ভারত সরকার কর্তৃক কাশ্মীরের স্বাধীনতা খর্ব করার এক বছর : কারফিউ জারি

প্রকাশিত: ১:৫৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০২০

২০১৯ সালের ৫ অগাস্ট জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে একপেশে ও হিন্দুত্ববাদী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মোদি-অমিত শাহ নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার।

ওইদিন সম্পূর্ণ অন্যায় ও অন্যায্যভাবে কাশ্মীর উপত্যকা থেকে ৩৭০ ধারা (Article 370) বাতিল করে সেটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

৩৭০ ধারা বাতিলের এক বছর পরও কাশ্মীরের চিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সারা বছরই কারফিউ এবং কাশ্মীরের জনগণের উপর নির্যাতন চালিয়ে গেছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার। এমনকি এই এক বছরে কাশ্মীরীদের উপর একাধিক গণহত্যার অভিযোগও রয়েছে বিজেপি শাষিত মোদি সরকারের উপর।

  • দেখতে দেখতে এই প্রহসনের সিদ্ধান্তের একবছর পূর্ণ হতে চললো কাল। এক বছর পরবর্তি এই সময়ে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রতি এই অন্যায্য কাজের কোনো প্রতিবাদ যেন না হতে পারে সেজন্য আজ অর্থাৎ ৪ অগাস্ট ও আগামিকাল অর্থাৎ ৫ অগাস্ট কাশ্মীরে কারফিউ (Curfew) জারি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হিন্দুত্ববাদী প্রশাসন।

কাশ্মীরের জন্য কালো দিবস হিসাবে গৃহিত এই দিনটি যাতে কেউ পালন না করতে পারে সে জন্যই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ৩৭০ ধারা বাতিলের আগেই কাশ্মীরজুড়ে বিপুল সেনা নিয়োগ করেছিল ভারত। সাধারণ মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারেননি। সবাই অনেকটা অনুভব করতে পেরেছিল যে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। সেইসময় অন্যায়ভাবে কাশ্মীরের প্রায় সব জনপ্রিয় রাজনীতিবীদদের গ্রেফতার করা হয়। চলতি বছরে সাবেক দুই মুখ্যমন্ত্রী মুক্তি পেলেও এখনো জেলে বন্দি রয়েছেন মেহবুবা মুফতিসহ অন্যান্য রাজনীতিবীদরা।

বিতর্কিত রামমন্দির স্থাপনের আগে অমিত শাহসহ এক ডজন বিজেপি নেতার করোনা

প্রসঙ্গত : গত বছরের ৫ আগষ্ট সোমবার ভারতের সংসদে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিরোধীদের তুমুল বাধা ও বাগ-বিতণ্ডার মধ্যে  ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়ার আইনটি বাতিল ঘোষণা করেছে।

অথচ এই অনুচ্ছেদের আলোকে হওয়া চুক্তিতেই জম্মু কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো। ফলে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর পেতো বাড়তি সুবিধা। কেন্দ্রীয় কোনো আইন প্রয়োগ করতে হলেও রাজ্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হতো।

এই ৩৭০ অনুচ্ছেদের সুবাদেই কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারাই শুধুমাত্র সেখানে বৈধভাবে জমি কিনতে পারতেন, সরকারি চাকরি করার সুযোগ পেতেন এবং সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। ঐ অনুচ্ছেদ বাতিল করে বিজেপির তাদের পুরনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করলো।

কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি তখন টুইট করেছেন যে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে ভারতকে ঐ রাজ্যের দখলদার বাহিনী হিসেবে প্রমাণ করেছে। ভারত এবং কাশ্মীর দুই দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীর রাজ্যের পুরো অংশের নিয়ন্ত্রণ দাবি করে, তবে উভয় দেশই সেখানকার অংশবিশেষ নিয়ন্ত্রণ করে।

জম্মু কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা কী ও কেন?

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অঙ্গ ছিল না৷ ছিল মহারাজা হরি সিং-এর স্বাধীন রাজতন্ত্র৷ কিন্তু ১৯৪৭ সালের ২২শে অক্টোবর কিছু পার্বত্য দস্যুরা কাশ্মীর আক্রমণ করলে, রাজা হরি সিং ভারতের কাছে সেনা সাহায্য চান ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন’, অর্থাৎ ভারতভুক্তির শর্তে৷ তাতে জম্মু-কাশ্মীরকে ৩৭০ নং ধারা অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসনের বিশেষ মর্যাদা দেবার সংস্থান রাখা হয়৷ সে সময়ে বিনা পারমিটে কাশ্মীরে কেউ প্রবেশ করতে পারতো না৷

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীর একটি ব্যতিক্রমী রাজ্য – কারণ প্রতিরক্ষা-পররাষ্ট্র বা যোগাযোগের মতো কয়েকটি বিষয় ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে সেখানে ভারতের কোনও আইন প্রয়োগ করতে গেলে রাজ্য সরকারের সম্মতিও জরুরি। নাগরিকত্ব, সম্পত্তির মালিকানা বা মৌলিক অধিকারের প্রশ্নেও এই রাজ্যের বাসিন্দারা বাকি দেশের তুলনায় বাড়তি কিছু সুবিধা ভোগ করেন, আর ৩৭০ ধারাই তাদের সে অধিকার দিয়েছে। ৩৭০ ধারার ভিত্তি নিহিত আছে ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের সংযুক্তিকরণের ইতিহাস।

৩৭০ নং ধারা কি রদ করা যায়?

ভারতীয় সংবিধানে কাশ্মীর সংক্রান্ত ৩৭০ নং ধারা রদ করার প্রক্রিয়া সহজ নয়৷ সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা আছে সংসদের৷ রাষ্ট্রপতি বিজ্ঞপ্তি জারি করে তা সংশোধন করতে পারেন৷ অবশ্য তা রাজ্যের গণপরিষদের অনুমোদন সাপেক্ষে৷ এছাড়া এটা কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি, তাই তা সংশোধন করা অসম্ভব।

ঐ ধারা রদ করতে হলে প্রথমে সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভা এবং উচ্চকক্ষ রাজ্যসভা – উভয় সভাতেই রদ করা সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস করাতে হবে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায়৷ তারপর সেই প্রস্তাবটিকে অনুমোদন পেতে হবে জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে, যেটা কার্যত অসম্ভব৷

৩৭০ নং ধারা রদ করা হলে জম্মু-কাশ্মীর আর ভারতের অঙ্গ হয়ে থাকবে না৷ কেন না, ভারত্যের সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরের সাংবিধানিক সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে ঐ ৩৭০ নং ধারার ওপর৷

ভারতে সংবিধানের যে ৩৭০ ধারা জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে বিশেষ সুবিধা ও অধিকার দেয়, তা নিয়ে ভারতে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশের নতুন বিজেপি সরকার এই ৩৭০ ধারা নিয়ে বিতর্ক শুরুর প্রস্তাব দেওয়ার পর কাশ্মীরি নেতারা তার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। ওমর আবদুল্লা এবং মেহবুবা মুফতি বিজেপি-র এই উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করলেও বিজেপি-র অভিভাবক বলে পরিচিত সঙ্ঘ পরিবার কিন্তু এই প্রশ্নে দলকেই সমর্থন করছে।

বিজেপি বরাবরই এই ধারা বিলোপের পক্ষে, তবে সংবিধান সংশোধনের মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যা না থাকায় আগে কখনওই তারা সেই উদ্যোগ নিয়ে এগোতে পারেনি। কিন্তু এখন নরেন্দ্র মোদীর জোট সরকার লোকসভায় অন্তত দুই তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার বেশ কাছাকাছি, আর সরকারের প্রথম দিনেই ৩৭০ ধারা নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন সরাসরি মোদীর অধীনে কাজ করা প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং।

জম্মুর উধমপুর থেকে জিতে আসা এই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর যুক্তি হল, ‘‘৩৭০ ধারায় রাজ্যের লাভ হয়েছে না লোকসান, তা নিয়ে আলোচনা তো হতেই পারে, লোককে বোঝানো যেতেই পারে।’’ তিনি আরও বলেছেন, ‘‘এখন একটা মনস্তাত্ত্বিক ধোঁয়াশা তৈরি করে রাখা হয়েছে – ৩৭০ উঠে গেলে যেন সর্বনাশ হয়ে যাবে। আরে আমরা পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষকে বোঝাই না-কেন বাস্তবতাটা কী।’’

খোদ প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এ কথা বলার পরই তীব্র প্রতিবাদ জানান ওমর আবদুল্লা। তিনি বলেন এই ধারা বিলোপ করার অর্থ হবে কাশ্মীরকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। জিতেন্দ্র সিংয়ের মন্তব্যকে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে বর্ণনা করেন পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতিও। পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে কিছুদিন আগে তার দলের কোর গ্রুপের জরুরি বৈঠকও ডাকেন ওমর আবদুল্লাহ।

সেই বৈঠকের শেষে তিনি বলেন, ‘‘কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি বা গণপরিষদ নতুন করে না বসলে এই ধারা বিলোপ করা সম্ভব নয় – কারণ তারাই এই অধিকার আমাদের দিয়েছে। নতুন করে এই প্রশ্ন খুঁচিয়ে তুলতে চাইলে বেশ তো, গণপরিষদ ডাকুন – আমরা কথা বলব। তবে এতে কাশ্মীরিদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত হবে না, তাদের আরও দূরে ঠেলে দেওয়া হবে।’’

মন্তব্য করুন