করোনায় কুরবানি বর্জন নয়

কুরবানী ২০২০

প্রকাশিত: ৪:৩৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২০

-মুফতি মাহমূদ হাসান

ঈদ খুশি! ঈদ আনন্দ! ঈদ ধনী-গরীব সবার। ঈদ বয়ে আনে সকলের মনে সীমাহীন খুশির জোয়ার। ঈদের পবিত্রতম দিনে বৈধ আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠা সকল মুসলমানের ঈমানি ও ইসলামিক অধিকার। ঈদের দিনে ধনী-গরীবের কোনো ভেদাভেদ নেই। বরং উৎসবের ঈদে রাজা-প্রজা সবাই সমান।

কিন্তু আফসোস যে, পবিত্র ঈদুল ফিতরে সবার মাঝে সমানভাবে ঈদের খুশি ও এমন মনোভাব পরিলক্ষিত হলেও ঈদুল আজহায় এসব দৃশ্যের দেখা মিলে না। রোজার ঈদে সবাই যেমন ঈদ উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠতে চায় কুরবানি ঈদে তাদের তেমন প্রস্তুতি ও উৎসাহ থাকে না। বিশেষত কুরবানি দিতে অক্ষম ব্যক্তিরা ঈদুল আজহায় কুরবানি বিষয়ে নিজের অসহায়ত্ব অনুভব করে বিধায় আজকের নিবন্ধে আমি ধনী-গরীব সবাইকে আসন্ন ঈদুল আজহায় কুরবানি দিতে বলব।

ঈদুল আজহায় ধনী-গরীব সবার জন্যই কুরবানি দেওয়া উচিত। করোনা’য় কুরবানি বর্জন না করে ধনীদের পাশাপাশি গরীব লোকদেরও কেন কুরবানি করতে হবে? বাস্তবিক অসহায়, নিঃস্ব ও অভাবী মানুষকেও কুরবানি দিতে হবে নাকি ছদ্মবেশী গরীবদের কুরবানি দিতে হবে?

বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে খাটি আল্লাহওয়ালা মানুষের সংখ্যা খুব কম। আমাদের সমাজে আল্লাহর হুকুম মানতে আগ্রহী মানুষের বড় অভাব। বর্তমান দুনিয়ায় মুখোশধারী মানুষের আনাগোনা বেশি। এমনকি ছদ্মবেশী গরীব লোকেরা ধর্ম পালনে অনাগ্রহী হলেও গোনাহ ও অহেতুক অপচয়মূলক কাজে তারা হাজারো টাকা খরচ করে আনন্দ অনুভব করে। নিজের চাহিদা পূরণ করতে ধনীদের পাশাপাশি গরীব ব্যক্তিরাও পিছিয়ে নেই। বরং সামাজের অধিকাংশ মানুষ হাতে নগদ টাকা না থাকলেও আনন্দ ফূর্তির জন্য ঋণে টাকা হস্তগত করে। তাই আলোচনার সুবিধার্থে ও পাঠকদেরকে প্রবন্ধের বাস্তবতা বুঝানোর জন্য কুরবানি সংক্রান্ত মাসআলা সামনে রেখে বর্তমান যুগের মানুষকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। এবং আসন্ন ঈদুল আযহায় এই তিনটি শ্রেণীর মধ্যকার কাদের কুরবানি করতে হবে আর কাদের কুরবানি করতে হবে না- তা বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। এবং পরিশেষে কুরবানি বিষয়ক কয়েকটি জরুরী মাসআলাও উল্লেখ করা হয়েছে।

  • (এক) প্রথম প্রকারের মানুষ হল প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী ধনী ব্যক্তিরা। ধনী বলতে বুঝানো হয়েছে ঐ ব্যক্তিদেরকে যারা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণ বাদে কুরবানির দিনগুলো তথা ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক। তাদের উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। উল্লেখ্য যে, সাড়ে বায়ান্ন তোলা রোপার বর্তমান বাজার মূল্য হিসাবে কুরবানির নেসাব হলো ৫০ হাজার টাকা মাত্র।

উপরোক্ত প্রকারের মানুষগুলো যদি কোন কারণে কুরবানি না করে তবে তাদের ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে, ‘যার কুরবানীর সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’-মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৩৫১৯; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫

এমনকি তাদের কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিলো, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫

  • (দুই) দ্বিতীয় প্রকার হল সামর্থ্যবান ছদ্মবেশী মুসলিম গরীব। যারা মূলত ধনী তথা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণ বাদে ৫০ হাজার টাকার মালিক। কিন্তু বিভিন্ন অহেতুক অজুহাতে কুরবানি দেয় না। তারা কুরবানি যাতে না দিতে হয় সেজন্য শুধুমাত্র ঈদুল আজহার দিনগুলোতে গরীবের মত কথা বলে। অথচ তারা অন্য সময় ধনীদের চেয়েও ভালো পোষাক ও খাবার গ্রহণ করে থাকে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ তাদেরকে গরীব বলে ডাকলে মাথাচাড়া দিয়ে দাঁড়ায়। তারা মৃত ব্যক্তির কুলখানি নামে গরু জবাই দিয়ে অনুষ্ঠান করতে পারে। বিবাহের সময় ঋণ করে গায়ে হলুদের অবৈধ আসর জমাতে পারে। সামান্য অসুস্থ হলে হাজার টাকা খরচ করে ভাল ডাক্তার দেখাতে পারে। মন যখন যা খেতে চায় তারা তখন তা খেতে পারলেও কুরবানি সময় সুর পাল্টিয়ে একদম অসহায় ও ফকির সাঁজে। এরা কুরবানির সময় বলে হাতে টাকা নেই। অনেক টাকা ঋণগ্রস্ত। কেমনে কুরবানি দিই ইত্যাদি বলে বেড়ায়।

সর্বোপরি উপরোক্ত ব্যক্তিদের কথা ও বাস্তবতা যদি ভিন্ন ও দুই রকম হয় তবে এসব ছদ্মবেশী গরীবদের হুকুম প্রথম প্রকারের হুকুমের মতই। দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকদের উপরও ঈদুল আজহায় কুরবানি দেওয়া ওয়াজিব। তারা কুরবানি না দিলে গোনাহগার হবে। এবং সামর্থ্য থাকা সত্তেও কুরবানি না দেওয়ার কারণে পরকালে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহিতা করতে হবে। এমনকি ঈদের দিনগুলোতে যদি তাদের হাতে কুরবানি করার মত নগদ অর্থ না থাকে তবুও বৈধ পন্থায় ঋণ ও কর্জ করে কুরবানি দেওয়া তাদের ঈমানি দায়িত্ব। (আল্লাহ এশ্রেণীর ভাইদেরকে দ্বিনের সহীহ বুঝ দিয়ে আসন্ন ঈদে কুরবানি করার তাওফিক দান করুক। আমিন। ছুম্মা আমিন।)

  • (তিন) তৃতীয় প্রকারের মানুষগুলো হল তারা যারা বাস্তবিকপক্ষে ওয়াজিব কুরবানির নেসাব পরিমাণ তথা ৫০ হাজার টাকার মালিক নয়। বরং যারা কোন রকম জীবন উপভোগ করে। যারা আসলেই গরীব, অসহায়। যাদের অভাবের কোন সীমা নেই। তারা আর্থিকভাবে সচ্ছল ও স্বাবলম্বী নন। বরং তৃতীয় প্রকারের মধ্যকার কথিপয় ব্যক্তি এমন আছে যাদের থাকার কোন ভালো ব্যবস্থা নেই। গায়ে জড়াবার মতো দামি কাপড় নেই। যারা দিন মজুরী করে সংসার চালায়। দুঃখ-কষ্টে পরিবার নিয়ে সুখি হতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। নিজেদের উজ্জল ভবিষ্যতের জন্য তারা দিনরাত সাধনা ও পরিশ্রম করে। কখনো তাদের ভাগ্যে ভাল মানের খাবার জুটে না। একদিন খেলে অন্যদিন অনাহারে কাটাতে হয়। ঝড়বৃষ্টি ও রোদে-গরমে তাদের কোন রকম জীবন কাটে।

এই তৃতীয় প্রকারের মানুষগুলো হচ্ছে বাস্তবিক গরীব ও আর্থিকভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত। তারা কুরবানির সময় ধনী হয়ে গরীব সাঁজে না বিধায় ইসলামি শরীয়তে তাদেরকে প্রকৃত গরীব হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তাদের জন্য আসন্ন ঈদুল আযহায় কুরবানি করা ওয়াজিব নয়। তারা কুরবানির দিনগুলোতে কুরবানি না করলে গোনাহগার হবে না। এবং কুরবানি না দিতে পারায় লজ্জিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কুরবানি দাতাদের মত তারাও কুরবানি না দিয়ে খুশি থাকবে। তথাপিও তারা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় কষ্ট করে হলেও কোনভাবে কুরবানি দেয় তাহলে অবশ্যই তারা সওয়াব পাবে। এবং আল্লাহ তাদের প্রতি বেশি খুশি ও রাজি হবেন।

কুরবানি সংক্রান্ত জরুরি কয়েকটি মাসআলা

মাসআলা : ১. সাতজনে মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭

মাসআলা : ২. যদি কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কুরবানী হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন করতে হবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮, কাযীখান ৩/৩৪৯

মাসআলা : ৩. কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে।-তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩৬২

মাসআলা : ৪. শরীকদের কারো পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না।

মাসআলা : ৫. কুরবানীর পশু হারিয়ে যাওয়ার পরে যদি আরেকটি কেনা হয় এবং পরে হারানোটিও পাওয়া যায় তাহলে কুরবানীদাতা গরীব হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়) দুটি পশুই কুরবানী করা ওয়াজিব। আর ধনী হলে কোনো একটি কুরবানী করলেই হবে। তবে দুটি কুরবানী করাই উত্তম। -সুনানে বায়হাকী ৫/২৪৪, ইলাউস সুনান ১৭/২৮০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৯, কাযীখান ৩/৩৪

মাসআলা : ৬. অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ যবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। যদি কোনো একজন না পড়ে তবে ওই কুরবানী সহীহ হবে না এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩৩৪

মাসআলা : ৭. কুরবানীর গোশত তিনদিনেরও অধিক জমিয়ে রেখে খাওয়া জায়েয।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, সহীহ মুসলিম ২/১৫৯, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৮, ইলাউস সুনান ১৭/২৭০

মাসআলা : ৮. শরীকে কুরবানী করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়।-আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭, কাযীখান ৩/৩৫১

মাসআলা : ৯. কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকীনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলমগীরী ৫/৩০০

মাসআলা : ১০. জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে না। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারী দেওয়া যাবে।

মাসআলা : ১১. কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া জায়েয নয়। গোশতও পারিশ্রমিক হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া যাবে না। অবশ্য এ সময় ঘরের অন্যান্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরকেও গোশত খাওয়ানো যাবে।-আহকামুল কুরআন জাস্সাস ৩/২৩৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলবাহরুর রায়েক ৮/৩২৬, ইমদাদুল মুফতীন

মাসআলা : ১২. কুরবানী পশু জবাই করে পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েয। তবে কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া যাবে না। -কিফায়াতুল মুফতী ৮/২৬৫

মাসআলা : ১৩. কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিল, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫

লেখক : তরুণ আলেম ও বিশ্লেষক। খতিব, রাজারহাট কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ মাদারীপুর।

মন্তব্য করুন