সৌদি জেলখানার সেই দিনগুলি : মুফতী ফয়জুল করীমের বিশেষ সাক্ষাৎকার

সৌদি জেলখানার

প্রকাশিত: ৮:৪৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২০
সৌদি জেলখানার সেই দিনগুলি : মুফতী ফয়জুল করীমের বিশেষ সাক্ষাৎকার।

আজ থেকে ৫ বছর আগে ২০১৫ সালের জুলাই মাসের ১১ তারিখে সৌদি আরবে বিশেষ একটি আলোচিত ঘটনার পর দেশে ফিরেছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম।

ধর্মীয় দাওয়াত ও সাংগঠনিক সফরে ২০১৫ সালের মে মাসের ১২ তারিখে মধ্যপ্রাচ্যে সফরে গিয়েছিলেন তিনি। প্রথমে ওমানে গিয়ে ২৫মে পর্যন্ত ওমান ছিলেন। সেখান থেকে ২৬মে তারিখে ওমরা হজ্ব পালন করতে বাইরোড হয়ে সৌদি যাওয়ার পর সেখানে একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে।

  • ২৮ মে রাতে রিয়াদে পৌঁছার পর তাকে সেখান থেকে কিছু মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় সৌদি পুলিশ। এরপর প্রায় ৪০ দিন তিনি সৌদি আরবের জেলখানায় বন্দি ছিলেন। এরপর সকল অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে তিনি ১১ জুলাই বাংলাদেশে ফিরেছিলেন। বিশাল গণসংবর্ধনার মাধ্যমে মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীমকে সেদিন বরণ করে নিয়েছিলো দলের নেতাকর্মীরা। সৌদি আরব সরকার এর সাথেও এরপর সম্পর্ক জোরদার হয়েছিলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের। এরপর চরমোনাই মাহফিলে একাধিকবার উপস্থিত হয়েছিলেন সৌদি আরবের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বিশেষ মেহমানসহ একাধিক রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ।

সৌদি আরবের সেই ঘটনা কেন ঘটলো, কারা এসবের জন্য দায়ী ছিলো, কিভাবে তারপর তিনি ফিরে এলেন এসব নিয়ে দীর্ঘ আলাপ হয়েছিলো মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীমের (শায়খে চরমোনাই) সাথে। এ বিষয়ে শায়খে সাথে একান্ত আলাপ করেছেন (৫ বছর আগে) পাবলিক ভয়েস নির্বাহী সম্পাদক হাছিব আর রহমান।

বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে যাওয়ার আগে পাঁচ বছর পরে এসে এ বিষয়ে মুফতী ফয়জুল করীম কী ভাবছেন তা জেনে নেওয়া যাক।

[মুফতী ফয়জুল করীম। ছবিঃ পাবলিক ভয়েস]

দুঃখজনক সেই ঘটনা নিয়ে পাঁচ বছর পরে এসে আজকের দিনে মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম এর সাথে পাবলিক ভয়েস এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন –

‘তখন একদল ষড়যন্ত্রকারীরা এ বিষয়ে ষড়যন্ত্র করে আমাকে সৌদি আরবের জেলে বন্দি রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে বিষয়টি পরবর্তীতে এসে ইসলামী আন্দোলন তথা চরমোনাই তরিকার জন্য অনেক ভালো ফলাফল বয়ে এনেছিলো। সৌদি আরবের সাথে আমাদের একটি দীর্ঘ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে তাদের সাথে এক ধরনের একটি বড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এখন চরমোনাই মাহফিলে সৌদি আরবের অনেক বড় বড় মেহমানরা উপস্থিত হন। তাদের সাথে আমাদের রাজনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়। তাছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও এই ঘটনার কারণে অনেক বড় উদ্দীপনা এবং উৎসাহ তৈরি হয়েছে। যা আমাদের দ্বীন কায়েমের মিশনকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করেছে বলেই মনে করছি। এরপর তিনি পবিত্র কোরআনের উদ্বৃতি দিয়ে বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন – “হতে পারে কোন বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে কোন বিষয় তোমরা পছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যানকর। বস্তুত আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।” (সূরা বাকারা, আয়াত ২১৬)

মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার :

হাছিব : আপনার শারিরিক অবস্থা এখন কেমন?

শায়খে চরমোনাই : আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তায়ালার অশেষ মেহেরবানিতে ভালো আছি। দীর্ঘ দিন অন্য পরিবেশ, অন্য আবহাওয়ায় ছিলাম, দীর্ঘ সফর করেছি তাই শারিরিক অবস্থা কিছুটা দুর্বল ছিলো। এখন আলহামদুলিল্লাহ কিছুটা সুস্থতার দিকে।

হাছিব : এবার কোন কোন দেশ আপনি সফর করেছেন? এবং সফরটা কিভাবে শুরু হয়েছে ?

শায়খে চরমোনাই : আমি তো আগে থেকেই বিভিন্ন দেশ সফর করে আসছিলাম সেই নিয়মেই মধ্যপ্রাচ্যে এবার সফর শুরু করলাম। মে মাসের ১২ তারিখে বাংলাদেশ থেকে সফর শুরু করে ঐ দিনই ওমানে গিয়ে পৌঁছলাম। ওমানের বিভিন্ন যায়গায় সফর শেষ করার পর ২৬-ই মে আমরা ওমরা করার নিয়তে বাইরোড হয়ে সৌদি যাওয়ার প্রোগ্রাম ঠিক করেছিলাম

হাছিব : বিমান রেখে বাই রোডে সফর কেন?

শায়খে চরমোনাই : কারন প্লেনে সফর করলে দেশের মানযার তথা দৃশ্যাবলি সে ভাবে দেখা যায় না আর আল্লাহ তায়ালা বলেছেন ‘সি-রু ফিল আরদ ফানযুর…’ গাড়িতে সফর করলে যেহেতু জাযিরাতুল আরবকে প্রাণভরে দেখতে পারবো তাই এ নিয়তেই সে পথে সফরের ইচ্ছা করলাম। এভাবেই ২৬ মে আমরা মাসকট থেকে রওয়ানা হয়ে আল-বিরুণী এলাকা পার হয়ে ২৭ মে তারিখে ‘আলাইনা’ এসে পৌঁছলাম। এরপর আবু জাবি ইমিগ্রিশন চেকআপ করিয়ে সৌদি বর্ডার পার করলাম।

হাছিব : সৌদি বর্ডার পার হতে কোন ঝামেলা পোহাতে হয়েছে কি না?

শায়খে চরমোনাই : না, সেখানে কোন বিড়ম্বনা বা ঝামেলা ছাড়াই তাদের পুর্ণ আন্তরিকতার সাথে আমাদের ছাড়পত্র দিয়ে দেয়া হয়েছে সৌদিতে ইন (প্রবেশ) করতে। এরপর ঐ দিনই অর্থাৎ ২৭ মে তারিখেই সৌদির দাম্মামে আমরা এশার সালাত (নামাজ) আদায় করলাম। এরপর আমার বোন জামাই মাও. আলতাফ (যিনি সৌদির একটি মসজিদ এবং মাদ্রাসার খেদমতের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন) ওনার মসজিদে এবং ওনার মেহমান খানাতেই সেখানের প্রবাসীদের সাথে কুশলাদি বিনিময় করে বিশ্রাম নিলাম।

হাছিব : দাম্মামে এবং রিয়াদে আপনার প্রোগ্রামগুলো কিভাবে সেট করা হয়েছিলো?

শায়খে চরমোনাই : যেহেতু আমাদের সফর বাই রোড ছিলো তাই পথে পথে যারা আমাদের মুহিব্বিন ছিলো তারাই এই প্রোগ্রামগুলো সেট করেছিলো।

হাছিব : কি ধরনের প্রোগ্রাম ছিলো সেগুলো?

শায়খে চরমোনাই : প্রোগ্রামগুলো মূলত দাওয়াতী প্রোগ্রাম ছিলো। তারা (সমর্থকরা) ভেবেছে আমরা যেহেতু ঐ পথ হয়েই যাচ্ছি তাই পথে পথে যাত্রাবিরতি করে একটু বিশ্রাম এবং তাদেরকে কিছু নসিহত করে তবেই আমরা যাবো। এবং এই নেক ইচ্ছাতেই এটা তারা করেছেন। উল্লেখ্য আমাদের সফরসূচি এবং প্রোগ্রামগুলো ইন্টারনেট এবং ফেসবুকের মাধ্যমে বেশ প্রচারিত হয়ে গেছিলো তাই যায়গায় যায়গায় আশাতিত মানুষ সাড়া দিয়েছে আমাদের প্রোগ্রামগুলোতে।

হাছিব : অনাকাংখিত ঐ ঘটনাস্থল রিয়াদে কখন কিভাবে পৌছলেন?

শায়খে চরমোনাই : ২৮ মে তারিখ দিবাগত রাতে আমরা গাড়িতে করেই রিয়াদে পৌছলাম। যেখানে আমাদেরকে রিসিভ করার কথা ছিলো রিয়াদ শাখা ইসলামী আন্দোলন সভাপতির কিন্তু ওনার আসতে একটু দেরি হওয়াতে আমাদের এক মুহিব্বিন যে ওখানের সাংবাদিক (মোঃ সাইফুল ইসলাম) আমাদেরকে রিসিভ করে তার গাড়িতে করে নিয়েছিলো রিয়াদের এক প্রোগ্রামস্থলে।

হাছিব : রিয়াদে আপনার অবস্থানের ব্যাপারে প্রশাসনের অনুমতি নেয়া ছিলো কি?

শায়খে চরমোনাই : হ্যাঁ, আমার রিয়াদে তিন ঘন্টার অবস্থানের ব্যাপারে সেখানের দায়িত্বশীল এক শেখের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নেয়াই ছিলো। কিন্তু তথাকথিত ঐ লা মাযহাবীরা আগে থেকেই আমার সফরের এসবের সূচি জেনে একটি নীল নকশা করে পূর্ব থেকেই আমার ছবি এবং পরিচয় দিয়ে রিয়াদ প্রশাসনের কাছে ১১টি মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে রেখেছিলো। যেটা মূলত তখন পর্যন্ত আমরা জানতাম না। এবং এটাই ছিলো সমস্যার মুল কারণ।

হাছিব : সেই অভিযোগগুলো কি আপনাদের কাছে এখন আছে?

শায়খে চরমোনাই : সেগুলো সব পূর্ণরূপেই আমাদের কাছে আসবে এবং সেগুলো সংগ্রহের জোর প্রচেষ্টাও আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। যেহেতু সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থার কাছে অভিযোগপত্রগুলো তাই সংগ্রহ করতে একটু সময় লাগছে তবে সেগুলো সংগ্রহ করে আমরা তা প্রকাশ করবো এবং তাদের মিথ্যাচারগুলো উম্মোচন করে দেবো।

হাছিব : তারা যে অভিযোগ করেছে এটা আপনারা জেনেছেন কিভাবে?

শায়খে চরমোনাই : যারা আমার মুক্তির ব্যাপারে সুপারিশ তদবির করেছে। সৌদি প্রশাসনই তাদেরকে অভিযোগগুলোর ব্যাপারে এবং কারা করেছে সেটা বলেছে! আর যেহেতু বাই রোড হয়ে আমার ওমরা পালনের পারমিশন ছিলো তাই দাম্মাম রিয়াদে আইনগত ভাবেই আমি অবস্থান করতে পারি তাই অবস্থানের অভিযোগে আমাকে গ্রেফতার করার প্রশ্নই আসে না।

হাছিব : মূলত কি ধরনের অভিযোগ তারা করেছে ? এ বিষয়ে জানেন কিছু?

শায়খে চরমোনাই : সবগুলো তো জানিনা। তবে মূল যে অভিযোগ ছিলো তা হলো আমি ‘আইএস’-এর সাথে যুক্ত! আল কায়েদার সাথে যুক্ত! ইয়ামেনের অস্থিতিশীল পরিবেশের ব্যাপারে জানি! আমি ভন্ড সুফিবাদ কায়েম করতে এসেছি ইত্যাকার নানান অবান্তর অভিযোগ ছিলো সেখানে।

যেমন আমাকে যে চার যায়গায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে সবাই-ই আমাকে বলেছে তুমি কি সুফী? আমি বলেছি যে, ‘মা মা’নাস সুফি’? সুফি বলতে তোমরা কি বুঝাচ্ছো? তারা বলেছে তুমি কি ঢোল বাজাও? আমি বললাম, নাউযুবিল্লাহ!

এরপর তারা বলেছে তাদের কাছে অভিযোগ আছে আমি ভন্ড বেদয়াতীদের মত নারী পুরুষ একসাথে জিকিরের নামে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে নাচানাচি করে বেদআ’ত ছড়াই! এবং তাদের কাছে বিভিন্ন ভন্ডদের কর্মকান্ডের সাথে আমার ছবি এডিটিং করে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে যেটা দেখে তারা ভেবে নিয়েছে আমিও ভন্ডদের মত বেদআতি ও শরিয়ত বহির্ভূত কর্মকান্ড করি। এসব কারণেই আমরা বুঝতে পেরেছি যে তারা আমার ব্যাপারে মিথ্যা অভিযোগের পসরা সাজিয়েছিলো।

হাছিব : রিয়াদে যে প্রোগ্রামটা হয়েছিলো সে ব্যাপারে প্রসাশনের কী অনুমতি ছিলো?

শায়খে চরমোনাই : সেটা তো আমার জানার কথা নয়! আমি তো সেখানের মেহমান। এক কথায় বলতে গেলে আমি তো “দইফুর রহমান” তথা আল্লাহর মেহমান! কারণ আমি ওমরা হজ্ব পালন করে গেছি। ওটা তো সেখানের যারা মুকিম তাদের জানার কথা। সর্বপরী সেই প্রোগ্রামে কেবল আমি একাই তো বয়ান করিনি বরং বলতে গেলে মেহমান হিসেবে আমি একা বয়ান করেছি। আমি ছাড়াও আমার আগেই সেখানে রিয়াদের এক মাদ্রাসার উস্তাদ এবং এক শেখ সেখানে বয়ান করেছেন। যদি ওই বৈঠক অবৈধ হবেই তাহলে সকলেই তো দোষি তাহলে আমাকে একা কেন সে অভিযোগে গ্রেফতার করা হবে? সে কারণেই বুঝা যায় যে আমাকে গ্রেফতারের পেছনে ঐ প্রোগ্রাম নয় বরং অন্য কারন দায়ী। যা হলো ঐ লা মাযহাবী ফেতনাবাজদের মিথ্যা অভিযোগগুলো। যা পরবর্তিতে প্রমানও হয়েছে যে তারা পরিকল্পিতভাবেই আমাকে গ্রেফতার করিয়েছে।

হাছিব : আপনার গ্রেফতার প্রক্রিয়া কি হঠাৎই ছিলো নাকি পূর্ব পরিকল্পিত?

শায়খে চরমোনাই : এটা পূর্বপরিকল্পিতই ছিলো। আমরা পরে জেনেছি যে – আসলে আমার গ্রেফতারটা রিয়াদে নয় বরং দাম্মাম বা সৌদিতে প্রবেশের সাথে সাথেই করানোর কথা ছিলো তাদের। কিন্তু দাম্মামের শেখের আহবানে আমি যেহেতু ওনার মেহমান ছিলাম তাই সেখানে তারা গ্রেফতার করাতে পারেনি। যেটা রিয়াদে করিয়েছে।

হাছিব : ঐ প্রোগ্রামে আলোচনা হয়েছিলো কোন বিষয়ে ?

শায়খে চরমোনাই : মূলত আলোচনা হচ্ছিলো তাওহীদ ও ঈমান নিয়ে। আমি আলোচনা করছিলাম এমন সময় আমার বোন জামাই এসে আমাকে বললেন আলোচনা সংক্ষেপ করতে হবে কারণ পুলিশ এসেছে। আপনার সাথে তারা কথা বলবে। আমি একটু বিপদের গন্ধ পেলাম। তাই আলোচনা সংক্ষেপ করে পুলিশদের সাথে কথা বলতে চলে গেলাম। পুলিশ আমাকে বললো আপনার পাসপোর্টটা একটু চেক করতে হবে তাই আমাদের সাথে একটু চলেন। যেহেতু আমার কোন দুর্বলতা নেই তাই আমি তাদের সাথে চলে গেলাম।

হাছিব : পুলিশের আচরণ তখন কেমন ছিলো ?

শায়খে চরমোনাই : পুলিশের ব্যবহার তখন বেশ ভালোই ছিলো। গাড়িতে তারা পূর্ণ এহতেরামের সাথেই আমার সাথে কথা বার্তা বলেছে। যে পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করতে এসেছে তাদের প্রধানের নাম হলো মোঃ শাম্মিরি। যিনি আমার সাথে জাযিরাতুল আরব নিয়ে বেশ সুন্দর কথাবার্তা বলেছে। আমিও তার সাথে বন্ধুর মতই কথা বলেছিলাম।

হাছিব : থানায় নেয়ার পর কোন কথার প্রেক্ষিতে আপনাকে আটক করেছে?

শায়খে চরমোনাই : আমার ব্যাপারে যে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছিলো সেগুলো যাঁচাই করতে একটু সময় লাগবে তাই থানায় থাকতে হবে বলেই আমাকে রেখেছে তারা। এবং আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ সেলে পাঠানো হয়েছিলো তখনই। এরপর তারা আমার রিয়াদ, দাম্মাম এবং সব যায়গার আলোচনার ফুটেজ এনে সেগুলো যাঁচাই করেছে এবং ইউটিউব থেকে আমার অনেক বয়ান সংগ্রহ আরবীতে ট্রান্সলেট করে শুনে দেখেছে। এরপর সব যাঁচাই বাছাই করে ৪০ দিন পর সব অভিযোগ মিথ্যা প্রমানিত হওয়ায় আমার সব অভিযোগ খারিজ করে আমাকে সম্মানের সহিত মুক্তি দিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।

হাছিব : ওখানে (জিজ্ঞাসাবাদ সেলে) থাকাকালীন আপনার দৈনন্দিন রুটিন কি ছিলো?

শায়খে চরমোনাই : আমি পুরোটা সময়ই ইবাদতে লিপ্ত থাকতাম। যিকির আযকার, মুরাকাবা, মুশাহাদা, এবং আত্মসমালোচনায়ই আমি দিন কাঁটাতাম। এবং এটাই ভাবতাম যে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত আমাকে ইবাদাত করার একটা মওকা দিয়েছেন। আমি রমজানের দশ দিনে ওখানে ৩ খতম কোরআন পড়েছি, কোন কোন দিন ১০০ রাকায়াত নফল নামাজ আদায় করেছি। আমি ভেবে দেখলাম যে আমার ৪০ বছর পার হওয়ার পর এমন একটা ধাক্কা আমার এছলাহের জন্য জরুরী ছিলো এবং আমি বিশ্বাস করি আমার যে সব গুনাহ ছিলো আল্লাহ তায়ালা এই পরীক্ষার মাধ্যমে আমার সে সব গুনাহ মাফ করিয়ে আমাকে ওখান থেকে বের করেছেন আলহামদুলিল্লাহ।

হাছিব : ওখানের কিছু সুখস্মৃতি বলুন আমাদেরকে!

শায়খে চরমোনাই : জেলখানায় আমার খুব একটা কষ্টে কাঁটেনি তাই পুরা সময়টাই সুখেরই ছিলো তারপরও কিছু জিনিস বেশি ভালো লেগেছিলো যেমন কয়েদীরা আমাকে মুফতী, মুফতী বলে ডাকতো। ওখানের অনেক দায়িত্বশীলরা আমার কাছ থেকে ঝাঁড় ফুঁক নিতো। পানি পড়া নিতো। অনেকে তো আমার জন্য হাদিয়াও এনেছে। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় যেটা ছিলো সেটা হলো ওখানের ইসরাফিল এবং ফারুক নামের দু’জন লোক আমার এত বেশি খেয়াল রেখেছে যে তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তারা আমার ব্যাপারে সবাইকে বলেছে যে ইনি বাংলাদেশের বড় আলেম। তাই সবাই আমার সাথে বেশ সম্মানের সহিত ব্যবহার করতো এবং প্ররচুর এহতেরামের সাথে আমার সাথে কথা বলতো। তারা আমার সর্বদিকের খেয়াল রাখতো। এসব অবশ্যই সুখের ছিলো।

হাছিব : আমরা জেনেছি ওখানে আপনি বাড়তি কিছু সুযোগ সুবিধা পেয়েছেন যেটা সৌদি জেলখানায় বিরল! এব্যাপারে যদি বাস্তবতা জানাতেন?

শায়খে চরমোনাই : কথাটা ঠিকই। আমি সেখানে বাড়তি অনেক সুযোগ পেয়েছি যেমন আমার খাবার-দাবার আলাদা ছিলো, আমি ফোন ব্যাবহার করতাম প্রতিনিয়ত, বিছানাপত্রও আলাদা দেয়া হয়েছিলো। অফিসারদের সাথে আমি কথাবার্তা বলতাম তাদের রুমে গিয়ে। আসলে আল্লাহ তায়ালাই এসব ব্যাবস্থা করেছিলেন কারন সত্যিকারেই তো আমি নিরপরাধ ছিলাম। আমাকে গ্রেফতার করা সেই অফিসারের (মোঃ শাম্মিরি) সাথে ওখানে কথা বলে যেটা জানতে পেরেছিলাম যে তারা আমাকে আসামী হিসেবে নয় বরং তাদের মেহমান হিসেবেই মানতো আলহামদুলিল্লাহ ।

হাছিব : সেখানের কষ্টের কিছু স্মৃতি?

শায়খে চরমোনাই : কষ্ট বলতে এতটুকু ছিলো যে বাশারিয়াত তথা মানুষ হিসেবে মনে মাঝে মাঝে একটু ভয়-ভীতি কাজ করতো যে কি হয় না হয়। ফয়সালা কি আসে এসব। তবে আল্লাহ তায়ালার উত্তম ফয়সালার উপড় আস্থা ছিলো আমার।

হাছিব : সৌদি সফরসহ এই সফরের মূল উদ্দেশ্য কি ছিলো?

শায়খে চরমোনাই : মুলত দাওয়াতটাই মুল উদ্দেশ্য ছিলো।

হাছিব : কোন ধরণের দাওয়াত ছিলো? চরমোনাই তরিকা ভিত্তিক নাকি অন্য কোন পন্থার দাওয়াত?

শায়খে চরমোনাই : আসলে দাওয়াতের ধরণটা ছিলো মানুষকে দ্বীনে ইসলামের দিকে ডাকা। দ্বীনের সমজ তথা বুঝ তৈরি করা। ‘আমি মুসলিম! আমার জন্য কি করণীয় বা কি বর্জণীয়? ঈমানে আমলের অবস্থা কি এসব মৌলিক বিষয়েই দাওয়াত দেয়া হয়েছিলো।’ অর্থাৎ মৌলিক বিষয়াদী নিয়ে আলোচনা হতো আর চরমোনাই তরিকা যেহেতু ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা অর্থাত রাসুল সঃ যেই চার তরিকা তথা দাওয়াত, তালিম, তাযকিয়া এবং জিহাদ এসবের সমন্ময়েই চরমোনাই তরিকা তাই ইসলামের মৌলিক বিষয়ে দাওয়াত দিলেই অটোমেটিকলি চরমোনাই তরিকার দাওয়াত হয়ে যায়। এবং আমরা সব যায়গাতেই দাওয়াতটা এভাবেই দিয়ে থাকি।

[চরমোনাই বাৎসরিক মাহফিলে সৌদি আরবের ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে আগত বিশেষ মেহমান বৃন্দ।]

হাছিব : এই দাওয়াতে ওখানকার স্থানীয়দের মাঝে প্রভাব কেমন?

শায়খে চরমোনাই : আসলে আমাদের প্রোগ্রামগুলো ওখানে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের জন্যই ছিলো। তারপরও দাওয়াতটা যেহেতু কোরআন হাদীস ভিত্তিক আর সারা বিশ্বে কোরআন হাদীস একই তাই স্থানীয়দের মাঝেও তার প্রভাব বেশ লক্ষণীয়, যেমন এমারত এবং ওমানের স্থানীয় অনেকেই প্রোগ্রামকারীদের বলেছে যে – আমি যেন সব সময় এখানে আসি এবং এমন কোরআন হাদিসের কথা বলি। এবং প্রতি বছর যেন আমাকে সেখানে নেয়া হয়। এ থেকে বুঝা যায় তাদের মধ্যেও এর আছর পড়ে থাকতে পারে।

হাছিব : মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশকে ইসলামের জন্য সবচেয়ে উপযোগী মনে হয়?

শায়খে চরমোনাই : আসলে ইসলাম ও শরিয়ত পালনের ক্ষেত্রে সৌদিয়ানরা এগিয়ে আছে আর ওমানের মানুষ বেশ নরম দিলের এবং তারা বেশ দ্বীন প্রিয় এবং ধর্মপ্রিয়। তাদের মধ্যে দ্বীনদারীও বেশি। মূল কথা বলতে গেলে গোটা আরব্য লোকগুলিই ইসলামপ্রিয় এবং দ্বীনপ্রিয়। এদের ভিত্তমূল স্বর্ণের মত নিখাদ এবং সুন্দর ছাচে তৈরি। আমি তো বিশ্বাস করি – আমরা আমাদের দেশে যেমন দাওয়াত, তালিমের মাধ্যমে লোকদেরকে যেভাবে দ্বীনের দিতে ডাকি ওদেরকে সেভাবে মেহনত করতে পারলে তাদের গোটা মানুষগুলো আল্লাহর ওলিতে পরিণত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

হাছিব : রিয়াদের এই অনাকাংখিত ঘটনায় যেই লা মাযহাবী ,আহলে হাদিসদের ইঙ্গিত রয়েছে বলেছেন তাদের সাথে আপনাদের মতবিরোধটা ঠিক কোন জায়গায়?

শায়খে চরমোনাই : মতবিরোধের কথা বলতে গেলে তো অনেক বড় করে বলতে হবে। সংক্ষেপে যতটুকু বলতে পারি তা হলো –
তাদের সাথে আমাদের ইসলামের শাখাগত কোন বিরোধ নাই। শাখাগত মাসয়ালা মাসায়েলের বিরোধ হলো চার ইমামের মধ্যে। মাসয়ালার বিভিন্ন শাখায় ইজতেহাদ করে চার ইমাম চারটি স্তম্ভ দাড় করিয়ে ইসলামের ঘর তৈরি করে দিয়েছেন। এবং সেটা মানাটাই আসলে সবচেয়ে উত্তম। তো, ঐ কথিত লা মাযহাবিদের আমাদের বিরোধটা হলো ইসলামের উসূল বা মুল ভিত্তিগত বিষয় নিয়েই। তাদের ফেতনাবাজি মানসিকতায় মানুষের মধ্যে ইবাদত এবং ইসলামের মূল ভিত্তিতে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় যেটাই তাদের উদ্দেশ্য অর্থাৎ ইবাদাতের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করিয়ে ইবাদাত নষ্ট করে দেয়া। এছাড়াও তারা ইসলামের মধ্যে ডিভাইডেশন তৈরি করে ইসলামকে দুর্বল করার খৃষ্টিয় মিশন বাস্তবায়ন করার কাজ করে।

[মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করিম এর জন্য সৌদি আরবের ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো বিশেষ উপহার।]

খৃষ্টানদের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই তারা কাজ করে যাচ্ছে বলে মনে করছি এবং তাদের কাজকর্মে দেখা যায় তারা আসলে ইসলাম থেকেই খারেজ হয়ে গেছে অর্থাৎ যখন যারাই ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেছে তাদেরই মসজিদ আলাদা হয়ে গেছে অথচ মসজিদ কখনও দুই ধরণের হতে পারে না। যেমন রাসুল সঃ এর যুগে মুনাফিকরা আলাদা মসজিদ বানিয়েছিলো ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে। শিয়ারা ইসলাম থেকে বেরিয়ে আলাদা মসজিদে নামাজ পড়ে। কাদীয়ানিরাও ইসলাম থেকে খারেজ হয়ে আলাদা মসজিদ তৈরি করেছে ঠিক তেমনি এই কথিত আহলে হাদিসদেরও মসজিদ আলাদা হয়েছে। বিভিন্ন যায়গায় দেখবেন যে আহলে হাদিস মসজিদ তৈরি হয়েছে। এবং এই মসজিদ আলাদা করার মাধ্যমেই তারা ইসলামের মধ্যে ডিভাইডেশন করে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় আমার সাথে সৌদির রিয়াদে এমন ঘৃণ্য আচরন করার পর এটাই প্রমান হয়েছে যে তথাকথীত এই লা মাযহাবিরা মানবতার দুশমন, ইসলামের দুশমন, দেশেরও দুশমন।

  • মানবতার দুশমন কারণ আমি যেই হই না কেন আমি তো একজন মানুষ! আমার সাথে তাদের ইলমি মতবিরোধ থাকতেই পারে তাই বলে বিদেশের মাটিতে আমার সাথে এমন ঘৃণ্য আচরন করবে তারা? আমাকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিয়ে হেনস্থা করবে? এটা কোন ধরনের মানবতা!

 

  • ইসলামের দুশমন কারণ আমি তো মানুষকে ইসলামের দিকেই ডাকি সেখানে আমার সাথে এমন আচরন ইসলামকে আঘাক করা নয় ? সর্বপরী ইসলাম ধ্বংশের মিশন নিয়েই তারা খ্রিষ্টিয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।

 

  • দেশের দুশমন কারণ আমিতো বাংলাদেশ থেকে গেছি। যতটুকুই হোক আল্লাহর মেহেরবানিতে বাংলাদশে তো আমাদের একটা পরিচিতি আছে। আমাকে তো অনেকেই চিনে সেক্ষেত্রে এই দেশের সম্মানিত লোককে বিদেশে অপরাধী বানানো এটা কি দেশের বদনাম তৈরি নয়? এছাড়াও তারা দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার লক্ষে চাঁদ দেখা কমিটির বিরোধিতা করে। দেশের ফতোয়া বোর্ড থেকে কোন ফতোয়া দেয়া হলে তার বিরোধিতা করে এ থেকে বুঝা যায় এরা আসলে দেশদ্রোহীও।

হাছিব : (আল্লাহ না করুক) আপনি যদি অনেক দিন সেখানে আটক থাকতেন তাহলে আপনার ভক্তদের ব্যাপারে কী বক্তব্য থাকতো?

শায়খে চরমোনাই : আমি তো চিন্তা করেই রেখেছিলাম যে আমাকে যদি অনেক সময় আটক থাকতে হয় তাহলে সেখানে বসে আমি কোরআন হেফজ করার মনোবাসনাটা পুরণ করে ফেলবো এবং একটা হিসেবও করে রেখেছিলাম যে দৈনিক কত পৃষ্টা করে পড়বো (মুচকি হাসি)। আর ভক্ত-মুহিব্বিনদের ক্ষেত্রে আমার পক্ষ থেকে ছবরে জামিল এখতিয়ার করা এবং আল্লাহ তায়ালার ফয়সালার উপড় খুশি থাকারই অনুরোধ থাকতো। আর একটা কাজ আমি সেখানে বসে করতে চেয়েছিলাম যেটা এখনও করবো তা হলো একটা বই লিখতে চেয়েছিলাম ‘দুনিয়ার জেল ও আখেরাতের জেল’ নামে! যেখানে আমি লিখবো যে আসলে জেলখানায় গেলে মানুষের মানসিক অবস্থা কী হয়! দুনিয়ার জেলে কি হয়, আল্লাহ না করুক কেউ আখেরাতের জেলে যেতে হলে তার কি অবস্থা হতে পারে এই ব্যাপারগুলো আমি সেখানে লিখবো এবং যেই বইটিতে আমার এবারের মধ্যপ্রচ্য সফরের সব ঘটনা হুবহু লিখবো ইনশাআল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ বইটি আমি মদিনা মুনাওয়ারার মসজিদে নববীতে বসে লিখতে শুরু করেছি।

[সৌদি আরব থেকে ফেরার পর বিশাল গাড়ি বহর দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয় মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম শায়খে চরমোনাইকে।]

শায়খে চরমোনাই : আমি মনে করি এই ঘটনার দ্বারা তারা চাঙ্গা হয়েছে। সঠিক-বেঠিকের পার্থক্য বুঝতে পেরেছে। কারা শত্রু, কারা মিত্র সেটা চিনতে পেরেছে। সর্বপরি আমার প্রতি তাদের আন্তরিকতা এবং মুহাব্বাত অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং তারা পূর্ণোদ্যমে কাজ করার একটা পথ পেয়েছে।

হাছিব : মুক্তির পর আপনার প্রতিক্রিয়া কী ছিলো? এবং তার পরের কিছু ঘটনা জানতে চাই?

শায়খে চরমোনাই : অবশ্যই মুক্তির আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করেছি। হিসেব করে দেখেছি আল্লাহ তায়ালা ইউসূফ আঃ কে যেমন আসামী করে জেলখানায় ঢুকিয়ে বাদশাহ করে বের করেছেন তেমনি আমাকে অভিযুক্ত হিসেবে জেলে নিয়ে সম্মানিত করে বের করেছেন। জেলখানা থেকে বের হওয়ার পর ধর্মমন্ত্রীর (সৌদি আরবের) পাঠানো লোক আমাকে রিসিভ করে সৌদি সরকারের মেহমান হিসেবে মক্কার হোটেল হলি-ডে ইন ফাইভষ্টার হোটেলে রেখেছেন। মদিনাতেও তেমনই একটা হোটেলে রাখা হয়েছে। ধর্ম মন্ত্রনালয়ের ব্যাবস্থাপনায় ওমরা হজ্ব পালন করেছি। ধর্মমন্ত্রীর সাথে দীর্ঘ দেড় ঘন্টা একান্তে কথা বলেছি। তাকে চরমোনাই মাহফিলে আসার দাওয়াত দিয়েছি। তিনি আমাকে সৌদি সরকারের মেহমানের তাযকিয়া দিয়েছেন। এমনকি সৌদি কিং পর্যন্ত এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন যেটা ঐ ধর্মমন্ত্রীই আমাকে বলেছেন। মন্ত্রী হাস্যজ্জল মুখে বলেছেন যে এই ঘটনা দ্বারা আপনি এবং আপনাদের সাথে আমাদের যোগাযোগের পথ প্রশস্ত হলো। আমরা পরিচিত হতে পেরেছি। আপনাদের দ্বীনি কাজ সম্পর্কে জানতে পেরেছি। ইনশাআল্লাহ আপনাদের সাথে যোগাযোগ জারি থাকবে। (হুজুর বলেন) আমরা তাদের সাথে সর্বপ্রকারের যোগাযোগ করে যাচ্ছি আলহামদুলিল্লাহ। আশা করছি – সৌদির সাথে আমাদের সম্পকের্র নতুন একটা দিগন্ত উম্মোচিত হবে ইনশাআল্লাহ। [বাস্তবেও তাই হয়েছে]

[সংবর্ধিত মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীম।]

হাছিব : এই অনাকাংখিত ঘটনার সমাধানে অনেকেই সচেষ্ট ছিলেন তাদের ব্যাপারে হযরতের মুল্যায়ন কি?

শায়খে চরমোনাই : আমার গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে গোটা দুনিয়ার আহলে হ্বক আর আহলে বাতেল দুই মেরুতে চলে গিয়েছে। আহলে হকরা সব এক যায়গায় চলে এসেছে আর আহলে বাতেলরা এক যায়গায় চলে গিয়েছে। সৌদির অনেক আলেম, শেখ ভারতের অনেক আলেম ওলামা, পাকিস্থানের, সাউথ আফ্রিকার, ইন্দোনেশিয়ার অনেক অনেক ওলামায়ে কেরামরা আমার পক্ষে জোড়ালো কথা বলেছেন। তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং আন্তরিক দোয়া থাকবে । অনেকেই আমার মুক্তির জন্য রোযা রেখেছেন, সদকা করেছে, চোখের পানি ফেলেছে, নফল নামাজ আদায় করে দোয়া করেছে তাদের ব্যাপারেও বলি যে আসলে এই মুহাব্বাতের প্রতিদানে আমি তো কিছু দিতে পারবো না। আল্লাহ তায়ালাই তাদেরকে সবচেয়ে উত্তম জাযা দান করবেন এবং তাদের জন্য সব সময় আমার দোয়া জারি থাকবে।

হাছিব : কোন কোন ওলামায়ে কেরাম সবচেয়ে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছেন?

শায়খে চরমোনাই : সবার নাম তো মনে রাখতে পারিনি তবে আমি সবার নাম সংগ্রহ করে তা প্রকাশ করবো তবে বিশেষভাবে যাদেরকে স্বরণ করি তারা হলেন – সৌদির শায়েখ আঃ হাফিজ মক্কী সাহেব, সৌদির ড. ইবরাহীম সাহেব, দেওবন্দের প্রধান মুফতী এবং মোহতামিম সাহেব, মাহমুদ মাদানী সাহেব, বাংলাদেশের মহিউদ্দিন খান সাহেব, যাত্রাবাড়ির মুহতামিম আল্লামা মাহমুদুল হাছান সাহেব, আমাদের শায়খ মিজানুর রহমান সাঈদ সাহেব, মুফতী শহিদুল্লাহ সাহেবসহ আরজাবাদ মাদ্রাসার ওলামায়ে হযরতরা সহ অনেকেই আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়েন তাই সবার কাছেই আমি শুকরগুজার। আল্লাহ তায়ালা এর জাযায়ে খায়ের দান করবেন সবাইকে।

হাছিব : আপনি দেশে আসার পর বিমানবন্দরে আপনাকে দেয়া বিরল সংবর্ধনার ব্যাপারে আপনার মুল্যায়ন কি ?

শায়খে চরমোনাই : আমি যতটুকু জেনেছি বারবার আমার শিডিউল পরিবর্তনের কারনে সংবর্ধনা আয়োজন বড় করা যায়নি। তবে অবশ্যই একটা আন্তরিক মুহাব্বাতের বহিঃপ্রকাশ ছিলো।

[সৌদি আরব থেকে ফেরার পর বিমানবন্দরে সংবর্ধিত মুফতি ফয়জুল করিম]

হাছিব : সর্বশেষ দেশবাসী এবং ভক্তদের উদ্দেশ্যে দু একটা কথা।

শায়খে চরমোনাই : আলহামদুলিল্লাহ আমি মনে করি আহলে হক এবং আহলে বাতেলদের সাথে মোটামুটি ইলমী যেই মতনৈক্য চলছে এই বাতেলদের মুখোশ উম্মোচন করতে হবে। সবার কাছে বাতেলের চরিত্র প্রকাশ করে দিতে হবে এবং হক দাওয়াতটা পৌছে দিতে হবে যার জন্য প্রথমত- ইলম অর্জন প্রয়োজন, দ্বিতীয়ত- মিডিয়াতে আমাদের বেশি বেশি পদচারণা দরকার। তৃতিয়ত- শত্রু যে পথে আসে সে পথেই তাকে বাধা দিতে হয় নয়ত শত্রু দমন হয় না। চতুর্থত- আজকে গোটা দুনিয়ার মধ্যে আহলে বাতেলরা তাদের মতাদর্শ প্রচারে যতটা সচেতন আমরা আহলে হকরা নিজেদের হক মতাদর্শ প্রচারে ততটা সচেতন নই। সেই সচেতনাই বাড়াতে হবে। তাই আমরা যে বিষয়গুলোতে এক যেমন কাদীয়ানিদের বিরুদ্ধে, আহলে হাদীসদের বিরুদ্ধে এমন অনেক কিছুতেই তো আমরা এক প্লাটফর্মে আছি তাই রাজনৈতিক ভাবে এক যায়গায় না আসতে পারলেও ইসলামের এই মৌলিক বিষয়গুলোতে আমরা এক হয়ে ইসলামের পক্ষে কাজ করে যাবো সেই আশাবাদ ব্যাক্ত করে সবার কাছে দোয়া চাই আমি।

হাছিব : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এত সময় ধরে বসে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য।

শায়খে চরমোনাই : তোমাকেও ধন্যবাদ আমার জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সাক্ষাৎকারে সংরক্ষিত করে রাখার জন্য।

[সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ২৩-৭-২০১৫ (চরমোনাইতে কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে বসে গ্রহণ করা]

মন্তব্য করুন