শিক্ষার্থীদের মেসভাড়া সমস্যা নিরসনে জবি প্রশাসনের বাঁধা কোথায়? 

প্রকাশিত: ৪:৫৮ অপরাহ্ণ, জুন ১৮, ২০২০
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : ফাইল ছবি
ফয়সাল আরেফিন, জবি সংবাদদাতা: করোনাভাইরাস ও লকডাউন ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থানে দেশের একমাত্র অনাবাসিক প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও প্রশাসন। কোনো আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের বিভিন্ন মেস ও বাসা ভাড়া নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরেই হল তৈরিতে বিলম্বে প্রশাসনের সাথে বিপরীতমুখী অবস্থানে আছে শিক্ষার্থীরা। তবে করোনাকালের এই মহামারীতেও জবি প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মাঝে বিরাজ করছে অন্য এক চাপা উত্তেজনা।
জানা যায়, গত ১৭ মার্চ থেকে সরকারি নির্দেশে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করলে শিক্ষার্থীরা ছুটি কাটাতে গ্রামে চলে যান। যা পরে কয়েক দফায় বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে অনির্দিষ্টকালের জন্য অব্যহত আছে। যারা টিউশনি করিয়ে নিজেদের খরচ বহন করতেন করোনার কারণে প্রায় সকলেরই টিউশনি চলে যায়। এমতাবস্থায় পরবর্তী মাসগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য মেস ভাড়া দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে অসহায় হয়ে পড়েছেন তুলনামূলক দরিদ্র পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীরা।
এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা শিক্ষার্থীদের থেকে অভিযোগ আসছে ভাড়া আদায় করতে ফোনে হুমকি ও মানসিক নির্যাতন করছেন মেস মালিকরা। বৈশ্বিক এ সংকটে টিউশন বন্ধ থাকায় কোন ধরণের আয় নেই তার ওপর মেস মালিকদের বা বাড়িওয়ালাদের ভাড়া পরিশোধের চাপ শিক্ষার্থীদের সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদার্থবিজ্ঞানের এক শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করলে আমি কিছুদিন ছুটি কাটানোর উদ্দেশ্যে গ্রামে চলে যাই৷ আমার সকল রুমমেটও ভাবে হয়ত শীঘ্রই পরিস্থিতি অনূকূলে চলে আসবে তখন আবারো ঢাকায় চলে আসবো। কিন্তু করোনার এত দীর্ঘকাল স্থায়িত্বের ফলে মেস ভাড়া নিয়ে আমার মতো পুরাণ ঢাকার হাজার হাজার জবিয়ান শিক্ষার্থী সংকটে পড়ে যায়। আর্থিক সমস্যা নেই এমন কয়েকজন শিক্ষার্থী মেসভাড়া পরিশোধ করলেও আমাদের মতো দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য এটা খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি টিউশনি করিয়ে নিজের খরচ চালাতাম। এখন তো ওটাও করানোর সুযোগ নেই। এদিকে গ্রামে বাবা কৃষি কাজ করেন একই কারনে তারও কাজ কমে গেছে, কোনোমতে দিন পার করছি। এমতাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করে তবে কয়েক হাজার জবিয়ান প্রশাসনের নিকট চিরঋণি থাকবে।
এদিকে পুরাণ ঢাকার একটি আবাসিক ভবনের মালিক আশরাফুল আলম প্রতিবেদককে বলেন, আমরা যারা বাড়িওয়ালা তাদের অনেকেই পুরাণ ঢাকায় কেবল বাড়ি ভাড়া আদায়ের মাধ্যমেই জীবন নির্বাহ করে থাকি, বিকল্প কোনো আয়ের পথ নেই। আমার নিজের বাসায়ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৪/১৫ জন শিক্ষার্থী থাকে তাদের মধ্যে দুইজন মাত্র গত ২ মাসের ভাড়া দিয়েছে বাকিরা বলছে তারা দিতে পারবেনা। এখন আমি কি করব? বাধ্য হয়ে আমাকে এখন হয়ত ওদের রেখে যাওয়া বিছানা, টেবিল, বই এর দখল নিতে হতে পারে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কষ্ট বুঝি, তারা খুব পরিশ্রম করে দেশের অন্যতম সেরা ভার্সিটিতে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। লকডাউনে তাদের পরিবারও হয়ত খুব কষ্টে আছে, তাই আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এদিকে একটু দেখা উচিৎ তারা পুরোটা না হলেও যদি অর্ধেক ভাড়া তারা দেয়ার ব্যবস্থা করে, আর বাকি অর্ধেক ঐ শিক্ষার্থী বহন করে তাহলেও তাদের একটু সুবিধা হবে৷ প্রয়োজনে বিদুৎ বিল, গ্যাস, পানি ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে আমরাও ভাড়া কমিয়ে আনবো। আমরা যদি সবাই সবাইকে সাহায্য করি তবেই না জয় করতে পারবো খারাপ সময়কে।
এবিষয়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি কেএম মুত্তাকী বলেন, শিক্ষার্থীদের সংকট নিরসনে আমরা ইতোমধ্যেই ৫ দফা দাবি জানিয়েছি। ঢাকায় অস্থায়ী শিক্ষার্থীদের মেসভাড়া অন্যূন ৫০ ভাগ মওকুফ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে একমাত্র ভাড়ার উপর নির্ভরশীল বাসার মালিকরাও যেন ক্ষতির সম্মুখীন না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে সিটি কর্পোরেশনের সাথে আলোচনা করে তাদের ইউটিলিটি বিল মওকুফের উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের সংকটময় পরিস্থিতি বিবেচনা করে পুরো প্রক্রিয়াটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই তদারকি করতে হবে।
তিনি আরও জানান, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই টিউশনির মাধ্যমে শিক্ষাব্যায় নির্বাহ করে। ব্যক্তিবিশেষ পরিবারকেও সহায়তা করে। এই মহামারির সময়ে টিউশনি না থাকায় তাদের মধ্যে আর্থিক অস্বচ্ছলতা দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পূরক অর্থ সহায়তা দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আগামী অর্থবছরের বাজেটে এটির সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
পক্ষান্তরে আন্তরিকতা থাকা স্বত্তেও কিছু জটিলতার কারণে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো যাচ্ছে না বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটির সদস্য সচিব কাজী মো. নাসির উদ্দীন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভিসি স্যার শিক্ষার্থীদের বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক, তবে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের বাইরে তিনি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তাকেও সিস্টেমের মধ্যে যেতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিন্ডিকেটের মিটিং ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত হতে পারে না। সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের সদস্য, তাদের সবাইকে এক করে ভার্চুয়াল মিটিং করার ওয়ার্কস্টেশন করার কাজ চলছে। তখন ভিসি স্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র হিসেবে মিটিং এর ডাক দিলেই আলোচনার মাধ্যমে ছাত্রদের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’
‘উক্ত মিটিংএ যদি শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থ ও হিসাব দপ্তরে কোনো আর্থিক বাজেটের নির্দেশ আসে তবে তা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে নেয়ারও অঙ্গিকার প্রকাশ করেন তিনি। ’
উল্লেখ্য, পৃথিবীব্যাপী করোনা মহামারীর মাঝে বাংলাদেশে গত ৮ই মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এর পরপরই সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল কলেজ শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে সরকার ১৭ মার্চ দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩১ মার্চ পর্যন্ত জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। তবে পরিস্থিতি প্রতিকূলে থাকায় সেই ছুটি কয়েকদফায় বৃদ্ধি পেয়ে এখন অবধি চলছে।
এনএইচ/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন