা চালিয়ে সেখানকার চত্বরের দেয়ালে গর্ত তৈরি করা হয়। যে হামলায় নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী’র হাতে নিহত হয় ছয়জন যাদেরকে কোনো অনুসন্ধান ছাড়াই মুসলিম সন্ত্রাসী বলে আখ্যায়িত করা হয়।

এর পর ২০০৯ সালের জুন মাসে মসজিদ ধ্বংস হওয়া সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে থাকা লিবারহান কমিশন তদন্ত শুরু করার ১৭ বছর পর প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। তখন প্রকাশিত লিবারহান কমিশনের প্রতিবেদনে মসজিদ ধ্বংসের পেছনে বিজেপি’র শীর্ষ রাজনীতিবিদদের ভূমিকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয় এবং এ নিয়ে সংসদে হট্টগোল হয়।

পরবর্তিতে সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দেয় যে স্থানটির নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগি করে দেয়া উচিত। কোর্টের রায় অনুযায়ী এক-তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের, এক-তৃতীয়াংশ হিন্দুদের এবং বাকি অংশ ‘নির্মোহী আখারা’ গোষ্ঠীর কাছে দেয়া উচিত। যেই অংশটি বিতর্কের কেন্দ্র অর্থাৎ যেখানে মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল, তার নিয়ন্ত্রণ দেয়া হয় হিন্দুদের কাছে। একজন মুসলিম আইনজীবী বলেন যে এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করবেন।

পরবর্তিতে ২০১১ সালের মে মাসের ৯ তারিখে ২০১০ সালের রায়ের বিরুদ্ধে হিন্দু ও মুসলিম দুই পক্ষই আপিল করায় হাইকোর্টের পূর্ববর্তী রায় বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট ।

এরপর ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিষয়টি সুপ্রিমকোর্টের নিয়ন্ত্রনে থাকে। পরবর্তিতে তারিখ বাই তারিখ আদালতে সংগঠিত বিভিন্ন প্রহসনের মাধ্যমে বাবরি মসজিদের জায়গা বেদখল হয় মুসলমানদের।

এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সালে বাবরি মসজিদের স্থানে স্থানে রাম মন্দির তৈরির অনুমতি চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। ২১ মার্চ, ২০১৭- প্রধান বিচারপতি জেএস খেহর যুযুধান পক্ষগুলোকে আদালতের বাইরে সমঝোতার প্রস্তাব দেন।

৭ আগস্ট- এলাহাবাদ হাইকোর্টের ১৯৯৪ সালের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে করা আবেদনের শুনানির জন্য তিন বিচারপতির বেঞ্চ গঠন করে সুপ্রিম কোর্ট। ৮ আগস্ট – উত্তর প্রদেশের শিয়া সেন্ট্রাল বোর্ড সুপ্রিম কোর্টে জানায়, বিতর্কিত স্থান থেকে কিছুটা দূরে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় মসজিদ বানানো যেতে পারে। ১১ সেপ্টেম্বর– সুপ্রিম কোর্ট এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নির্দেশ দেয়, বিতর্কিত জমির ব্যাপারে সদর্থক মধ্যস্থতার জন্য দু’জন অতিরিক্ত জেলা বিচারককে ১০ দিনের মধ্যে মনোনয়ন করতে হবে। ২০ নভেম্বর- উত্তর প্রদেশের সিয়া সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড সুপ্রিম কোর্টকে বলে, অযোধ্যায় মন্দির ও লখনউয়ে মসজিদ বানানো যেতে পারে। ডিসেম্বর- এলাহাবাদ হাইকোর্টে ২০১০ সালের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আবেদন করেন ৩২ জন নাগরিক অধিকার রক্ষা কর্মী।

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮- সুপ্রিম কোর্টে সমস্ত দেওয়ানি মামলার আবেদনের শুনানি শুরু হয়। ১৪ মার্চ- সুব্রহ্মণ্যম স্বামী-সহ সকল অন্তর্বর্তী আবেদন (যারা এই মামলার পক্ষ হতে চেয়েছিল) নাকচ করে সুপ্রিম কোর্ট।

