আয়াসোফিয়া নিয়ে কারও নাক গলানো মেনে নেওয়া হবে না : এরদোগান

আয়া সোফিয়ার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

প্রকাশিত: ৬:০২ অপরাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২০
আয়াসোফিয়া/হাজিয়াসোফিয়া/হাগিয়াসোফিয়া। ফাইল ছবি।

১৫ শত বছর আগে নির্মিত তুরস্কের ঐতিহাসিক স্থাপনা হাজিয়াসোফিয়াকে (তুর্কি নাম – ‘আয়াসোফিয়া’) জাদুঘর থেকে মসজিদে রুপান্তর করা নিয়ে বিশ্বের কিছু কিছু প্রতিক্রিয়ার জবাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান বলেছেন – “হাজিয়াসোফিয়া নিয়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে যে কোন কথা বা অভিযোগ সরাসরি আমাদের সার্বভৌমত্বকে আক্রমন করার সামিল হবে”।

একই সাথে স্পষ্টভাবেই এ বিষয়ে তুরস্কের প্রতি আনিত যে কোন অভিযোগকেই নাকচ করে দিয়েছেন এরদোগান।

ধারণা করা হচ্ছে গত বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও হাজিয়াসোফিয়া নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন – এই স্থাপনাটিকে মসজিদে রুপান্তর না করে জাদুঘর হিসাবে রেখে দেওয়ার জন্য তুর্কি সরকারের প্রতি আমি আহবান জানাবো। এবং এ বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কিছু কিছু সমালোচনার বিষয়েও তুর্কি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

কিন্তু সেই সমালোচনা এবং অভিযোগকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে এরদোগান বলেছেন – তুরস্ক সর্বদা মুসলমান এবং দেশে বসবাসরত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করবে। এবং আয়াসোফিয়ার ব্যাপারে আদালত যে কোন রায় দেবে।

তিনি আয়াসোফিয়ার ব্যাপারে যে কোন মন্তব্য বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন – “এ বিষয়টি আঙ্কারার নিজস্ব বিষয় এবং আয়াসোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করা না করাও তুরস্কের অভ্যন্তরীণ বিষয়।”

একই সাথে তুর্কি প্রসিডেন্ট উল্লেখ করে বলেন যে, তুরস্কে ৪৩৫ টি গীর্জা এবং বিভিন্ন উপাসনালয় রয়েছে যেখানে খ্রিস্টান ও ইহুদিরা প্রার্থনা করতে পারে। তাই ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় তুরস্ক বরাবরই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

প্রসঙ্গত : তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে বসফরাস প্রণালীর কোলঘেঁষে নির্মিত ঐতিহাসিক ভবন হাজিয়াসোফিয়াকে জাদুঘর থেকে মসজিদে পরিণত করা হবে কিনা – এ বিষঢে গত (২ জু্লাই) সেদেশের এক আদালতের যে রায় দেবার কথা ছিল, তা আগামী ১৫ দিনের জন্য পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগামী ১৫ দিন পর (১৭ জুলাই) এই স্থাপনাটিকে জাদুঘর থেকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হবে কিনা এ বিষয়ে তুরস্কের আদালত থেকে রায় ঘোষণা করা হবে। সেদিন ১৭ মিনিটের শুনানীর পর তুরস্কের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সংস্থা – দি কাউন্সিল অব স্টেট – বলেছে তারা ১৫ দিনের মধ্যে এ ব্যাপারে একটি রুলিং দেবেন।

[আয়াসোফিয়া মসজিদ। ফাইল ছবি।]

তবে ধারণা করা হচ্ছে হাজিয়া সোফিয়া তার পুরনো রূপ অর্থাৎ মসজিদের রূপেই ফিরে যাবে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান তুরস্কবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে আবার এটাকে মসজিদে পরিণত করতে চায়, এবং আদালত পক্ষে রায় দিলে তাই হতে পারে।

আয়াসোফিয়ার (হাজিয়া সোফিয়া) সংক্ষিপ্ত ইতিহাস :

তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের বসফরাস প্রণালীর কোল ঘেষে রয়েছে দৈত্যাকৃতির এক স্থাপত্যবিস্ময়। বাইজেন্টাইন শাসনামলে বানানো এই স্থাপত্যকর্মটির নামই ‘হাজিয়া সোফিয়া’। বলা হয়, অনন্য সৌন্দর্য আর বৈশিষ্ট্যের বাইজেন্টাইন স্থাপত্যবিস্ময় হাজিয়া সোফিয়া স্থাপত্যকলার ইতিহাসকেই বদলে দিয়েছে।

হাজিয়া সোফিয়া নির্মাণ করা হয়েছিল প্রায় ১,৫০০ বছর আগে একটি বাইজেন্টাইন খ্রিস্টান ব্যাসিলিকা হিসেবে। সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানের আদেশে এই হাগিয়া সোফিয়া নির্মাণ শুরু হয়েছিল ৫৩২ খ্রীষ্টাব্দে। ইস্তাম্বুল শহরের নাম তখন ছিল কনস্টান্টিনোপল, যা ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী – যাকে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যও বলা হয়। এই সুবিশাল ক্যাথিড্রাল তৈরির সময় তখনকার প্রকৌশলীরা ভূমধ্যসাগরের ওপার থেকে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে এসেছিলেন।

[বসফরাস প্রণালী ঘেঁষে দাঁড়ানো অনিন্দ্যসুন্দর আয়াসোফিয়া স্থাপনা]

হাজিয়া সোফিয়া নির্মাণ শেষ হয় ৫৩৭ সালে। এখানে ছিল অর্থডক্স চার্চের প্রধানের অবস্থান। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজকীয় অনুষ্ঠান, রাজার অভিষেক ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হতো এখানেই। বলা হয়ে থাকে প্রায় ৯০০ বছর ধরে এটি ছিল পূর্বাঞ্চলীয় অর্থডক্স খ্রিষ্টান ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু। তবে এ ইতিহাস প্রশ্নাতিত নয়। অবশ্য মাঝখানে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে একটি সংক্ষিপ্ত কালপর্ব ছাড়া, যখন চতুর্থ ক্রুসেডের সময় ইউরোপের ক্যাথলিকরা এক অভিযান চালিয়ে কনস্টান্টিনোপল দখল করে নেয়। তারা হাজিয়া সোফিয়াকে একটি ক্যাথলিক ক্যাথিড্রালে পরিণত করেছিল।

কিন্তু ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় ফাতিহ্ সুলতান মোহাম্মাদ কনস্টান্টিনোপলকে খেলাফতের আওতায় নিয়ে আসেন । এর নতুন নাম হয় ইস্তাম্বুল। চিরকালের মত অবসান হয় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের। হাজিয়া সোফিয়ায় ঢুকে বিজয়ী সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মদ নির্দেশ দেন এটাকে সংস্কার করে একটি মসজিদে পরিণত করতে। তিনি এই ভবনে প্রথম শুক্রবারের নামাজ পড়েন।

[এ যেন স্থাপত্যশিল্পের মাস্টার কপি]

এরপর ইস্তাম্বুলে ১৬১৬ সালে ব্লু মস্ক বা নীল মসজিদ নির্মাণ শেষ হওয়া পর্যন্ত হাগিয়া সোফিয়াই ছিল শহরের প্রধান মসজিদ। নীল মসজিদ সহ এ শহরের এবং বিশ্বের অন্য বহু মসজিদের নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করে এর স্থাপত্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৮ সালে শেষ হলে ইসলামী খেলাফত শেষ হয়। বিজয়ী মিত্রশক্তিগুলো তাদের ভূখন্ডকে নানা ভাগে ভাগ করে ফেলে।

এরপর তথাকথিত আধুনিক তুরস্কের স্থপতি মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক এটিকে জাদুঘরে পরিণত করে ১৯৫৩ সালে৷ এরপর থেকে তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক তুরস্কের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে আয়া সোফিয়াকে৷ এটি এখন ইউনেস্কো-ঘোষিত একটি বিশ্ব-ঐতিহ্য স্থান।

তুরস্কের পুরাতন অংশে বসফরাস প্রণালীর কোল ঘেঁষে নির্মিত এই স্থাপনাটি খ্রিস্টান এবং মুসলিম উভয় ধর্মের মানুষের কাছেই মর্যাদার বস্তু। কেননা, তুরস্কের বহু বছরের ঐতিহ্য আর ইতিহাসের ধারক-বাহক এই স্থাপনা। ইতিহাসের পালাবদলের সাথে সাথে বিভিন্ন সময় বদল হয়েছে এর পরিচয় এবং ব্যবহার।

[প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়া সোফিয়া স্থাপনা।]

তুরস্কের ভেতরে এবং বাইরে বহু গোষ্ঠীর জন্য হাজিয়া সোফিয়ার ১৫০০ বছরের ইতিহাস ব্যাপক ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। ১৯৩৪ করা এক আইনে এই ভবনটিতে ধর্মীয় প্রার্থনা করা নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো।

কিন্তু ইসলামপন্থীরা এবং ধার্মিক মুসলমানরা দাবি করেন যে হাজিয়া সোফিয়া আবার মসজিদে পরিণত করা হোক। তারা ওই আইনের বিরুদ্ধে ভবনটির বাইরে বিক্ষোভও করেছেন।

[আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরিত করতে বাহিরে বিক্ষোভ মিছিল এবং নামাজ আদায়]

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বক্তব্যে এই দাবির প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। গত বছর স্থানীয় নির্বাচনের আগে এক প্রচার সভায় দেয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, হাজিয়া সোফিয়াকে জাদুঘরে পরিণত করা ছিল এক “বিরাট ভুল।“ এর পর তিনি নির্দেশ দেন কিভাবে ভবনটিকে মসজিদে পরিণত করা যায় তা খতিয়ে দেখতে।

[আয়া সোফিয়া বাহিরে নামাজ পড়ছেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা]

সে ধারাবাহিকতায় আগামী কিছুদিনের মধ্যেই জানা যাবে বিশ্বের অনিন্দ্যসুন্দর এই স্থাপনাটি তার হারানো রূপ মুসলমানদের সর্বপবিত্র প্রার্থনাগার মসজিদ হিসেবে রূপান্তরিত হবে কিনা।

তথ্যসূত্র : হাজিয়াসোফিয়া ওয়েব, বিবিসি, রোর।

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন