ঈদের পরে ‘জামায়াত’ ছাড়তে পারে বিএনপি

জামায়াত-বিএনপি সম্পর্কের ২০ বছর

প্রকাশিত: ৬:৩৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০২০

বিশেষ প্রতিবেদক : প্রায় ২০ বছর ধরে একসাথে জোট বেঁধে বিএনপির সাথে রাজনীতি করা চারদলীয় ঐক্যজোটের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ছেড়ে দিতে পারে বিএনপি।

করোনার এ সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ আওয়াজ এখন জোড়ালো হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে বিএনপির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সূত্র উল্লেখ করে ঢাকার একটি সংবাদপত্র এ বিষয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে। ওই সংবাদে সর্বশেষ স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সূত্র উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ সদস্যই জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের জন্য মত দিয়েছেন। এখন দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। এর আগেও অনেকবার জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কচ্ছেদের সংবাদ শোনা গিয়েছে।

এছাড়াও বিএনপির একাধিক নেতারা সরাসরিই জামায়াত ছাড়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

এ বিষয়ে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বলেন- বিএনপি একটি মুক্তিযোদ্ধার দল। আমি বিএনপি করি, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। কিন্তু যখন অনেক জায়গায় আমরা যাই তখন তারা আমাদেরকে এমন ভাবে ট্রিট করে যেন আমরা রাজাকারের সন্তান। আমাদের সাথে জামাত জোটবদ্ধ আছে বলেই এই দাগটা আমাদের নিতে হয়। তাই জামায়াতের সাথে এখন জোটবদ্ধভাবে রাজনীতি করা উচিত নয় বলে মনে করি।

এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার বলেন- স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সাথে রাজনীতি করতে পারে না। বিএনপির রাজনৈতিক অনেক ভুলের সমাহারের মধ্যে এটাও একটা বড় ভুল যে জামাতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে বিএনপির রাজনীতি করা।

এ বিষয়ে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন – দল যা সিদ্ধান্ত নেবে আমরা সেই সিদ্ধান্তের সাথে আছি। তবে এই মুহূর্তে বিএনপি জামাতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা উচিত। তাতে আমি মনে করি নতুন প্রজন্মের কাছে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে এবং এতে করে বিএনপি আরো শক্তিশালী হবে।

বাগেরহাট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি কাজী খায়রুজ্জামান শিপন বলেন – আমরা গাছ লাগাই আর তারা এসে ফল খায়। জামাতের যে দুর্নামটি আছে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে। বিএনপি কেন এটা বয়ে বেড়াবে। সেই ক্ষেত্রে আমরা মুক্তিযোদ্ধার ধারায় রাজনীতি করতে চাই। এবং জামায়াতকে ছাড়ার পক্ষেই মতামত দেই।

এছাড়াও পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতা জানান তারা জামাতকে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এমনকি আসছে শনিবারে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হবে এবং দলীয় চেয়ারপারসনের নির্দেশ পেলে ঈদের পরে এ বিষয়ে নির্দেশ আসবে।

এসব গুঞ্জন থেকেই বুঝা যায় – জামায়াতকে বিএনপি জোট থেকে বিদায় করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে ঈদের পরে। দীর্ঘ সময় একসাথে থাকার পর বিএনপি এখন বলছে জোটে জামায়াত থাকায় তাদের গায়ে লেগেছে যুদ্ধাপরাধের তকমা। দলের রাজনীতির অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগেও। তবে তখন বিষয়টি আমলে নেয়নি বিএনপি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ, এবং সর্বোপরি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনকে ঘিরে’ বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব বাড়তে থাকে।

এছাড়াও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জামায়াত এবং বিএনপি আলাদা আলাদা মেয়র প্রার্থী দেওয়াকে ঘিরেও বিএনপি জামায়াতের মধ্যে দুরত্ব বেড়েছে।

এদিকে করোনায় জেরবার অবস্থা, ওদিকে ধেয়ে আসছে বন্যা। করোনার ত্রাণ নিয়ে অনিয়ম হয়েছে। এখন বন্যার ত্রাণ কী হয়, তা দেখার অপেক্ষা। অন্যান্য কার্যক্রমের মতো স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও নেই তেমন একটা। এসব মিলিয়ে রাজনৈতিক স্থবিরতার মধ্যে বিএনপির জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের বিষয়টি আলোচনা এল বেশ হুট করেই।

প্রসঙ্গত : ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়তে গিয়ে বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোট গঠন হয়। একসঙ্গে আন্দোলনের পর এই জোট ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্য পায় এবং সরকার গঠন করে। শুরুর দিকে চারদলীয় জোটের শরিক ছিল এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট ও জামায়াতে ইসলামী। একপর্যায়ে এরশাদ চার দল ছেড়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে গেলে জাতীয় পার্টির নেতা নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে দলটির একটি অংশ (যা পরে বিজেপি হয়) চার দলে থেকে যায়। চারদলীয় জোট পরে ১৮ দলীয় জোট এবং যা আরও পরে ২০-দলীয় জোটে রূপান্তরিত হয়।

অষ্টম জাতীয় সংসদ থেকে একাদশ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত প্রায় ২০ বছর একসঙ্গে আন্দোলন ও নির্বাচন করেছে বিএনপি-জামায়াত।

আরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন