হেফাজত নিয়ে আল্লামা শফী ও বাবুনগরীর প্রতি মামুনুল হকের খোলা চিঠি

প্রকাশিত: ৪:২৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২০
হেফাজত নিয়ে আল্লামা শফী ও বাবুনগরীর প্রতি মামুনুল হকের খোলা চিঠি

… পরিস্কার করে বলতে গেলে, বাতাসে যে মাইনাস প্লাসের গুজব ভাসছে, আমরা সেটাকে গুজবের পরিধিতেই সীমাবদ্ধ দেখতে চাই। ওই অশুভ সংবাদটি যেন সত্যে পরিণত না হয়। এমনিতেই সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সেই প্রভাব আর নেই। এখন যেটা টিকে আছে, সেটা হলো- হেফাজতি গৌরব আর আত্মমর্যাদার পরিচয়।

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কওমি মাদ্রাসা দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী এবং অরাজনৈতিক আলোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন কথাবার্তা মধ্যেই প্রজন্মের পক্ষ থেকে আল্লামা আহমদ শফী ও আল্লামা বাবুনগরীর প্রতি খোলা চিঠি লিখেছেন বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস-এর সভাপতি শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহমাতুল্লাহ আলাইহির সন্তান মাওলানা মামুনুল হক।

আজ ৭ জুলাই (মঙ্গলবার) কওমী ফোরাম প্রজন্মের পক্ষ থেকে তিনি দীর্ঘ এই খোলা চিঠিটি লেখেন। চিঠির মধ্যে হেফাজতের বর্তমান টানাপোড়েন এবং হাটহাজারী মাদ্রাসা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা সমালোচনা ও আল্লামা শাহ আহমদ শফী এবং বাবুনগরী নিয়ে দুটি পক্ষের বিষয়ে আলোচনা করেন।

পাঠকদের জন্য সম্পূর্ণ ‘খোলাচিঠি’ এখানে প্রকাশ করা হলো –

শায়খুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফী এখন এমন এক বয়সে উপনীত, যখন মানুষের নিজস্ব কোনো চিন্তা গঠন হয় না। নিজে নিজে কিছু করার সক্ষমতার সময়গুলো তিনি ফেলে এসেছেন দূর অতীতে। এই পর্যায়ের মানুষদের চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও সক্রিয়তার পুরোটাজুড়েই থাকে ঘনিষ্ঠজনদের বিচরণ। তাই ভালো-মন্দের কৃতিত্ব-দায়টাও প্রধাণত তাদেরই প্রাপ্য। কিন্তু ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। ইতিহাস এমন মহানদের জীবনময় কর্মগুলোকে যেমন তাদের জীবনীতে আলোকপাত করে, তাদের শেষ জীবনের এই ঘনিষ্ঠজনদের তৎপরতাগুলোকেও তাদেরই জীবনসূচীতে গেঁথে রাখে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ইসলামপন্থীদের অবিস্মরণীয় ঐক্যমতের যে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা আল্লামা আহমদ শফী পেয়েছেন, তা এক কথায় অভূতপূর্ব ও অতুলনীয়। ২০১৩ সালে হেফাজতের অভ্যুদয় তাঁকে জাতীয় পর্যায়ের এই সমীহ জাগানিয়া উচ্চতায় আসীন করেছে। হাটহাজারীর গোশানাশীন বুজুর্গী থেকে তিনি বাংলাদেশের এক মহান প্রভাবক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। এই সময়টাতে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।

আল্লামা আহমদ শফীর এই সন্মান ও প্রভাব ওনাকে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের অবিসংবাদিত প্রতীকে পরিণত করেছে। এর পেছনে নিয়ামকের ভূমিকা রেখেছে ওনার সর্বজনগ্রহনযোগ্যতা তথা মাকবূলিয়তে আম্মাহ। কাজেই আজকের আল্লামা আহমদ শফী শুধু একজন ব্যক্তি নন, একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। যেই প্রতিষ্ঠানের ভিত রচনায় যেমন ব্যক্তি আহমদ শফীর শতাব্দীকালের কর্মের ভূমিকা রয়েছে, তেমনি ভূমিকা রয়েছে সারাদেশের ওই সকল আলেমদের, যারা বছর বছর ধরে তাঁর আনুগত্য করেছেন নির্দ্বিধায়, তাঁর নেতৃত্বের কথা জোরগলায় বলে বেড়িয়েছেন মিম্বর থেকে রাজপথে। একজন জাতীয় প্রভাবক আহমদ শফী বিনির্মাণের ইতিহাস রচিত হয়েছে বহু শহীদের লাল লহুতে। আল্লামা আহমদ শফী তাই ঘনিষ্ঠজনদের নিকট জাতির আমানত। শত শহীদের রক্তবিধৌত লাল উপাখ্যান।

হেফাজতের মহা জাগরণ যেমন গোশানাশীন আহমদ শফীকে জাতীয় প্রতীকে পরিণত করেছে, তেমনি হাদীসের মসনদনাশীন জুনায়েদ বাবুনগরীকেও দিয়েছে জাতীয় বীরের গৌরবজনক খেতাব। তাই আল্লামা আহমদ শফীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত ভিত্তিহীন অভিযোগ যেমন শুধু হাটহাজারী মাদরাসার এহতেমামের বিরুদ্ধেই চ্যালেঞ্জ নয়, বরং জাতির শ্রদ্ধার আসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার নামান্তর। তেমনি বাবুনগরীর দিকে অভিযোগের অঙ্গুল শুধু হাটহাজারীর হাদীসের মসনদকেই ঝাঁকুনি দেয় না, গোটা জাতির ভালোবাসার আসনেও আঘাত করে। আর তাই আল্লামা আহমদ শফীর বিরুদ্ধে আনীত ভিত্তিহীন কোনো অভিযোগের যেমন অপনোদন জরুরি, একইভাবে আল্লামা বাবুনগরীর দিকে উত্তোলিত অসৎ আঙ্গুলগুলোও মুড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। যারা প্রথমটি করেছেন, দ্বিতীয়টি করাও তাদের দায়িত্ব। যারা দ্বিতীয়টি করবেন, প্রথমটিও তাদেরকে স্মরণে রাখতে হবে। এই যে হেফাজতের জাগরণ, আহমদ শফীর সন্মান, বাবুনগরীর গৌরব আর শত শহীদের রক্তের ঋণ সব মিলিয়েই আমরা হেফাজতি। এটাই আমাদের স্পর্ধিত পরিচয়। এই পরিচয়েই আমরা শীর উঁচু করে আছি, সোজা রেখেছি মেরুদন্ডের হাড়।

আমরা এটাও বুঝি, হেফাজতে ইসলাম শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়, এটি একটি স্কুল অফ থট। একটি অমর চেতনার নাম। হেফাজতের সাংগঠনিক পরিচয়ের চেয়ে এর আদর্শিক পরিচিতিটা অনেক বেশি মহিয়ান। আল্লামা আহমদ শফী এবং আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর প্রতি প্রজন্মের আত্মমর্যাদাবান সন্তান হিসাবে প্রথমত আবেদন দ্বিতীয়ত অধিকার তৃতীয়ত দাবি আর সর্বশেষ আমাদের স্পষ্ট পয়গাম হচ্ছে, এই জনপদের রাসূলপ্রেমী জনতা আপনাদেরকে যে ভালোবাসা আর সম্মান দিয়েছে এবং যেই সুযোগ আর সুবিধার দুয়ার খুলে দিয়েছে প্রতিদানে আপনারা তাদের উঁচু মাথাটাকে লজ্জার গ্লানিতে ডুবিয়ে দেবেন না। তাদেরকে জাতির সামনে হাস্যকর বানাবেন না। নতুন কোনো অর্জনের পালক সংযোজন করার আর প্রয়োজন নেই, ন্যূনতম অর্জিত গৌরবের পরিচয়কে ধ্বংস করে দেবেন না।

পরিস্কার করে বলতে গেলে, বাতাসে যে মাইনাস প্লাসের গুজব ভাসছে, আমরা সেটাকে গুজবের পরিধিতেই সীমাবদ্ধ দেখতে চাই। ওই অশুভ সংবাদটি যেন সত্যে পরিণত না হয়। এমনিতেই সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সেই প্রভাব আর নেই। এখন যেটা টিকে আছে, সেটা হলো- হেফাজতি গৌরব আর আত্মমর্যাদার পরিচয়। হেফাজত সংগঠনের কাছ থেকে আমাদের চাওয়া এতটুকুই, আমরা ওই আত্মমর্যাদা আর গৌরবটুকু নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই, এগিয়ে যেতে চাই নতুন কোনো বালাকোট আর নতুন কোনো সাইয়্যেদ আহমদ শহীদের সন্ধানে। হেফাজতকে যে বা যারা দ্বিখণ্ডিত করবে, মাইনাস প্লাসের কাঁচি টানবে, তাদেরসাথে অন্য কেউ থাকলেও হেফাজতিরা নেই।

মাওলানা মামুনুল হকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে সংগ্রহিত

হেফাজত সংশ্লিষ্ঠ আরও সংবাদঃ

হেফাজতের মহাসচিব পদে রদবদলের গুঞ্জণ, সরগরম সোশ্যাল মিডিয়া

শুকরানা মাহফিল করে হেফাজত ভোলানো যাবে না : বাবুনগরী ইস্যুতে ৬৬ আলেম

‘সুপ্রভাত’ পত্রিকায় হেফাজত নিয়ে প্রতিবেদন : মুফতী ফয়জুল্লাহর প্রতিবাদ

ফিরে দেখা ৫ মে ; হেফাজতের ঢাকা অবরোধ

আনাস মাদানীর ফোনালাপ : মুখ খুললেন আল্লামা বাবুনগরী

মুঈনে মোহতামীমের পদ থেকে আমি পদত্যাগ চাইনি : আল্লামা বাবুনগরী

নাজিরহাট মাদরাসায় গোলযোগ : যা বলছেন মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী

সাঈদীমুক্তি ইস্যুতে বাবুনগরী! : বাংলাদেশ প্রতিদিনকে ১০ লক্ষ টাকার চ্যালেঞ্জ

মন্তব্য করুন