বেফাক ও কওমী মাদরাসা সংকট : মূল প্রশ্ন আড়ালেই থাকছে

কওমী মাদরাসার চলমান বিতর্ক

প্রকাশিত: ৩:০৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২০

বেফাকুল মাদারিস আল আরাবিয়া বাংলাদেশের ইসলামী জ্ঞান কেন্দ্রসমুহের সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান। এই জ্ঞানকেন্দ্র যেগুলোকে মাদ্রাসা বলা হয় সেগুলোর ভিত্তি রচিত হয়েছে তাকওয়া ও ইখলাসের ওপরে, এই মাদ্রাসাগুলো বিকশিত হয়েছেও তাকওয়ার ওপরে ভর করে এবং এখনো টিকে আছে সেই তাকওয়া ও ইখলাসের ভিত্তিতেই। কওমী উলামায়ে কেরামের আত্মত্যাগ, খোদাভীতি, আল্লাহ নির্ভরতা, একনিষ্ঠতার এই বয়ান কোন দাবী না বরং এগুলো তথ্য। যা যুগের পরে যুগ নানা সংকটে প্রমানিত হয়েছে।

এখনো পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়, বর্তমান সমাজের অন্য সকলের চেয়ে এই উলামায়ে কেরাম সততা, একনিষ্ঠতা ও আমানতদারিতায় সেরা।

বেফাকে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের বয়স বা একজন একাধিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এবং তাদের চেয়ে যোগ্যরা পদের বাহিরে থাকার প্রশ্ন উঠলেও স্বয়ং তাদের যোগ্যতা, ইলমি খ্যাতি, প্রাশাসনিক দক্ষতা ও বুজুর্গি কওমী অঙ্গনে প্রবাদ প্রতিম। তারা দীর্ঘদিন শাইখুল হাদিসের মতো নিখাদ যোগ্যতা নির্ভর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। (শাইখুল হাদিস হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা কোন সার্টিফিকেট বা কোন লবিং করে অর্জন করা যায় না)। তারা যেসব মাদ্রাসার নেতৃত্ব দিয়েছেন বা দিচ্ছেন সেগুলোও দেশের শীর্ষ মাদ্রাসা। তাদের নেতৃত্বেই এসব মাদ্রাসা শীর্ষে পৌছেছে। তারা জীবনে কম অর্থ নাড়াচাড়া করেন নি।

বেফাক থেকে তিনজন বরখাস্ত : দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত চলবে

বেফাকের ফোনালাপ ফাঁস ও মার্কশীট দুর্নীতি : ফেঁসে যেতে পারে শতাধিক মাদরাসা

সব মিলিয়ে তারা কওমী অঙ্গনের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। যা তাদের ইলমি-আমলী যোগ্যতা, তাকওয়া, পরহেজগারি ও আমানতদারিতার মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে।

  • হ্যাঁ! বর্তমান গরম হাওয়ায় উত্তপ্ত হয়ে কেউ তাদের অতিতের সকল অর্জনকে অস্বীকার করে বসতে পারেন। অতি আবেগের বশবর্তী হয়ে সেটা করার অর্থ হবে গোটা কওমী ব্যবস্থা ও ঐহিত্যকে অস্বীকার করা।

একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হবে। চলতি সাহেদ কাণ্ডে একটি প্রশ্ন উঠছে যে, সাহেদ তৈরি হলো কি করে? কারা তাকে এতো প্রশ্রয় দিয়েছে? এর পরের প্রশ্নই হয় তার দলের চরিত্র ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে। বিশ্বাস করা হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক চরিত্র, দলগুলোর চরিত্র ও তার দলের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার দুর্নীতিই সাহেদ তৈরি করে। মানে এখানে সাহেদকে অভিযুক্ত করার অর্থ শুধু সাহেদ ব্যক্তি থাকছে না বরং তার রাজনৈতিক দল, দলের চরিত্র, দেশের রাজনৈতিক চরিত্রকেও অভিযুক্ত করা হচ্ছে। যদিও সাহেদ ঐ পাড়ার শীর্ষ ব্যক্তি না।

এখন কওমী অঙ্গনের শীর্ষ ব্যক্তিদের তাকওয়া, পরহেজগারি, আমানতদারিতা নিয়ে যদি নির্বিচার প্রশ্ন তোলা হয় তাহলে একই ভাবে গোটা কওমী অঙ্গনের তাকওয়া, পরহেজগারি, আমানতদারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু সত্য হলো, এগুলোই কওমী অঙ্গনকে টিকিয়ে রেখেছে, বিকশিত করেছে।

– তাহলে চলতি বেফাক সংকটকে  কিভাব ব্যাখ্যা করা যাবে?

  • বেফাকের চলতি সংকটের মূল কারণ কারো সততা, তাকওয়া ও আমানতদারিতার অভাব না বরং সংকটের মূল কারণ “বেফাকের সাংগঠনিক কাঠামো, নীতিমালা, পেশাদারিত্ব, কর্মপদ্ধতি(Rules, regulation, procedure)”।

বেফাকের চলতি সংকট কোন ব্যক্তির তাকওয়া, পরহেজগারি, আমানতদারিতার অভাবে তৈরি হয় নি বরং তৈরি হয়ে বেফাকের সুনির্দিষ্ট  সাংগঠনিক কাঠামো, নীতিমালা, পেশাদারিত্ব, কর্মপদ্ধতি(Rules, regulation, procedure) না থাকার কারণে। এবং বিস্ময়করভাবে কেউই এই বিষয়ে নজর দিচ্ছেন না। বেফাকের সাংগঠনিক কাঠামো, নীতিমালা, পেশাদারিত্ব, কর্মপদ্ধতি(Rules, regulation, procedure) নিয়ে কথা না বলে সবাই কথা বলছে ব্যক্তিকে নিয়ে, প্রশ্ন তুলছে ব্যক্তির সততা, তাকওয়া ও আমানতদারিতা নিয়ে।

মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস দা.বা. এখন কেবলই একজন ব্যক্তি? তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয়  কওমী মাদ্রাসা ফরিদাবাদের দীর্ঘ দিনের মুহতামিম ও শাইখুল হাদিস। এখন যদি তার সততা, তাকওয়া ও আমানতদারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তাহলে তো এই প্রশ্নও উঠবে যে, উনি এতো খারাপ মানুষ হয়ে এতো উচ্চপর্যায়ে পৌছলেন কি করে বা এতো দিন এতো সন্মানিয় দায়িত্ব পালন করলেন কি করে? তাঁকে যে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে তেমন নেতিবাচক একজন মানুষ যদি দেশের শীর্ষ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান হয় তাহলে তো বলতেই হবে যে, দেশের ধর্মীয় অঙ্গন পুরোটাই তার মতোই নেতিবাচক।

আরও পড়ুন :  আল্লামা আ. কুদ্দুসের সভাপতিত্বে হাইআর বৈঠক : চামড়া সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি

যারা পূর্ণ আবেগ নিয়ে বেফাকের নেতৃবৃন্দের ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাদেরকে সবিনয়ে মনে করিয়ে দিতে চাই, যেকোন ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ধর্মবিরোধীরা সবসময়ই ধর্মীয় নেতাদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তাওহিদি দাওয়াতের মোকাবিলা করতে গিয়ে কাফেররা তাওহিদের বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তি দাড় করায় নাই বরং রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাগল, ক্ষমতালোভি ইত্যাদি বলে তার চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। একইভাবে পৃথিবীর সমস্ত নবীদের চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

কারণ কুচক্রীরা জানে, ধর্ম প্রচারিত হয় ব্যক্তি দিয়ে। ব্যক্তিকে কলংকিত করা গেলে ধর্মকেও কলংকিত করা যায়।
বাংলাদেশে কওমী মাদ্রাসা নিয়ে এযাবৎকালে কম ষড়যন্ত্র হয়নি। আলহামদুলিল্লাহ! প্রত্যেকটা ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া গেছে। কিন্তু এবার তারা কওমী শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের সততা, তাকওয়া ও আমানতদারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে যে ষড়যন্ত্র করছে তাতে মনে হচ্ছে এবার কওমী বিরোধীরা এবার সফল হবে। কওমী শীর্ষ ব্যক্তিদের সততা, তাকওয়া ও আমানতদারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কওমী মাদ্রাসার নৈতিক জায়গাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে এবং এর মাধ্যমে ইসলামের নৈতিক বয়ান ও নৈতিকতা চর্চার দাবীকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ইসলামকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে। যার শেষফলে দেশকে ইসলামমুক্ত করা হবে।

আমার এই কথাকে যাদের কাছে অবান্তর মনে হচ্ছে তারা ইউরোপের সেক্যুলার হওয়ার ঘটনা প্রবাহ দেখতে পারেন। ইউরোপকে ধর্মমুক্ত করার প্রথম পদক্ষেপ ছিলো সেখানকার ধর্মীয় নেতাদের চরিত্র নিয়ে ও তাদের সততা, তাকওয়া ও আমানতদারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। আজকের বাংলাদেশে যারা বেফাক সংকটে বেফাকের সাংগঠনিক কাঠামো, নীতিমালা, পেশাদারিত্ব, কর্মপদ্ধতি(Rules, regulation, procedure নিয়ে কথা না বলে সকল দায় ব্যক্তির সততা, আমানতদারিতার ওপরে চাপিয়ে ব্যক্তির চরিত্র হননের পেছনে ছুটেছেন, ব্যক্তির চরিত্র নিয়ে লেখালেখি করছেন, মানববন্ধনের আয়োজন করছেন তারা জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারেই বাংলাদেশকে উগ্র সেক্যুলারাইজেশনে সহায়তা করছেন।

(কোন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক নেতার রাজনৈতিক সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আর ধর্মীয় সমস্যার ব্যাখ্যাদাতা হিসেবে স্বীকৃত কওমী মাদ্রাসার ইলমি প্রধান শাইখুল হাদিসের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এক জিনিস না)

আবারো বলছি, বেফাকের চলতি সংকট কোন ব্যক্তির সততা-আমানতদারিত্বের ঘাটতির কারণে হয়নি বরং এই সংকটের মূল কারণ বেফাকের সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো, নীতিমালা, পেশাদারিত্ব, কর্মপদ্ধতি(Rules, regulation, procedure না থাকা।

বেফাকের কোন সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক পদবিন্যাস, কর্মকর্তা নির্বাচনের নীতিমালা, তাদের যোগ্যতা কি হবে, কোন পদ্ধতিতে নিয়োগ হবে, কর্মকর্তাদের শর্ত কি হবে, তারা কতক্ষণ অফিস করবেন, কর্মকর্তাদের সুযোগ, সুবিদা সংক্রান্ত নীতিমালা, কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারন, কর্মকর্তাদের মেয়াদ, রিপোর্টিং পদ্ধতি ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট করা নাই।

এগুলো চলছে কিছুটা প্রথা, কিছুটা অভিজ্ঞতা ও কিছুটা মিটিংয়ের রেজুলেশন দিয়ে। ফলে বিতর্ক উঠছে, প্রশ্ন উঠছে।

কোন সংগঠনের Organisational Organogram, selection procedure, rules, regulation, terms, conditions, tenure, reporting system,  job description, monitoring, supervision, evaluation ইত্যাদি ভালোভাবে করা থাকলে সেখানে এমনিতেই দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে। আর এগুলো না থাকলে যেকোন প্রতিষ্ঠানেই বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে, প্রশ্ন উঠবে, সমালোচনা হবে এবং প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হবে।

বেফাকের চলতি সংকটও এই কারণে তৈরি হয়েছে। কারো সততা-আমানতদারিতার অভাবে তৈরি হয় নি।

কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, কেউই এই বিষয়ে কথা বলছে না। সবাই ব্যস্ত ব্যক্তি সমালোচনায়। কেউই পদ্ধতি পরিবর্তনের কথা বলছে না, সবাই ব্যক্তি পরিবর্তনের কথা বলছে। নীতির পরিবর্তন না করে সবাই নেতা পরিবর্তন করার শ্লোগান তুলছে। এটা করতে গিয়ে তরুণ কওমী প্রজন্ম নিজেদের অজান্তেই দেশকে উগ্র সেক্যুলারাইজেশনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সেজন্য অনুরোধ করবো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন ভালো কথা। কিন্তু সেটা যেনো বুমেরাং না হয়। সঠিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ করলে লক্ষ্য অর্জন হয় আর ভুল পথে অন্যায়ের প্রতিবাদ আরো বড় অন্যায় ও সর্বনাশ ডেকে আনে।

বেফাক সংকটের মুল কারণ বেফাকের সাংগঠনিক সক্ষমতা, যোগ্যতা ও অপূর্ণাঙ্গতা নিয়ে কথা বলুন, বেফাককে আরো সমকালীন সাংগঠনিক কৌশল অবলম্বনের কথা বলুন। বেফাক সংকটের জন্য ধর্মীয় শীর্ষ ব্যক্তিদের চরিত্র, সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইসলাম বিরোধীদের হাতকে শক্তিশালী করবেন না দয়া করে।

আরও পড়ুন : 

মাদরাসা খুলতে সরকারের সাথে যোগাযোগে হাইআর সাব-কমিটিতে আছেন যারা

বেফাকে অনিয়ম : বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ

আরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন