করোনা সংকটে বিপর্যস্ত কওমী মাদরাসা ও একটি বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: ৩:১৬ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০

মুহাম্মাদ মাহবুবুল হক

চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া মরণঘাতী করোনাভাইরাস থমকে দিয়েছে পৃথিবীকে। স্থবিরতা নেমে এসেছে জনজীবনে। মানুষের জীবনধারায় এসেছে পরিবর্তন।ঘরবন্দী জীবন আর সীমিত পরিসরে পথচলার এ এক নতুন জীবন।

কোভিড-১৯ প্রতিরোধে করণীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এখন অপরিহার্য। নতুন অভিজ্ঞতা আর শিক্ষা নিয়ে চলছে মানুষের অন্যরকম এক জীবন। অদৃশ্য জীবাণু করোনাভাইরাসকে সঙ্গী করে অজানা আতঙ্ক নিয়ে দুঃসময়ের পথচলার ছয় মাস পাড় করলো পৃথিবী। করোনা নির্মূলে সুনির্দিষ্ট কোন প্রতিষেধক নেই। ছোঁয়াচে এই রোগের সংক্রমণজনিত কারণে গোটা পৃথিবীর মানুষ ঘরে বসে আছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান এখনো এর কোন ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কার করতে পারেনি।

আরও পড়ুন : মাত্র ১ হাজার টাকায় কওমী শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শিখুন

সঙ্গত কারণেই অর্থনৈতিক সংকট বাড়ছে। দেশে দেশে বাড়ছে মানুষের হাহাকার। বাংলাদেশের ৬০ ভাগ মানুষ দৈনন্দিন রোজগার করে উপার্জন করে। এসব কর্মহীন মানুষের চোখে এখন শুধুই অন্ধকার। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বেহালদশা। করুণ ও কঠিন সময় অতিক্রম করছে সঞ্চয়হীন এসব পরিবার।আর্থিক সঙ্গতি ও সঞ্চয় আছে -এমন পরিবারও অর্থনৈতিক চাপে আছেন।ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকারখানাসহ দেশের সকল পর্যায়ের সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

বাংলাদেশে করোনা প্রার্দুভাবের শুরু থেকেই দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি -বেসরকারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কথা আছে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এই ছুটিকালীন বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।

এদেশের কওমী মাদরাসাগুলো বেসরকারি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ধর্মীয় শিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি দান-অনুদানও চায় না। করোনা পরিস্থিতির শুরুর দিকে দেশের কওমী মাদরাসাগুলোকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮ কোটি টাকার একটি অনুদান দিয়েছেন। কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের দায়িত্বশীলরা এই অনুদান গ্রহণ করেননি এবং মাদ্রাসাগুলোকে তা গ্রহণ না করতে বলেছেন। তবে স্থানীয়ভাবে অনেক কওমি মাদ্রাসা এই অনুদান গ্রহণ করেছে।

ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দের আদর্শ ও মূলনীতির আলোকে এ দেশের কওমি মাদরাসাগুলো পরিচালিত হয়। কওমি মাদরাসার নীতিমালা ও স্বকীয়তা হলো, সরকারি দান-অনুদান গ্রহণ না করা। জনগণের দান-অনুদান নির্ভর এই কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে চার মাস থেকে বন্ধ। শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সবার মতো শিক্ষক,কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বাড়িতে ছুটি কাটাচ্ছেন। সম্পূর্ণ জনগণের স্বপ্রণোদিত দান-অনুদানে পরিচালিত হওয়া দেশের কওমি মাদরাসাগুলো কঠিন সংকটকাল অতিক্রম করছে। জনগণের কাছ থেকে চাঁদা কালেকশনের প্রক্রিয়া বন্ধ থাকা ও জনগণের দুর্ভোগের কারণে অার্থিকভাবে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে কওমি মাদরাসাগুলো। ৫০ ভাগ কওমি মাদরাসায় স্বাভাবিক সময়েও বারো মাসই আর্থিক টানাপোড়েন থাকে। প্রতি মাসে সময় মতো শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করার সক্ষমতা থাকে না দেশের প্রায় অর্ধেক কওমি মাদরাসাগুলোর। করোনা পরিস্থিতি যেন এই শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য মরার উপর খাড়ার ঘা।

অনেক দুর্যোগ ও বিপদ-আপদ এবং দুর্ভিক্ষ এসেছে পৃথিবীতে। করোনাভাইরাসের মতো ভয়াবহ এমন দুর্যোগ কয়েক শতাব্দীতেও কেউ দেখেনি। দীর্ঘকালীন এই করোনা পরিস্থিতিতের কারণে কওমি শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সংকটও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কওমি মাদ্রাসাসমূহের চাঁদা কালেকশনের আদর্শ সময় হলো, রমজান মাস ও ঈদুল আজহা। প্রত্যেক মাদরাসা নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছ থেকে পুরো রমজান মাস ব্যাপী দান-অনুদান গ্রহণ করে থাকে।করোনাভাইরাসের কারণে এ বছর তা সম্ভব হয়নি। ফলে আর্থিকভাবে বড় একটি হোঁচট খেয়েছে এখানে মাদ্রাসাগুলো।

সামনে ঈদুল আজহা। জনগণের কাছ থেকে কুরবানীর পশুর চামড়া সংগ্রহ করে থাকে কওমী মাদরাসা। কারোনার দুর্যোগের কারণে এবছর এটাও সম্ভব হবে না। সম্প্রতি চামড়া শিল্পে কওমি মাদরাসার সম্পৃক্ততার প্রস্তাব দিয়েছেন শিল্প প্রতিমন্ত্রী।এবিষয়ে কওমি মাদরাসা কতৃপক্ষকে ভাবার সময় এসেছে। গত কয়েক বছর চামড়া শিল্পে ধস নামায় কওমি মাদরাসা বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলো। পর্যালোচনা করে সম্ভাবনাময় এই শিল্পের মূলধারায় কওমি মাদরাসার সম্পৃক্ততা দরকার।

পরিস্থিতি বলে করোনার বিপর্যয়ে চামড়া কালেকশনেও বিরাট ক্ষতির প্রভাব পড়বে মাদরাসাসমূহে। পরিস্থিতির শিকার কওমী মাদরাসাসমূহের বড় দুই আয়ের সময়ে করোনা দুর্যোগ বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বলাবাহুল্য যে, আপদকালীন এই চার মাসে কওমি মাদরাসা আর্থিক খাতে ও শিক্ষা কার্যক্রমে বিশাল ধাক্কা খেয়েছে। মার্চ-এপ্রিল শিক্ষাবর্ষের শেষ সময় ছিলো।বছর শেষে ছাত্রদের শ্রেণী পরিবর্তনের সাধারণ বার্ষিক পরীক্ষা ও ফাইনাল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। শিক্ষা ঘাটতি পূরণে কওমি বোর্ডগুলোর সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনার কথাও জানা যায়নি। মে-জুন ছিলো কওমি শিক্ষাবর্ষের সূচনা সময়। নতুন শিক্ষাবর্ষে ছাত্রভর্তি ও বিভিন্ন শ্রেণীর উত্তীর্ণদের শ্রেণী পরিবর্তন -এসব কার্যক্রম করোনার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে এসব ক্ষতি চলমান।অনেক মাদ্রাসা সীমিত পরিসরে অল্প সংখ্যক ছাত্র ভর্তি ও কিছুক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাসও শুরু করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না,কুরআন-হাদীস তথা ইলমে ওহীর শিক্ষাব্যবস্থা বিরাট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই করোনাকালে।সীমাবদ্ধতা থাকলেও যতটুকুন সম্ভব অনলাইন ক্লাস চালু করতে পারে কওমি মাদরাসাসমূহ।এতে শিক্ষাব্যবস্থার গতিময়তা কিছুটা হলেও থাকবে।

কওমি অঙ্গনে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার আগের যে কোন সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। অনলাইন ক্লাসের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ কঠিন কোন কাজ নয়।মাদরাসা প্রধানরা উদ্যোগী হলে এই ব্যবস্থাপনা সহজেই করা সম্ভব। যোগাযোগ মাধ্যমের উৎকর্ষের এই সময়ে ছাত্র-শিক্ষকদের যোগাযোগ সম্পর্ক চাইলেই উন্নতি করা যাবে।মাদরাসাগুলো শ্রেণীভিত্তিক দায়িত্ব অর্পণ করতে পারে শিক্ষকদের মধ্যে। ফোন যোগাযোগ বা অনলাইন মাধ্যমে শিক্ষকরা ছাত্রদের শিক্ষাবিষয়ক তদারকি করবেন নির্দিষ্ট শ্রেণীর ছাত্রদের।এক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুপাতে এক শ্রেণীর ছাত্রদের জন্য দুই-তিনজন শিক্ষক নিয়োজিত করতে পারে মাদরাসা কতৃপক্ষ।

  • করোনা দীর্ঘদিনের অতিথি হওয়ায় শিক্ষা ক্ষেত্রের এই স্থবিরতা অনেকটা কেটে যেবে এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে। মাদরাসাগুলোর সুর্নিদিষ্ট পরিকল্পনা থাকলে শিক্ষা ক্ষতি অনেকাংশে পূরণ করা সহজ হবে।

আগেই বলেছি, জণগণের সহায়তা নির্ভর অভাব পিছু না ছাড়া এসব কওমি মাদরাসার ৭০ভাগ মাদরাসা এই করোনাকালের বিগত চার মাসে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে সক্ষম হয়নি।অভাব-অনটন ও অর্থকষ্টে কারোনাকাল যাপন করছেন কওমি মাদরাসা শিক্ষকরা।স্থায়ীভাবে নিজস্ব জায়গায় প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাগুলো কোনভাবে ঠিকে থাকলেও ভাড়ায় পরিচালিত অস্থায়ী ক্যাম্পাসের অনেক প্রাইভেট মাদরাসা বন্ধ হয়ে গেছে স্থায়ীভাবে।চাকরি হারিয়েছেন অসংখ্য শিক্ষক।

অর্থাভাবে সংকটে পড়া কওমি শিক্ষকদের বিকল্প আয়ের উৎস নেই অনেকের। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক সমাজের পাশে নেই কেউ। কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাক একটি উদ্যোগ নিয়েছিলো করোনায় উপার্জন সংকটে পড়া শিক্ষকদের সহায়তা করার। সেই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখতে দেখতে চার মাস চলে গেলো। অবশেষে চলতি জুন মাসের শেষ দিকে বেফাকের সেই কল্যাণ তহবিলে ৩ কোটি টাকার একটি ফান্ড জমা হয়েছে বলে জানা যায়। সহায়তা কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। ৩ কোটি টাকা বিশাল সংখ্যক শিক্ষক সমাজের জন্য অত্যন্ত স্বল্প। তবুও কিছু শিক্ষক উপকৃত হলে মন্দ নয়।

ইসলামি শিক্ষার আলো বিকিরণ কেন্দ্র এই কওমি মাদরাসাগুলোর অবদান সমাজ ও দেশের জন্য অপরিসীম। ইসলামি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও আদর্শের এই কওমি মাদরাসাসমূহকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।সমাজের বিত্তবান-সম্পদশালীরা কওমি মাদরাসার পাশে দাঁড়ান।জনসাধারণের আস্থা ও বিশ্বাসের ঠিকানা, ইসলামের বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চার ভরসাস্থল কওমি মাদরাসা করোনায় যেন হারিয়ে না যায়,সে দিকে সবাইকে খেয়াল করতে হবে।এলাকার নিকটস্থ কওমি মাদরাসার দিকে আপনার সহযোগিতা ও সহানুভূতির চোখ রাখুন।ক্ষতিগ্রস্ত দেশের বিভিন্ন খাত সরকারি প্রণোদনা ভোগ করছে।দুঃসময়ের এই যাত্রায় ঠিকে থাকবে। কওমি মাদ্রাসা জনগণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরিস্থিতির শিকার করোনার এই দুর্যোগকালে দেশের জনগণকেই কওমি মাদরাসা ঠিকিয়ে রাখতে হবে।করোনার কারণে কওমি মাদরাসার জনসম্পৃক্ততার অভাব দূর করতে হবে।করোনা পরিস্থিতিতেও বিভিন্ন মাধ্যমে জনগণের সাথে কওমি মাদরাসার জোরালো সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। মাদরাসা প্রধান বা মুহতামিমরা মাদরাসা পরিচালনার কৌশল ও পরিকল্পনা নতুন আঙ্গিকে সাজাতে হবে।আমার বিশ্বাস, জনগণের ভালোবাসায় করোনাকালীন ক্ষতি ও হতাশা দূর করে হবে কওমি অঙ্গনের। মাদরাসা কতৃপক্ষরা সংকট উত্তরণে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।কওমি মাদরাসাসমূহের উন্নতি ও অগ্রগতি থেমে থাকবে না।ইলমে ওহীর এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আল্লাহর অদৃশ্য সাহায্যের কল্যাণেই এগিয়ে যাবে,ইনশাআল্লাহ।করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ও পর্যবেক্ষণের আলোকে মাদরাসাসমূহ খোলে দেয়ার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি রাখতে হবে। মাদরাসাসমূহকে যথাযথ পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা দিয়ে কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডগুলোকে সংকট উত্তরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

লেখক : শিক্ষক, কলামিস্ট।

মন্তব্য করুন