বিশ্বের চোখ ধাঁধানো ১০টি মসজিদ

প্রকাশিত: ৬:৩৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০

এনামুল হোরাইরাঃ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের পবিত্র স্থান মসজিদ। ইসলাম ধর্মানুসারীদের প্রার্থনার তীর্থস্থান। যেখানে ধনী-গরিব সবাই সমান। সমাজের ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে নামাজ আদায় করেন। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন মসজিদ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এসব মসজিদ বাহ্যিক দৃষ্টিতে অত্যাশ্চর্য এবং ভাগ্যবান মুসলমানরা প্রতি বছরই মসজিদগুলো পরিদর্শনের পাশাপাশি সেখানে নামাজ আদায় করেন। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি এসব মসজিদ ঐতিহাসিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। নান্দনিক নির্মাণশৈলী ও আয়তনে কোন কোন মসজিদ মানুষকে বিস্মিত করে তুলে। শৈল্পিক অবকাঠামো মসজিদগুলোকে করেছে অনন্য। মসজিদে মুসলিমদের প্রধান উপাসনালয় হলেও একেক দেশের একেক রকম সংস্কৃতির ছাপ বিশ্বের একাধিক মসজিদের নির্মাণ শিল্পে ঠাঁই পেয়েছে।

চলুন দেখে নেয়া যাক এমন সেরা দশটি মসজিদ:

১.মসজিদুল হারাম:

পবিত্র কোরআন শরিফে বর্ণিত আছে, ‘এটি মানবজাতির জন্য প্রথম মসজিদ, যেখানে মানুষ আল্লাহর ইবাদত করবে।’ সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর এই মসজিদটি বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত স্মারক। মসজিদুল হারাম হলো ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য সবচেয়ে পবিত্র স্থান। এ মসজিদ পবিত্র কাবা শরিফকে ঘিরে অবস্থিত। ঐতিহাসিক এই মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় মুসলিমরা কাবা শরিফের চারদিকে মুখ করে দাঁড়ান। পবিত্র মসজিদটি মুসল্লিদের জন্য চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা থাকে। প্রতি বছর পবিত্র হজ এবং ওমরাহর জন্য ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মসজিদুল হারামে আসেন। দৃষ্টিনন্দন এই কাঠামোর ভিতরে ও বাইরে নামাজের স্থানসহ মসজিদের সম্পূর্ণ কাঠামোতে রয়েছে প্রায় ৮৮.২ একর। এখানে একসঙ্গে ১০ লাখ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। আর প্রতি বছর পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ এখানে উপস্থিত হন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে কাবা ঘর সংস্কার করেছিলেন মক্কার বিখ্যাত কোরাইশ বংশের লোকেরা। এই কাবা শরিফে পরবর্তীতে হাজারে আসওয়াদ নামক পবিত্র পাথর স্থাপন করা হয়। কাবার নিকটবর্তী পাহাড় থেকে গ্রানাইট পাথর দিয়ে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এর ভিত্তিভূমি মার্বেল পাথরের তৈরি। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং হজরত ইসমাইল (আ.) একত্রে কাবা ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন। এ জন্যই ঐতিহাসিকভাবে মসজিদুল হারাম গুরুত্ব বহন করে

২. আল আকসা মসজিদ:

জেরুজালেমের পুরনো শহরে অবস্থিত মসজিদুল আল আকসা। এই মসজিদ বাইতুল মুকাদ্দাস নামেও পরিচিত। এটি ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। এর সঙ্গে একই প্রাঙ্গণে কুব্বাত আস সাখরা, কুব্বাত আস সিলসিলা ও কুব্বাত আন নবী নামক স্থাপনাসমূহ অবস্থিত। স্থাপনাগুলোসহ পুরো স্থানটিকে ‘হারাম আল শরিফ ‘বলা হয়। আবার এটি ‘টেম্পল মাউন্ট’ বলেও পরিচিত এবং ইহুদি ধর্মে পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পবিত্র মিরাজের রাতে মসজিদুল হারাম থেকে আল আকসা মসজিদে এসেছিলেন এবং এখান থেকে তিনি ঊর্ধ্বাকাশের দিকে যাত্রা করেন।

৩. ইসতিকলাল মসজিদ:

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় মসজিদ ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় অবস্থিত। মসজিদটির নাম ইসতিকলাল মসজিদ। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় মসজিদ এটি। ১৯৭৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মসজিদটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ১৯৪৯ সালে নেদারল্যান্ডস এর পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে তৎকালীন সরকার একটা জাতীয় মসজিদ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেন। ১৭ বছরের দীর্ঘ ব্যবধানে মসজিদটি নির্মিত হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সুহার্তো মসজিদটি উদ্বোধন করেন। মসজিদ নির্মাণে ব্যয় হয় ১২ মিলিয়ন ইউএস ডলার। আর মসজিদটির ধারণক্ষমতা একত্রে দুই লক্ষ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারবে।

চার. মসজিদুল হাসান:

আল শানী মসজিদুল হাসান-আল শানী স্থানীয়দের কাছে ‘ক্যাসাবালাঙ্কা হাজ বা হাসান মসজিদ’ নামে পরিচিত। মরক্কোর সবচেয়ে বড় শহর ক্যাসাবালাঙ্কায় আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত এই মসজিদটি। অনেকটা মোঘল স্থাপত্যের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই মসজিদটির অবস্থান প্রায় ২১ হাজার বর্গমিটার জমির ওপরে। প্রায় ৪০ হাজার হাজার মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করতে পারে এই মসজিদটিতে।

৫.তাজুল মসজিদ:

ভারতের সর্ববৃহৎ মসজিদ হলো ‘তাজুল মসজিদ’। মোঘল সম্রাট বাহদুর শাহ জাফর এর শাসনামলে নবাব শাহ জাহান বেগম কর্তৃক নির্মিত হয় তাজুল মসজিদ। কিন্তু তিনি পুরোপুরি নির্মাণ কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে তার মেয়ে সুলতানা জাহান বেগম তার জীবদ্দশায় এর কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। পুনরায় নির্মাণ কাজ ১৯৭১ সালে আল্লামা মুহাম্মাদ ইমরান খান নদভী আজহারি এবং মাওলানা সাইয়্যেদ হাসমত আলী সাহেব শুরু করেন। ১৯৮৫ সালে নির্মাণ শেষ হয়। মসজিদটির তিনটি গম্বুজ ও দুটি সুউচ্চ মিনার। মসজিদের ভিতর ও বাহিরে মিলে এক লাখ ৭৫ হাজার লোক একসাথে নামাজ পড়তে পারে।

৬. বাদশাহী মসজিদ:

মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৬৭১-১৬৭৩ সালের মধ্যে পাকিস্তানের লাহোরে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। সামনের বিশাল চত্বরসহ মসজিদটির আয়তন প্রায় দুই লাখ ৭৬ হাজার স্কয়ার ফিট। ১৯৬ ফিট উচ্চতার সুদৃশ্য আটটি মিনার রয়েছে। আরও রয়েছে তিনটি গম্বুজ। সিঁড়ির ২২টি ধাপ পেরিয়ে মূল ফটকে পৌঁছাতে হয়। এই মসজিদের ধারণক্ষমতা একত্রে এক লক্ষ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারবে।

৭.শেখ জায়েদ:

‘গ্রান্ড মসজিদ’ আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে অবস্থিত। এই মসজিদটি বিশ্বের সেরা দশটি মসজিদের মধ্যে অন্যতম। মসজিদটি নির্মাণকাল ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল। এটি আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় মসজিদ। মসজিদটি ৩০ একর জমির উপর নির্মিত। বিভিন্ন সাইজের সাতটি গম্বুজ রয়েছে, যার উচ্চতা ২৭৯ ফিট। রয়েছে ৩৫১ ফিট উচ্চতার চারটি মিনার। মুসল্লি ধারণক্ষমতা ৪১ হাজার। তিন হাজারের বেশি শ্রমিক মিলে তৈরি করেছে এই বিখ্যাত মসজিদটি।

৮. দিল্লির জামা মসজিদ:

দিল্লির জামা মসজিদ বিশ্বজুড়ে নান্দনিক সৌন্দর্যমণ্ডিত মসজিদ গুলোর একটি। মসজিদের ফটক এবং তার সিঁড়ি ও গম্বুজের ওপরে শত শত পায়রার বসতি স্থাপন করার দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়। জামা মসজিদে একসঙ্গে ২৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। দিনের বেলায় মসজিদের সমৃদ্ধ স্থাপত্য নকশা অধ্যায়নের জন্য খোলা থাকে। মসজিদটির নির্মাণকাজ ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় এবং ১৬৫৬ তে শেষ হয়।

৯. হাসান আল:

‘বলখিয়া মসজিদ’ মসজিদটি সুলতান হাসানাল বলখিয়া মুজাদিন ওয়াদুল্লাহর নামে নামকরণ করা হয়েছে। এটি ব্রুনাইয়ে অবস্থিত। দেশটির সুলতানের সিংহাসনে আরোহণের ২৫ বছরপূর্তি উপলক্ষে ব্রুনাই সুলতানের উপহার ছিল। এখানে একসঙ্গে ৩০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

১০ বায়তুল মোকাররম:

মসজিদের শহর বলা হয় ঢাকাকে। বিশ্বের সেরা দশটি মসজিদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই মসজিদটির নির্মাণ শেষ হয় ১৯৬৮ সালে। মসজিদের প্রবেশদ্বার রয়েছে বেশ কয়েকটি। বর্তমানে এই মসজিদে একসঙ্গে ৪০ হাজার লোক নামাজ পড়তে পারে।

এছাড়াও বিশ্বে অনেক সুন্দর ও চমৎকার দৃষ্টিনন্দনীয় মসজিদ রয়েছে।

এমএম/ওআইপি/এনএইচ/পাবলিকভয়েস

মন্তব্য করুন