সমুদ্র দেখা বারণ! || নুসরাত জাহান তন্বী

করোনাকালীন দুঃখকথা

প্রকাশিত: ৯:০৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০২০

নুসরাত জাহান তন্বী :

ভর দুপুর। ঘড়ির কাটায় ঠিক ১২:১৭ বাজে। বদ্ধ ঘরে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে দম বন্ধ লাগছে। আজ ক’দিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। ভ্যাপসা গরম। এত বৃষ্টি তবুও যেন বসূধার তৃষ্ণা মিটছে না!

ভাবছিলাম একবার ছাদে গেলে কেমন হয়? অন্য কোন ছাদে অবশ্য এতটা সুখ খুজে পাব কিনা জানি না। চিরচেনা জায়গাটায় বোধহয় মনটা একটু বেশিই টানে। ছাদ ঘেঁষে উত্তর -পূর্ব দিকে বিশাল নিম গাছ। শত বছরের পুরোনো গাছটা ছাদের খানিকটা জুড়েই দখল করে আছে ছায়া দিয়ে। মেঘলা দুপুর, ভ্যাপসা গরমে ঐ নিমছায়ায় আজ স্বর্গীয় সুখ খুজছে মন।

রেলিং ঘেঁষে দাড়িয়ে মেঘলা আকাশ দেখতে দেখতে চোখ পড়লো বাড়ির পেছনের বড় পুকুরের দিকে। একেবারে জলে থৈ থৈ করছে। মনে হচ্ছে জল উপচে পরবে এখনি। পাতিহাঁস গুলো ভাসছে,সাঁতার কাটছে আর কতগুলো জলের তলে ডুব মারছে। কি অপূর্ব সেই দৃশ্য। নিঃস্তব্ধ পরিবেশ দেখছি আর ভাবছি সেই দিনগুলোর কথা।

যেখানে ছিল না কোন নিঃস্তব্ধতা, ছিল না কোনো খোলা আকাশের ঘন কালো মেঘ, ছিল না বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দ, ছিল না পাতিহাঁস, শোনা যেত না মধ্যাহ্নের দূর থেকে ভেসে আসা ঘুঘু পাখির ডাক, দেখা মিলত না পুকুর পাড়ের ওপাশে দাড়িয়ে থাকা বিশাল দেহের কড়াই গাছের মোলায়েম সবুজ পাতা,বিকেলের সোনালি রোদে পাতা গুলোর ঝলমলানি, রঙিন সূর্যাস্ত!

চার দেয়ালের যান্ত্রিক জীবনই ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। শহুরে জীবনযাপন আর ছিল দীর্ঘশ্বাস। হঠাৎ ই আগমন করোনাভাইরাসের! শুনেছি বিশ্বের ১৯৫ টি দেশের ১৮৮টি দেশে ৯৮ লাখের বেশি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, আর মারা গেছেন প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ! স্বভাবতই সকলে যার যার নিরাপদ স্থান বেছে নিয়েছে। মহামারি আকার ধারন করেছে যে! দেয়া হয়েছে লকডাউন,বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা।

এইতো সেদিনকার কথা,ভার্সিটির ফ্রেন্ডরা মিলে ঠিক করলাম যান্ত্রিক জীবন থেকে বেরিয়ে সমুদ্রে বেড়াতে যাব। যাওয়া আর হলো কই। সমুদ্র দেখা যে বারণ এখন। সেই উত্তাল ঢেউ, সাদা ফেনারাশি, বাতাসের গুণগুণ শব্দ, হাওয়ার ঝাপটা, যে একবার যাবে প্রেমে পড়বে নিঃশ্চয়ই। ভালোবাসার টানে যেতে চাইবে হাজার বার! করোনা আমাদের সমুদ্র দেখতে দেয় নি ঠিকই, কিন্তু ফিরিয়ে দিয়েছে প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন করার সুযোগটুকু। তবুও মনের কোনায় ব্যাথা অনুভব হয় তাদের জন্য, যারা আজও শহরের চার দেয়ালে বদ্ধ, যাদের সময় কাটছে হাসপাতালের সিড়ি ভেঙে, যাদের চোখ দুটো চেয়ে আছে স্বল্প ত্রানের আশায়, যাদের চোখে ভাসছে স্বজন হারানোর শোক, বহুদূর থেকেও শোনা যায় সেই আর্তনাদ।

জলে ঘন কালো মেঘের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ – পূর্ব দিক থেকে মেঘরাজ এসে কালো অন্ধকারাচ্ছন্নে তলিয়ে দিচ্ছে আকাশটা।বোধহয় ঝুমঝুম বৃষ্টি নামবে এখনই।

লেখিকা : গণিত বিভাগ, অনার্স চতুর্থ বর্ষ, সরকারি তোলারাম কলেজ।

মন্তব্য করুন