ইমরান খানের টেলিফোন ও ভারতের অন্তর্দহন : প্রেক্ষিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ৭:০০ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২০

জিয়া -আল- হায়দার

  • ইমরান খানের টেলিফোন ও ভারতের অন্তর্দহন এবং ইসলামী আন্দোলনের সামনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের হাতছানি

ইমরান খান সেদিন (২২ জু্লাই) হঠাৎ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন। জম্মু কাশ্মীর ইস্যুতে বাংলাদেশের ইতিবাচক সহযোগিতা চাইলেন। ইমরান খানের অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে এটিকে আবার প্রচার করা হলো।

ব্যাস! এতোটুকুতেই ভারতের নীতি-নির্ধারক ও বুদ্ধিজীবী মহলের বুক ধড়পড় শুরু হয়ে গেল! এদেশে তাদের দালাল চক্র আড়মোড়া ভেঙে নড়েচড়ে বসল! মুক্তিযুদ্ধ গেল! গেল! রব উঠল।

এটা থেকে যা বুঝা গেল, বাংলাদেশ যদি ভারতের অক্টোপাস থেকে মুক্ত হয়ে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে চায় তাহলে কৌশলগতভাবে ও কূটনীতিক ভাবে সে প্রচুর লাভবান হবে।

বাংলাদেশ ভারতের সাথে শুধুমাত্র দিয়ে যাওয়ার শর্তে যে দহরম মহরম সম্পর্ক রাখতে চায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিবেচনায় তার কারণ হচ্ছে দুইটা।

প্রথমত: বিশ্ব মোড়ল আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়াকে দেখে ভারতের চোখে। অতএব ভারতের ছোটভাই হয়ে থাকার মানে হচ্ছে আমেরিকার দিক থেকে নিরাপত্তা।

দ্বিতীয়তঃ জনমনে এই ধারণা বিদ্যমান বাংলাদেশের ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ে ভারতের ‘র’। কাজেই ক্ষমতায় যারা থাকে কিংবা ক্ষমতার যারা প্রতিদ্বন্দ্বী তারা কেউই ভারতকে নাখোশ করতে চায় না।

ক্ষমতালোভী দ্বিতীয় কারণের কোনো প্রতিষেধক আসলে নাই। তারপরও আমি একটি প্রতিষেধক দেয়ার চেষ্টা করব শেষদিকে।

চলে আসি প্রথম আলাপে। ভারত আঞ্চলিক পরাশক্তি, এটা অস্বীকারের জোঁ নাই। সাথে সাথে এটাও তো ভুলে গেলে চলবে না, চায়না ক্রমে ক্রমে বৈশ্বিক পরাশক্তি হয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে সে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়ে গেছে।

এদিকে পাকিস্তানের সাথে তার খুব ভালো সম্পর্ক। চায়না যাতে পাকিস্তানকে পুরোপুরি ভাগে নিতে না পারে এজন্য দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব হ্রাস করতে পাকিস্তানের সাথে আবার আমেরিকার খুব ভালো সম্পর্ক। এখন বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান হয়ে আমেরিকার সাথেও তার সুসম্পর্ক বজায় থাকবে।

এদিকে আবার ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে কৌশলগত কারণে চায়নার খুব বেশি প্রয়োজন। সুতরাং চীন বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক চাইবে। কাজেই পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব এবং চীনমুখী পররাষ্ট্রনীতি হলে দিল্লির সাথে ঢাকার যে দেন-দরবার সেগুলো ভারত আপনা আপনিই দিয়ে দিবে। ইমরান খানের সাথে হাসিনার টেলিফোন সংলাপে ভারতের উদ্বিগ্নতা এই সম্ভাবনার কথা স্পষ্ট ভাবে জানান দেয়।

এটা বুঝার জন্য ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনের ছাত্র হওয়ার প্রয়োজন নাই। এটা আমরা সাধারন জনগনও বুঝি। বলবেন, ইস! আপনার মাথায় এত পররাষ্ট্রনীতি! তাহলে আমাদের জাঁদরেল আমলারা বসে বসে কি করে? বসে বসে তারা কি করে এটা তারাই জানে। দেশের জন্য যে কাজ করে না অথবা তাদের যে কূটনৈতিক যোগ্যতা নাই এটা প্রমাণ করার জন্য সম্প্রতি মালয়েশিয়ার ঘটনার দিকে তাকান। বাঙালি কুটনীতিকরা অত দক্ষ হলে তিস্তার পানি এখনও আমরা পাইনি কেন? ভারতের সাথে এত বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি কেন?

এখন আসেন কেন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিরা ভারতের বিরুদ্ধে যেতে চায়না। সেটা নিরেট বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্য ও অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপের কারণে ক্ষমতাকামী দলগুলোর নিজ নিজ দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে। এটা লীগ- বিএনপি -জামাত- জাপা সবার মধ্যে বিদ্যমান। কট্টরপন্থী হিন্দু নেতা গুজরাটের কসাইকে নির্বাচিত হওয়ার পর জামায়াতের অভিনন্দন বার্তা এটাই প্রমাণ দেয় ‘আমিও ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তোমার বিরুদ্ধে না।’ বিতর্কিত ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির বিরুদ্ধে যেখানে হরতাল-অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়ার কথা; সেখানে বিএনপি-জামায়াত রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ।

জামায়াতে ইসলামী বিবৃতি ছাড়া বড় কোনো কর্মসূচি দিবে না। এটা তাদের এই দুরবস্থা না থাকলেও না। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এক্ষেত্রে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবাই বাংলাদেশের জনগণের বিপক্ষে অবস্থান করে।মাঠে ময়দানে মাঝেমধ্যে যে ভারতবিরোধী গরম বক্তব্য দেখা যায় সেটা স্রেফ রাজনীতি। বিএনপি মাহমুদুর রহমান ও আবদুল হাই শিকদার বুদ্ধিজীবী ভারতের বিরুদ্ধে বেশ সোচ্চার। কিন্তু এই দুজনের বক্তব্য বিএনপির ভারতবর্ষে নির্ধারণে কোন প্রভাবক নয়। আমার কথা হল এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ের কথা বুঝার মত একটা রাজনৈতিক দল খুব প্রয়োজন। যারা জনগণকে সাথে নিয়ে ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলবে।

এই জায়গায় আমরা ইসলামী আন্দোলন ও তার ছাত্র সংগঠনকে বেশ সরব দেখি। আমার কাছে মনে হয় ভারতমুখী দেশ বিরোধী রাজনীতির এই ভন্ডামি  তারা ধরে ফেলেছে। এবং তারা যদি জনগণের দল হতে চায় তাদের এই বোধ ও উপলব্ধিকে ব্যাপকভাবে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রচুর কর্মসূচি দিয়ে জনগণকে সাথে নিয়ে ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি বাতিলে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি টিপাইমুখ বাঁধ, তিস্তা ব্যারেজ এসবের চেয়ে বেশী ঝুঁকিপূর্ণ। এটা নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের বড় পরিসরে রাজনীতির সুযোগ আছে। তারা যদি পরিকল্পিতভাবে গুচ্ছ কর্মসূচি নিয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে তাহলে হয়তো বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে জনগণের চাপে একটি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারবে। এতে দেশ ও জনগণের প্রতি তাদের একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমি ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পন্থী জনগণের আত্মমর্যাদাপূর্ণ বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতর কর্মসূচিতে নামার আহ্বান জানাচ্ছি।

ভারতের সাথে গোলামির চুক্তি বাতিল করতে হবে : অধ্যক্ষ ইউনুস

সমুদ্র বন্দরে ভারতের সাথে দেশবিরোধী চুক্তি বাতিলের দাবিতে ইশার বিক্ষোভ

সমুদ্র বন্দরে ভারতীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চুক্তি বাতিল করুন : ইশা

লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য করুন