যুগে যুগে আলেমদের ব্যবসা বাণিজ্য : ইতিহাস ও নীতি-আদর্শের আলোকে

প্রকাশিত: ৮:৩৪ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০

১. করোনা পরিস্থিতি ভেঙে দিয়েছে দেশের আর্থসামাজিক শৃঙ্খলা। পাল্টে দিয়েছে মানুষের জীবনযাত্রার গতি ও ছন্দ। অসংখ্য আলেম ও দীনদার পরহেজগার মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিচলন দেখা গেছে। এবার উলামায়ে কেরামের জন্যও সময়টা বেশ অস্বাভাবিক। সারাদেশ থেকে অসংখ্য আলেম উলামা আমাকে এসব বিষয় নিয়ে কিছু বলতে ও লিখতে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।

যারা ভালো আছেন, তাদের ততটা চিন্তা থাকার কথা নয়। অনেকে সবাইকে নিয়ে চিন্তা করেন। ভাবেন, কী করে উলামায়ে কেরামের জীবন যাত্রার মৌলিক জরুরতটুকু পুরা হতে পারে।

২.
এক্ষেত্রে  অঅনুরোধ থাকবে এই যে, ছাত্ররা কষ্ট করে হলেও পড়াশোনা চালিয়ে যান। একান্ত অপারগ না হলে আয় উপার্জনে ব্যাস্ত হবেন না। কারণ ছাত্র জীবন মানবজীবন অমূল্য সময়। দুনিয়ার সব পাওয়া যায়, কিন্তু ছাত্র জীবন সময় হারিয়ে আর পাওয়া যায় না।

৩.
যারা আলেম উলামা হাফেজ কারী ও ইমাম, তারা দীনি কাজে নিজেকে উৎসর্গ করে থাকলে, এই কাজটিকেই জীবনের লক্ষ্য বানান। অল্প আয়ের ওপর সন্তুষ্ট থেকে সাধনার জীবন যাপন করুন। কাজের ক্ষতি না হয় এমন কোনো বাড়তি পেশা অবলম্বন করতে পারেন, তবে খুব খেয়াল রাখবেন, যেন এ পেশা আপনার জীবনের সাধনা শান্তি ও সৌন্দর্য্য নষ্ট করে না দেয়।

৪.
আর যারা দীনি শিক্ষা নিয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি আলেমানা কর্মক্ষেত্রে নিজের জীবনকে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ বা প্রয়োজন দেখছেন না। আপনারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে নির্দ্বিধায় যে কোনো হালাল পেশায় আত্মনিয়োগ করুন। দীনি দাওয়াত, শিক্ষা ও চরিত্রের ব্যবহারিক রূপ, শরীয়তী মুআমালার আলো সমাজের মাঝে ছড়িয়ে দিন। বাংলাদেশের মানুষ দীনদার পরহেজগার মানুষের সাক্ষাৎ ও সান্নিধ্য লাভ করুক, নিজেদের স্পর্শে ও সঙ্গে।

৫.
আল্লাহ আমাদের হালাল ও পবিত্র খাবার খেতে বলেছেন। তিনি সুদ, প্রতারণা ও অন্যায় অবিচারের মাধ্যমে পরের মাল গ্রাস করতে নিষেধ করেছেন। আর দুনিয়ার বৈধ সব নেয়ামত দীনদার পরহেজগার মানুষের জন্য অনুমোদিত সাব্যস্ত করেছেন।

৬.
তিনি ব্যবসাকে হালাল এবং বরকতময় করেছেন। বৈধ সব পেশাকে সম্মানিত করেছেন। সব নবী রাসূল স. কে বিভিন্ন পেশা অবলম্বন করতে বলেছেন। সকল নবীগণের জীবনে কিছু সময় হলেও তাদের পশু চড়ানোর কাজে নিযুক্ত করেছেন।

৭.
আল্লাহর প্রিয় নবী আমাদের রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা উত্তম জীবিকা হলো সেটি, মানুষ যা তার নিজ হাতে উপার্জন করে। আল্লাহর নবী স. আরো বলেছেন. জীবিকা উপার্জনকারী আল্লাহর বন্ধু। আরেক হাদীসে আছে, সত্যবাদী আমানতদার ব্যবসায়ীরা হাশরের দিন নবী, শহীদ, সিদ্দিক ও ওলী-আউলিয়াগণের সাথী হবে। আল্লাহর নবী স বলেন, হালাল রিজিকের অন্বেষণ প্রধান ফরজ সমূহের ( ঈমান ও নামাজ) পরের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ কাজ। এক হাদীসে আছে, নবী করীম স. বলেছেন, আল্লাহ তাআলা রিজিকের নয় দশমাংশ রেখেছেন ব্যবসা-বাণিজ্যে আর বাকি এক দশমাংশ রেখেছেন অন্য সব পেশায়।

৮.
প্রিয় পাঠক, আসুন দেখা যাক, কোন নবী ও ওলী কি পেশার লোক ছিলেন। তাদের অধিকাংশই জনতার কাতারে মিশে প্রচলিত সাধারণ মানুষের নানা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। যেমন,

হজরত আদম আ. কৃষিকাজ বা ফলে ফসল চাষ করতেন। শিকারও করতেন।  হজরত শীষ আ. পেশায় ছিলেন বস্ত্রবয়নকারী। তুলো, রেশমগুটি থেকে সুতো কেটে কাপড় বানাতেন। চাষবাসও করতেন।  হজরত ইদরিস আ. প্রথম সুঁইয়ের ব্যবহার করেন। শীস আ. থান কাপড় বানাতে জানতেন। আর ইদরিস আ. তা সেলাই করে জামায় রূপান্তরিত করেন।

হজরত নূহ আ. জীবিকার দিক দিয়ে ছিলেন কাঠের জিনিস তৈরির শিল্পী । হজরত হুদ আ.ব্যবসার সূচনা করেন। পশুপালনও করতেন। অনেকটা জেনারেল স্টোর জাতীয় দোকানে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ব্যবসা করতেন।

হজরত সালেহ আ.খামারি ও মিল্ক প্রোডাক্ট তৈরির কাজের সূচনা করেন। উট পালন আর এর দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।  হজরত লুত আ. মৎস্য শিকার ও কৃষিকাজ করতেন।

হজরত ইবরাহিম আ.স্থপতি ও নির্মাতা ছিলেন। হজরত ইসমাইল আ.ও পিতা ইবরাহিমের মত একই পেশায় ছিলেন।সেইসঙ্গে শিকারও করতেন। হজরত ইসহাক আ. ছিলেন মেষপালক ও শিকারী। হজরত ইয়াকুব আ.ও ছিলেন পশুপালনকারী ।

হজরত ইউসুফ আ. সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। কৃষি, অর্থ ও পরিকল্পনা দফতরের দায়িত্ব পালন করেন।পরে মিসরের শাসকও হন। হজরত আইয়ুব আ. কৃষিকাজ। হজরত শুআইব আ. কৃষক ও পশুপালনকারী।

হজরত মুসা আ. পশুপালনকারী ছিলেন, হজরত শুআইব আ. এর পশু চারণকর্মী হিসেবেও নিয়োজিত ছিলেন।
হজরত হারুন আ. পেশায় দাপ্তরিক কর্মকর্তা ছিলেন।
হজরত দাঊদ আ. লৌহ ও ইস্পাতের ব্যবহারে অস্ত্র উৎপাদনের কাজ করতেন। হজরত সুলাইমান আ.বিশ্বের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বাধিক ক্ষমতাবান শাসক ছিলেন। হজরত যুল-কিফল আ. বেকারিকর্মী ছিলেন।

হজরত ইলিয়াস আ. টেক্সটাইল, রেডিমেড গার্মেন্টস ব্যবসা আর কৃষিকাজ করেছেন।  হজরত ইউনুস (আ.) : তিনি তাঁর পিতার মতই মৎস্য শিকারী ছিলেন। মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন।  হজরত উযাইর আ. গার্ডেনার ছিলেন। হজরত যাকারিয়া আ. ছিলেন কাঠশিল্পী। হজরত ইয়াহিয়া আ. এর পেশা ছিল শিকার ও বন থেকে ফলমূল সংগ্রহ। হজরত ঈসা আ. জীবিকা হিসেবে শিকারকে বেছে নিয়েছিলেন। আল্লাহর ওয়াস্তে রোগীর চিকিৎসাও করতেন।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) চাচাতো ভাইদের সাথে উট ছাগল ভেড়া দুম্বা চড়িয়েছেন। সম্মানীর বিনিময়ে অন্যের ব্যবসায়িক কাফেলার তত্বাবধানের দায়িত্বেও নিয়োজিত হন। অবশ্য নবুওয়ত লাভের পর আল্লাহর দীনের কাজে আত্মনিবেদিত থাকেন। শেষ তেইশ বছর উপার্জনের চিন্তা বা চেষ্টা করার মতো অবস্থায় ছিলেন না। আল্লাহর হুকুমে তখন নিজের জন্য নবুওয়তের দায়িত্বপালন করাটাকেই কাজ বানিয়ে নিয়ে ছিলেন।

কেবল হজরত সুলাইমান, হজরত ইউসুফ আর হজরত হারুন আ. ব্যতীত বাকি সব নবীদের জন্য আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন সাধারণ জনগণের বা আম মানুষের জীবিকা। আর এজন্যই ইসলামে নীচু পেশা বলে কোনো বিষয় নেই। আর্থিক অবস্থা বা পেশার কারণে কাউকে অবজ্ঞা করাটা ইসলামে হারাম ও মারাত্মক কবিরা গুনাহের কাজ।

প্রকৃতপক্ষে প্রায় সমস্ত নবীর জীবিকা এইরকম হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল যেন তারা সমাজের বঞ্চিত, অবহেলিত আর অনগ্রসর মানুষকে পুরোপুরি বুঝতে পারেন। তাদের অধিকার ও প্রয়োজনের ব্যাপারে সচেতন থাকেন। তাদের মধ্যে মানবসভ্যতার জন্য মহান শিক্ষা থেকে যায়।

৯.
হজরত আবু বকর রা. বস্ত্র ব্যবসায়ী ছিলেন। মুসলিম উম্মাহর প্রধান নির্বাহী নির্বাচিত হওয়ার আগে পর্যন্ত কাপড়ের ব্যবসা করেন। খলীফা হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী গোটা জাতির গড় আয়ের পরিমাণ জীবন ধারণ ভাতা পেতেন।

১০.
হজরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. খাদ্য দ্রব্য আমদানী কারক ছিলেন। পশু বেচাকেনার কাজও করতেন। এ ছাড়া যাদের প্রয়োজন ছিল তেমন সব সাহাবী যে কোনো হালাল পেশা অবলম্বন করে জীবিকা উপার্জন করতেন। সাহাবায়ে কেরাম থেকে জীবনের অমূল্য শিক্ষা ও চেতনা বিস্তার লাভ করে তাবেয়ী ও তাবয়ে তাবেয়ী হয়ে দীর্ঘ দেড় হাজার বছরের ইসলামী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে। বিশ্ব ব্যাপী মুসলিম উম্মাহর এই সফর ছিল এর বাণিজ্য ও সামাজিক সুবিচার নীতির আলোকে।

১১.
তাবেয়ীদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো অর্থনীতিবিদ,ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ছিলেন ইমাম আজম হজরত আবু হানীফা রহ.। ইসলাম জগতের এ অবিস্মরণীয় মহা মনিষী ছিলেন সুদ বিহীন আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থার প্রবক্তা, স্থপতি ও রূপকার। সাহাবায়ে কেরামের পর আমার তুলনামূলক সবচেয়ে বেশী পছন্দের, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ব্যক্তি হলেন এই মহান ইমাম। ইমাম আজম আবু হানীফা নুমান ইবনে সাবিত রহ.।

১২.
ইমাম অসাধারণ বড়ো আলেম, মুত্তাকী হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন প্রজ্ঞা বিচক্ষণতা ও সাধনায় সেরা। কোরআন সুন্নাহ থেকে গবেষণা করে উম্মতের জন্য বের করেছেন ৯০ হাজার বিধান-উপবিধান। তার স্কুল অব থ্যট থেকে মুসলিম উম্মাহ পেয়েছে দেড় থেকে দুই লাখ মাসআলা। ইমাম আজমের ইন্ডাস্ট্রি থেকে সূতি,পশমী ও সিল্কের কাপড় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সব দেশে সরবরাহ করা হতো। মক্কা, মদীনা, দামেশক, আলেপ্পো,বাগদাদ সহ হিন্দ, খোরাসান, বোখারা, সমরকন্দে ইমামের কারখানার গুদাম ও শো-রুম ছিল। এতবড় শিল্পপতি হয়েও ইমাম আজম সূফী দরবেশের কৃচ্ছসাধন করে দিন কাটাতেন।

তিনি এ ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালানোর সময় কেবল দীনের খেদমতের উদ্দেশ্যকেই সামনে রেখে ছিলেন। বহু আলেমের কাছ থেকে সামান্য পুঁজি নিয়ে তাকে বেশী বেশী লভ্যাংশ পৌঁছে দিতেন। নিজে কিছু রাখতেন না। ১০০% লাভের টাকা এমনকি নিজের অংশ থেকে ভর্তুকি দিয়ে উলামায়ে কেরামের দীনি কাজের সুযোগ করে দিতেন। তারা যেন জীবিকার চিন্তা না করে ইসলামের জন্য সময় মেধা এবং কোরবানি পেশ করতে পারেন। ইমাম নিজের আয় থেকে শত শত শিক্ষার্থী ও গবেষক আলেমকে তাদের যাবতীয় খরচ যোগাতেন।

তার বৃত্তি নিয়ে পড়ালেখা করা এমন একজন ছাত্র হলেন ইমাম আবু ইউসুফ রহ.। যিনি পরবর্তীতে মুসলিম উম্মাহর কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা করা খেলাফতে আব্বাসীর তিনজন শাসকের সময় কালব্যাপী কাজিউল কুজাত বা প্রধান বিচারপতি ছিলেন। সারাজীবন ইচ্ছা করে চরম দারিদ্র্যকে সযত্নে লালন ও সংরক্ষণ করে চলেন। আইন ও বিচার বিশেষ করে রাজস্ব বিষয়ে তার গ্রন্থ ‘কিতাবুল খারাজ’ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।

ইমাম আজম আবু হানীফা রহ. যখন বৃদ্ধ বয়সে রাজরোষের শিকার হয়ে কারাগারে। তাকে সরকারের পক্ষ নেওয়া এবং জনগণকে পজেটিভ বার্তা দেওয়ার জন্য চিফ জাস্টিস পদে নিয়োগ নেওয়ার জন্য চাপ দিতেই কারাবন্দী করা হয়। যখন গভর্নর ইবনে হোবায়রার অত্যাচার বাড়তে লাগলো, ইমামকে জেলখানায় স্লো পয়জনিং করা শুরু হলো, তখন তিনি মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে লাগলেন, আলেমদের সব বিনিয়োগ ফেরতের ব্যবস্থা করলেন। তার পরিবার ও ম্যানেজিং স্টাফ দ্রুত আলেমদের টাকা পয়সা ফিরিয়ে দেওয়ার পরও অনেককে পাওয়া না যাওয়ায় তাদের টাকা পরবর্তী সময় ফেরত দেওয়া হয়।

৮০% ভাগ শেয়ার হোল্ডার ও ইনভেস্টরের টাকা তাড়াহুড়ো করে ফিরিয়ে দেওয়ার পরও মহান ইমামকে জালেম সরকারের গভর্নর কর্তৃক কারাগারেই শহীদ করার পর দেখা যায় যে, তার বাড়িতে সাড়ে পাঁচ কোটি স্বর্ণমুদ্রা রয়ে গেছে। এসব তার ওয়ারিসগণ দীর্ঘ দিন ধরে মানুষকে বুঝিয়ে দিয়ে শেষ করেন। ‘ইমাম আজম কি সিয়াসী জিন্দেগী’ নামক গ্রন্থে রচয়িতা মাওলানা মানাজির আহসান গিলানী রহ.এসব বিস্তারিত বর্ননা করেছেন।

১৩.
যুগে যুগে আলেমদের পেশা অবলম্বন করা নিয়ে আধুনিক সময়ের লেখক ও গবেষকরা বহু বইপত্র রচনা করেছেন। আরবী উর্দু ফার্সি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে অভিভাবক, দীনদার পরহেজগার মানুষ ও নবীন আলেমদের পড়া দরকার। ইমাম গাযযালী ছিলেন স্পিনার ফ্যামিলির একজন। ইমাম কুদুরী তৈজসপত্র ও ডেক পাতিল নির্মাতা পরিবার থেকে এসেছেন। মনসুর হাল্লাজ ছিলেন তুলা ধুনকর পরিবারের মানুষ। শামসুল আয়িম্মা হালউয়ায়ী ছিলেন মিষ্টান্ন তৈরির কাজের সাথে যুক্ত। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, নানা ধরনের প্রচলিত হালাল পেশায় আত্মনিয়োগ করতে ইসলামের কোনো যুগের উলামায়ে কেরামের মধ্যে কোনো অনীহা ছিলনা।

১৪.
দেওবন্দের বিপ্লবী চেতনাকে যারা ধারণ করেন তাদের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন এর মহান প্রতিষ্ঠাতা কাসিমুল ইলমি ওয়াল খাইরাত হজরত মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম নানুতুভী রহ.। তিনি সারা জীবন বিনা পয়সায় দীনের কাজ করেছেন। জায়েজ হওয়া সত্বেও দীনি কাজের জন্য কোনো ভাতা সম্মানী ইত্যাদি নেননি। জীবিকার প্রয়োজনে একাধিক ছাপাখানায় পান্ডুলিপি ও কপি সম্পাদনা এবং মুদ্রণপ্রমাদ সংশোধনের কাজ করেছেন। বিশ্বব্যাপী আলেমসমাজের জন্য এতে রয়েছে অনেক চিন্তার খোরাক।

সবশেষে স্মরণ করছি, অতি সম্প্রতি ওফাতপ্রাপ্ত বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম, সময়ের শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলভী, যুগস্রষ্টা মুহাদ্দিস ফকীহ ও মুহাক্কিক, দারুল উলূম দেওবন্দের যুগপৎ সদরুল মুদাররিসীন ও শায়খুল হাদীস, আমার শ্রদ্ধেয় ও মাহবুব খুসুসী মুরব্বী-উস্তাদ, মুম্বাইয়ে কবরস্থ আল্লামা হজরত মাওলানা সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ. অবিস্মরণীয় জীবন আদর্শের কথা। হজরত দীনি কাজ করে হালাল হওয়া সত্বেও কোনো বিনিময় নিতেননা। সম্মানী ও ভাতা যা নিয়েছিলেন, সামর্থ্য হওয়ার পর একাধিক প্রতিষ্ঠানে তা পাই পাই হিসাব করে ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিজে পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রয় ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করে গেছেন।

হজরত বলে গেছেন, ইমাম,আলেম উলামা, মাশায়েখ ও দীনদার পরহেজগার মানুষের জন্য দীনের কাজের সহায়ক অন্য কোনো পেশা অবলম্বন করা উচিৎ। এমন হলে দীনি কাজ খেদমত হিসাবে নিশ্চিন্ত মনে নিষ্ঠার সাথে করা সহজ হয়। ইমাম আবু হানীফা রহ. হজরত শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলী রহ. মাওলানা কাসেম নানুতুভী রহ. এবং হজরত মাওলানা সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ. এর চেয়ে বড় আলেম পৃথিবীতে কয়জন হবেন আর তাদের মর্যাদা মকবুলিয়্যত ও মরতবা নিয়ে কি কিছু বলার ভাষা আমাদের জানা আছে?

১৫.
এটা তো বাংলাদেশ। এখানে সবই সম্ভব। কিছু ‘বুজুর্গ’ সম্ভবত তাদেরকে নিয়েও পেরেশানি ওঠাতে পারেন, এই বলে যে, আহা কেন তারা ব্যবসা বাণিজ্য করতে গেলেন। আমাদের মতো নিছক খেদমতে লেগে থাকলেই তো ভালো হতো! অথচ কওমী উলামায়ে কেরামের ১০% মাত্র বিশেষভাবে পরিচিত সীমিত খেদমতের মওকা পেয়ে থাকেন। বাকিদের নিজে চিন্তাফিকির করে কাজ বের করতে হয়। নিজ উদ্যোগে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। আর হালাল কামাই করেও পেতে হয় ‘বরবাদ’ হয়ে যাওয়ার সনদ। নিজ বেরাদরীতে অচ্ছ্যুত অস্পৃশ্য হয়ে কাটাতে হয়, একধরনের পলাতক ও একরকম অভিশপ্ত জীবন। কিন্তু কেন? নবীরাসূলগণ, আউলিয়া, ইমাম, উলামা,মাশায়েখদের আদর্শ থেকেও যদি তারা শিক্ষা না নেন, তাহলে এসব ‘বুজুর্গ’কে বোঝায় সাধ্য কার?

লেখক : মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী। চেয়ারম্যান ও মহাপরিচালক, ঢাকা সেন্টার ফর দাওয়াহ এন্ড কালচার।

মন্তব্য করুন