করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ সেশনজট

প্রকাশিত: ৬:০০ অপরাহ্ণ, জুন ১০, ২০২০
সেশনজটে বিশ্ববিদ্যালয়।

নাজমু্ল হাসান। সিনিয়র প্রতিবেদক, পাবলিক ভয়েস : করোনাভাইরাস আগ্রাসনে গোটা বিশ্ব এখন এলোমেলো। স্থির হয়ে আছে চলমান বিশ্বব্যবস্থা । থমকে গেছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রমে। অর্থনৈতিক, সামাজিক,রাজনৈতিক, ধর্মীয় সবকিছুই যেনো নিরব ও নিস্তব্দ। সরব শুধু করোনাভাইরাস। কিভাবে প্রতিহত, প্রতিরোধ করা যায় এ ভাইরাসকে তা নিয়েই ভাবনা বিশ্ববাসীর।

আমাদের দেশের শিক্ষা কার্যক্রম কখনো কখনো রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা প্রাকৃতিক দূর্যোগের জন্য বাধাগ্রস্থ হয়েছে। আবার আধুনিক যুগে প্রযুক্তির কল্যাণে শিক্ষাখাত উত্তরাধুনিক যুগে উপনীত হয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আমাদের নতুন করে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাড় করিয়েছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৫ মার্চ থেকে সারাদেশ লকডাউন ঘোষণা করা হয়। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ ছুটি আরো বাড়তে পারে।

বন্ধ ঘোষণার পর থেকে প্রায় তিন মাস যাবত উৎসবমুখর ক্যাম্পাসগুলো নিস্তব্দ হয়ে আছে। বর্তমানে করোনাভাইরাস প্রকোপে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ক্যাম্পাসগুলো পূনরায় কবে উৎসবমুখর হয়ে উঠবে তা আমাদের অজানা। লকডাউনে টিউশন বা পার্টটাইম জব যেসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা নিজেদের পড়ালেখার খরচ চালাতো, তারা এখন যে যার মতো অবসর সময় কাটাচ্ছে। পড়ালেখা, চাকরি এসব নিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন গুলো আজ মলিন হয়ে যাচ্ছে।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক বিভাগের স্নাতক বা মাস্টার্সের পরীক্ষা চলমান ছিলো। কিন্তু আবার কবে নাগাদ পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে শিক্ষার্থীরা বসতে পারবে তার কোনো নিশ্চয়তা নাই। এছাড়াও অনেক বিভাগের বিভিন্ন বর্ষের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যাদের পরীক্ষা শেষ হয়েছে তাদেরও রেজাল্ট পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ সেশনজট। একটা সেমিস্টার বা ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা পিছিয়ে গেলে তা কতটা সেশনজট তৈরি করে তা আমরা জানি। আর এ সেশনজটের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার মানসিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। এদেশে শিক্ষার্থীরা পাস করার আগে থেকেই চাকরির জন্য লেখাপড়া করতে থাকে। অনেকের লক্ষ্য থাকে বিসিএস, অন্যান্য সরকারি চাকরি; যা পেয়ে গেলে মনে করে সোনার হরিণ পাওয়া হয়ে গেছে।

দীর্ঘদিনের চেষ্টার পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ক্যাম্পাসগুলোতে রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ সবকিছু আবার তছনছ করে দেয়। যেকোনো রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের প্রথম শিকার হয় শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষার্থীরা। করোনাভাইরাস এর প্রভাবও প্রথম শিক্ষাখাতে পড়েছে। ১৭ মার্চ দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে শিক্ষার্থীদের গৃহবন্দী হয়ে বসবাস করতে হচ্ছে।

বর্তমান সংকটময় অবস্থা থেকে উত্তরণের স্থায়ী সমাধান কি তা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। কীভাবে সেশনজট থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেওয়া যাবে তা আমাদের ভাবতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের সকল সরকারি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুরু করেছে অনলাইন ক্লাসের প্রক্রিয়া। তবে কথা উঠছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট কমিয়ে আনতে অনলাইন ক্লাসের যৌক্তিকতা নিয়ে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক মোঃ শহীদুল হক পাবলিক ভয়েসকে বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট যে সেশনজট তৈরি হচ্ছে তা কিছুদিনের জন্য আমাদের মেনে নিতে হবে।

ড. মোঃ শহীদুল হক। সভাপতি : যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

অনলাইন ক্লাস নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে অনলাইন ক্লাস শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে অনলাইনে ক্লাস নেয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখন গ্রামে অবস্থান করছে। গ্রামে পর্যাপ্ত ইন্টারনেট পরিসেবার যেমন অভাব, তেমনি সব শিক্ষার্থীর অনলাইনে ক্লাস করার জন্য ইন্টারনেটে প্যাকেজ ক্রয়ের আর্থিক সামর্থ্যও নেই। তবে এককভাবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ইউজিসি -বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কমিটি, সিন্ডিকেট সভায় আলোচনা করে অনলাইন ক্লাস করার ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তিনি আরো বলেন, ক্লাস ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় যে সময়টি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে আছে, সেটির উত্তরণে তাদের পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। পাঠ্যক্রম পরিচালনা তথা পরীক্ষা গ্রহণ এবং ফল প্রকাশের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেহেতু স্বাধীন, সেহেতু তারাই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এইচআরআর/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন