শিশুদের প্রতি নবীজির স্নেহ-ভালবাসা

প্রকাশিত: ১১:৪১ অপরাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০

আলেমা মারিয়া মিম: শিশুরা নিষ্পাপ৷ ফুলের মত পবিত্র৷ শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ তারা বোঝে না৷ তাই,সবাই তাদের ভালবাসেন,আদর-স্নেহ করেন৷ রাসুলুল্লাহ(সা.)ও শিশুদের ভালবাসতেন। স্নেহ-আদরে তাদের শিশুমন ভরিয়ে দিতেন। শিশুদেরকে ফুলের সঙ্গে তুলনা দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘শিশুরা আল্লাহ তায়ালার ফুল’
(তিরমিজি, হাদিস:১৯১০)

শৈশবের এ সময়টা তাদের বেড়ে ওঠার বয়স ৷এই সময় তাদের যেভাবে গড়ানো হয় তারা সেভাবে গড়ে ওঠে ৷অবসরের এই সময়ে আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত ঘরের শিশুদের সুষ্ঠু মানসিকতা বিকাশে মনোযোগী হ‌ওয়া। বেড়ে ওঠার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া৷ শিশুদের মন-মানস গঠনে নবীজির আদর্শ কেমন ছিল,সে বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করছি৷ আশা করি সেগুলো আপনার পরিকল্পনায় সহযোগিতা করবে৷

শিশুদের সময় দিতেন তিনি।

বিভিন্ন পেশায় ব্যস্ত থাকার কারণে আমরা আমাদের সন্তানদেরকে যথেষ্ট সময় দিতে পারিনা৷ যার ফলে তারা আমাদের মায়া-মমতা থেকে কিছুটা বঞ্চিত থাকে৷ অবসরের এই সময়গুলোতে আমরা যেন তাদের সময় দিতে না ভুলি৷আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.)ও শিশুদের অনেক সময় দিতেন৷ তাদের সাথে খেলা করতেন৷ আদর করতেন৷ চুমু খেতেন৷ সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন হারিস থেকে বর্ণিত, নবী কারীম (সা.)কুরাইশ বংশের ছোট ছোট বালক আব্দুল্লাহ,ওবায়দুল্লাহ ও কাসিরকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে নবীজী বলতেন, যে সবার আগে আমার কাছে আসতে পারবে তাকে এই পুরস্কার দিব৷ সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা নবীজির কাছে ছুটে আসত এবং তাঁর কোলে-পিঠে ঝাপিয়ে পড়তো৷নবীজি সবাইকে দুহাতে জড়িয়ে ধরতেন এবং আদর করে চুমু খেতেন৷
(মুসনাদে আহমাদ হাদীস:১৮৩৬)

কখনো কখনো তিনি তাঁর বড় নাতি হযরত হাসান (রা.)-কে কাঁধে চড়িয়ে বেরুতেন৷
(বুখারি,হাদিস:৩৭৪৯)

আদর করে ডাকতেন।

শিশুদের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করার একটি মাধ্যম হচ্ছে,তাদেরকে আদর সোহাগ করে ডাকা৷ যেমন,এই খোকা,ছোট্ট মনি এদিকে আসো,আমার আদরের বাবুটা কি বাড়িতে আছে ? অঞ্চল ভেদে বিভিন্ন ভালোবাসার শব্দে তাদেরকে কাছে টানা৷ আদরমাখা এ ডাক তাদের বড় হওয়ার পিছনে বড় কার্যকরী ভূমিকা রাখে৷ সাহাবী আবু হুরায়রা( রা.)থেকে বর্ণিত-তিনি বলেন, একদিন আমি নবী কারিম (সা. )এর সঙ্গে বের হয়েছিলাম৷ তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেননি এবং আমিও তাঁর সঙ্গে কথা বলিনি। অবশেষে তিনি ‘বানু কায়নুকা’ বাজারে এলেন৷ বাজার থেকে ফিরে ফাতিমা (রা.)-এর ঘরের আঙ্গিনায় এসে ডাকতে লাগলেন- ছোট্ট মনি আছে কি? ছোট্ট সোনা আছে কি ? ভেতরে হযরত ফাতিমা (রা.) নবীজির নাতি হাসান (রা.)-কে কিছুক্ষণ দেরী করালেন। আমার ধারণা হল তিনি তাঁকে পুতির মালা সোনা-রূপা ছাড়া যা বাচ্চাদের পরানো হতো, পরাচ্ছিলেন। তারপর তিনি দৌড়িয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং চুমু খেলেন। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহ! তুমি তাকেও (হাসানকে) মহব্বত কর এবং তাকে যে ভালবাসবে তাকেও মহব্বত কর।
( মুসলিম, হাদিস: ২৪২১)

নিজ হাতে সাজিয়ে দিতেন তাদের৷

মাঝে মাঝে ছোট বাচ্চাদের সাজগোজ করানো নবীজির একটি সুন্নত৷ এর মাধ্যমে বাচ্চারা আনন্দিত হয়৷ খুশি হয়৷ এতে শিশুরা বড়দের কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনে এবং বাস্তবায়নের চেষ্টা করে৷ তাই অবসর সময়টাতে আমরা ছোট ছোট সোনামণিদের নিজ হাতে সাজগোজ করাব এবং তাদের প্রতি আন্তরিকতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করব৷

একবার নবীজির কাছে বেশ কিছু কাপড় এলো৷ তাতে একটি কালো রঙ্গের নকশা করা ছোট কাপড় ছিল৷ নবীজি সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, এই কাপড়টি কাকে দেওয়া যায়? কেউ কিছু বলল না৷ নবীজি তখন তার একজন সাহাবী খালিদ বিন সাঈদ(রা.) এর ছোট মেয়ে উম্মে খালেদকে ডাকলেন৷ ছোট্ট উম্মে খালেদ নবীজির কাছে এলো৷ নবীজী তাকে নিজ হাতে নকশাকৃত কাপড়টি পরিয়ে দিলেন এবং তার দীর্ঘায়ুর জন্য দোয়া করলেন৷এরপর তাকে লক্ষ্য করে সোহাগের সাথে বললেন-হে উম্মে খালেদ এটি কত সুন্দর!
(বুখারি,হাদিস:৫৮২৩)

নবীজির এই হাদিস থেকে আমরা শিখতে পারি ছোট বাচ্চাদেরকে কিভাবে যত্ন নিতে হয়৷

তাদের মনোভাব বুঝতেন

অনেক সময় শিশুরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মন খারাপ করে থাকে৷ তখন তাদের সাথে রাগারাগি না করে, ধমক না দিয়ে তাদের কষ্ট বুঝা এবং তাদের কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করা৷ প্রিয় নবী শিশুদের কষ্ট সইতে পারতেন না তিনি কোনো শিশুকে দুঃখিত দেখলে মিষ্টি মধুর কথা বলে তার মন খুশি করতেন৷সুন্দর সুন্দর কথা বলে তাকে হাসিয়ে দিতেন৷ মদিনার এক ছোট্ট বালক আবু উমাইর৷ নবীজি (সা.)যখন তাদের ঘরে যেতেন তখন তাকে খুব আদর করতেন৷ আবু উমাইরের একটি ছোট্ট পাখি ছিল৷ বুলবুলি জাতীয় এক প্রকার ছোট্ট পাখি ‘নুগাইর’৷আবু উমাইর পাখিটিকে খুব ভালোবাসতো এবং তাকে নিয়ে খেলা করত৷একদিন হঠাৎ পাখিটি মারা গেল৷ ছোট্ট শিশু আবু উমাইর পাখির শোকে কাতর হয়ে পড়ল৷তখন তাকে খুশি করার জন্য নবীজি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং সুন্দর করে ছন্দ মিলিয়ে বলতে লাগলেন ‘ইয়া আবা উমাইর মাফাআলান নুগাইর’? ও আবু উমাইর কি করছে নুগাইর?
(বুখারি,হাদিস:৬১২৯)

শিশুর সঙ্গে কোমল ছিলেন তিনি৷

শিশুরা কোমলমতি৷ তাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করা একটি অমানবিক কাজ৷ নবীজি এ কাজকে অপছন্দ করতেন এবং শিশুদের সাথে যারা এ জাতীয় কাজ করত তাদেরকে ভৎসনা করতেন৷ হযরত আনাস( রা.) একজন বিখ্যাত সাহাবী ছিলেন৷ ছোটবেলা থেকেই নবীজির সঙ্গে থাকতেন এবং নবীজির বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতেন৷ তিনি প্রায় দশ বছর নবীজির খেদমতে ছিলেন৷ কিন্তু নবীজী কখনো তাকে ধমকের স্বরে একটি কথাও বলেননি৷ (মুসলিম,হাদিস:২৩০৯)

শিশুকে ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা দিন।

অন্যান্য শিক্ষার পাশাপাশি শিশুকে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞানে গড়ে তোলা একটি জরুরী কাজ ৷ তাই এই অবসর সময়ে আমরা শিশুদেরকে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অনুপ্রাণিত করতে পারি এবং নামাজ-রোজা কোরআন তেলাওয়াতে অভ্যাস গড়াতে পারি৷

ইরশাদ হয়েছে,‘আপনি আপনার পরিবারবর্গকে নামাযের আদেশ করুন এবং নিজেও তার ওপর অবিচলিত থাকুন।’ (সুরা তাহা আয়াত:১৩২) শিশুরাই আমাদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত।তাদের হাতেই নির্মিত হবে সুন্দর সমাজ,রাষ্ট্র ও আগামীর পৃথিবী।তাই, কোনো শিশুই যেন অযত্নে-অবহেলায় বেড়ে না উঠে।

আল্লাহ তায়ালা শিশুদের প্রতি যত্নশীল হওয়ার তৌফিক দান করুন৷

লেখিকা:- ফাজেলা: জামিয়া ইবরাহিমিয়া আমিনিয়া মহিলা মাদরাসা, সিদ্ধিরগঞ্জ,নারায়ণগঞ্জ

এমএম/পাবলিকভয়েস

মন্তব্য করুন