আমি একজন বাবা!

মাহিন মাহিন

মুহসিন

প্রকাশিত: ১২:১৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১, ২০২০

গতকাল রাতে খালামণি নিয়ে ঈদের মার্কেট করতে গিয়েছিলাম।

অনেকের জন্য কেনাকাটা করলাম। বউয়ের জন্য কিছু নিতে ভুলিনি অবশ্য হুজুরের জন্য আরও আগেই মার্কেট করেছিলাম। খালামণি কিছু টাকা দিলেন হুজুরের জন্য কিছু কিনতে।

মোবাইলে লাউডস্পিকার ছিল যারদরুন তার কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। একটা মেয়ে তাকে বলছে বাবা তুমি বাড়ি আসবে না ? বাবা আমার কিছু লাগবে না তুমি পারলে সুমাইয়াকে একটা জামা কিনে দিও আর তা না পারলে লাগবে না। বাবা আমার কিছু লাগবে না। মেয়েটির কথা আর লোকটির গঠোন দেখে মনে হচ্ছিল তিনি পেশাদার রিকশা চালক নন।

যখন মার্কেট করে ফিরে আসবো তখন এক রিকশাতে উঠলাম রিকশাওলা আমাদের নিয়ে যখন আসতে ছিলেন তখন আমরা কথা বলছিলাম, আমাদের মার্কেট নিয়ে খালামণি আমাকে বললেন। বাহ তোর চয়েস আছে দেখি। তুই তো অনেক সুন্দর জিনিষ কিনতে পারিস।

রিকশাওলা তখন আমাদের কথা শুনছিলেন। এক পর্যায় উনার ফোনে কল আসলো উনার বড় মেয়ে কল দিছে।

কল রিসিভ করার একটু পর দেখি কাকা আর রিকশা চালাতে পারছেন না। হাত পা কাপছে। তখন আমি বললাম কাকা রিকশাটা একটু থামান। কথা বলে শেষ করুন।

তাকে দেখে বুজলাম তার বয়স বেশি না বড়জোর ৪০-৪২ হবে।

মোবাইলে লাউডস্পিকার ছিল যারদরুন তার কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। একটা মেয়ে তাকে বলছে বাবা তুমি বাড়ি আসবে না ? বাবা আমার কিছু লাগবে না তুমি পারলে সুমাইয়াকে একটা জামা কিনে দিও আর তা না পারলে লাগবে না। বাবা আমার কিছু লাগবে না। মেয়েটির কথা আর লোকটির গঠোন দেখে মনে হচ্ছিল তিনি পেশাদার রিকশা চালক নন।

আমার আর বুঝতে কিছুই বাকি রইলো না।

আমি তাকে বললাম কাকা রিকশাটা রাখুন আগে বলুন কী হইছে আপনার।

উনি কিছু বলতে নারাজ। কিন্তু আমি নাছোড় বান্দা।

উনাকে বললাম ওকে তাহলে চলুন আগে আমাদের পৌঁছে দিন।

বাসর কাছে এসে খালামণিকে বললাম আপনি বাসায় যান আমি আসতেছি এটা শুনে খালামণি তার হাতে যা যা নেয়া যায় তাই নিয়ে বাসায় আসলেন। আমার কাছে বাকিগুলি রেখে।

আমি রিকশাওলাকে আগে আমার পরিচয় দিলাম এর পর বললাম কাকা আপনি আপনার কথাগুলো আমাকে বলুন। কারণ পুরো রাস্তাতে আমি আপনাকে লক্ষ করেছি আর আপনার কথা শুনে আমার মনেহচ্ছে আপনি কোনো অভিজাত ঘরের লোক এবং আপনার মেয়ের কথা শুনেতো পুরোটাই মনে হচ্ছে আপনি অনেক কষ্টে আছেন।

আসল ঘটনা আমাকে বলুন। কিন্তু তিনি কিছু বলতে রাজি হচ্ছেন না। এর ভিতর এশার আযান! উনি আমাকে বললেন হুজুর চলুন নামাজ পড়বো। আমি বললাম কাকা নামাজের এখনও ১৫ মিনিট বাকি দয়াকরে কিছু বলুন আমি আপনার জন্য কিছু করবো।

উনি তখন বললেন আপনি এই জিনিষ গুলি বাসায় দিয়ে আসুন আমি বলবো এটা বলে তিনি দাড়িয়ে রইলেন আমি জিনিষ গুলি বাসায় রেখে আবার আসলাম তার কাছে, তিনি বললেন হুজুর চলুন আগে নামাজ পড়ে নেই এর পর না হয় সব বলবো।

এশার নামাজের পর লোকটা আমাকে নিয়ে একটা চায়ের দোকানে গেলেন।

তারপর তার জীবনের কিছু মর্মস্পর্শী কাহিনী আমাকে শোনালেন।

  • আর এটা আমি পাঠকদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে করলাম তাই লিখছি।

তার নাম মাহবুব খান বাড়ি আমাদের বরিশালে।

তার দুই মেয়ে বড় মেয়ের নাম কনা আর ছোট মেয়ের নাম ছুমাইয়া। বড় মেয়ে ৯ম শ্রেণীতে পড়ে আর ছোট মেয়ে পড়ে ২য় শ্রেণীতে।

তার একটা ফ্যাক্টরী ছিল। ছিলবারের ফ্যাক্টরী। তবে বেশী বড় ছিল না। ৮ জন কর্মচারী ছিল। গ্রাম থেকে নানান মানুষের টাকা দিয়ে গড়ে উঠা এই ফ্যাক্টরী।

করোনার আগে থেকেই লছ খেয়ে বসে ছিলেন। এর ভিতর যখন করোনা শুরু হয় তখন তো আরও খারাপ অবস্থা। লকডাউনের সময় ফ্যাক্টরী বন্ধ হয়ে যায়, যা টাকা ছিল তা দিয়ে কর্মীদের বেতন দেন। এই দিকে হঠাৎ তার বউ অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েন, উপায় না পেয়ে ফ্যাক্টরীটা বিক্রি করে দেন।

এর পর এই এক মাস আগে তার স্ত্রী হাসপাতাল থেকে বাসায় আসে। এদিকে তার আর কোনো সম্বল বাকি নেই, যা দিয়ে তার সংসার চালাবেন। আগে যখন টাকা ছিল তখন তার অনেক বন্ধু সজন ছিল এখন আপন বলতে তার বিবি আর দুটো মেয়ে ছাড়া কেউ নেই। এইদিকে তিনি তার বউয়ের চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা ঋণী হয়েছেন।

তাই তার বউ বাচ্চা গ্রামে রেখে পালিয়ে গাজীপুর এসেছেন। কোনো কাজ না পেয়ে রিকশা চালানো শুরু করেছেন। কারণ প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে যে টাকা ইনকাম করতে পারেন তা চাকুরী করে সম্ভব না। প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে প্রায় ৭০০ থেকে ১,০০০ পর্যন্ত আয় করতে পারেন। মাসে কম হলেও ২০ হাজার টাকার মত থাকে।

আমি এই গল্প শুনে তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কী বলে তাকে শান্ত্বনা দিবো খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখন তাকে বললাম ভাই আমি একটা কাজ করতে চাই আপনি প্লিজ না করবেন না। উনি বললেন হুজুর আগে কি বলুন? আমি তখন বললাম আপনি বসুন আমি আসতেছি। এটা বলে আমার বউয়ের জন্য যেই মার্কেট করেছিলাম সব নিয়ে তার হাতে দিলাম। বললাম ভাই আমি সদ্য বিয়ে করেছি।

আমার ইচ্ছে আপনি কাল বাড়ি যাবেন আর আমার বউ এর জন্য কেনা এই জিনিষ গুলি পড়ে আমার বোন ঈদ করবে। উনি রাজি হচ্ছিলেন না তখন বললাম দেখুন আপনার মেয়ের নাম সুমাইয়া আর আমার শালীর নামও সুমাইয়া। ও শুনলে অনেক খুশি হবে। এটা সেটা বলে ওই লোকটাকে রাজি করলাম। বউয়ের জন্য যা যা মার্কেট করছি সব ওই লোককে দিয়ে দিলাম।

তখন ঐ লোকের খুশিতে তার চোখ দিয়ে পানি বেরুচ্ছিল।

আসুন আমরাও এই ঈদে আমাদের আসে পাশের লোক গুলির একটু খোঁজ নেই।

এমএম/পাবলিকভয়েস

মন্তব্য করুন