৬ এপ্রিল- ১৯৯৪ সালের রায়ে যে পর্যবেক্ষণ ছিল তা বৃহত্তর বেঞ্চে পুনর্বিবেচনা করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানালেন রাজীব ধাওয়ান। ২০ জুলাই- সুপ্রিম কোর্ট রায়দান স্থগিত রাখে।

২৭ সেপ্টেম্বর- পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে মামলা নিয়ে যেতে অস্বীকার করে সুপ্রিম কোর্ট। জানানো হয়, ২৯ অক্টোবর থেকে মামলার শুনানি হবে নবগঠিত তিন বিচারপতির বেঞ্চে। ২৯ অক্টোবর- সুপ্রিম কোর্ট জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে যথাযথ বেঞ্চে মামলার শুনানি স্থির করে বলে ওই বেঞ্চই শুনানির দিন ধার্য করবে। ২৪ ডিসেম্বর- সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত নিল, এ সম্পর্কিত সমস্ত আবেদনের শুনানি হবে ৪ জানুয়ারি থেকে।

৪ জানুয়ারি, ২০১৯- সুপ্রিম কোর্ট জানায়, তাদের তৈরি করা যথোপযুক্ত বেঞ্চ মামলার শুনানির তারিখ ১০ জানুয়ারি স্থির করবে। ৮ জানুয়ারি- সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ ঘোষণা করে। শীর্ষে রাখা হয় প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈকে। এ ছাড়া বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন এস এ বোবদে, এনভি রামানা, ইউইউ ললিত এবং ডিওয়াই চন্দ্রচূড়।

১০জানুয়ারি- বিচারপতি ইউইউ ললিত নিজেকে মামলা থেকে সরিয়ে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে বলেন, ২৯ জানুয়ারি নতুন বেঞ্চের সামনে মামলার শুনানি শুরু করতে।

২৫ জানুয়ারি- সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ সদস্যের নতুন সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করে। নতুন বেঞ্চের সদস্যরা হলেন বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি এসএ বোবদে, ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ এবং এস এ নাজির। ২৯ জানুয়ারি- কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টে বিতর্কিত অংশ বাদ দিয়ে বাকি ৬৭ একর জমি তাদের আদত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেবার আবেদন জানায়। ২০ ফেব্রুয়ারি- সুপ্রিম কোর্ট জানায়, মামলার শুনানি শুরু হবে ২৬ জানুয়ারি থেকে।

২৬ ফেব্রুয়ারি- সুপ্রিম কোর্ট মধ্যস্থতার কথা বলে, আদালত নিযুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের কাজে লাগানো হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য ৫ মার্চ দিন স্থির হয়। ৬ মার্চ- জমি বিতর্ক মধ্যস্থতার মাধ্যমে মীমাংসা করা হবে কিনা সে সম্পর্কিত রায় দান মুলতুবি রাখে সুপ্রিম কোর্ট।

৯ এপ্রিল- নির্মোহী আখড়া কেন্দ্রের জমি ফেরানোর আবেদনের বিরোধিতা করে। ৯ মে- তিন সদস্যের মধ্যস্থতাকারী কমিটি সুপ্রিম কোর্টে তাদের অন্তর্বর্তী রিপোর্ট জমা দেয়। ১৮ জুলাই- সুপ্রিম কোর্ট মধ্যস্থতা চালিয়ে যেতে বলে, ১ অগাস্ট রিপোর্ট জমা দেওয়ার দিন ধার্য হয়। ১ আগস্ট– মধ্যস্থতা সংক্রান্ত রিপোর্ট বন্ধ খামে সুপ্রিম কোর্টে জমা পড়ে।

৬ আগস্ট– সুপ্রিম কোর্ট জমি মামলায় দৈনিক ভিত্তিতে শুনানির কথা জানায়। ১৬ অক্টোবর- সুপ্রিম কোর্টে শুনানি শেষ হয়, রায়দান মুলতুবি রাখা হয়।

  • ৯ নভেম্বর ২০১৯- অযোধ্যা মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মন্দির তৈরির পক্ষেই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে সেদিন সকাল সাড়ে দশটায়। পরবর্তিতে বিভিন্ন আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে হিন্দুত্ববাদী বিজেপিশাসিত ভারতের মোদি-অমিত শাহ্ নেতৃত্বাধীন সরকার অযোধ্যায় মুসলমানদের প্রিয় “বাবরি মসজিদ”কে সম্পূর্ণ অন্যায্য ও অন্যায়ভাবে রামমন্দিরে রূপান্তর করার প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন ২০২০ সালের ৫ আগষ্ট।

এই ধারাবাহিকতায়ই নতুন করে কোনো একদিন ইতিহাস লিপিবদ্ধ হবে –

  • ... এরপর এত তারিখে হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাত থেকে আইনগতভাবেই মুক্তি পেয়ে পূনরায় মসজিদের হারানো গৌরব ফিরে পেয়েছে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ। সেদিনের অপেক্ষায়…।

আদালতের রায় ও একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ : 

কিসের ভিত্তিতে আদালত এই বিতর্কিত রায় দিলো? : জানা যায় অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের নিচে ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় হাজারবার খুঁড়েও কোনো মন্দিরের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ওই এলাকায় বেশ কয়েকবার খোঁড়াখুঁড়ি চালানো হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রত্নতাত্ত্বিকই মন্দির পাননি।

এমনকি সর্বশেষ ভারতের প্রত্নতত্ব বিভাগ ‘দ্য আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’র (এআইএ) প্রত্নতাত্ত্বিক খননেও কোনো মন্দির মেলেনি। অথচ কেবল বিশ্বাসের ওপর ভর করে বির্তকিত সেই স্থানে মন্দির নির্মাণের নির্দেশনা দিয়ে রায় দিল ভারতের সুপ্রিমকোর্ট।

এদিকে এ রায় ঘোষণার পর যে নামটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন তিনি হলে কারিঙ্গামান্নু কুঝিয়ুল মুহাম্মদ। বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজনরা তাকে ‘কেকে’ নামে ডাকেন। তিনি একজন ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক। বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিতর্কিত ধর্মীয় স্থানে মন্দির বানানোর পক্ষে সুপ্রিমকোর্ট শনিবার যে রায় দিয়েছেন, তার পেছনে এই প্রত্নতাত্ত্বিকের দেয়া রিপোর্টটির বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল।

[কারিঙ্গামান্নু কুঝিয়ুল মুহাম্মদ।]

বিবিসি জানিয়েছে, কে কে মুহাম্মদের অধীনে করা ওই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিরা মেনে নেন যে, বাবরি মসজিদের স্থাপনার নিচে বহু পুরনো আরো একটি কাঠামোর ছিল। যে কাঠামো ‘ইসলামিক কাঠামো’ নয়। এ বিষয়ে কে কে মুহাম্মদের দাবি, বাবরি মসজিদের নিচে একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্ত্ব ছিল।

বস্তুত ওই রিপোর্টেই প্রথম স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছিল, বাবরি মসজিদ চত্ত্বরে মসজিদ প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্ত্ব ছিল। এদিকে কে কে মুহাম্মদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে তাকে তিরস্কৃত করছেন ভারতের মুসলিমরা। একজন মুসলমান হয়ে কী করে বাবরি মসজিদের নিচে মন্দির ছিল বলে যুক্তি দিয়ে গেছেন কে কে মুহাম্মদ, তা ভাবতেই পারছেন না ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। এমন রায়ের পর কে এই কারিঙ্গামান্নু কুঝিয়ুল মুহাম্মদ, সে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। বিবিসি জানিয়েছে, ভারতের কেরালা রাজ্যের কালিকটের বাসিন্দা তিনি। আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স করা প্রত্নতত্ত্ববিদ।

যদিও সেদিকে মোটেই পাত্তা দিচ্ছেন না কেকে মুহাম্মদ। বরং এই রায়ে তার রিপোর্টটিকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেয়ায় নিজেকে ধন্য মনে করছেন কে কে। একে জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ সম্মান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি। রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় কে কে মুহাম্মদ বলেছেন, ‘এটা একেবারে সঠিক বিচার। আমি মনে করি, এর চেয়ে ভালো রায় আর কিছুই হতে পারে না। এ রায়ের মধ্যে দিয়ে আমার দীর্ঘদিনের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও পরিশ্রমই স্বীকৃতি পেল।’

তবে কে কে মুহাম্মদের ওই প্রতিবেদনকে ভুল বলে দাবি করেছেন ভারতের অনেক বিশেষজ্ঞ। তাদের মধ্যে অন্যতম ইতিহাসবিদ আরফান হবিব। সেসব দাবি অনুযায়ী এটাই প্রমাণিত যে, বাবরি মসজিদের নিচে প্রাচীন কাঠামো থাকলেও তা হিন্দু ধর্মীয় কোনো মন্দির ছিল না।

[ইতিহাসবিদ আরফান হবিব।]

১৯৭৬ সালে বাবরি মসজিদকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হলে তখন র্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া প্রত্নতাত্ত্বিক খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে। সেই প্রত্নতাত্ত্বিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভারতের বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ড. বি বি লাল। তার অধীনেই একজন তরুণ গবেষক হিসেবে যোগ দেন এই কে কে মুহাম্মদ। ৪৩ বছর ধরে এই বিষয়ে গবেষণা করার পর উত্তর ভারতে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার আঞ্চলিক অধিকর্তা হিসেবে অবসর নেন কে কে মুহাম্মদ। এই সময়ের মধ্যে বাবরি মসজিদ নিয়ে যে রিপোর্টটি তৈরি হয় তার মূল প্রণেতা হলেন কে কে মুহাম্মদ। প্রত্নতত্ত্বে অবদানের জন্য চলতি বছর ভারত সরকার তাকে বেসামরিক খেতাব পদ্মশ্রীতে ভূষিত করেছে।

জানা গেছে, পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ ভারত সফরে গেলে তাকে আগ্রাসহ তাজমহল ঘুরিয়ে দেখানোর দায়িত্ব পড়েছিল কে কে মুহাম্মদের ওপর। এর পর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারত সফলে এলে তারও ‘ট্যুর গাইড’ ছিলেন তিনি।

কে দিয়েছেন রায়? অপরদিকে ঐতিহাসিক ও স্পর্শকাঁতর এই মামলার রায় দিয়েছেন একজন বিতর্কিত বিচারক। যিনি অনেক আগেই যৌন কেলেঙ্কারীর মত অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। ‘যৌন কেলেঙ্কারিতে ফেঁসেছেন ভারতের প্রধান বিচারপতি’ চলতি বছরের এপ্রিলে এমন শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়েছিল ভারতসহ আর্ন্তজাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে। আর সেই গুরুতর দোষে অভিযুক্ত বিচারপতি আর কেউ নন, বাবরি মসজিদের রায় ঘোষণাকারী বিচারপতি রঞ্জন গগৈ।

[নারী নির্যাতন কেলেংকারীতে অভিযুক্ত বিচারপতি রঞ্জন গগৈ।]

সে সময় উৎসব সিং বাইন্স নামের এক আইনজীবী রঞ্জন গগৈয়ের বিরুদ্ধে এই গুরুতর অভিযোগ আনেন। গত ২৫ এপ্রিল ভারতের সুপ্রিমকোর্টে এক হলফনামায় তিনি এই অভিযোগ করেন। রঞ্জন গগৈয়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ করেন সুপ্রিমকোর্টের ৩৫ বছর বয়সী এক সাবেক নারী কর্মী। তিনি প্রধান বিচারপতির বাড়ির অফিসে জুনিয়র কোর্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন। তার অভিযোগ, ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে গগৈ তাকে যৌন হেনস্তা করেছেন।

প্রতিবাদ করায় তাকে প্রথমে ওই অফিস থেকে সরিয়ে দেয়া হয়, পরে চাকরি থেকেও। এই অভিযোগ জানিয়ে ওই নারী সুপ্রিম কোর্টের ২২ জন বিচারপতির কাছে হলফনামা পেশ করেন। যৌন কেলেঙ্কারীর বিষয়টি অস্বীকার করে দেশের বিচার ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে স্বার্থ সিদ্ধির উদ্দেশ্যে বড় কোনো শক্তি এই চক্রান্ত করেছে বলে দাবি করেন বিচারপতি গগৈ। আর সেই বিচারকের কলমেই শনিবার ঘোষিত হলো হাইপ্রোফাইল বাবরি মসজিদ রায়।

কে এই বিচারপতি রঞ্জন গগৈ? ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের ৪৬তম প্রধান বিচারপতি তিনি। তবে বাবরি মসজিদের রায় দিয়েই অবসরে যাচ্ছেন এই বিচারপতি। আগামী ১৭ নভেম্বর অবসর নেবেন তিনি। রঞ্জন গগৈয়ের জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৮ নভেম্বর আসামের ডিব্রুগড়ে। তার বাবা কেশবচন্দ্র গগৈ ১৯৮২ সালে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হন।

দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক করেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন গগৈ। ১৯৭৮ সালে বার কাউন্সিলে যোগ দেন। ২০০১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই হাইকোর্টেরই স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে যোগ দেন। ২০১১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পঞ্জাব এবং হরিয়ানা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসাবে যোগ দেন। ২০১২ সালে তিনি সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি হিসাবে নিযুক্ত হন। তার ছয় বছর পর ২০১৮ সালে দীপক মিশ্র অবসর নেয়ার পর তিনি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হন।

তথ্যসূত্র : বিবিসি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস, বাবরি মসজিদ ও আমাদের কান্না।

ঘটনাপ্রবাহ : ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ থেকে বিতর্কিত রামমন্দির

আয়াসোফিয়ার মতো বায়তুল মুকাদ্দাস ও বাবরি মসজিদও পুনরুদ্ধার করা হবে: আল্লামা বাবুনগরী

আয়াসোফিয়ার মত বাবরি মসজিদও তার স্বরূপে ফিরে যাবে : মাসুদ আজহার

বাবরি মসজিদের স্থানে বিতর্কিত রামমন্দির স্থাপন শুরু করার আগে অমিত শাহ’সহ এক ডজন বিজেপি নেতা করোনা আক্রান্ত 

আরএসএস থেকে বিজেপি : হিন্দুত্ববাদের উত্থান ও বাংলাদেশে ইসলাম

ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ: কিছু প্রসঙ্গ কথা

অযোধ্যায় মসজিদ নির্মাণের ৫টি জায়গা চিহ্নিত

বাবরি মসজিদ ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আরও পড়ুন

বাবরি মসজিদ : শাহাদাতের ২৬ বছর

আমরা বাবরি মসজিদ ফেরত চাই: আসাদুদ্দিন ওয়াইসি

বাবরি মসজিদ মামলার রায় : যা বললেন মাহমুদ মাদানী

বাবরী মসজিদ রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দের

বাবরি মসজিদ মামলার রায় নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

বাবরি মসজিদ মামলার বিচারককে পুরস্কৃত করলো ভারত সরকার

বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের বিরুদ্ধে করা সব পিটিশন খারিজ

বাবরি মসজিদ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন ভারতের ৪৮ বুদ্ধিজীবী

বাবরি মসজিদের রায় নিয়ে পোস্ট করায় ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

বাবরি মসজিদের স্থানে মন্দির নির্মাণের রায় ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি : আল্লামা বাবুনগরী

বাবরি মসজিদ নিয়ে এই রায় মানবে না মুসলিম বিশ্ব: ইশা ছাত্র আন্দোলন

বাংলাদেশে হচ্ছে বাবরী মসজিদ 

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন