মাদক নির্মূল দিবস : প্রয়োজন ইসলামী শিক্ষা ও বিধিবিধান চর্চা

প্রকাশিত: ১২:৪২ অপরাহ্ণ, জুন ২৮, ২০২০

মুফতী মোহাম্মদ এনামুল হাসান –

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস আজ (২৮ জুন) । এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য হলো- ‘শুদ্ধ জ্ঞানেই সঠিক যত্ন হবে, জ্ঞানের আলোয় মাদক দূর হবে।’

মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ২৬ জুনকে মাদকবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরের বছর থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

আজ মানবসভ্যতার চরম শত্রু হয়ে দাড়িয়েছে মাদক। মাদকের ভয়াল থাবায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে যুবসম্প্রদায়। মাদকের নেশায় তছনছ হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার ও পারিবারিক বন্ধন । চুরি, ডাকাতি, হত্যা,ধর্ষন, সহ সকল কিছু-ই হচ্ছে মাদকের জন্য। মাদকসেবীরা তাদের অর্থ জোগান দিতে এমন কোন অন্যায় ও গর্হিত কাজ নেই, যা তারা করছেনা।

  • আমরা মুসলমান। আমাদের ধর্ম ইসলাম। আর ইসলাম হচ্ছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ও পরিপূর্ন জীবন বিধান। তাই আমাদের উচিৎ ইসলাম কি বলে সে অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করা। আর এটাই ঈমানের দাবি।

ইসলাম মানব কল্যাণময় ও শান্তির ধর্ম। আজকের পৃথিবীতে মাদকের ছড়াছড়ি তে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে মানব সভ্যতা। মাদক নির্মূলের লক্ষ্যকে সামনে রেখে আজ থেকে চৌদ্দশত বৎসর পূর্বে-ই ইসলাম মাদকের কুফল সম্পর্কে স্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করেছে।

মাদকদ্রব্যের আরবি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘খমর’। যে সমস্ত বস্তু সেবনের ফলে মাদকতা সৃষ্টি হয় এবং বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে অথবা বিবেকবোধ শক্তির উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে তাকে ইসলামের ভাষায় ‘ খমর’ বা মাদক বলা হয়।

  • মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, “হে মুমিনগণ! এই যে মদ,জুয়া এবং ভাগ্যনির্ধারক শর সমুহ (তৎকালীন প্রচলিত একধরণের জুয়া) এসবকিছু শয়তানের কাজ বৈ অন্যকিছু নয়। অতএব এগুলো থেকে দূরে থাকো। যাতে তোমরা কল্যাণ প্রাপ্ত হও”।(সুরা মায়িদা,আয়াত- ৯০)। উক্ত আয়াতে মাদক সংশ্লিষ্ট সকল কিছুকে শয়তানের জঘন্য কাজ বলা হয়েছে।

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) হতে বর্ণীত হাদিসে মাদকাসক্তদের প্রতি কঠোর ভৎর্সনা করে রাসুল (সা:)এরশাদ করেন, ‘যদি কেউ মদ পান করে, আল্লাহ তায়ালা তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল করেন না। আর যদি মদ্যপ অবস্থায় সে মৃত্যুবরন করে তবে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামি হবে।

অন্য এক হাদিসে রাসুল(সা:)বলেছেন, ‘মদ সকল অশ্লীলতার মূল ও মারাত্মক কবিরা গোনাহ যা ক্ষমার অযোগ্য। যতক্ষণ না সে তার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা না করে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করবেন না।’

হজরত ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণীত রাসুল(সা:)এরশাদ করেছেন, ‘সকল নেশা জাতীয় দ্রব্য ই খমর তথা মদের অন্তর্ভুক্ত।আর সবধরনের মাদক ই হারাম’।(মুসলিম শরিফ)

বর্তমান সমাজে মাদকসেবীদের মাদকাসক্তি থেকে বিরত রাখতে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু সমাজে দেখা যাচ্ছে তার উল্টো চিত্র। মাদকাসক্তির সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে লাগামহীন ভাবে। যতকিছু-ই করা হউক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত মাদকসেবীদের অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করা না যায় ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের মাদক থেকে দূরে আনা যাবে না। আর আল্লাহর ভয় তখনই সৃষ্টি হবে যখন ইসলামী শিক্ষা চর্চার মাধ্যমে নিজেকে এবং নিজের দায়িত্ব কর্তব্য বুঝতে পারবে এবং নিজের প্রভুর পরিচয় লাভ করতে পারবে। সুতরাং মাদককে চির নির্মুল করতে প্রয়োজন, মাদকসেবীদের ইসলামী শিক্ষার আলোকে আলোকিত করা।

প্রসঙ্গত : করোনার কারণে দেশব্যাপী অত্যন্ত সীমিত পরিসরে মাদক দিবস পালন করবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তবে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাদকবিরোধী প্রচার কার্যক্রম চালানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মাদকের সর্বব্যাপী বিস্তার ঠেকিয়ে তরুণ প্রজন্মকে এর অভিশাপ থেকে রক্ষায় বাংলাদেশে ২০১৮ সালের ৪ মে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান শুরু করে র‌্যাব। এরপর পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থাও মাদকবিরোধী অভিযান চালায়। অভিযানে এখন পর্যন্ত কয়েকশ’ ব্যক্তি মাদক কারবারে জড়িত থাকায় অভিযুক্ত হিসেবে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায়। গ্রেপ্তার হয় কয়েক হাজার। তবু মাদক নির্মূল করা যায়নি। মাদক কারবার চলছেই। করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারিও মাদককে রুখতে পারেনি।

র‌্যাবের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ২০১৮ সালের ৩ মে থেকে চলতি বছরের ২০ জুন পর্যন্ত শুধু র‌্যাব সারাদেশ থেকে এক হাজার তিন কোটি ৭৭ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে। এই দুই বছরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৫১৭ জন মাদক কারবারিকে। হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছে ৮৪ কেজি। এক কোটি ৫২ লাখ ২৩ হাজার ৬৭৩ পিস ইয়াবা বড়ি, দুই লাখ ৭৪ হাজার ৩০৩ বোতল ফেনসিডিল, আট হাজার ৫৫৪ কেজি গাঁজা, প্রায় দুই কেজি কোকেন, ছয় লাখ ৪৭ হাজার ২১৪টি নেশাজাতীয় ইনজেকশনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে সারাদেশে মাদক মামলা হয়েছে সাত হাজার ৬২৫টি। এপ্রিল মাসে এই মামলা কমে দাঁড়ায় এক হাজার ৬৪০টিতে। মে মাসে মামলার সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৪৬৫টি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, স্বাভাবিক সময়ে গড়ে প্রতি মাসে ঢাকায় মাদক উদ্ধারজনিত ২৫০-৩০০ মামলা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। করোনাকালে মামলার সংখ্যা গড়ে মাসে একশ’তে নেমে এসেছে।

লেখক : মুফতী মোহাম্মদ এনামুল হাসান। যুগ্ম সম্পাদক,
ইসলামী ঐক্যজোট, ব্রাক্ষণবাড়ীয়া জেলা।

#পরিমার্জন/আরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন