সিনহা হত্যা মামলা : ওসি প্রদীপসহ ৭ আসামি কারাগারে

প্রকাশিত: ৮:৩৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০২০

পুলিশের গুলিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহতের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ৭ আসামির জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মামলার বাকি দুই আসামি পলাতক রয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (০৬ আগস্ট) বিকেলে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন।

এর আগে আজ বিকেলে আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। এরপর আসামিদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়। তবে কোনো রিমান্ডের আবেদন করা হয়নি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক আসামিদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

কারাগারে পাঠানো আসামিরা হলেন টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ, টেকনাফের বাহারছড়া শামলাপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের প্রত্যাহার হওয়া পরিদর্শক লিয়াকত আলী, উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিত, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, পুলিশ কনস্টেবল সাফানুর রহমান, কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন।

আসামি এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা আত্মসমর্পণ করেননি বলে নিশ্চিত করেছেন আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) ফরিদুল আলম। তিনি আরো বলেন, ‘মামলার নয় আসামির সাত আসামি আত্মসমর্পণ করেন। এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মোস্তফা আত্মসমর্পণ করেননি। আদালত মামলার গুণাগুন পরীক্ষা করে এবং জামিনঅযোগ্য ধারা হওয়ার কারণে তাদেরকে জেল-হাজতে প্রেরণ করেছেন।’

‘আসামিরা আত্মসমর্পণ করেছেন এবং তারা জামিনের আবেদন করেছেন’, যোগ করেন পিপি।

টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে আজ চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে বিকেল ৫টার দিকে কক্সবাজারে নেওয়া হয়। আর লিয়াকতসহ অপর ছয় আসামিকে সোয়া ৪টার দিকে আদালতের হাজতখানায় এনে রাখা হয়। বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে সব আসামিকে কক্সবাজার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাসে তোলা হয়। পরে শুনানি শুরু হয়।

গত শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাত ৯টার দিকে টেকনাফের বাহারছড়ায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে মারা যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ খান। এ ঘটনা তদন্ত করতে প্রথমে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহা. শাজাহান আলিকে আহ্বায়ক করে গত ১ আগস্ট তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পরে একই দিন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সদস্য রেখে যুগ্মসচিব পদমর্যাদার চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

গতকাল দুপুরেই মেজর (অব.) সিনহা হত্যার বিচার চেয়ে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। মামলাটির শুনানিতে সন্তুষ্ট হয়ে তা ‘ট্রিট ফর এফআইআর ’ হিসেবে আমলে নিতে টেকনাফ থানাকে আদেশ দেন আদালতের বিচারক তামান্না ফারাহ। একইভাবে মামলাটি কক্সবাজার র্যা ব-১৫-কে তদন্তের দায়িত্ব দিয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মামলা অগ্রগতির প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফ থানায় মামলাটি (নম্বর সিআর : ৯৪/২০২০ইং/টেকনাফ) তালিকাভুক্ত করা হয়। দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ জামিন অযোগ্য ধারায় মামলাটি তালিকাভুক্ত করা হয়।

প্রদীপ কুমার দাশ আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম মহানগরীর দামপাড়ায় পুলিশ লাইন হাসপাতালে যান। সেখান থেকে তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেন পুলিশ সদস্যরা। এরপর কড়া পাহাড়া দিয়ে তাঁকে নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন পুলিশ সদস্যরা।

এদিকে হত্যা মামলা দায়েরের আগেই ওসি প্রদীপ স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে গত ৪ আগস্ট ছুটির আবেদন করেন। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এ বি এম মাসুদ হোসেন তাঁর ছুটির আবেদন গ্রহণ করেন বলে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাননি এসপি। মেডিকেল ছুটি নিয়েই ওসি প্রদীপ কক্সবাজার ছেড়েছেন। তাঁকেসহ মামলার আসামি নয় পুলিশ সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে কি না, জেলা পুলিশ নিশ্চিত করতে পারেনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মঙ্গলবার সকালে সিনহা রাশেদের মা নাসিমা আক্তারকে ফোন করে সমবেদনা ও সান্ত্বনা জানিয়েছেন। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তেরও আশ্বাস দিয়েছেন।

গতকাল দুপুরে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ কক্সবাজারে যান। তাঁরা কক্সবাজার সৈকতে অবস্থিত সেনাবাহিনীর রেস্টহাউস জলতরঙ্গতে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। পরে সেখানে তাঁরা যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। তাঁরা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদের নিহত হওয়াকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁরা বলেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে দূরত্ব নেই। আর এ ঘটনায় দুই বাহিনীর মধ্যে চিড় ধরবে না।

যৌথ ব্রিফিংয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ বলেন, আমরা একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই— এই ঘটনার সঙ্গে যে বা যারা জড়িত, ঘটনার দায় তাদেরই। এর দায় প্রতিষ্ঠানের হতে পারে না। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি যাদের দোষী সাব্যস্ত করবে, তাদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান কাউকে সহযোগিতাও করবে না, কারও বিপক্ষেও যাবে না। একাত্তরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী। স্বাধীনতার ৫০ বছরের ইতিহাসে দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতিতে দুই বাহিনী একযোগে কাজ করেছে। আমাদের মধ্যে পারস্পারিক আস্থা, বিশ্বাস ও সহায়তার সম্পর্ক অনেক বছরের। আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলছি, আমাদের এই সম্পর্ক অটুট থাকবে। এই সম্পর্কে চিড় ধরে— এমন কিছু সেনাবাহিনীর দিক থেকে হবে না, পুলিশ বাহিনীর দিক থেকেও হবে না।

জেনারেল আজিজ আরও বলেন, ঘটনাটি এখন তদন্তাধীন। আমরা সেটা নিয়ে মন্তব্য করব না। তবে আমরা আবারও বলছি, এই ঘটনা নিয় যেন কেউ সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্ক তৈরির বা দুই বাহিনীর সম্পর্কে চিড় ধরানোর প্রয়াস না চালায়, সে বিষয়ে আমরা সবাইকে অনুরোধ করব।

ব্রিফিংয়ে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ৫০ বছর ধরে আমরা দুই বাহিনী একসঙ্গে কাজ করে চলছি। দুইটি প্রতিষ্ঠানই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে আসছে। এই যে গত তিন মাস দেশ করোনা সংকটের মধ্যে রয়েছে, এই সময়েও আমরা একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও আস্থার। যে ঘটনাটি ঘটেছে, তাতে আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধার এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় সৃষ্টি করবে বলে আমরা মনে করি না। বরং আমাদের লক্ষ্য হবে তদন্ত কমিটি যে প্রভাবমুক্ত হয়ে তদন্ত করে। তারা অনুসন্ধানের পর যে পরামর্শ দেবে, তা অনুসরণ করে এ ধরনের ঘটনা যেন পরে না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে কাজ করব।

উসকানিতে দুই বাহিনীর সম্পর্কের অবনতি ঘটবে না জানিয়ে আইজিপি বলেন, অনেকেই এ ঘটনা নিয়ে উসকানিমূলক কথাবার্তা বলছেন। কিন্তু দুই বাহিনীই অত্যন্ত দক্ষ, চৌকষ ও পেশাদার বাহিনী। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এসব উসকানি দিয়ে কেউ সফল হতে পারবে না। যারা উসকানিমূলক কথাবার্তা বলে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছেন, তারা সফল হবেন না।

আইজিপি আরও বলেন, পাশাপাশি যারা উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের বলতে চাই— দেশের কল্যাণের জন্য, রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য, জনগণের অগ্রগতির জন্য দয়া করে দেশকে ভালোবাসুন, উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন না।###

এনএইচ/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন