মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ

আধুনিক বাংলা কাব্য সাহিত্যের বরপূত্র তিনি

প্রকাশিত: ১:২৫ অপরাহ্ণ, জুন ১০, ২০২০
মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ। ছবি : পাবলিক ভয়েস।

আধুনিক সাহিত্য ও মুসলিম রেনাসাঁর অন্যতম কবি ফররুখ আহমদ এর ১০২ তম জন্মদিন আজ। ১৯১৮ সালের এই দিনে (১০ জুন) জন্মেছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ক্ষণজন্মা এই কবি প্রতিভা। এই প্রতিবেদনে সংক্ষিপ্ত আকারে আমরা জানবো ফররুখ আহমেদের জীবন কর্ম ও প্রতিভা সম্পর্কে।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম জনপ্রিয় কবি ফররুখ আহমদ। তিনি মুসলিম রেনেসাঁর কবি হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। কারণ তার কবিতা তৎকালীন বাংলার অধঃপতিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অনুপ্রেরণা জোগায়।

আরও পড়ুন : বাংলা নববর্ষকে অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে

ফররুখ আহমদ দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের হাহাকার, আর্তনাদ, অনাহার ক্লিষ্টের করুণ পরিনতি, সমকালের সংকট, জরাগ্রস্ত বাস্তবতা, সাম্প্রদায়িকতার হিংস্রতা দেখে তিনি আঘাত পান। আর সকল অসঙ্গতি-ই তাকে সাহিত্য সাধনায় অনুপ্রেরণা জোগায়।

ফররুখ আহমদের জন্ম, শিক্ষা ও প্রাথমিক জীবন :

১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরা জেলার শ্রীরামপুর থানার মাঝাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফররুখ আহমদ। ১৯২৪ সালে মা রওশন আখতারের মৃত্যু ঘটে। ১৯৩৭ সালে খুলনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে রিপন কলেজে ভর্তি হন। স্কুল জীবনেই সম্পর্ক স্থাপিত হয় কবি গোলাম মোস্তফা, কথাসাহিত্যিক আবুল ফজল এবং কবি আবুল হাশিমের সাথে। বিখ্যাত সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায় ছিলেন তার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের সহপাঠী। পরবরর্তীতে আহসান হাবীব, আবু রুশদ ও আবুল হোসেনের সঙ্গে মিত্রতা হয়।

রিপন কলেজে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, প্রমথনাথ বিশীর মতো প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের। ১৯৩৯ সালে সেখান থেকেই আইএ পাশ করেন। বন্ধু হিসেবে পান সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও ফতেহ লোহানীকে।

কর্মজীবন :

স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন ও ইংরেজী সাহিত্যে বিএ ভর্তি হলেও অসমাপ্ত রেখেই নেমে পড়তে হয় কর্মজীবনে। ১৯৪৩ সালে কলকাতা আই.জি. প্রিজন অফিসে যোগদান করেন। একবছর পরেই সেখান থেকে সরে গিয়ে যোগ দেন সিভিল সাপ্লাই অফিসে। ১৯৪৫ সাল থেকে মোহাম্মদী পত্রিকাতে যোগ দেন। এই চাকরিতে ইস্তফা দিলে বেকার জীবনের শুরু।

এরপর ১৯৪৬সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকুরী করেন। ১৯৪৮সালে কোলকাতা থেকে ঢাকায় এসে ঢাকা বেতারে যোগ দেন। ঢাকা বেতারে নিয়মিত ষ্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন তিনি। ঢাকা বেতারে তিনি ‘ছোটদের খেলাঘর’ অনুষ্টান পরিচালনা করতেন। একবার বাংলাদেশ বেতার থেকেও তাঁর চাকরি চলে যায়। এ সময়ে এগিয়ে এলেন আরেক কিংবদন্তী সাহিত্যিক আহমদ ছফা। ‘ফররুখ আহমদের কী অপরাধ’ শীর্ষক তীব্র ও তীক্ষ্ণ প্রতিবেদন লিখলেন গণকণ্ঠ পত্রিকায়। ফলে কবিকে পুনর্বহাল করা হয়। তবে শেষ জীবনে কবি অবমূল্যায়ন এবং ভয়াবহ অর্থসংকটে জীবন যাপন করেছেন।

ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কবীর অকুণ্ঠ সমর্থন :

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রতি তার ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন। ধর্মীয় কুসংস্কার ও পাকিস্তানের অপরিণামদর্শী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে তার লেখা ছিল কঠোর। ১৯৬৬ সালে তিনি সিতারা-ই ইমতিয়াজ খেতাব প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতিও তার সমর্থন ছিল। তারপরেও স্বাধীনতার পর তাকে চাকরির ক্ষেত্রে বিপর্যয়ে পড়তে হলো।

কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন একজন ভাষা সৈনিক। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে তার “মধুর চেয়েও মধুর যে ভাই আমার দেশের ভাষা” গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়। পাকিস্তান আন্দোলন চলাকালীন ভাষা বিতর্কের সময় থেকেই তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরদার ছিলেন।

বায়ান্নর রক্তাক্ত ঘটনার পর রেডিওতে কর্মরত শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, আব্দুল আহাদ, আব্দুল হালিম চৌধুরীদেরকে নিয়ে তিনি ধর্মঘটে যোগদেন। তিনি তদানিন্তন পাকিস্তানী শাসকদের ব্যাঙ্গ করে ‘রাজ-রাজরা’ নামে একটি নাটক লেখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটকটি মঞ্চায়িত হয়। প্রখ্যাত নাট্যকার মুনীর চৌধুরী এতে অভিনয় করেন।

এরপর পাকিস্তান প্রতিষ্টার পরপরই তিনি মাসিক সওগাত (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর,১৯৪৭) সংখ্যায় পাকিস্তান: রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য নিবন্ধে লেখেন: “গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র্রভাষাকে পর্যন্ত যারা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রুপান্তরিত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল অধিবাসীদের সাথে আমিও এই প্রকার অসাধু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি”।

মুসলিম রেনেসাঁয় ফররুখ আহমদ :

কবি ফররুখ আহমদ প্রথম যৌবনে ভারতবর্ষের বিখ্যাত কমরেড এম.এন রায়ের শিষ্য ছিলেন। কিন্তু জন্মসূত্রে ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যের অধিকারী কবি একসময় ধর্মীয় চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তার কবিতায় ইসলামী সমাজতন্ত্র মূর্ত হয়ে ওঠেন।

চল্লিশের দশকে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন তথা স্বাধীনতা আন্দোলনে গনজাগরণ মূলক কবিতা লেখে জনপ্রিয়তা পান কবি ফররুখ আহমদ। তিনি ছিলেন মুসলিম পুনর্জাগরণে বিশ্বাসী। ইসলামী আদর্শ ও আরব ইরানের ঐতিহ্য তার কবিতায় ব্যাঙময় হয়ে উঠে।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কবিতায় আরবী, ফারসী শব্দের যে স্বার্থক প্রয়োগ শুরু করেন, মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ তা আরও বেগবান করেন। ১৯৪৩ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ নিয়ে ফররুখ আহমদ অসংখ্য কবিতা রচনা করেন। যার সংখ্যা প্রায় ১৯।

১৯৪৩ সালে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ‘আকাল’ নামে একটি সংকলন প্রকাশ করেন। তাতে কবি ফররুখ আহমদের বিখ্যাত ‘লাশ’ কবিতাটি স্থান পায়। দুর্ভিক্ষ নিয়ে অদ্যবধি বাংলা সাহিত্যে ‘লাশ’ এর মত কবিতা আর কেউ লিখতে পারেন নি। দুর্ভিক্ষ নিয়ে ব্যাথিত কবির উচ্চারণ-
“যেখানে পথের পাশে মুখ গুঁজে প’ড়ে আছে জমিনের ’পর;
সন্ধ্যার জনতা জানি কোনদিন রাখেনা সে মৃতের খবর”।

রেনেসাঁর কবি, জাগরণের কবি, ঐতিহ্যের কবি, জাতিসত্তার কবি ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যে মহান উচ্চতায় অধিষ্টিত। জাতীর আগামী স্বপ্নের জাল বুনতে পথ দেখিয়েছেন এই মহান কবি। তার শ্রেষ্ট সৃষ্টি ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্য গ্রন্থের জন্য তিনি অমর হয়ে আছেন।

তথাকথিত প্রগতিশীলদের নখরদন্তে ফররুখ :

নয়া প্রগতিশীলতার স্রোতে ফররুখ আহমদের তাৎপর্য মূল্যায়নে বিশাল বড় ভুল হচ্ছে। প্রায়ই পাকিস্তান ও সাম্প্রদায়িকতার এক পৈতা ঝুলিয়ে দেয়া হচ্ছে তার গলায়। অথচ বিষয়টাকে আমরা ইতিহাসের আলোয় ফেললে সত্যিকার ফররুখের মনস্তত্ত্ব ধরা যায়। তার উত্থানের সময় নিখিল ভারতে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব প্রকট। শুধু ভারতের স্বাধীনতা নয়, মুসলিম জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম অংশ চেয়েছিল স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (২০১৪) বইতে তখনকার তরুণদের মনোভাব টানতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন,

পাকিস্তান আনতে না পারলে লেখাপড়া শিখে কি করব?

তিনি আরও লেখেন,

অখণ্ড ভারতে যে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না এটা আমি মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করতাম।

আনিসুজ্জামানের আত্মজীবনী কাল নিরবধিতে বলা হয়েছে,

‘আমার জ্ঞান হতে দেখি, বাড়ির সকলে পাকিস্তান চান, মুসলিম লীগকে সমর্থন করেন এবং জিন্নাহ্‌কে নেতা মানেন। আশপাশেও এই ভাবটাই প্রবল ছিল’।

পরবর্তী সময়ের আরেক কিংবদন্তি আহমদ ছফার ভাষায়,

পাকিস্তান এবং ইসলাম নিয়ে আজকের বাংলাদেশে লেখেননি, এমন কোনো কবি-সাহিত্যিক নেই বললেই চলে। অন্য অনেকের কথা বাদ দিয়েও কবি সুফিয়া কামালের পাকিস্তান এবং জিন্নাহ্‌র ওপর নানা সময়ে লেখা কবিতাগুলো জড়ো করে প্রকাশ করলে সঞ্চয়িতার মতো একখানা গ্রন্থ দাঁড়াবে বলেই আমাদের ধারণা। (ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, পৃষ্ঠা- ৫৩৯)

আদতে ফররুখ আহমদের অবস্থান ছিল শোষণের বিরুদ্ধে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলি চালানোর প্রতিবাদে রেডিও পাকিস্তান থেকে তাৎক্ষণিক সব অনুষ্ঠান বন্ধ করেন তিনি। নিজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে নিয়ে নেমে আসেন রাস্তায়। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের হাত থেকে পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জানান। ‘হায়াতদারাজ খান’ ছদ্মনামে পাকিস্তানি শাসকচক্রের অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে রচনা করেন অসংখ্য ব্যঙ্গ কবিতা। খুব সম্ভবত তার অপরাধ, তিনি তার জনগোষ্ঠীর ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী নতুন জাগরণকে ধরতে পারেননি।

সে যা-ই হোক, ফররুখ আহমদকে বিয়োগ করলে বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ এক অভিজ্ঞতাকে বিয়োগ করার মতো বোকামি হবে। বাঙালি জাতিসত্তা এবং বাংলা কবিতার অনিবার্য সংগ্রামী ইতিহাসকে বিয়োগ করা হবে। ফররুখ আহমদের প্রয়োজনীয়তা বাঙালির ইতিহাসের জন্যই। পৃথিবীর কোনো জাতিই নিশ্চয়ই নিজের সংস্কৃতির সম্পদকে ছুড়ে ফেলবে না। ফররুখ আহমদের অস্তিত্ব বাংলা সাহিত্যের সৌন্দর্য বাড়ায় বৈ কমায় না। বহু ফুলের উপস্থিতি যেমন আরো বৈচিত্যময় ও সমৃদ্ধ করে তোলে বাগানকে।

ফররুখ আহমদের কাব্যপ্রতিভা ও মূল্যায়ন :

কাব্যপ্রতিভায় ফররুখ আহমদ অনন্য সৃষ্টিশীল কবি ছিলেন। তিনি অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ রচনা করোছেন। কবি ফররুখ আহমদের কাব্যগ্রন্থগুলো হলো- ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪), ‘সিরাজাম মুনিরা’ (১৯৫২), ‘নৌফেল ও হাতেম’ (১৯৬১), ‘মুহুর্তের কবিতা’ (১৯৬৩), ‘ধোলাই কাব্য’ (১৯৬৩), ‘হাতেম তায়ী’ (১৯৬৬), ‘নতুন লেখা’ (১৯৬৯), ‘কাফেলা’ (১৯৮০), ‘হাবিদা মরুর কাহিনী’ (১৯৮১), ‘সিন্দাবাদ’ (১৯৮৩), ‘দিলরুবা’ (১৯৮৪)।

শিশু সাহিত্যেও তিনি অতুলনীয় ছিলেন। তার রচিত শিশুতোষ গ্রন্থ হলো- ‘পাখির বাসা’ (১৯৬৫), ‘হরফের ছড়া’ (১৯৭০), ‘চাঁদের আসর’ (১৯৭০), ‘ছড়ার আসর’ (১৯৭০), ‘ফুলের জলসা’ (১৯৮৫)।

বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত মহাকাব্য ‘মেঘনাদ বধ’ এর পরে অন্যতম সফল মহাকাব্য ফররুখ আহমদ রচিত ‘হাতেম তায়ী’।

মুসলিম কবিদের মধ্যে কাব্যনাটক রচনার পথিকৃত তিনি। তার ‘নৌফেল ও হাতেম’ একটি সফল ও জনপ্রিয় কাব্যনাটক।

সনেট রচনায়ও সফল তিনি। বাংলা সাহিত্যে মাইকেলের পরে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আর কোন কবি এত বেশি সফল সনেট রচনা করতে পারেন নি। তার সনেট গ্রন্থের মধ্যে- ‘মুহুর্তের কবিতা’, ‘দিলরুবা’, ‘অনুস্বার’ প্রধান। গদ্য কবিতা রচনায় সিদ্ধহস্ত কবি ফররুখ আহমদ। তার গদ্য কবিতার সংকলন-‘হাবেদা মরুর কাহিনী’ লিখে সফল তিনি। গীতিনাট্য ‘আনার কলি’ (১৯৬৬)।

কবি ফররুখ আহমদের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও সমাদৃত কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’র ভাষা ও ভাষ্য, ব্যাকুলতা ও আবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কবি একই সঙ্গে মুসলিম সমাজকে অতীত ঐতিহ্য স্মরণ করিয়ে উজ্জীবিত করছেন আবার তাদের পতিত জীবনযাপন দেখে ব্যথিত হচ্ছেন। তিনি তাদের সোনালি দিনের শোভা গ্রহণ করতে বলছেন, অতীতে ফিরে যেতে নিষেধ করছেন। আর অতীতে ফিরে না গিয়ে ঐতিহ্য ধারণের নামই সম্ভবত জাগরণ। এ ডাক দিয়ে যাওয়ায় ফররুখ আহমদ জাগরণের কবি।

আবুল কালাম শামসুদ্দীন লিখেছেন : ‘হাতেম তায়ী’ কবি ফররুখ আহমদের লেখা প্রায় সোয়া তিন শত পৃষ্ঠায় সমাপ্ত এক বিরাট মহাকাব্য। এ আখ্যায়িকা-কাব্যটি যখন সাময়িক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল, তখনই কবি আবদুল কাদির, ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হক প্রমুখ সাহিত্য-সমালোচকগণ একে মহাকাব্য বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আমিও মনে করি, সব দিক দিয়ে বিবেচনা করে একে মহাকাব্য বলে আখ্যায়িত করলে ভুল তো কিছু করা হবে না, বরং এতে যথার্থ মূল্যায়নই এর হবে।’

পুরস্কার ও সম্মাননা :

কবি ফররুখ আহমদ কবি স্বীকৃতি স্বরুপ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। অন্যতম হলো- বাংলা একাডেমী (১৯৬০), প্রেসিডেন্ট পদক ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ (১৯৬৫), আদমজী পুরস্কার (১৯৬৬), ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬৬), একুশে পদক (১৯৭৭-মরনোত্তর), স্বাধীনতা পদক (১৯৮০-মরনোত্তর)।

ফররুখ আহমদের ইন্তেকাল ও বেদনামাখা কিছু কথা :

কবি ফররুখ আহমদ ১৯৭৪ সালের ১৯শে অক্টোবর ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। তিনি তার কবিতায় সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা লিখে গেলেও তার জীবনে তাকে বহু দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয়েছে। মূলত ইসলামী আদর্শ লালন করার কারনেই তাকে এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে বলে মনে করা হয়। এমনকি ঢাকা বেতার থেকে তার চাকুরী চলে যায়।

তার এক ছেলে ডাক্তারি পড়ছিল, টাকার অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। চিকিৎসার অভাবে এক মেয়ে মারা যায়। তখন রমজান মাস ছিল। টাকার অভাবে ও শারীরিক অসুস্থতার কারনে না খেয়েই রোজা রাখতেন তিনি। এ অবস্থাতেই ২৭শে রমজান ইন্তেকাল করেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এই কবি।

তাকে কোথায় দাফন করা হবে তা নিয়েও সমস্যা দেখা দেয়। প্রখ্যাত সাংবাদিক আসাফউদ্দৌলা রেজাসহ অনেকেই সরকারিভাবে কোন জায়গা পাওয়া কিনা চেষ্টা করলেন। কিন্তু সরকারিভাবে কোন জায়গা পাওয়া যায়নি। অবশেষে কবি বেনজীর আহমদ তার শাহজাহান পুরের পারিবারিক গোরস্থানে কবিকে দাফন করার জায়গা দান করেন।

বাংলা সাহিত্যের অমর কিছু কবি ও লেখক এর কলমে ফররুখ আহমদের মূল্যায়ন :

কবি ফররুখ আহমদের শেষ জীবনের করুণ পরিণতি দেখে আহমদ ছফা লেখেন- “আজকের সমগ্র বাংলা সাহিত্যে ফররুখ আহমদের মত একজনও শক্তিশালী স্রষ্টা নেই। এমন একজন স্রষ্টাকে অনাহারে রেখে তিলে তিলে মরতে বাধ্য করেছি আমরা। ভবিষ্যত বংশধর আমাদের ক্ষমা করবে না।”

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান কবি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তিনি মারা গেছেন একেবারে নিঃস্ব অবস্থায়। না, ভুল বললাম, নিঃস্ব কথাটা তাঁর জন্য প্রযোজ্য নয়। তাঁর মানসিক ঐশ্বর্যের কোনো কমতি ছিল না। তিনি রেখে গেছেন এমন কয়েকটি গ্রন্থ, যেগুলো পঠিত হবে দীর্ঘকাল।’

সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, ‘ফররুখের কাব্যপ্রক্রিয়ায় যেহেতু একটা বিশ্বাসের উন্মুখরতা ছিল, তাই তার পাঠকের সংখ্যা আমাদের মাঝে সর্বাধিক। বিশ্বাসের সে একটা কল্লোলিত সমর্থন পেয়েছে। আবার ব্যবহৃত শব্দের পরিধির সার্থক বিবেচনায় এবং ধ্বনি সাম্যের কারণে অবিশ্বাসীরাও তাকে অগ্রাহ্য করতে পারেনি।’

বাংলা সাহিত্যের প্রভাবশালী আর এক কবি আল মাহমুদ ফররুখ আহমদ সম্পর্কে বলেছেন, ফররুখ আহমদ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষে নতুন ভোর দেখতে আগ্রহী বাঙালি সাহিত্যের একজন বিখ্যাত কবি। ইংরেজিভাষী পাঠকদের সামনে তাকে উপস্থাপন করার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘ দিন ধরে অনুভূত হচ্ছিল। প্রকৃতপক্ষে ‘ঈগল আই’ বইটি ফররুখ আহমদের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাডেমিক গ্রন্থ, যাতে ইংরেজিতে কবির জীবন ও কাজগুলোর অনেক দিক নিয়ে গবেষণাধর্মী আলোচনা করা হয়েছে। কবি ফররুখকে তিনি যেমন ছিলেন, তেমনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন লেখক।

বাংলা সাহিত্য বিশ্লেষক হাসান হাফিজুর রহমান আধুনিক কবি ও কবিতা (১৯৬৫) বইয়ে লিখেছেন, ‘ফররুখ আমাদের কাব্যসাহিত্যে আধুনিক উত্তরণে প্রকৃত সাহায্যটা করেছেন তার কাব্যভাষা এবং আঙ্গিকের প্রয়োগে।’ ফররুখকে বাদ দেয়া মানে, আমাদের জাতিসত্তার এবং কবিতার একটি অনিবার্য সংগ্রামী ইতিহাসকে কেটে ফেলে দেয়া। এই প্রবণতা বোধ করি পৃথিবীর কোনো জাতির ইতিহাসেই পাওয়া যাবে না। ফররুখ আমাদের বহুস্বর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বর হিসেবে আদরনীয় হোক। বহুস্বরের মধ্যে প্রধান স্বরের গুরুত্ব বাড়ে বই, কমে না। ব্যক্তি জীবনে কবি ছিলেন লোভ লালসার ঊধ্বের্, স্বেচ্ছায় সুযোগ-সুবিধা ত্যাগী একজন মানুষ। নিজের ব্যাপারে তিনি গভীর আস্থাশীল ছিলেন। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে এ ভূখণ্ডের বেশির ভাগ কবি-সাহিত্যিকের মতো তিনিও মুসলমানদের আলাদা দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এ জন্য লেখালেখি করেছেন। কিন্তু তার সে স্বপ্ন ছিল আল্লামা ইকবালের মতো আদর্শগত, পরিবর্তন ও সুবিচারের স্বপ্ন।

তথ্যসূত্র : আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত ‘ফররুখ আহমদ কবিতাসমগ্র’ ফররুখ আহমদ ব্যাক্তি ও কবি, সাহাবুদ্দিন আহমদ সম্পাদিত। দৈনিক ইনকিলাব, রোর মিডিয়া।

কবি ও কবিতা নিয়ে আরও কিছু লেখা : 

নজরুল বাঙালির প্রতিভা : পৃথিবীর সংগ্রামী মানুষের অনুপ্রেরণা’

জাতীয় ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী

কাজী নজরুল ইসলাম: একুশ শতকে কেন অনিবার্য?

আল্লামা ইকবাল : কাব্যদর্শনের বরপুত্র

বিশ্বাসী কবি আল মাহমুদের মৃত্যুভাবনা ও ধর্ম দর্শন

একজন অবমূল্যায়িত ‘আল মাহমুদ’

রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা সাহিত্য 

ইসলামের সুমহান বানী প্রচারেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা দরকার

সংগ্রহ সম্পাদনা : হাছিব আর রহমান/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন