সরকারী কলেজ নিয়ে উত্তাল বরিশাল : নাম অপরিবর্তিত রাখতে গোলটেবিল বৈঠক

২৫ জুলাই গোলটেবিল বৈঠক হবে

প্রকাশিত: ৩:৩৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২০

বরিশালের ঐতিহ্যবাহী সরকারি বরিশাল কলেজের নাম অপরিবর্তিত রাখা এবং বরিশালের ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার দাবীতে ২৫ জুলাই শনিবার গোলটেবিল বৈঠকের আহবান করেছে বরিশাল ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর ও বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীমের আহবানে শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত হবে এ গোলটেবিল বৈঠক। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন মুফতী ফয়জুল করীম।

[গোলটেবিল বৈঠকে মুফতী সৈয়দ ফয়জু্ল করীমের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ পত্র]

গত ১৮ জুলাই গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাতকারে মুফতী ফয়জুল করীম বলেন, দেশটিকে যারা ভিনদেশি করার স্বপ্ন দেখছে তারাই নাম পরিবর্তনের এ চক্রান্ত করছে। এটা বরিশালের অস্তিত্বের প্রশ্ন। এমন চক্রান্ত রুখতে অচিরেই তিনি গোলটেবিল বৈঠক করছেন।

জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ৩ মে ৪০ হাজার ২৯৫ টাকায় অশ্বীনী কুমারের বাড়ির জমি অধিগ্রহণ করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তৎকালীন জেলা প্রশাসক অধিগ্রহণ অনুযায়ী ১.৪৭৬ একর জমি বরিশাল নাইট কলেজকে প্রদান করেন। ১৯৮৬ সালে সরকারি বরিশাল কলেজ নামে প্রতিষ্ঠানটি সরকারীকরণ করা হয়। বর্তমানে কলেজটি প্রায় ৫ একর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত।

[সরকারী বরিশাল কলেজের প্রবেশ গেট]

কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর নাসির উদ্দিন বলেছেন, নাম পরির্বতনের প্রস্তাব জেলা প্রশাসক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে কোনো মতামত নেওয়া হয়নি।

গত ফেব্রুয়ারিতে বরিশাল জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়ার রহমান কলেজটির নাম পরিবর্তন করে অশ্বীনী কুমার দত্তের নামে নামকরণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠান। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় শিক্ষা বোর্ডকে গত ২৯ জুন এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বিষয়টি চলতি মাসে চাউড় হয়ে গেলে নগরীতে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। এরপরই ধারাবাহিক প্রতিবাদে নামে সবাই।

নাম অপরিবর্তিত রাখার দাবিতে ধারাবাহিক প্রতিবাদ :

প্রথমে গত ১১ জু্লাই সরকারি বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তন করে অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে করার প্রস্তাবে ফুঁসে উঠে বরিশালের ছাত্র সমাজ। ওই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের ছাত্র সমাজ। মানববন্ধনে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।

[১১ জুলাই মানববন্ধনে অংশ নেয় বিভিন্ন নেতাকর্মীরা]

সেদিন (শনিবার) বেলা সোয়া ১১টায় নগরীর সদর রোডে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসলাম তালুকদার অনিক। বক্তব্য রাখেন সরকারি বরিশাল কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি একেএম জাহাঙ্গীর হোসাইন, সাবেক এজিএস হাফিজ আহমেদ বাবলু, প্রাক্তন ছাত্র ও সিনিয়র সাংবাদিক আলম রায়হান, কাউন্সিলর শেখ সাঈদ আহমেদ মান্নাসহ অনেকে।

এরপর কলেজের নাম অপরিবর্তিত রাখার দাবিতে গত ১৫ জুলাই থেকে গণস্বাক্ষর নিচ্ছে কলেজের সাবেক-বর্তমান ছাত্রনেতারা। তাদের দাবির পক্ষে সহমত জানিয়েছে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল সহ বরিশালের সকল সচেতন মহল।

বক্তারা বলেন, সরকারি বরিশাল কলেজ প্রতিষ্ঠাকালে অশ্বিনী কুমার দত্তের কোনও অবদান নেই। সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস, সাবেক মন্ত্রী শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, সাবেক পৌর চেয়ারম্যান গোলাম মাওলাসহ বিভিন্ন গুণীজন ও ব্যক্তিদের অর্থে এবং কলেজের নিজস্ব অর্থায়নে এ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ কলেজে অশ্বিনী কুমার দত্তের কোনও অবদান নেই। কাজেই সরকারি বরিশাল কলেজের নাম কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন বক্তারা।

[গণস্বাক্ষর কর্মসূচিতে অংশ নেয় বরিশালের সর্বস্থরের মানুষ। একই দিনে নাম পরিবর্তনের দাবিতে মিছিল করে বাসদ]

একই দিন (১৫ জু্লাই) একই সময়ে সরকারী কলেজের নাম পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ করেছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) বরিশাল জেলা আহবায়ক কমিটি ও অঙ্গ সংগঠন। বাসদের জেলা সভাপতি ইমরান হোসেন রুমন এবং সদস্য সচিব ডা. মনিষা চক্রবর্তী নাম পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে বক্তৃতা করেন। বরিশালে একমাত্র তারাই কলেজের নাম পরিবর্তনের পক্ষে। তবে তারা এ দাবি জানিয়ে বেশ বেকায়দায় পরেছে বরিশালে। রাজনৈতিকভাবে তাদের বয়কট করার পক্ষও বেশ জোড়দার হচ্ছে। আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোতে তাদের এ দাবিকে সাম্প্রদায়িক দাবী বলে উল্লেখ করে খবর প্রকাশ হয়েছে।

[পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে পুলিশের উপস্থিতিতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি শান্ত হয়]

এরপর গত শনিবার (১৮ জু্লাই) একই দাবিতে নগরীর অশ্বিণী কুমার টাউনহল সম্মূখে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন। মানবন্ধনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বরিশাল মহানগর সেক্রেটারি মাওলানা মুহাম্মাদ জাকারিয়া হামিদী প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, সরকারি বরিশাল কলেজ বরিশালের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম বাহন। ৬০ বছর পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী কলেজের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ বরিশালের ঐতিহ্যকে বিনষ্ট করবে বলে মনে হচ্ছে। কিছু দিন ধরে লক্ষ্য করছি বরিশালের ঐতিহ্যেকে মিটিয়ে দেয়ার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে, যা আমরা কোনো ভাবে মেনে নিতে পারছি না।

[মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে ইশা ছাত্র আন্দোলন]

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবকারী জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, অশ্বিনী কুমার দত্ত্বের ভক্ত ব্যাপক জনগোষ্ঠী রয়েছে বরিশালে। প্রতি বছর অশ্বিনী কুমার দত্তের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে স্থানীয় সুশীল সমাজ-সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা দাবি তুলে আসছেন অশ্বিনী কুমার দত্তের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কলেজের (সরকারি বরিশাল কলেজ) নামকরণ তার নামে করা হোক। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন থেকে অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এখন মন্ত্রণালয় যদি মনে করে কলেজের নাম অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে হবে সেটা তারা করবে, অথবা আগের নামেও বহাল রাখতে পারে। এটা মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার।

প্রসঙ্গত : সরকারি বরিশাল কলেজ বাংলাদেশের বরিশাল শহরে অবস্থিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কলেজটি ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক (পাস), স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর বিষয়ে পাঠদান করে থাকে। এর উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রী শ্রেণীতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা – তিনটি শাখায় পাঠদান করা হয় ও শিক্ষা কার্যক্রম বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় ও স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা কার্যক্রম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত।

সরকারী বরিশাল কলেজের ইতিহাস :

পাকিস্তান সরকারের আমলে কলেজটির নাম ছিলো ‘নাইট কলেজ’। সরকারী বরিশাল কলেজ তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সময় (২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩ সালে) এক সময়ের ‘বরিশাল নাইট কলেজ’ কালের পরিবর্তনে বর্তমানে ‘সরকারি বরিশাল কলেজে’ পরিণত হয়েছে।

১৯৬৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর কালিবাড়ি রোডে অবস্থিত ব্রজমোহন (বিএম) স্কুলের একটি ভবনে বরিশাল নাইট কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়। শুরু থেকেই এ কলেজে ডিগ্রি কোর্স চালু ছিলো। পরে ১৯৬৬ সালে অশ্বিনী কুমার দত্তের বাস ভবনে কলেজটি স্থানান্তরিত করা হয়।

এরপর থেকে ধীরে ধীরে কলেজে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে দেখা দেয় শ্রেণীকক্ষের সংকট। শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষ এবং একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। এ ভবনটি নির্মাণের জন্য আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেন বরিশালের তৎকালীন জেলা প্রশাসক এটিএম শামসুল হক। দিন দিন এ কলেজের শিক্ষাদান ব্যবস্থা প্রসার লাভ করায় ১৯৭০ সালে এখানে দিবা শাখার কার্যক্রম শুরু করেন কলেজ কর্তৃপক্ষ।

এরপর ১৯৭১ সালের ৩ মে ৪০ হাজার ২৯৫ টাকায় অশ্বীনী কুমারের বাড়ির জমি অধিগ্রহণ করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তৎকালীন জেলা প্রশাসক অধিগ্রহণ অনুযায়ী ১.৪৭৬ একর জমি বরিশাল নাইট কলেজকে প্রদান করেন।

স্বাধীনতার পরবর্তি সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে কলেজে মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে চালু হয় অনার্স কোর্স। ১৯৮৬ সালের ১৪ নভেম্বর কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়। বরিশাল নাইট কলেজের পরিবর্তে এর নামকরণ হয় সরকারি বরিশাল কলেজ। একই সময় এর নৈশ শাখাও বন্ধ হয়ে যায়।

বর্তমানে প্রায় ৫ একর জমির ওপর রয়েছে সরকারি বরিশাল কলেজের সব স্থাপনা। এখানে ১টি একাডেমিক ভবন, ১টি প্রশাসনিক ভবন, ১টি মাস্টার্স ভবন, ১টি মসজিদ, ডাকঘর ১টি, ছাত্র সংসদ ভবন, সাইকেল গ্যারেজ, লাইব্রেরি (একাডেমিক ভবনের ভিতরে), বিশাল মাঠ ও তমাল গাছ রয়েছে।

– হাছিব আর রহমান/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন