আলোচিত হোলি আর্টিজান হামলা : কী হয়েছিলো সেদিন, জেনে নিন অদ্যোপান্ত…

হলি আর্টিসান হামলার ৪ বছর

প্রকাশিত: ৩:৩০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২০

বিশ্লেষকরা মনে করেন – এ হামলার একান্ত কারণ হলো ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে রাষ্ট্রের উদাসীনতা এবং প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা সকলের কাছে পৌঁছানোর প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রের দুর্বলতা ও ব্যর্থতা। তাছাড়া ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন ধরনের খন্ডিত আলোচনা দেশের এলিট শ্রেণীর লোকদের কাছে পৌঁছে থাকে বলেই এ ধরনের ভুল চিন্তার মাধ্যমে সন্ত্রাসী হামলা হয়ে থাকে। কারণ হলি আর্টিজান হামলায় সম্পৃক্ত বেশিরভাগ তরুণরাই সর্বোচ্চ আধুনিক শিক্ষা এবং দেশের ইংলিশ মিডিয়াম সহ বিভিন্ন এলিট শ্রেণীর পরিবারের সদস্য। তাই এ ধরনের নৃশংস হামলা ঠেকাতে দেশের প্রতিটি অঙ্গনে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা বিস্তার এবং ইসলাম ধর্মের প্রকৃত মূল্যবোধ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সর্বাত্বক ভূমিকা রাখা একান্তই জরুরী।

হোলি আর্টিজান হামলার বিস্তারিত বর্ণনা :

পবিত্র রমজান মাস ছিলো তখন। ইংরেজি জুলাই মাসের প্রথম দিন। রাত তখন সোয়া ৯টা থেকে সাড়ে ৯টা হবে। দিনভর রোজা শেষে তারাবিতে মগ্ন ছিলো সারাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। কোথাও তারাবিহ পড়া চলছে, কোথাও আবার শেষ হয়েছে মাত্র। এরই মধ্যে ঘটে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর এক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা।

সেদিন গুলশানের হোলি আর্টিজান নামের একটি রেস্টুরেন্টে মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা উপস্থিত লোকজনদের জিম্মি করে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে, গুলি করে হত্যা করে একে একে ২০ জন দেশী-বিদেশী নাগরিককে। রাতভর জিম্মি করে রাখে আরো ৩২ জনকে। পরেরদিন পুলিশ ও সোয়াটের অভিযানের সময় হত্যা করে আরো দুই পুলিশ সদস্যকে। নিজেদের মধ্যে নিহত  হয় ৫ জন ভয়ংকর সন্ত্রাসী।

হোলি আর্টিজান হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম শীর্ষ ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলা। ২০০৫ সালে দেশ জুড়ে সিরিজ বোমা হামলার চেয়েও এই হামলা ছিলো ভয়ংকর এবং ক্ষতিকর।  সিরিজ হামলায় দেশের ৬৩ জেলার প্রেসক্লাব, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ঢাকার ৩৪ টিসহ সাড়ে ৪শ’ স্পটে প্রায় ৫শ’ বোমার বিস্ফোরণ ঘটেছিলো। এই হামলায় নিহত হন ২ জন এবং আহত হয় দু’শতাধিক মানুষ। কিন্তু হলি আর্টিসানে হামলায় নির্দিষ্ট একটি জায়গায় হলেও সারাদেশের মানুষের আতঙ্ক আর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এর ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশান-২ এর হোলি আর্টিজান (holy artisun) বেকারিতে আক্রমণ করে কয়েকজন মুখোশধারী সন্ত্রাসী। এ সময় দেশী-বিদেশি ২২ জন নাগরিককে হত্যা করে তারা। নিহতদের মধ্যে ইতালির নয় জন, জাপানি সাত জন, ভারতীয় এক জন, আমেরিকার এক জন ও বাংলাদেশী দুই জন সাধারণ নাগরিক ও দুই জন পুলিশ কর্মকর্তরা রয়েছেন। এছাড়াও সম্মিলিত বাহিনীর উদ্ধার অভিযানে ৫ হামলাকারী নিহত হয়। এবং উদ্ধার করা হয় হোটেলের একজন শেফ-এর লাশ।

প্রথমে ৬ জন হামলাকারী নিহত হয়েছে বলা হলেও পরবর্তীতে জানা যায় নিহতদের মধ্যে হামলাকারী ছিলো ৫ জন। ৬ জনের বাকী একজন ছিলো ওই হোটেলের শেফ। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সোয়াট টিমের সম্মিলিত অভিযানে ৩২ জন নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল।

যেভাবে হয়েছিলো পরিকল্পনা:

হামলাকারীরা প্রথমে ঢাকা মহানগর সম্পর্কে ধারণা রাখে এমন তিনজনকে বাছাই করে। গ্রাম থেকে বাছাই করা হয় আরো দুজনকে। এই পাঁচজনকে প্রথমে গাইবান্ধা পাঠানো হয়। সেখানে চলে প্রায় একমাসের (২৮ দিন) প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শেষে তারা ঢাকায় আসে। এরপর তারা গুলশান-বারিধারা এলাকায় হামলার জন্য উপযু্ক্ত টার্গেট খুঁজতে থাকে। সর্বশেষ তারা গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর রোডের ‘হোলি আর্টিজান বেকারি’কে তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করে। হোলি আর্টিজানকে টার্গেট মূল কারণ ছিলো সেখানে প্রচুর পরিমাণে বিদেশীদের আনাগোনা। তাদের লক্ষ্য ছিলো বিদেশী নাগরিক হত্যা করে দেশ ও দেশের বাইরে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। দেশকে একটা বৈদেশিক চাপে ফেলে নিজেদের ভয়ংকার শক্তিমত্তার জানান দেয়া। হামলাকারীদের অধিকাংশই ছিলো রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং অভিজাত পরিবারের সন্তান।

হামলার রাতে এই ছবি প্রকাশ করে আইএস নিয়ন্ত্রীত সংবাদ সংস্থা আমাক।

যেভাবে হামলা হয়:

হামলাকারীরা বসুন্ধরা এলাকার বাসা থেকে প্রথমে রিকশা ও পরবর্তীতে পায়ে হেঁটে হোলি আর্টিজানে আসে। এ সময় তাদের কাঁধে ব্যাগ আর পরনে ছিল টিশার্ট-জিনস-কেডস। আউটফিট এমন ছিলো যাতে প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রুত পালিয়ে বাঁচা যায়। হোলি আর্টিজানে ঢোকার সময় হামলাকারীরা নিজস্ব কোনো মোবাইল বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে যায়নি। যতক্ষণ তারা হোলি আর্টিজানের ভেতরে ছিলো ততক্ষণ তারা জিম্মিদের মোবাইল ও আইপ্যাড ব্যবহার করে ছবি তুলে মিরপুরের শেওরাপাড়ায় অবস্থানরত তাদের লিডার তামিম চৌধুরী এবং নুরুল ইসলাম মারজানের কাছে পাঠায়। পরবর্তীতে সোয়াট ও পুলিশের আলাদা অভিযানে তামিম চৌধুরী ও নুরুল ইসলাম নিহত হয়।

সোয়াটের অভিযান: 

সেনাবাহিনীর প্যারাকমান্ডোর নেতৃত্বে ঘটনা শুরুর পরদিন অর্থাৎ ২ জুলাই শনিবার সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে অপারেশন শুরু করে ১২-১৩ মিনিটে ঘটনাস্থলের নিয়ন্ত্রণ নেয়া সম্মিলিত অভিযান টিম। পরবর্তীতে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে প্রাথমিকভাবে সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত ৪টি পিস্তল, একটি ফোল্ডেডবাট একে-২২, ৪টি অবিস্ফোরিত আইআইডি, একটি ওয়াকিটকি সেট ও ধারালো দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এর আগে হামলাকারীদের আত্মসমর্পনের আহ্বান করা হলে তারা বেশ কিছু দাবি জানায়। তাদের দাবির মধ্যে ছিলো

  • ডেমরা থেকে আটক জেএমবি নেতা খালেদ সাইফুল্লাহকে মুক্তি দিতে হবে।
  • তাদেরকে নিরাপদে বের হয়ে যেতে দিতে হবে।
  • ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাদের এই অভিযান- স্বীকৃতি দিতে হবে।

নিহত পাঁচ হামলাকারী: 

হলি আর্টিজান বেকারিতে পুলিশও  সোয়াটের সম্মিলিত অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্টে’ নিহত পাঁচ হামলাকারী হলেন- রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।

অস্ত্রের যোগান:

হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও বিস্ফোরকসমূহের মূল যোগান আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও যশোর সীমান্ত দিয়ে। অস্ত্র যোগানে বড় ভূমিকা রাখে মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান নামে একজন। পরবর্তীতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বড় মিজানকে গ্রেফতার করা হয়।

আইএস-এর দায় স্বীকার: 

এই ঘটনার পর সিরিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস হামলার দায় স্বীকার করে বিবৃতি প্রকাশ করে। আমাক সংবাদ সংস্থায় প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় আইএস এর পক্ষ থেকে বলা হয় এই  হামলায় ২০ জন নিহত হয়েছে। এটা সবেমাত্র শুরু ভবিষ্যতে আরো হামলা হবে বলেও হুমকি দেওযা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এই স্বীকারোক্তি নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি হয় এবং বাংলাদেশ ধরনের আক্রমণ বিগত চার বছরে আর হয়নি।

সন্ত্রাসী হামলায় যারা নিহত হয়েছিলেন: 

  • ক্রিস্তিয়ান রসসি (ইতালীয়)
  • মার্কো তোন্ডাত (ইতালীয়)
  • নাদিয়া বেনেদেত্তি (ইতালীয়)
  • আদেলে পুলিসি (ইতালীয়)
  • সিমোনা মন্তি (ইতালীয়)
  • ক্লাউদিয়া মারিয়া ড’আন্তোনা (ইতালীয়)
  • ভিনসেনজো ড’আল্লেস্ত্রো (ইতালীয়)
  • মারিয়া রিভোলি (ইতালীয়)
  • ক্লাউডিও কাপ্পেল্লি (ইতালীয়)
  • হিদেকি হাশিমোতো (জাপানি)
  • নোবুহিরো কুরোসাকি (জাপানি)
  • কয়ো অগাসাওয়ারা (জাপানি)
  • মকোতো ওকামুরা (জাপানি)
  • ইউকো সাকি (জাপানি)
  • রুই শিমোদাইরা  (জাপানি)
  • হিরোশি তানাকা (জাপানি)
  • ফারাজ আইয়াজ হোসেন (বাংলাদেশী)
  • ইশরাত আখন্দ (বাংলাদেশী)
  • রবীউল করিম (বাংলাদেশী)
  • সালাউদ্দিন খান (বাংলাদেশী)
  • সাইফুল ইসলাম চৌকিদার (বাংলাদেশী)
  • জাকির হোসেন শাওন (বাংলাদেশী)
  • আবিনতা কবির (বাংলাদেশী)
  • তরিশি জৈন (ভারতীয়)

জাপান ইতালির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আগমণ: 

এই ঘটনার পর ইতালীয় উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিও জিরো বাংলাদেশে আসেন এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এছাড়াও জেষ্ঠ্য উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেইজি কিহারার নেতৃত্বে জাপানী নাগরিকের লাশ সনাক্ত করার জন্য জাপানি নাগরিকদের স্বজনরা বাংলাদেশে আসেন। তাঁদের সাথে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ও দেশটির দাতা সংস্থা জাইকার কয়েকজন কর্মকর্তাও আসেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত মাসাতো ওয়াতানাবে এসময় উপস্থিত ছিলেন।

মামলা: 

এই ঘটনার পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় একটি মামলা করে পুলিশ। ঘটনার চারদিন পর ৫ জুলাই মধ্যরাতে গুলশান থানায় এ মামলা করা হয়।

মামলার চার্জশিট গ্রহণ: 

দীর্ঘ তদন্ত শেষে ঘটনার দুই বছর পর ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট মামলার চার্জশীট গ্রহণ করে আদালত। সন্ত্রাস বিরোধী বিশেষ টাইবুনালের বিচার মুজিবুর রহমান এ মামলার চার্জশীট গ্রহণ করেন। এর আগে একই বছরের ২৩ জুলাই পুলিশের কাউন্টার টেররজিম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর ৮ জনকে অভিযুক্ত করে মামলার চার্জশীট দাখিল করেন। আসামীদের ৬ জন কারাগারে এবং দুই জন পলাতক রয়েছে। কারাগারে থাকা ৬ জন হলো: জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, রাশেদুল ইসলাম, সোহেল মাহফুজ, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, রাকিবুল হাসান রিগান ও হাদিসুর রহমান সাগর। পলাতক দুজন হলো: শহিদুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন।

শহীদুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া বিভিন্ন হামলায় নিহত ১৩ জনকে এই মামলা থেকে অব্যহতি প্রদান করা হয়। এদের মধ্যে পাঁচজন হলি আর্টিজান বেকারিতেই নিহত হয়। বাকীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়।

হলি আর্টিজান বেকারি ছাড়া নিহত বাকি ৮ জন হলেন: তামীম আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ান জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান।

হাসানাত করিম ও তাহমিদ খানকে অব্যহতি: 

এই ঘটনায় ঘটনায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমকে প্রাথমিকভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। অভিযানের সময় হলি আর্টিসানের দোতলার বারান্দায় হামলাকারী জঙ্গিদের সাথে হাসানাত করিমকে কথা বলতে দেখা যায়। ছবিতে হাসানাত করিমের সাথে সন্দেভাজন আসামী তাহমীদ খানকে দেখা যায়। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে যার চিত্র সংগ্রহ করে তদন্তকারী কর্মকর্তা।

হলি আর্টিসান

হলি বেকারির ছাদে সন্দেহভাজন তাহমিদ খানের সাথে কথা বলছেন হাসানাত করিম

কিন্তু পরবর্তিতে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। চার্জশিটে তার নাম না থাকায় আইনজীবীরা তাকে অব্যাহতির আবেদন জানান। পরে (৮ আগস্ট) সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারক মজিবুর রহমান আবেদন গ্রহণ করে তাকে অব্যাহতি দেন।

অন্যদিকে ২৮শে সেপ্টেম্বর কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের পরিদর্শক মো. হুমায়ুন কবীর আদালতে গুলশান হামলার অভিযোগ থেকে তাহমিদের অব্যাহতির আবেদন করেন৷ এরপর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান কানাডা প্রবাসী শিক্ষার্থী তাহমিদ খান৷

অভিযোগ গঠন: 

সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান ২০১৮ সারের ২৬ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হয়।

সাক্ষ্যগ্রহণ: 

আদালতে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। কয়েক দফায় ২১১ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬০ জনের সাক্ষ্য নিয়েছেন আদালত।

মামলার রায় : 

দুই বছরের বেশি সময় ধরে তদন্তের পর ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। বিচারিক কার্যক্রম শুরুর এক বছরের মধ্যেই গত ২৭ নভেম্বর আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত।

রায়ে মামলার ৮ আসামির ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে বেকসুর খালাস দেন আদালত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়।

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ রিপন। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে বেকসুর খালাস দেন আদালত।

সিটিটিসির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, প্রায় দেড় বছর আগে পরিকল্পনা এবং দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে নৃশংস এ হামলা সরাসরি বাস্তবায়নে দায়িত্ব দেওয়া হয় আত্মঘাতি পাঁচ জঙ্গিকে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস’র ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে জেএমবির একটি গ্রুপ বিদেশিদের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত নেয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। পরবর্তীতে ‘নব্য জেএমবি’ নামে পরিচিতি পাওয়া এ গ্রুপটির কথিত শুরাকমিটি গাইবান্ধার সাঘাটায় বৈঠক করে এই সিদ্ধান্ত নেয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, “বাংলাদেশে তথাকথিত জিহাদ কায়েমের লক্ষ্যে জননিরাপত্তা বিপন্ন করার এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস’র দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য জেএমবির একাংশ নিয়ে গঠিত নব্য জেএমবির সদস্যরা গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় ও দানবীয় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হলি আর্টিজান হামলার মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদের উন্মত্ততা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার জঘন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। নিরপরাধ দেশি-বিদেশি মানুষ যখন রাতের খাবার খেতে হলি আর্টিজান বেকারিতে যায় তখনই আকস্মিকভাবে তাদের ওপর নেমে আসে জঙ্গিবাদের ভয়াল রূপ। জঙ্গি সন্ত্রাসীরা শিশুদের সামনে এ হত্যাকাণ্ড চালায়। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য জঙ্গিরা নিথর দেহগুলোকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায়। মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় হলি আর্টিজান বেকারি।”

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন – এ হামলার একান্ত কারণ হলো ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে রাষ্ট্রের উদাসীনতা এবং প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা সকলের কাছে পৌঁছানোর প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রের দুর্বলতা ও ব্যর্থতা। তাছাড়া ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন ধরনের খন্ডিত আলোচনা দেশের এলিট শ্রেণীর লোকদের কাছে পৌঁছে থাকে বলেই এ ধরনের ভুল চিন্তার মাধ্যমে সন্ত্রাসী হামলা হয়ে থাকে। কারণ হলি আর্টিজান হামলায় সম্পৃক্ত বেশিরভাগ তরুণরাই সর্বোচ্চ আধুনিক শিক্ষা এবং দেশের ইংলিশ মিডিয়াম সহ বিভিন্ন এলিট শ্রেণীর পরিবারের সদস্য। তাই এ ধরনের নৃশংস হামলা ঠেকাতে দেশের প্রতিটি অঙ্গনে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা বিস্তার এবং ইসলাম ধর্মের প্রকৃত মূল্যবোধ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সর্বাত্বক ভূমিকা রাখা একান্তই জরুরী।

এইচআরআর/এসএস/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন