চীনের শুল্কমুক্ত সুবিধা বিষয়ে বাংলাদেশকে বাজেভাবে কটাক্ষ ভারতীয় মিডিয়ার

প্রকাশিত: ১১:৪৪ অপরাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০

বাংলাদেশকে ব্যবসায়িকভাবে চীনের শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার বিষয় নিয়ে চরম কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্য করে বাজেভাবে শিরোনাম দিয়ে সংবাদ করেছে কলকাতার সর্বপ্রধান দৈনিক আনন্দবাজার, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়াসহ ভারতের একাধিক মিডিয়া।

যা বাংলাদেশের জনসাধারণের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিয়ে সকল জায়গায় এ বিষয়ে প্রচন্ড প্রতিবাদ হচ্ছে।

এ বিষয়ে আনন্দবাজারের শিরোনাম ছিলো – ‘খয়রাতি টাকা ছড়িয়ে বাংলাদেশকে পাশে পাওয়ার চেষ্টা চীনের’। এমনকি এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনায় আনন্দবাজার বলেছে – ‘বাণিজ্যিক লগ্নি আর খয়রাতির টাকা ছড়িয়ে বাংলাদেশকে পাশে পাওয়ার চেষ্টা নতুন নয় চিনের। লাদাখে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত-সংঘর্ষে উত্তাপ ছড়ানোর পরে ফের নতুন উদ্যমে সে কাজে নেমেছে বেজিং।

এছাড়া টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ হিসেবে চীনের কাছে শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ। আশ্চর্যজনকভাবে গত ১৬ জুন, অর্থাৎ লাদাখ সংঘর্ষের মাত্র একদিন পরেই বিষয়টিতে ইতিবাচক সাড়া দেয় বেইজিং।“

আনন্দবাজারের এমন কটাক্ষপূর্ণ এবং বাংলাদেশ নিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে কঠোর প্রতিবাদ।

তথাকথিত বন্ধু দাবিদার ভারত রাষ্ট্র চীনের সাথে তাদের নিজেদেরকে বিবাদ কে জড়িয়ে বাংলাদেশকে এভাবে ছোট করার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তা অবশ্যই আন্তর্জাতিকভাবে কূটনৈতিক আইন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীলতার ভূমিকা নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সি আর আবরার একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, ভারতের সাথে পার্শ্ববর্তী সবগুলি দেশের সাথেই সম্পর্কের টানাটানি রয়েছে। সেজন্য দায় দায়িত্ব ভারত সরকারের ওপরই বর্তায়। তাছাড়া বাংলাদেশের বর্তমান সরকার গত দশ বছরে ভারতকে তাদের সকল চাহিদা যেভাবে পূরণ করেছে তার বিপরীতে বাংলাদেশেকে তারা কিছুই দেয় নি।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, আজ বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বার্থে চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কিছু করলে তা নিয়ে ভারতের গা-জ্বালা হতে পারে কিন্তু তারা এভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মন্তব্য করতে পরে না।

উল্যেখ্য : চীনের সাথে ভারতের সমস্যা নতুন কিছু নয়। সীমান্ত বিরোধ এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে ভারতের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে। এছাড়াও চরম হিন্দুত্ববাদ লালন করা দেশ ভারত কেবল চীন নয় বরং তাঁর আশেপাশের সকল দেশের সাথেই সীমান্ত ঝগড়া এবং বৈরি ভাব নিয়ে আছে।

এর মধ্যে যেসব দেশ ভারতের থেকে ছোট এবং শক্তিশালী নয় যেমন বাংলাদেশ, নেপাল শ্রীলংকা সেসব দেশের সাথে ভারত অনেকটাই মোড়লের ভূমিকায় আছে অরদিকে চীন এবং ভারতের সাথে অনেকটাই ভেজা বিড়ালের মত আছে। ভারতের এসব কারণে ধীরে ধীরে বন্দুহারা হয়ে পড়ছে ভারত।

প্রসঙ্গত : চীনের বাজারে নতুন করে বাংলাদেশের ৫ হাজার ১৬১টি পণ্যেকে শুল্কমুক্ত প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে চীন। আগামী ১ জুলাই থেকে বাংলাদেশ এই সুবিধা ভোগ করবে। গত ১৬ জুন দেশটির ট্যারিফ কমিশন নোটিশ দিয়ে এ তথ্য জানায়। নোটিশে বলা হয়, স্বল্পোন্নত দেশের জন্য শুল্কমুক্ত পণ্যের প্রবেশাধিকার দিতে চীনের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নোটিশে আরও বলা হয়, বাংলাদেশি পণ্য চীনে ৯৭ শতাংশ শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাবে। কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে কোনো শুল্ক দিতে হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন ১৪০ কোটি জনসংখ্যার একটি বিশাল সম্ভাবনাময় বাজার। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে এ দেশের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, একই উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। চীনের বাজারে ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পেলে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা সম্পন্ন প্রায় সকল পণ্য চীনে শুল্কমুক্ত কোটামুক্তভাবে প্রবেশের সুবিধা পাবে। ফলে, চীনে রপ্তানি উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়, যা বাংলাদেশের বাণিজ্য বৈষম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কার্যকর ভ‚মিকা রাখবে।

সুত্র মতে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীক সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। বিশেষ করে এ অঞ্চলে চীনের পণ্য আমদানির বড় ক্রেতা বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশ থেকে চীনে পণ্য রফতানির গতি খুব একটা বাড়ছিলো না। এবার চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির পথ আরো উন্মুক্ত হলো।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশ পাঁচ হাজার ১৬১টি পণ্যে এই সুবিধা পাবে। এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্য চুক্তির (এপিটিএ) আওতায় বর্তমানে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৯৫টি পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ভোগ করছে। চীন নতুন করে ৯৭ শতাংশ শুল্কমুক্ত ঘোষণা দেওয়ায় বাংলাদেশ ৮ হাজার ২৫৬টি পণ্যে এ সুবিধা পাবে। এতে দেশটিতে ৩টি বাদে বাকি সব পণ্যই শুল্কমুক্ত প্রবেশের অনুমতি পেলো।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীনে ৮৩ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করে। বিশেষ করে কাচা চামড়া, চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, তৈরি পোশাকসহ কাঠের আসবাবপত্র উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে উৎপাদিত প্রক্রিয়াজাত চামড়ার ৬০ শতাংশের বেশি রফতানি হয় চীনে।

এলডিসি কান্ট্রি হিসাবে বাণিজ্যের এই প্রাধিকারটি পেতে দীর্ঘ দিন ধরে ঢাকা-বেইজিং আলোচনা চলছিল। ১৬ জুন সুবিধাটি দিতে সম্মত হয় শি জিন পিংয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশসহ ৩৩টি স্বল্পোন্নত দেশ যাদের সাথে চীনের ক‚টনৈতিক সম্পর্ক আছে তাদেরকে চীনের ৬০ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে শুল্ক-মুক্ত সুবিধা প্রদান করা হয়। কিন্তু চীন প্রদত্ত এ সুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার অনুক‚ল কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা আছে এমন অনেক পণ্য শুল্ক-মুক্ত সুবিধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এ প্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি সম্ভাবণাময় পণ্যে শুল্ক-মুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা প্রদানের জন্য চীনকে অনুরোধ করে। যদিও চীন ২০১৩ সালে শুল্ক-মুক্ত সুবিধা প্রাপ্ত দেশের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ৪০টি দেশে উন্নীত করে।

মন্তব্য করুন