বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবি : জড়িতদের শাস্তি ও নিহতদের ক্ষতিপূরণ দাবি ইশার

প্রকাশিত: ৩:৫৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২, ২০২০

গত ২৯ জুন ঢাকার শ্যামবাজার এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে ময়ূরি-২ নামের একটি লঞ্চের খামখেয়ালিপনায় ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ রুটের মর্নিং বার্ড লঞ্চডুবির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে মানববন্ধন করেছে ইশা ছাত্র আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলা। একই সাথে লঞ্চ ডুবির ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি এবং নিহতদের যথাযোগ্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে তারা।

গতকাল ১লা জুলাই (বুধবার) বিকাল ৫ টায় নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা লঞ্চঘাটে বিআইডব্লিউটিএ’র অব্যবস্থাপনায় লঞ্চডুবিতের প্রতিবাদে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলার উদ্যোগে এই মানবন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

শাখা সভাপতি শিব্বির আহমাদ এর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মাদ সারোয়ার হোসেনের সঞ্চালনায় উক্ত মানববন্ধনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ জেলার সংগ্রামী সভাপতি মাওলানা আনোয়ার হোসেন জিহাদী।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাওলানা আনোয়ার হোসেন জিহাদী বলেন, বাংলাদেশে আবারও লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে। এবার নিহতের সংখ্যা তিন ডজনের উপরে। ২৯ জুন সকালে সদরঘাটের শ্যামবাজার পয়েন্টে ময়ূর-২ নামের লঞ্চের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে যায় মর্নিং বার্ড লঞ্চ। নৌ-পুলিশের সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড হওয়া দুঘর্টনার দৃশ্যতে দেখা যায়, সকাল ৯টা ১২মিনিটে ফরাশগঞ্জ ঘাট সংলগ্ন কুমিল্লা ডক এরিয়ায় ঘাট থেকে পেছন দিকে (ব্যাকে) যাচ্ছিল ময়ূর-২।

এ সময় পেছনে থাকা মুন্সিগঞ্জ কাঠপট্টি থেকে আসা যাত্রীবোঝাই ‘মর্নিং বার্ড’ এর ওপর উঠে যায় দৈত্যাকার ময়ূর-২। মুহূর্তেই তলিয়ে যায় লঞ্চটি।
স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বেশি নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে মেঘনা নদীতে। কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। মৃত্যুবরণ ছাড়াও অনেকেই পঙ্গু হয়ে গেছেন সারাজীবনের জন্য। স্বাধীনতার পর মেঘনা নদীতে ছোট-বড় মিলিয়ে কমপক্ষে শতাধিক নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে নৌ দূর্ঘটনা কোনো নতুন বিষয় নয়। আমরা দেখেছি ২০০৩ সালের ৮ জুলাই ঢাকা থেকে লালমোহনগামী ‘এমভি নাসরিন-১’ চাঁদপুরের ডাকাতিয়া এলাকায় অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল বোঝাইয়ের কারণে পানির তোড়ে তলা ফেঁটে গেলে প্রায় ২ হাজারের বেশি যাত্রীসহ এটি ডুবে যায় মেঘনা নদীতে। আমরা আরও দেখেছি ২০০২ সালের ৩রা মে চাঁদপুরের ষাটনল সংলগ্ন মেঘনায় ডুবে যায় সালাহউদ্দিন-২ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চ। ওই দুর্ঘটনায় ভোলা ও পটুয়াখালী জেলার ৩৬৩ যাত্রী মারা যান। ২০০৬ সালে মেঘনা সেতুর কাছে ‘এম এল শাহ পরাণ’ লঞ্চ দুর্ঘটনায় ১৯ জন মারা যায়। ২০০৪ সালের ২২ মে আনন্দ বাজারে ‘এমভি লাইটিং সান’ লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৮১ জন এবং ও ‘এমভি দিগন্ত’ ডুবির ঘটনায় শতাধিক যাত্রীর মৃত্যু ঘটে। এছাড়া ভৈরবে মেঘনা নদীতে এমএল মজলিসপুর ডুবে ৯০ জনের মৃত্যু হয়। বার বার এ দুর্ঘটনা ঘটলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের টনক নড়ছে না। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তা আলোর মুখে দেখে না।

তাই বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান যেহেতু নৌ-পথে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে তাই জনাবকে আহবান করবো অনতিবিলম্বে আপনি পদত্যাগ করুন। নয়তো পীর সাহেব চরমোনাইর আহবানে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন এদেশের আপামর জনতাকে নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবে ইনশাআল্লাহ। কোনো দূর্নীতিবাজ, অসৎ, দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষকে আমরা এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দেখতে চাই না।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা সভাপতি শিব্বির আহমাদ বলেন, লালমোহন ও চরফ্যাশনের প্রায় ৮ লাখ মানুষ ও দক্ষিণবঙ্গের লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন হাতে নিয়ে উত্তাল পদ্মা, মেঘনা পাড়ি দিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে যাতায়াত করে থাকে। এসব মানুষ বাধ্য হয়ে লঞ্চে উঠলেও ভীত সন্ত্রস্ত থাকে। কোস্ট ট্রাস্ট নামের একটি বেসরকারি সংস্থা সম্প্রতি তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, স্বাধীনতার পর নৌ-দুর্ঘটনা নিয়ে ২০ হাজার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে প্রায় ২০০ টি মামলা। কিন্তু কারও কোনো শাস্তি হয়নি। এসব দুর্ঘটনা নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন হলেও কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি। এসব দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এগুলোতে পর্যাপ্ত লাইফবয়া ছিল না। এদিকে লঞ্চে আগুন লাগলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ‘কার্বন-ডাই অক্সাইড সিলিন্ডার’ রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বেশিরভাগ লঞ্চে এ ব্যবস্থা নেই।

জেলা সভাপতি শিব্বির আহমাদ আরও বলেন,
বুড়িগঙ্গা নদীতে সোমবার সকালে ডুবে যাওয়া যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি মর্নিং বার্ড লঞ্চটিতে সার্ভে সনদে একজন করে দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার ও ড্রাইভার থাকলেও দীর্ঘদিন থেকে অভিজ্ঞ মাস্টার ও ড্রাইভার ছাড়াই লঞ্চটির অপারেশন পরিচালিত হচ্ছিল। সার্ভে সনদ ও ফিটনেস নেওয়ার সময় নৌ অধিদফতরে জমা দেওয়া কাগজে কলমে একজন দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার ও একজন ড্রাইভার দেখানো হলেও বাস্তবে ওই লঞ্চে কোনো মাস্টার ড্রাইভার কর্মরত ছিল না।

মানববন্ধন থেকে তারা কিছু দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো হলো :

  • লঞ্চ ডুবিতে নিহতের পরিবারকে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
  • এই ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। বিআইডব্লিউটিএ’র অদক্ষ চেয়ারম্যানের পদত্যাগ করতে হবে।
  • নিরাপদ নৌ -পথ এর জন‍্য কার্যকর ব‍্যাবস্থা গ্রহন করত হবে

মানববন্ধনে আরো উপস্থিত ছিলেন, ইশা ছাত্র আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলার সহ-সভাপতি আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ হাসান, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হান্নান, প্রশিক্ষণ সম্পাদক মুহাম্মাদ আনোয়ার হোসেনসহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

মন্তব্য করুন