আজ বিশ্ব বাঘ দিবস : কেমন আছে সবচেয়ে প্রভাবশালী এই প্রাণিটি

প্রকাশিত: ৪:৫১ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০২০

শেখ সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট :

বাঘ টিকে আছে বিশ্বে এমন ১৩টি দেশে ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন অংশে গত ৩ বছরে বাঘের সংখ্যা ১০৬ থেকে বেড়ে বর্তমানে ১১৪টি হয়েছে। অর্থাৎ ৩ বছরে সুন্দরবনের বাঘ বেড়েছে ৮টি।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের প্রধান আকর্ষণ বাংলাদেশের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে এর সংখ্যা এক সময় আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছিলো। কিন্ত ধিরে ধিরে এর সংখ্যা বাড়ছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। ২০১৫ সালের বাঘশুমারির প্রতিবেদন অনুসারে, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে মাত্র ১০৬টি বাঘ ছিলো। পরে ২০১৭-২০১৮ বাঘশুমারিতে সেখানে ১১৪ টি বাঘ শনাক্ত করা হয়। তাদের মতে, বনে বাঘ আছে বলেই সুন্দরবনের সৌন্দর্য এখনও বহাল রয়েছে। কিন্ত যেদিন বনে বাঘ থাকবে না, সেদিন সুন্দরবনের সকল সম্পদেরই আস্থিত্ব হারিয়ে যাবে।

[সুন্দরবনের প্রধান আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার।]

তবে, লকডাউনের মধ্যে বনের পুর্ব রেঞ্জে বাঘের আনাগনা দেখতে পাওয়ায় এর সংখ্যা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে দাবী বন বিভাগের।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের তথ্যমতে, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৪৮টি বাঘ মারা গেছে। এর মধ্যে ২২টি সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগে এবং ১৬টি পশ্চিম বিভাগে মারা যায়। এ সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ১০টি বাঘের চামড়া ও হাড়গোর উদ্ধার করে। ১১৪টি বাঘ নির্ধারণ করার পরে বনের পুর্ব বিভাগের গত বছরের ২০ আগাষ্ট কচিখালীতে ১টি, চলতি বছরের ৩ ফেব্রয়ারী কুকিলমনির কবরখালীতে ১টি ও ১১ জুলাই পশ্চিম সুন্দরবনের আন্দারমানিক এলাকায় ১টি বাঘ মারা যায়।

তবে জেলে ও মৌয়ালদের বরাত দিয়ে বন বিভাগ বলছেন, লকডাউনের মধ্যে পর্যটকদের পদচারনা বন্ধ থাকায় বাঘের বিচারন লক্ষ করা যাচ্ছে। তাদের প্রজনন ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকায় ইতিমধ্যে বাঘের সংখ্যা আগের তুলনায় বারতে পারে বলে ধারনা তাদের। এছাড়াও “বাঘ সংরক্ষণ” নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, প্রকল্পটি চালু হলে ২০২১ সালের নতুন করে বাঘ গননা ও এর সংরক্ষনে কাজ শুরু করবে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

গত বছরের এক তথ্যে, সারা বিশ্বে বাঘের সংখ্যা এখন মাত্র ৩ হাজার ৮৯০টি, যা একশ’ বছর আগে ছিল এক লাখের মতো, যাদের উল্লেখযোগ্য অংশের আবাস ছিলো সুন্দরবন। ২০০৪ সালের এক জরিপে খুলনা ও সাতক্ষিরা রেঞ্জ এলাকায় ২৭১টি এবং বাগেরহাটের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্চ এলাকায় ১৬৯টি সহ মোট ৪৪০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার বেঁচে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে ২০১৮ সালের জরিপে সুন্দবনের বাঘের সংখ্যা এসে ১১৪ টিতে দাড়ায় বলে উল্লেখ করেন পুর্ব বন বিভাগ।

২০১৫ সালের ২৬ জুলাই প্রকাশিত ক্যামেরা পদ্ধতীতে বাঘ গণনার জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ওই সময় ভারত-বাংলাদেশ মিলে পুরো সুন্দরবন জুড়ে বাঘের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল ১৭০টি যা এর আগের শুমারি থেকে ২৭০টি কম। অথচ ২০০৪ সালে বন বিভাগ এনএনডিপির সহায়তায় প্রথমবারের মতো বাঘের পায়ের ছাপ গুণে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করেছিল ৪৪০টি। দু’বছর পর ২০০৬ সালে ক্যামেরা পদ্ধতিতে বাঘ গণনা করে এর সংখ্যা নির্ধারণ করে ২০০টি।

ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। গত বছরের ২২ মে সর্বশেষ বাঘ জরিপে সুন্দরবনে ১০৬ থেকে বেড়ে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৪টিতে। ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বন বিভাগের হিসেবে ৫৩টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে মাত্র ১৫টি। লোকালয়ে ঢুকে পড়া ১৪টি বাঘকে পিটিয়ে মেরেছে স্থানীয় জনতা, একটি নিহত হয়েছে ২০০৭ সালের সুপার সাইক্লোন সিডরে ও বাকি ২৫টি বাঘ হত্যা করেছে চোরা শিকারিরা। অধিক মুনাফার আশায় বাঘের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, চামড়া, হাড়, দাঁত, নখ পাচার ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। আর এটি দেশ ও দেশের বাইরে চলে যেত চোরকারবারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। তবে আশার খবর হচ্ছে সুন্দরবনে একের পর এক বনদস্যুদের আত্মসমর্পণে বাঘ নিধন কমে এসেছে।

সুন্দরবনে চোরা শিকারির পাশাপাশি বাঘের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে হুমকির মুখে রয়েছে বাঘ। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এ অবস্থায় হারিয়ে যেতে পারে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ২০৭০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বাঘের জন্য কোনো উপযুক্ত জায়গা থাকবে না। কেননা বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধিসহ উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সুন্দরবনে টিকে থাকা কয়েকশ বাঘ বিলীন হওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই অবস্থায় সুন্দরবনে বাঘের আবাসভূমি এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন ও এর জীববৈচিত্রে বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ। দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং ঝড়, বন্যাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে মানুষের জীবন ও সম্পদ বাঁচাতে সুন্দরবনসহ উপকুলীয় বনাঞ্চলের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। অথচ নির্বিচারে বনভূমি উজাড় হওয়ায় উদ্ভিদবৈচিত্র আজ বিলুপ্তির পথে। ফলে প্রাণিবৈচিত্র আজ হুমকির সম্মুখীন।

বনখেকোদের নির্বিচারে বৃনিধনের ফলে আজ সুন্দরবন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শুধু তাই নয়, সব আইন-কানুন উপো করে হত্যা করা হচ্ছে বাঘ ও হরিণসহ নানা প্রজাতির পশুপাখি। প্রতিকুল পরিবেশে বর্তমানে সুন্দরবনে বেঁচে থাকা বাঘ ও সীমিতসংখ্যক পশুপাখির জন্য আবাসস্থলের অভাব ও প্রবল খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। সুন্দরবনের তিন দিকে থাকা ঘনবসতিও বাঘের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পরিবেশবিদরা। সুন্দরবনে বাঘের জীবনযাপনে নানা প্রতিকুল পরিবেশের পাশাপাশি সাগরে পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে মিষ্টি পানি পানে অভ্যস্থ’ বাঘসহ অন্যান্য প্রাণী বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায়ই অকালে মারা যাচ্ছে। এছাড়া ঝড়, জলোচ্ছ¡াসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বন্যপ্রাণী হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে। তবে স্বাভাবিক মৃত্যুর চেয়ে বাঘ হত্যার ঘটনাই বেশি ঘটছে।
বাংলাদেশে বাঘ, হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকার নিষিদ্ধ হলেও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় হরহামেশা বাঘের চামড়া, হরিণের মাংস, এমনকি বিরল প্রজাতির নানা ধরনের বন্যপ্রানী শিকার হচ্ছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহের জন্য চোরাকারবারিদের দৌরাত্ন থেমে নেই। এর ফলে সুন্দরবনে বাঘের নির্বিঘ্নে বেঁচে থাকা মারাত্মক হুমকি হয়ে পড়েছে।

বাঘদের যেমন সুন্দরবন অত্যাবশ্যক, তেমনি সুন্দরবনেরও বাঘের প্রয়োজন। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষও বাঘের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তোলে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন বিলুপ্ত হয়ে গেলে গোটা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকের আশংকা। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেও প্রচন্ড ক্ষতির সম্মুখীন হবে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের সুন্দরবন বলেও উল্লেখ করেন বিষেশাজ্ঞরা।

সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাইন্ডেশন’র চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ড. লায়ন ফরিদুল ইসলাম জানান, বিশ্ব ঐতিহ্য “ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড” হিসেবে স্বীকৃত এই বনের ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বাংলাদেশ অংশে রয়েছে বাঘ,চিতা বাঘ,বনর, চিত্রা ও মায়া হরিণ, বন বিড়াল, বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতীসহ ৩৭৫ প্রজাতির বন্য প্রাণী। চোরা শিকারীরা বনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগার (বাঘ) শিকার করে তার চামড়া,হাড় ও মাংশপেশী বেশীদামে বিক্রি করছে। এছাড়াও বিভিন্ন কারনেও বাঘ মারা পরছে, প্রতি নিয়ত চোরাই ভাবে জাল ও ফাদঁ পেতে শিকার করছে। যা বন্ধ না করলে বনের রাজা হারিয়ে গেলে বনেরও আস্থিত্বই বিলিন হয়ে যাবে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ বেলায়েত হোসেন জানান, হাজার হাজার মানুষ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। তাই বনে বাঘের সংখ্যা সংরণে সকলকে সম্পৃক্ত করা উচিত। এব্যাপারে এর সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রশিণ দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, সুন্দরবনে বাঘ ও হরিন শিকারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি স্মার্ট টহল জোরদার করা হয়েছে। তারা শিকারিদের প্রবেশের জায়গাগুলোকে বিশেষ নজরদারির মধ্যে রেখেছেন বলে জানায় এ কর্মকর্তা।

মন্তব্য করুন